log1

আমার স্মৃতিস্মারণে শ্রদ্ধেয় বনভন্তে এবং জুরাছড়ি

আমার স্মৃতিচারণে শ্রদ্ধেয় বনভন্তে এবং জুরাছড়ি

ভদন্ত বিমলানন্দ স্থবির

মৈত্রীপুর ভাবনা কেন্দ্র, ইটছড়ি, খাগড়াছড়ি।

জন্ম আমার জুরাছড়ি উপজেলায়। অবশ্য তখন জুরাছড়ি নামে পরিচিতি ছিল না। জুরাছড়ির নাম পরিচিতি লাভ করে ১৯৮২ সালে, যখন উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। আদিকাল হতে লোকেরাই চিনত সুবলং বা সুবলং খাগড়াছড়ি নামে। আর এই জুরাছড়ি হচ্ছে আয়তন ও লোকসংখ্যার দিক থেকেও বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট্ট থানা এবং উপজেলা। তাই জুরাছড়ির এটি তার আলাদা পরিচিতি। ১৯৯২ সালের শেষের দিকে এই জুরাছড়িতে রাজবন বিহারের শাখা বন বিহার হিসাবে স্থাপিত হয়। নাম সুবলং শাখা বন বিহার। এটিই শ্রদ্ধেয় বনভন্তের সর্ব প্রথম শাখা বন বিহার এবং শাখা বিহার প্রতিষ্ঠার সূচনা করা হয়। যদিও তার আগে যমচুগ ভাবনা আশ্রম ছিল, কিন্তু সেটি বন বিহার শাখা বিহার হিসাবে নয়, কেবল মাত্র অরণ্য কুটির হিসাবে প্রতিষ্ঠা হয় এবং পরে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।

04

১৯৯৩ সালে এই শাখা বন বিহারে প্রথম বারের মতো দানোত্তম কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠিত হয়। যেমনি প্রথম শাখা বন বিহার প্রতিষ্ঠা এবং দানোত্তম কঠিন চীবর দান উদ্‌যাপন, তেমনি আমার জীবনের প্রথম স্বচক্ষে দেখা কঠিন চীবর দানোৎসব। আর অন্যদিকে সে বছরই শ্রদ্ধেয় বনভন্তেকে আমার জীবনের প্রথম দর্শন। এর আগে আমার তাঁকে স্বাক্ষাত পাওয়ার ভাগ্য জোটেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ার কারণে ১৯৮৭ সালে পার্শ্ববর্তী ভারতের উত্তরপূর্ব মিজোরাম রাজ্যে জীবনযাপন করি। ১৯৯২ সালের প্রথম দিকে উদ্ভাস্তু জীবনযাপন থেকে পরিসমাপ্তি হয়ে জন্ম স্থানে আবারও প্রত্যাবর্তন করি। এরপর ১৯৯৬ সালে শেষের দিকে এই শাখা বন বিহারে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে এবং ১৯৯৭ ইংরেজিতে রাজবন বিহারে উপসম্পদা (ভিক্ষুত্ব) লাভ করি।

প্রথম যেই দিন শ্রদ্ধেয় বনভন্তেকে দর্শন করি সেই দিনের কথা স্মৃতিচারণ করলে মনে হয় কী যেন অলৌকিক ব্যাপার। লোকমুখে যখন রাষ্ট্র হল শ্রদ্ধেয় বনভন্তে অমুক তারিখে দানোত্তম কঠিন চীবর দান উপলক্ষে জুরাছড়ি আসছেন, ঠিক তার আগের দিনে আমি ঘর থেকে জুরাছড়ি উদ্দেশ্যে রওনা হই। তাঁকে এবারে প্রথম সাক্ষাত পাব এই ভেবে মনে কী যে আনন্দ অনুভব করেছিলাম তা এখনো প্রকাশে ভাষা খুঁজে পাই না। যখন তিনি বেলা ৩ টা দিকে জুরাছড়ি পৌঁছতে যাচ্ছেন, তখন বিহারের বোটঘাটে অপেক্ষামান দায়ক-দায়িকা উপচেপড়া ভিড়। এর মাঝে আমিও আপ্লুত ও আত্মহারা হয়ে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর তিনি স্পীড্‌ বোট নিয়ে ঘাটে এসে পৌঁছলেন, তখন আমি ১০/১৫ গজের মধ্য থেকে ভন্তেকে দেখলাম। তখন শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে দেখছি মনে হয় যেন ইউরোপিয়ান মানুষের মতো ধবধবে সাদা, উজ্জ্বল লাবণ্যময় মুখের চেহারা। মনে মনে তখন ভাবছি তিনি হয়তো বিল্ডিংয়ের ভিতরে দীর্ঘ বছর ধরে থাকতে থাকতে হয়তো এ রকম উজ্জ্বল ব্রহ্মবর্ণ সদৃশ হয়েছেন। তারপর দিন যখন দ্বিতীয়বারে তাঁকে দর্শন করতে গেলাম তখন তিনি আসনে উপবিষ্ট আছেন। তখন লক্ষ্য করলাম তাঁর স্বাভাবিক রূপ প্রতিভাত হল। আর তখনও মনে মনে ভাবছি যে হায়! শ্রদ্ধেয় ভন্তে এখানে আসার পরপরই অন্যান্য ভন্তেগণের মত স্বাভাবিক রূপ (এমনিতে তাঁর স্বাভাবিক রূপ ফর্সা) পরিবর্তন হল। কিন্তু তখন আমার মহাপুরুষের কতগুলো যে বৈশিষ্ট্য এর সর্ম্পকে বিন্দু মাত্রও ধারণা ছিল না। সত্যিকার অর্থে সেটি হচেছ আমার জীবনের প্রথম মহাপুরুষ দর্শনের শুভ সূচনার একটি বহিঃপ্রকাশ। বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করলে অনুমান করা যায়, মহাপুরুষগণের এ দৃশ্য সকলের নিকট দৃশ্যমান হয় না। এর মধ্যে রয়েছে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং সৌমনস্য সহগত চিত্তের ব্যাপার।

এই সুবলং শাখা বন বিহার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার পিছনে রয়েছে এক বিরাট কাহিনী (কাহিনী সবার জানা)। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে যখন কোন এক স্থানে সর্বপ্রথম তাঁর শাখা বিহার প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন তখন তাঁর স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল। কেন না, তাঁর অনুশাসনে যোগ্য ও অভিজ্ঞ এবং তাঁর মতাদর্শের ভিক্ষুসংঘ প্রয়োজনে এক প্রকার কারণ ছিল। তিনি নিজেও শিষ্যসংঘের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও অভিজ্ঞ (মার্গফল প্রাপ্ত) সম্পন্ন শিষ্যের কথা তাঁর দেশনার মধ্যে উত্থাপন করতেন। তাই শাখা বন বিহার প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁর অনুমোদন পাওয়া অনেক কষ্টসাধ্য হয়েছিল জুরাছড়ি এলাকাবাসীর দায়ক দায়িকাদের জন্য। তিনি রীতিমতো বিরাট দায়িত্বের ভার দিয়ে শাখা বিহার প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকারনামা আরোপ করেন। কিন্তু জুরাছড়ি দায়ক দায়িকারাও পিছপা না হয়ে বড় দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে মহাপুরুষের নিকট লিখিত অঙ্গীকারনামা অনুমোদন নিয়ে নেন। মহাপুরুষের আশীর্বাদ থাকার ধরুন আদৌ পর্যন্ত ধর্মের পরিহানীমূলক পরিস্থিতি উদ্ভব হয়নি।

আমার জীবনে সদ্ধর্মের পথে ধাবিত হওয়ার ভিত্তিস্তম্ভ হচ্ছে এ সুবলং শাখা বন বিহার। যদিও আমি জন্ম সূত্রে বৌদ্ধকুলে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে কর্মসূত্রে বৌদ্ধ হতে সক্ষম হয়েছি, যখন শ্রদ্ধেয় বনভন্তেকে দর্শন লাভ করি। এবং তার পাশাপাশি এই শাখা বন বিহার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে আমি বিহারে ওতপ্রোতভাবে আসতে পেরেছি। কেননা, আমার জন্ম স্থান উপজেলা সদর হতে ১৫/২০ কিলোমিটার দূরে। বাল্যকাল হতে ধর্ম-কর্ম করার ক্ষেত্রে সুযোগ পাওয়ার তেমন পরিবেশ পায়নি। বাল্যকাল জীবন অর্ধেক কাটিয়েছি দেশের বাইরে। তাই নিজেকে সদ্ধর্ম অনুকুলে রাখতে সুযোগ লাভ করতে পারিনি। তবে এটা সত্য যে, যদিও বাল্যকাল হতে ধর্ম শিক্ষা পায়নি কিন্তু ধর্ম-কর্মের প্রতি আমি খুবই শ্রদ্ধাশীল। সেক্ষেত্রে আমি নিজেকে অনেকটা গর্ববোধ করি।

জুরাছড়ি সর্ম্পকে শ্রদ্ধেয় বনভন্তে এ হতে ১৭ বছর আগে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা বর্তমানে বাস্তব রূপ প্রতিফলিত হতে যাচ্ছে। আমি আশাকরি আর কয়েক বছরের মধ্যে বাস্তবে রূপ নিতে পারে। আমার স্মৃতিপাতায় এখনো ভেসে উঠে সেই দিনকার কথা, আমরা (আমি তখন গৃহী) তাঁকে পালকীতে করে জুরাছড়ি রাস্তামাথায় স্পীড বোটে তোলে দিতে যাচ্ছি, যখন আমরা রাস্তার মাঝপথে আসি তখন কতিপয় উপাসক ভন্তেকে বলেছিল, ভন্তে কবে আমরা গাড়ীতে করে ভন্তেকে পৌঁছে দিতে পারব? প্রত্যুত্তরে শ্রদ্ধেয় ভন্তে বলেছিলেন, “কমপক্ষে আরো ২০/২২ বছর সময় লাগবে।” অন্ততঃ এখন কিছুটা হলেও আঁচ করা যাচ্ছে যে, বাধের পানি যখন নেমে যায় তখন উপজেলা সদর হতে রাস্তা মাথা পর্যন্ত টেক্সীর মাধ্যমে কোন রকম হলেও সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতে পারছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে অন্যান্য গাড়ীও চলাচলের যুগোপযোগী হয়ে উঠবে। বলতে গেলে শ্রদ্ধেয় ভন্তের ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে এটি একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত।

শ্রদ্ধেয় বনভন্তে শুধুই জুরাছড়ি সদর এলাকায় পদাচারণ করেননি। তিনি জুরাছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আনাচেকানাচেও পদাচারণ করেছিলেন। এর মধ্যে উল্যেখযোগ্য হচ্ছে ফকিরাছড়া। কেননা, ফকিরাছড়া যোগাযোগ দিক দিয়ে বিচার করলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ন্যায়। সেখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম পায়ে হেঁটে চলা। সেখানে যেতে হলে নেই কোন নৌকা, বোট কিংবা গাড়ী। জুরাছড়ি সদর হতে দক্ষিণে প্রায় ১৫/২০ কিলোমিটার দূরে সেখানেও তিনি ৪ মার্চ ১৯৯৬ ইং তারিখে গমণ করেছিলেন। বলতে গেলে তখন সেখানকার জনসাধারণ বাহ্যিক শিক্ষাদীক্ষা সহ ধর্মীয় শিক্ষা ক্ষেত্রেও ছিল প্রায় পিছিয়ে। তারপরও তাঁর মহান করুণা আধারে তিনি স্ব ইচ্ছায় সেখানে পর্দাপন করেছিলেন। তাঁকে নেওয়া হয়েছিল বাঁশের ভেলা দিয়ে শত শত মানুষের শারীরিক ও মানসিক শক্তির টান দিয়ে। তাঁর মহান ত্যাগ তিতিক্ষা ফলশ্রুতিতে আজ সে এলাকা হতেও কয়েক জন ভিক্ষু-শ্রামণ বর্তমানে তাঁর অনুশাসনে রয়েছে।

এক সময় শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বিদ্বেষী মানুষ ছিল অনেক। প্রায় প্রত্যেক জায়গায় সে রকম মানুষ প্রায়ও শ্রদ্ধেয় বনভন্তের প্রতি অগুণ বর্ণনা হতে শুরু করে বিবিধ অসংযত বাক্য দ্বারাও ব্যবহার লোকমুখে শ্রুত হত। আর শ্রদ্ধেয় ভন্তেও নিজে মাঝে মধ্যে তাঁর প্রতি বিদ্বেষী কতিপয় লোকের নাম উল্লেখ করে দেশনা প্রসঙ্গে উত্থাপন করতেন। বলাবাহুল্য সে রকম শ্রদ্ধেয় ভন্তের বিদ্বেষী মানুষ জুরাছড়িতে নেই বললেই চলে। শ্রদ্ধেয় ভন্তের প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা কিংবা ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা থাকুক বা নাই থাকুক কিন্তু কখনো জুরাছড়িতে সে ধরণের শ্রদ্ধেয় ভন্তের প্রতি বিদ্বেষী , কটুক্তি প্রলাপকারী মানুষের কথা এখনো রাষ্ট্র হয়নি। কাজেই সে দিক দিয়ে জুরাছড়ির কুকীর্তি নেই।

বর্তমানে জুরাছড়িতে সপ্তাহকালীন এবং ততোদিক সময়ের জন্য প্রব্রজ্যা নেওয়া একটা নীতিগত রেওয়াজ রয়েছে। বলা বাহুল্য এই পরিবেশ অন্য কোথাও দৃষ্ট হয়নি। প্রতি বছর বিশেষ করে চীবর দানের সময়, শ্রদ্ধেয় বনভন্তের জন্মদিনের পূর্বে এবং বিঝু (বাংলার নববর্ষ বরণ) সময়ে বেশী প্রব্রজ্যা হওয়ার হিরিক পরে। আসলে মানুষের চিন্তা চেতনা এবং বুদ্ধিদীপ্ত হয় কতগুলো পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপরও নির্ভর করে। আর মানুষ মাত্রই কমবেশী অনুকরণশীল। এর ফলে আয়তন ও জনসংখ্যার গড় অনুপাতে তুলনা করলে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের শিষ্যসংঘ জুরাছড়ি উপজেলা হতে ভিক্ষুর সংখ্যায় এত কম নয়। আর এর একটি কারণ হচ্ছে এক সময় শ্রদ্ধেয় বনভন্তে ঘনঘন জুরাছড়িতে পদাচারণ। এর ফলে কমবেশী জনসাধারণের মন মানসিকতা এবং চিন্তা চেতনা পরিবর্তনের নিশ্চয়ই একটি বড় কারণ রয়েছে। আর তিনি নিজেও তখন বলতেন জুরাছড়ি আমার বিহার (অবস্থান) করার একটি পরিবেশবান্ধব স্থান। কোলাহল মুক্ত অনেকটা নিরিবিলি পরিবেশ হিসাবেও তিনি প্রশংসা করতেন। তাই তখন তিনি প্রতিবছরে অন্ততঃ তিন চার বার জুরাছড়িতে পদার্পন করে থাকতেন। নিঃসন্ধেহে বলা যায় মহাপুরুষের পদাচারণার এটি একটি উন্নতির মাইলফলক। অধিকন্তু বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ণ করলে তিন পার্বত্য জেলার সর্বমোট ২৫ টি উপজেলার মধ্যে একমাত্রই জুরাছড়ি উপজেলাটি পাহাড়ী অধ্যুষিত অঞ্চল। তদ্ধেতু জাতিগত বিদ্বেষ সমস্যাও নেই বললেই চলে।

আমার দৃষ্টিতে সুবলং শাখা বন বিহার পরিচালনার ক্ষেত্রে ভূবনজয় সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরও অবদান অনস্বীকার্য | অবশ্যই এর পেছনে রয়েছে বড় অবদান সেই উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশিষ্ট প্রবীন শিক্ষক, সুবলং শাখা বন বিহারের পরিচালনা কমিটির অতীত-বর্তমান সভাপতি বাবু ধ্বল কুমার চাকমা। আর আমার স্মৃতি নেত্রে ভেসে উঠে এক সময় সেই স্কুলের সহকারী শিক্ষক বাবু আশীষ বড়ুয়া। অনেকটা তাঁদের ঐকান্তিক উৎসাহ উদ্দীপনায় ছাত্রছাত্রীরা ধর্ম-কর্ম কাজে অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। প্রত্যেক বছর কঠিন চীবরদান হতে শুরু করে প্রত্যেকটি ছোট বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পরিবেশনার ক্ষেত্রে; পাশাপাশি বিহারের অন্যান্য কাজেও বড় ভূমিকা পালন করত সেই হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। তুলনামূলকভাবে অন্যান্য জায়াগায় ওরকম বড় উৎসাহ উদ্দীপনা ঐক্যভাবে এগিয়ে আসতে কম দৃষ্ট হয়। যদিও অন্যান্য এলাকাতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বিচ্ছিন্নভাবে সহযোগীতা দিয়ে থাকলেও ভূবনজয় সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর ন্যায় নয়। বলাবাহুল্য এক সময় আমিও যখন গৃহী জীবনে সেই স্কুলের ছাত্র ছিলাম তখন বিহারের বিভিন্ন কাজকর্মে যথাসাধ্য ভিবিন্ন ধর্মীয় কাজে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। আমি মনে করি, আমার জীবনে সদ্ধর্মে অনুরাগী হওয়া এবং প্রব্রজ্যিত জীবন লাভ করা ইত্যাদি অনুপ্ররণা সে হতে শুরু হয়। চিন্তা চেতনা অনেকাংশে ওভাবেই ধীরে ধীরে মন পরিবর্তনের অবকাশ পায়। এ হতে আমি নিজেকে সৎভাবে চলার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম।

আমার ভিক্ষুত্ব জীবন প্রথম বর্ষা শেষে দ্বিতীয় বর্ষা শুরুর মাঝে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের সেবকের দায়িত্ব পালন শুরু করি। ২০০০ সালের কঠিন চীবর দান মাস শুরু হয় প্রথম জুরাছড়ি হতে। রাজবন বিহার হতে প্রকাশিত কঠিন চীবর দানের কর্মসূচী অনুসারে জুরাছড়ি এলাকাবাসী দায়ক দায়িকারা শ্রদ্ধেয় বনভন্তেসহ ভিক্ষুসংঘকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথা সময়ে রাজবন বিহারে উপস্থিত, ঠিক সেই মহূর্তে শ্রদ্ধেয় ভন্তে আমাকে জানিয়ে দিলেন তিনি শারীরিক অসুস্থতা বোধ করছেন কাজেই ফাঙে যেতে পারবেন না। তখন আমি ভন্তের মনোভাবে ছিলাম। তারপরও আমি দায়ক দায়িকাদেরকে শ্রদ্ধেয় ভন্তের ফাঙে না যাওয়ার অপারগতা প্রকাশের বিষয়টি জানিয়ে দিলাম। তখন স্বাভাবিকভাবে দায়ক দায়িকারা দুশ্চিন্তায় পড়লেন। যেহেতু প্রত্যেক দায়ক দায়িকাদের মূল দৃষ্টি আকর্ষণ থাকে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের উপস্থিতি। শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে দুপুর সোয়েং (ভোজনাহার) শেষে যখন তাঁর বাসভবনে নিয়ে আসি তখন তাঁকে কোন কিছু না বলেই তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে দিচ্ছি ফাঙে যাওয়ার জন্য। তখন আমার দিকে থাকিয়ে সামান্য মুচকি হেসে বললেন, “শারীরিক কেমন জানি অসুস্থভাব পাচ্ছি, কোন অসুবিধা হবে না তো?” তখন আমি শ্রদ্ধেয় ভন্তের মনোভাব একটু নমনীয়তা ভাব প্রকাশ পেয়ে সাহস করে বললাম ভন্তে, আশা করি কোন অসুবিধা হবে না………। তখন তাঁর পাশে থাকা ক্যাসেটের রীলের বান্ডিলগুলো বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তখন আমি নিশ্চিত হলাম তিনি ফাঙে যাবেন। মোটাকথা আমার ধারণা শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁকে সেবাশুশ্রুষা দেওয়া একটা বড় অবদান, অন্য দিকে তিনি নিজেই জানেন যে আমি জুরাছড়ি হতে প্রব্রজিত হয়েছি, কাজেই আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে। তাই শ্রদ্ধেয় ভন্তেরও আমার এবং জুরাছড়ি এলাকাবাসী দায়ক-দায়িকাদের প্রতি অনুকম্পা নিশ্চয় থাকতে পারে।

প্রত্যেক মানুষের কম-বেশী তার ভাগ্য নিহিত থাকে। প্রথমে সে তার ভাগ্য যে একজন মানুষ হিসাবে জন্ম; সেটা তার বিরাট একটা সৌভাগ্য। খুব কম মানুষই জানে তার নিহিত ভাগ্যেকে পরিস্ফুটন করতে। ভাগ্যরূপী মনুষ্য কুলে জন্ম গ্রহণ, সুতরাং সে যদি জানে না তার মানুষ হিসাবে করণীয় কর্তব্য কী, তাহলে পরে সে তো নিশ্চয়ই দুর্ভাগ্যটাকে ভরণ করেই নিতে হবে। সাধারণ মানুষ মনে পোষন করে থাকে সে যদি একজন উচ্চ শিক্ষিত, বড় চাকরী জীবি, অর্থবিত্ত, গাড়ী-বাড়ি ইত্যাদি স্বয়ং সম্পূর্ণ তিনিই ভাগ্যবান ব্যক্তি। কিন্তু বৌদ্ধের দৃষ্টিকোণে তিনিই ভাগ্যবান, যিনি নিজেকে সত্যপথে পরিচালিত করার সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছেন। অর্থাৎ সে যদি তাঁর জীবন বুদ্ধের পরিভাষায় শীলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আর্য্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ পথে পরিচালিত করতে পারেন তবেই সার্থক অনেকেই এর মূল অর্থ না বুঝে অনেক সময় অনর্থক বিপরীত চিন্তা করে নিজেকে নিস্তেজ করে ফেলেন। হয়তো এক জন ব্যক্তি তার কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে বিত্তশালী হতে পারে, উন্নতমানের লেপ তৌষক ক্রয় করতে পারে। কিন্তু সে অর্থ দিয়ে উন্নত লেপ তৌষকে আরামে নিদ্রা যাওয়ার সে নিদ্রাসুখটি অর্থ দিয়ে ক্রয় করতে পারবে না। সে যদি অতীত কিংবা বর্তমান প্রাণী হত্যার অকুশল পাপ জনিত কর্ম বিপাক থাকে, সে যদি একজন প্যারালাইসিজ্‌ রোগী হয়, তাহলে কী সেই উন্নত মানের লেপ তৌষকে নিদ্রাসুখ এনে দিতে পারবে! সে হয়তো তার পরিশ্রমের মাধ্যমে সে বস্তু গুলো ক্রয় করতে পারবে, কিন্তু সে নিদ্রাসুখ ক্রয় করতে পারবে না। সে জন্য তার অবশ্যই কুশল কর্মই থাকতে হবে। সে তার স্বয়ং  কুশল কর্মের ফলে তার অর্জিত সম্পদ নিয়েই সুখী হতে পারবে, অন্যথা অলীক কল্পনা মাত্র। তদ্ধেতু প্রয়োজন বুদ্ধের শিক্ষা। বুদ্ধের শিক্ষা পেতে হলে তার অবশ্যই ধর্মালোচনার পাশাপাশি বই পুস্তকও পঠনপাঠন করতে হবে। খারাপ কাজে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি কিংবা শিক্ষকের প্রয়োজন পরে না, কিন্তু সুশিক্ষা করতে হলে অবশ্যই তা প্রয়োজন পরবে। একাডেমী শিক্ষা পেতে হলে তার অবশ্য বিদ্যালয়ে যেতে হবে তদ্রুপ ধর্ম শিক্ষা পেতে হলে অবশ্যই তার ক্যায়ং বা বিহারে যেতে হবে। সকলের অবশ্য এটা মনে রাখতে হবে যে, একাডেমী শিক্ষায় মানুষকে ইহ জীবনে কোন রকম বেঁচে থাকার দিক নির্দেশনা করে, কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষায় ইহ-পরকাল সার্বিক উন্নতি এবং চিরতরে দুঃখমুক্তির নির্বাণ সুখ পর্যন্ত দিক নির্দেশনা প্রদান করে থাকে।

অতএব, আমার স্মৃতিচারণের এ প্রবন্ধ পাঠ করে অন্ততঃ কিছুটা হলেও পাঠকগণের মনে স্বকীয় জীবনকে উন্নতি সাধন করার পথে অনুপ্রাণিত করবে। স্বকীয় জীবন সার্বিক উন্নতির পাশাপাশি অপরেরও সুখ শান্তি বয়ে আনুক সকল পাঠকগণের নিকট এ প্রত্যাশা… … …। “জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক

 

 

Print Friendly, PDF & Email