log1

আদর্শ সমাজ ও জাতি গঠনে বৌদ্ধ ধর্মের ভূমিকা

আদর্শ সমাজ জাতি গঠনে বৌদ্ধ ধর্মের ভূমিকা    

 

    কৃতি চাকমা

      ভগবৎ গৌতম বুদ্ধের সমIMG_3344কালীন অনেক জাতিগোষ্ঠী নিজেদের আচার-আচরণে, নীতি-আদর্শে ও ত্যাগ-তিতিক্ষায় প্রদীপ্ত হয়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানে, বিদ্যা-বুদ্ধিতে ও শিল্প চর্চায় তারা ছিলেন অতুলনীয় এবং সকলের প্রশংসিত। সে সময়ে বৈশালী, শ্রাবস্তী, রাজগৃহ ইত্যাদি জনপথ ছিল সমৃদ্ধ নগরী। এসব জনপদের অনেক শ্রেষ্ঠী, ব্রাহ্মণ, গৃহী, ধার্মিক ব্যাক্তি এমনকি সমাজে অবহেলিত ও নিগৃহীত ব্যাক্তি এবং নারী বৌদ্ধধর্মের আদর্শে জীবনকে পরিচালিত করে নিজেদের ধন্য করেছেন এবং সে সাথে সমাজে রেখেছেন বিরাট অবদান। দানময়, শীলময় ও ভাবনাময় চিত্ত সদা জাগ্রত রেখে সদ্ধর্মের উন্নয়নসহ সমাজ ও জাতির সামগ্রিক অগ্রগতিতে রেখে গেছেন অনন্য ভূমিকা। তাছাড়া বৌদ্ধধর্মের আদর্শে তথা বৌদ্ধনীতির ভিত্তিতে অনেক রাজ্যের রাজা, মহারাজাগণ রাজ্য পরিচালনা করতেন। প্রজাদের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্দির জন্য তারা সর্বদা থাকতেন নিবেদিত প্রাণ। বর্তমান সময়ে অনেক বিশৃঙ্খল, দুর্নীতিগ্রস্ত তথা অধোঃমূখী সমাজ ও জাতিকে শান্তি ও সমৃদ্দির দিকে ধাবিত করতে আবারও সেই পরম করুণাময় বুদ্ধের বাণী বারংবার স্মরণ করতে হয় এবং তা অনুসরণের কোন বিকল্প নেই। তাই আদর্শ সমাজ ও জাতি গঠনে বৌদ্ধধর্ম যে অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে সে প্রেক্ষিত আলোচনা করাই এ লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য।

        জন্মের মাধ্যমে কেউ দুর্নীতি পরায়ণ, অসৎ ও অধার্মিক হয়ে জন্মায় না। সমাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরিবেশ থেকে সে শিক্ষা লাভ করে এবং সেভাবে সে আস্তে আস্তে নিজেকে প্রস্তুত করে। যে সমাজে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা এবং ন্যায়-নীতি বিদ্যমান সে সমাজ শান্তি ও সমৃদ্দির দিকে ধাবিত হয়।  মানুষের মন সদা পবিত্র থাকে ও অনেক ধর্ম পরায়ণ হয়। ফলে সমাজের মধ্যে বিরাজ করে অনাবিল শান্তি ও সমৃদ্ধি।  অন্যদিকে যে সমাজ বিশৃঙ্খল ও ন্যায়-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত নয় এবং সমাজে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধাভাব বিদ্যমান এবং নিজেরা সবসময় অন্তর্কলহ ও নানা কটু বাক্য, পিছুন বাক্য এবং সর্বোপরি মিথ্যাদৃষ্টি পরায়ণ হয় সে সমাজ কখনও উন্নতি লাভ করতে পারে না। সমাজে সবসময় অশান্তি বিরাজ করে।  এ ধরণের পরিস্থিতে কোন জ্ঞানী কিংবা কোন ধর্ম পরায়ণ ব্যাক্তি সুখে বসবাস করতে পারে না। সমাজের লোকগুলো স্বার্থবাদী তথা ব্যাক্তি ভোগ বিলাসে বেশি মত্ত থাকে। সমাজে বসবাসরত অন্য বাসিন্দাদের প্রতি তারা সব সময় উদাসীন থাকে এবং সময় ও সুযোগ বুঝে নিন্দা ও হিংসা করতেও দ্বিধা করে না। এ ধরণের বিরুপ পরিস্থিতে কোন দেবতা কিংবা কোন মহাপুরুষ সে সমাজে জন্ম গ্রহণ করে না।  কাজেই যে জন্মগ্রহণ করবে কিংবা বসবাস করবে সেও আস্তে আস্তে সে সমাজের নানা কুটিলটায় আস্তে-পৃষ্ঠে জড়িত হয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তুলবে। এ জন্যই ভগবান গৌতম সমাজে শৃঙ্খলা ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মানব তথা সমাজের কল্যাণে আজীবন কাজ করে গেছেন এবং তাঁর প্রত্যেকটি উপদেশ ও পরামর্শ অনুসরণ করে অনেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে তৎকালীন লিজ্জবিগণ একটি শ্রেষ্ঠ ও অজেয় জাতিতে পরিণত হয়েছিলেন। সাতটি নীতি তারা সবসময় পরিপালন করতেন যা বৌদ্ধধর্মে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম নামে পরিচিত। মগধরাজ অজাতশত্রু বৃজিদের রাজ্য আক্রমণ করার আগে তার বিচক্ষণ প্রধান মন্ত্রীকে বুদ্ধের কাছে পরামর্শের জন্য পাঠালে ভগবান বুদ্ধ আনন্দকে সম্বোধন করে এবং মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বৃজিদের মধ্যে উক্ত নীতি অনুসরণ করার কথা বলেন। ফলে রাজা অজাতশক্র বৃজিদের আর আক্রমণে যাননি। এ থেকে বুঝা যায়, ধর্মের কত গুণ, একতার কত শক্তি। মহাপরাক্রমশালীও ন্যায়-নীতির কাছে মাথানত করতে বাধ্য হয়। কাজেই সামগ্রিক উন্নতির জন্য আদর্শ সমাজ ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই এবং আদর্শ সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্দশালী জাতি গঠন করা সম্ভব।

      ভগবৎ গৌতম তার ‘‘অহিংসা নীতি’’র উপর ভিত্তি করে ধনী-গরীব, উচু-নীচু, রাজা-প্রজা, ব্রাহ্মণ-শুদ্র সকল শ্রেণির মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন। তাঁর মহান করুণাময়ী বাণী দেব- মনুষ্যসহ সকল প্রাণীর মঙ্গলার্র্থে উচ্চারিত ও প্রচারিত। বৌদ্ধধর্মের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং কেহ পর নয়। বুদ্ধের সমকালীন সমাজ ব্যবস্থায়ও যে জাত-পাতের ভেদাভেদ ছিল; ছিল নারীর প্রতি পুরুষের বিরুপ মনোভাব।  নারী পর্দার অন্তরালে, ঘরের কোণে বসে থাকবে, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে কাজ করবে, এই ছিল সমাজের মধ্যকার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। ভগবান গৌতমই প্রথম মহামানব যিনি এ জাতপাত বিভেদে ভরা সমাজকে আলোর পথে ঠেনে এনেছেন এবং মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তিনি মানুষকে নতুন অরুণোদয়ের মতো অমৃতময় দুঃখ-মুক্তির বাণী শুনালেন। সকল প্রাণীর প্রতি তার যে মৈত্রী-করুণার বহিঃপ্রকাশ তা সকলকে সম্মোহিত করেছে। তিনি জোর করে কাউকে তাঁর ধর্মবাণী শ্রবণ করার উপদেশ দেননি, বরং তিনি বলেছেন, “এসো, দেখো এবং পরীক্ষা করে দেখো। ভাল লাগলে গ্রহণ কর আর ভাল না লাগলে বর্জন কর।”  এ ধরণের মৈত্রী পরায়ণ ও করুণা মিশ্রিত বাণী দিয়ে তিনি জয় করেছেন সকল শ্রেণির মানুষের হ্নদয়, জয় করেছেন বিশ্ব মানবতাকে। তার প্রচারিত ধর্মে নেই কোন ভেদাভেদ, নেই কোন হিংসা-হিংসি, হানাহানি; আছে শুধু মানব মুক্তির পথ, যে পথ তিনি সকলকে দেখিয়ে দিয়েছেন। যে পথ অনুসরণ করলে কোন দুঃখ নেই, আছে শুধু পরম শান্তি।

      একটি আদর্শ সমাজ গঠনে পরিবারের ভূমিকা অনেক। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা সুদৃঢ় হতে হবে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সদ্ধমের্র চর্চা থাকতে হবে। গৃহীদের জন্য পালনীয় যে পঞ্চনীতি আছে তা অনুসরণ পূর্বক নিজেকে সবসময় অকুশল কর্ম থেকে বিরত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। অন্তত কাউকে উপকার করতে না পারলেও ক্ষতি করব না এই মন মানসিকতা সর্বদা লালন ও পালন করতে হবে। পরিবারের কোন সদস্য যদি বিপদগামী হয় কিংবা কোন অকুশল কর্মে লিপ্ত হয় কিংবা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণপূর্বক খোলাখুলি আলোচনা করা দরকার। তার কৃতকর্মের ফলাফল তথা ক্ষতির দিকগুলোকে সুন্দরভাবে তার সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এ ধরণের আচরণ যদি পরিবারের মধ্যে চর্চ্চা করা হয় তবে সেই পরিবার একটি আদর্শ পরিবার হয়ে উঠবে।  এভাবে সমাজের মধ্যেও যদি পারস্পরিক বন্ধনসমূহ সুদৃঢ় করা যায়, তাহলে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করা অসম্ভব কিছু নয়। এক্ষেত্রে এলাকার শিক্ষিত ও স্ব-শিক্ষিত  যুবক-যুবতীদের বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শে উজ্জিবিত হয়ে নিজেদের সকল প্রকার অকুশল ও হীন কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখতে হবে। কারণ নিজের মধ্যে সৎ গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ ও চর্চ্চা না করলে অপরজনকে বোঝানো, কিংবা সমাজের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ প্রেক্ষিতে ভগবান বুদ্ধের উপদেশ হচ্ছে, আগে নিজেকে মুক্ত করতে হবে, তারপর অন্যকে মুক্তির পথ দেখাতে পার। নিজে মুক্ত না হয়ে অন্যকে মুক্তির পথ দেখানো এক ধরণের প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। দুঃখজনক বিষয় যে, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ ব্যবস্থা দিনকে দিন ক্ষয়িষ্ণুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নানা সমস্যার আবর্তে সমাজ অগ্রগতির বৈশিষ্ট্যসমূহ লোপ পাচ্ছে। অবশ্য অন্যতম দায়ি আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। আদিবাসী বৌদ্ধ যুব সমাজের একটি অংশ ঊচ্ছৃঙ্খল আচরণ তথা নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পড়ছে। এছাড়া অনেকে মদ. গাজা, হেরোইনসহ নানা ধরণের নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করে সমাজকে কলুষিত করছে। অথচ যদি তারা সত্যিকার বৌদ্ধধর্মাচরণ করতঃ তাহলে এ ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত হতো না এবং সমাজে অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারত। একমাত্র সদ্ধর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা তথা বৌদ্ধধর্মের নীতি ও আদর্শ মতে জীবনকে পরিচালিত করার মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করা সম্ভব।

      বর্তমান পুজিবাদী ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থায় মানুষ ব্যাক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য  তথা সুখের সন্ধানে কত কিছুই না করে। ক্ষমতা আর বস্তুগত সম্পত্তির লোভে মনের অজান্তে কতই না পাপ কাজে জড়িত হয়ে পড়ে।  ব্যাক্তিকেন্দ্রীক স্বার্থের পেছনে দৌঁড়াতে এক সময় কখন যে সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সে নিজেই টের পায় না। যখন সে বুঝতে পারে তখন সে অনেক দূরে চলে যায় এবং তার কাছে জীবনটাই বৃথা মনে হয়। সে বুঝতে পারে এতদিন সে মরীচিকার পেছনে ছুঁটেছিল কিন্তু কিছুই লাভ করতে পারেনি। এজন্যই ভগবান বুদ্ধের অমূল্য উপদেশ বাণী অনুসারে লোভ, দ্বেষ, মোহকে ত্যাগ করা উচিত। ভোগ লোভ থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র, সৌম্য, মৈত্রীপরায়ণ হওয়াই হচ্ছে সেই সুপ্রাচীন মহান বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা। তাছাড়া আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের সম্যকভাবে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত। সমাজের কোন ব্যাক্তি যদি সম্যকভাবে জীবিকা অর্জন করে, সম্যকভাবে কর্ম সম্পাদন করে তাহলে সে সমাজে খুবই প্রশংসনীয় হই এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কাজ করতে আরো অনুপ্রাণিত হয়। এভাবে বুদ্ধের উপদেশ মতে জ্ঞান ও কর্মের সহযোগে সমাজে কোন উদ্যোগ নিলে, সে উদ্যোগ সাফল্যের মুখ দেখবেই এবং সমাজ সামনে এগিয়ে যাবে।

      সত্য কথা বলতে আমি দ্বিধাবোধ করব না এজন্য যে সত্য অনেক সময় অন্যের ভুল ধারণা ভেঙ্গে দেয় এবং জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়। বৌদ্ধধর্মালম্বী হলেও অনেকে সদ্ধর্মের নিয়ম-কানুনগুলো সঠিকভাবে পরিপালন করতে জানে না। যেমন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গেলে কিংবা পথে ঘাটে পূজনীয় ভিক্ষু সংঘের সাথে সাক্ষাত হলে কিভাবে আচরণ করতে হবে, ভিক্ষু সংঘের সামনে কিভাবে বসে বন্দনা করতে হবে, অনুষ্ঠানে গেলে কিভাবে আচরণ করা দরকার তা অনেকের অজানা।  ফলে অনেক সময় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় এবং আসল উদ্দেশ্য ও কর্ম সম্পাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। যেমন ধর্মীয় সভা হোক কিংবা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কোন আলোচনা সভা হোক অনেকে সভা শেষ হওয়া পর্যন্ত না থেকে বাড়ীতে চলে যায়। যার ফলে সভায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এগুলো অত্যন্ত সত্য কথা এবং ধর্মীয় কোন অনুষ্ঠানে গেলেই এ ধরণের দৃশ্য যে কারোর চোখে পড়বে। অথচ নিজেদের বৌদ্ধধর্মালম্বী বলে কতই না গর্ববোধ করে। কিন্তু এভাবে আচরণ করলে কিভাবে সমাজ এগিয়ে যাবে, কিভাবে সদ্ধর্মের অনুশাসন ঠিকে থাকবে। এ প্রসঙ্গে ভগবান বুদ্ধ বলে গেছেন, যতদিন ভিক্ষু সংঘ এবং সদ্ধর্মের অনুসারীবৃন্দ বৌদ্ধ ধর্মের অনুশাসন মেনে চলবে এবং বুদ্ধের উপদেশ ও নীতিসমূহ মেনে পবিত্র জীবন যাপন করবে ততদিন পর্যন্ত ধর্মের পরিহানি হবে না। কাজেই সমাজের সকলের ধর্মীয় রীতি- নীতিসমূহ সঠিকভাবে পরিপালন করা উচিত যাতে সদ্ধর্মের শাসন ঠিকে থাকে দীর্ঘ সময়। এ প্রেক্ষিতে ছোট ছোট বৌদ্ধ শিশুদের যদি নিয়মিতভাবে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া যায় এবং সময় মাফিক বিহারে যেতে উৎসাহিত করা হয় তাহলে তারা বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শে উজ্জিবিত হবে এবং এভাবে সমাজ অনেক আদর্শবান, চরিত্রবান ও জ্ঞানী-গুণী লোক পাবে যারা সমাজ ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে অনেকদূর। কারণ শিক্ষিত ও আদর্শবান একজন লোক দুশ্চরিত্র ও অশিক্ষিত হাজার লোকের চেয়ে বহু উত্তম।

      ধর্ম ও সমাজ পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ধর্ম ছাড়া যেমন সমাজ ভালভাবে চলতে পারে না, ঠিক তেমনি ধর্মও সমাজের উপর নির্ভরশীল। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী এমিল ডুর্কেইম বলেছেন, “ধর্ম হচ্ছে প্রাথমিকভাবে একটি সামাজিক বিষয়”। তাঁর মতে ধর্মীয় ঐতিহ্যসমূহ ধারণ ও লালনের মাধ্যমে সামাজিক ঐক্য সুদৃঢ় হয়। কাজেই একটি আদর্শ সমাজ গঠন করতে হলে সদ্ধর্মের তথা বৌদ্ধ ধর্মের ভূমিকা অতুলনীয়। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে দ্বন্দ সংঘাত, আভ্যন্তরীন অন্তর্কলহ এবং পরমত অসহিষ্ণুতা দেখা যায় তা হচ্ছে মানুষের মধ্যে দূরদৃষ্টির অভাব, অজ্ঞানতা ও অহমিকার ফসল। পারস্পরিক বিদ্বেষ পরায়ণতা এবং সীমাহীন ক্ষমতা ও বস্তুগত সম্পত্তির লোভে মানুষ নানা ধরণের ধ্বংসাত্বক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে যা আদৌ শুভ নয় বরং সমাজ ও জাতীয় জীবনে দুর্দিন ডেকে আনে। যদি তারা ধর্মের রীতি-নীতি অনুসরণ করত কিংবা বুদ্বের অহিংসা নীতি অনুসরণ করত তাহলে চারদিকে এতো রক্তপাত, হানাহানি হতো না। জগতে অনেক জ্ঞানী-গুনী ব্যাক্তি বুদ্ধের অহিংসা নীতি অনুসরণ করে বিখ্যাত হয়েছেন এবং মানুষের হ্নদয় জয় করেছেন। যেমন মহাত্মা গান্ধী, নেলশন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং এর মতো প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদগণ অহিংসা নীতিকে আশ্রয় করে জাতি ও সমাজকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করেছেন। তাই তাঁরা স্বজাতি ও সমাজসহ সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে স্মরণীয় ও বরণীয়। বিশিষ্ট লেখক অমলেন্দু দাশগুপ্ত বলেছেন, “পৃথিবীর ধর্মের ইতিহাসে প্রধানতম বিষ্ময় বোধ হয় এটাই যে বুদ্ধের মন্দির আজ পর্যন্ত রক্তে কলুষিত হয়নি। সর্বাবস্থায় এ ধর্মে প্রচার করা হয়েছে মৈত্রী, প্রেম, করুণা ও মুক্তির আবেদন নিয়ে। মানব ইতিহাসে এটাই বৌদ্ধ ধর্মের বড় বিজয়। কাজেই বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শে বলিয়ান হয়ে সত্যিকার জয়লাভ করা সম্ভব, অন্যভাবে নয়। ”কাজেই ধর্মকে সমুন্ন রেখে সমাজকে এগিয়ে নিতে হবে। আর এজন্য সবাইকে হানাহানি বন্ধ করে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে কিভাবে সমাজকে উন্নয়নের দিকে নেয়া যায়। কারণ সুষ্ঠু চিন্তা-চেতনার মধ্যেই উন্নয়নের ধারা নিহিত আছে।

      শেষে এতটুকু বলে লেখাটি শেষ করতে চাই যে, আসুন সবাই মিলে আমাদের এ ঘুনে ধরা সমাজ ও জাতিকে ধর্মীয় আদর্শে উজ্জিবিত করি এবং সমস্ত অকুশল কর্ম থেকে সমাজ ও জাতিকে মুক্ত করি। সে সাথে মনের সমস্ত কলুষতা, লোভ, দ্বেষ- কে চিরতরে বিদায় করি এবং নিজে পরিশুদ্ধ হয়ে কুশল কর্মে নিয়োজিত থাকি। কারণ নিজে পরিশুদ্ধ না হলে অন্যকে পরিশুদ্ধ করা যায় না। সে সাথে আমাদের বৌদ্ধকুলের গৌরব, সদ্ধর্মের ধ্বজাধারী, মুক্ত পুরুষ পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভন্তে) মহোদয়ের উপদেশ বানী মেনে চলি এবং ইহকাল ও পরকালের জন্য পূণ্য সঞ্চয় করি। সমাজ ও জাতির উন্নয়নে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করি। কারণ একমাত্র বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যেই প্রকৃত সত্য নিহিত। ভন্তের উপদেশ মতে, সত্যকে জানাটাই জ্ঞান, না জানাটাই অজ্ঞান। আমরা অজ্ঞানী হবো না, আমরা মূর্খ হবো না, আমরা জ্ঞানী হবো, আমরা পন্ডিত হবো। কারণ একমাত্র জ্ঞানী ও পন্ডিত ব্যাক্তি সমাজ, জাতি ও দেশের উন্নয়ন ঘটাতে পারে, অপর কেহ নয়। কাজেই সমাজ ও জাতি গঠনে বৌদ্ধ ধর্মের ভূমিকা গভীরভাবে উপলব্ধি করে সবাইকে সমানতালে এগিয়ে আসতে হবে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন সকলেই সদ্ধর্মের আদর্শে আদর্শিত হয়ে একটি আলোকিত সমাজ ও জাতি গঠন করতে সক্ষম হবো।

 

“জয়তু বুদ্ধ শাসনম্‌”

——————————————————————————–

লেখক পরিচিতি: কৃতি চাকমা, সম্পাদক, চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তা,

রূপালী ব্যাংক লিঃ, ফেনী।

Print Friendly, PDF & Email