log1

বিশ্বশান্তি প্যাগোডা প্রসঙ্গ রাজবন বিহার

বিশ্বশান্তি প্যাগোডা প্রসঙ্গ রাজবন বিহার

                                                                     ড. জিনবোধি ভিক্ষুPagoda

         ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি অপূর্ব নিদর্শন। বিচিত্র কারুকার্য খচিত শৈল্পিক চেতনার সৃষ্টি দৃষ্টিনন্দন এবং আকর্ষণীয় ‘প্যাগোডা’ বিশ্বশান্তির নীড় বলা যায়। ‘প্যাগোডা’ মূলত বুদ্ধবিহারকে বুঝায়। ‘বুদ্ধ’ শব্দের অর্থ মহাজ্ঞানী বলা হলেও এর প্রকৃত অর্থ সম্যক জ্ঞান অর্থাৎ যে জ্ঞান অর্জিত হলে মানবের জাগতিক ও আত্যন্তিক দুঃখ-যন্ত্রণাকে পরাভূত করে মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়া যায়। এককথায় বলা যায় তাকে আর এই ভব সংসারে জন্মগ্রহণ করতে হয় না। একেই বলা যায় পরম শান্তি নির্বাণ। রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের সেই উচ্চ মার্গের জ্ঞান অর্জিত হয়েছিল বলেই জগতে বুদ্ধ নামে খ্যাত হয়েছিলেন। প্যাগোডা বা বিহার এক অর্থে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবাসস্থলকে বুঝায়। যেখানে আত্মত্যাগী, সংসার বৈরাগী বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যমন্ডলীর আবাসস্থলরূপে প্রতিভাত। মহান ভিক্ষুসংঘরা সেখানে প্রতিনিয়ত ধ্যান-সমাধি ও শাস্ত্র-চর্চ্চায় রত থাকেন। মানুষ মাত্রেই সুখ-শান্তির প্রত্যাশী, সুখ শান্তি চায় না এমনতর মানুষ পৃথিবীতে খোঁজ করলে একজনও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ হয়। তবু কেন জানি না মানুষের জীবনমাত্রেই সুখ-দুঃখ মিশ্রিত। সুখের চেয়ে দুঃখের পাল্লাটা অতি ভারী বলে মনে হয়। অজ্ঞান অন্ধ মানুষ তা অতি সহজে বুঝে উঠতে পারে না বলেই দুঃখের কষাঘাতে শুধু তিনি জর্জরিত নন আজ সারা বিশ্ববাসীকে দুঃখে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। তার মূলে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা বা অতি লোভ যা মানুষকে মানবিক চেতনা ও মূল্যবোধ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখে। হিংসা মানুষের সহজাত স্বভাব হলেও প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষের জীবনে কোন আনন্দ ও স্বস্তি নেই। তাই আজ সারা বিশ্ব হিংসার বিষবাষ্পে প্রজ্জ্বলিত হতে দেখা যাচ্ছে মোহান্ধতাই এসব অসুন্দর অকল্যাণ অমঙ্গল অমানবিক ও অশান্তির মূল সোপানবিশেষ। তথাগত বুদ্ধই বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম বিশ্ব মানবতা ও বিশ্বশান্তির বার্তা ঘোষণা করেছেন যা এখনো অম্লান এবং চিরভাষ্মর হয়ে আছে এবং থাকবে যুগ যুগ ধরে। তারই কেন্দ্রস্থলস্বরূপ বুদ্ধবিহার বা প্যাগোডাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে জ্ঞান সাধনার শ্রেষ্ঠ পীঠস্থানরূপে। খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সিদ্ধার্থ গৌতমের বোধি জ্ঞান বা বুদ্ধত্ব জ্ঞানলাভের ৪৯ দিন পর সর্বপ্রথম ব্রহ্মদেশীয় (মায়ানমার) দুই জন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তৎমধ্যে একজন তপস্‌সু এবং অন্যজন ভল্লিক নামে ব্যক্তিদ্বয়ের সাক্ষাৎ হলে তারা দুই জনেই অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক মধু-পিণ্ড নামক আহারের উপাদান হিসেবে দান করেন। বুদ্ধজীবনে এই ছিল তাঁর প্রথম আহার গ্রহণ। তারা দুই জনেই সর্বপ্রথম দ্বি-বাচক উপাসক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন এটা তাদের উভয়ের জীবনে অতীব গৌরবের বিষয়। তারা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালে বুদ্ধ সমীপে প্রার্থনা করলেন – আমরা দুই জনেই দেশে ফিরে যাব। আপনার দর্শন পেয়ে আমরা সৌভাগ্যবান ও ধন্য হয়েছি বটে কিন্তু জন্মজনপদের অসংখ্য ভক্তপ্রাণ নর-নারীগণ আপনার দর্শন ও পূজা থেকে বঞ্চিত। আপনার স্মৃতিস্বরূপ কিছু নিদর্শন আমাদের অর্পন করলে দেশবাসী তা পূজো ও স্মরণ করার গৌরব লাভ করবে। তথাগত বুদ্ধ তাদের এই মহতী প্রত্যাশা পূরণের জন্য বুদ্ধ স্বীয় মস্তকে হস্ত দিয়ে চারগুচ্ছ (৮টি) পবিত্র কেশরাশি উত্তোলনপূর্বক তাদের অর্পন করেন তারা এহেন দূর্লভ বুদ্ধের কেশরাশি গ্রহণ করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনপূর্বক এই পবিত্র কেশরাশি সংরক্ষণ ও পূজো করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন – সোয়েডাগং প্যাগোডা বা স্বর্ণের প্যাগোডা। এ ঐতিহাসিক প্যাগোডায় সংরক্ষিত হয় (Hair Relics) বা বুদ্ধের পবিত্র কেশ ধাতু। মায়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুন হতে কিছুটা পূর্ব-দক্ষিণে সুউচ্চ পাহাড়-পর্বত শৃঙ্গে এই বিশাল প্যাগোডা নির্মিত হয় যা বিশ্ববাসীর কাছে গোল্ডেন প্যাগোডা নামে পরিচিত হলেও সবার দৃষ্টিতে এটি একটি বিশ্ব শান্তির অতি পবিত্রতম পীঠভূমি। তাছাড়াও পুণ্যভূমি নামে পরিচিত মায়ানমার ‘প্যাগোডার দেশ’ হিসেবে খ্যাত হয়েছে। তথায় সোয়েডাগং প্যাগোডা ছাড়াও মহাজাদি প্যাগোডা, শেমাদো প্যাগোডা, শেম্যেথান প্যাগোডা, ক্যইপুন প্যাগোডা, বাগো, সগেইং বাগান, মান্ডালয় ইত্যাদি আরো বহু প্যাগোডা ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে। বুদ্ধসমকালীন থেকে বর্তমান শতাব্দী পর্যন্ত দেশে-বিদেশে যতসব বুদ্ধবিহার গড়ে উঠেছে সবই শান্তির পীঠস্থান হিসেবে যুগ যুগ ধরে শান্তির অমিয় বাণী প্রচার করে চলেছে, ‘বুদ্ধ বিহার’ সদ্ধমবাণী প্রচার ও প্রসারের কেন্দ্রস্থল শুধু নয়, ধ্যান সমাধির অনুধ্যান অনুশীলন, ব্রতপালন, সংযতজীবন, ত্যাগানুষ্ঠান, গুরু-দর্শন-পূজা, হিতোপদেশ শ্রবণ ইত্যাদি মঙ্গল ও কল্যাণকর মুক্তচিন্তা চেতনাকে লালন করে থাকেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে

           অসম্প্রদায়িক এবং সর্বজনীনভাবে প্রবেশাধিকার রয়েছে এ প্যাগোডায়। রাজা-মহারাজা, ধনী-শ্রেষ্ঠি থেকে অতি সাধারণ মানুষের জন্য সকাল-সন্ধ্যা উন্মুক্ত থাকে এসব প্যাগোডা, বিশ্ববাসীর অন্তর জয় করার মত অতি পবিত্রতম স্থান। রাজা বিম্বিসার থেকে শুরু করে আজ অবধি যে সব বুদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সবই মানুষের তীর্থভূমি নামে খ্যাত। মহামতি অশোক সমগ্র জম্বুদ্বীপে ৮৪ হাজার ধর্মস্তূপ নির্মাণ করে সারা বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, জাপানের মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু ফুজি গুরুজির পরিকল্পনা ও বদান্যতায় জাপানে এবং ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে কয়েকটি বিশ্বশান্তি প্যাগোডা স্থাপন করে বিরল কীর্তি রেখে গেছেন যা পূর্ব ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করে এসেছে। শাস্ত্রে আছে – “কীর্তি যস্যশ্চ সজীবতী” অর্থাৎ কীর্তিমান মাত্রই আপন কীর্তি মহিমায় ভাষ্মর।

         এদেশের মাটি খনন করলেই এ অমরস্মৃতি ভেসে উঠে। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পকলা, স্থাপত্য, ভাষ্কর্য ইত্যাদির প্রচার ও প্রসারের মূল কেন্দ্রস্থল হিসেবে এ সব বিহারের ভূমিকা অসাধারণ। ভারত এবং বঙ্গভূমির বিভিন্ন এলাকায় যে সকল পূণ্যতীর্থ এবং জ্ঞানতীর্থ গড়ে উঠেছিল কালের বিবর্তনে অশুভ শক্তির করাল গ্রাসে দ্বাদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও ১৮৬৪ সালের কিয়ৎকাল পূর্বে বৌদ্ধদেশ আরাকান ও রেঙ্গুনের সঙ্গে নতুন করে যোগসূত্র তৈরী হওয়ার পর বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মীয় পরিবেশ অনেককেই আকৃষ্ট করেছে।

       এ মহাজাগরণের প্রবাদ-প্রতীম সাংঘিক পুরোধা ছিলেন মহামান্য সংঘরাজ শ্রীমৎ সারমেধ মহাস্থবির। তাঁর মহান আদর্শে উদ্ধীপ্ত হয়ে সর্বপ্রথম সাতজন রাউলি পুরোহিতগণ পুনরায় থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়ে এ জাগরণকে ত্বরাণ্বিত করেছেন। সবচেয়ে গৌরবের সংবাদ হলো রাজমাতা কালিন্দী রাণী পূণ্যশীলা সেই পূণ্যপুরুষের কাছে দীক্ষিত হয়ে সমগ্র পার্বত্য এবং সমতল বৌদ্ধদের মধ্যে নতুন করে সদ্ধর্মের গতিধারাকে মহাপ্লাবনে সূচিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে বিরল সাংঘিক মনীষা সর্বজন শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ আচারিয় পূর্ণাচার মহাস্থবির, রাজগুরু শ্রীমৎ ভগবানচন্দ্র মহাস্থবির, দার্শনিক শ্রীমৎ বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির, রাজগুরু শ্রীমৎ ধর্মরত্ন মহাস্থবির, রাজগুরু শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবির প্রমুখ মহাত্মাগণের দূরদর্শী ধর্মীয় চেতনা, সমাজ সংস্কার এবং সদ্ধর্মের উন্মেষে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখে গেছেন যা কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে।

           বর্তমান সময়ে তাঁদেরই যোগ্য উত্তরসুরী সাধকদের মধ্যে মহাসাধক যিনি সম্প্রতি মহাপরিনির্বাণ শয্যায় শায়িত আছেন আর্যপুরুষ শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির তাঁর সাধনপীঠ ছিল রাঙ্গামাটিস্থ রাজবন বিহারে। তাঁর শ্রামণ্য জীবন থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধ্যান-সমাধিতে রত ছিলেন (স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পূর্ব দিন পর্যন্ত)। আমার জীবনে এত বড় মহান বড় মাপের সাধক সিংহপুরুষ বঙ্গভূমিতে বর্তমান সময়ে দূর্লভ। তাঁর মত ধ্যান-জ্ঞান, ব্রহ্মাচর্য জীবনাচার, ত্যাগদীপ্ত নির্লোভ, নির্মোহ জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত জ্ঞানতাপস যে কোন জাতিতে বিরল। তিনি এ পর্যন্ত যে সকল এলাকায় গেছেন এবং অবস্থান করেছেন অত্র এলাকা পূণ্য তীর্থ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান রাজবন বিহার এরই জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি সংকল্প করেছেন যে, অত্র বিহার প্রাঙ্গণে একটি ‘বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা’ স্থাপন করা। তাঁর জীবর্দশায় তা স্থাপন করা সম্ভব না হলেও ইতোমধ্যে ‘প্যাগোডা’র ভিত্তি দেওয়া হয়েছে অত্র পুণ্য তীর্থভূমিতে। এর আনুমানিক ব্যয়ভার নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। এর নক্সা যেমন অভিনব, আকর্ষণীয় হয়েছে তেমনি শৈল্পিক কারুকার্যও অভূতপূর্ব।

         বিশ্বায়নের যুগ-সন্ধিক্ষণে প্রাচীন সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এ জাতীয় ‘প্যাগোডা’ প্রতিষ্ঠা সময়োপযোগী। সমতল এবং পার্বত্যবাসী প্রায় ১৪/১৫ লক্ষ মানুষের পক্ষে আর্থিক, কায়িক শ্রম প্রদানে নিষ্ঠাবান হলে কয়েক বছরের মধ্যে তা বাস্তবে রূপদান করা অতি সহজ হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি নব ইতিহাসের গোড়াপত্তন হবে। দেশী-বিদেশী ভ্রমণার্থীদের কাছে বিশাল তীর্থভূমিতে পরিণত হবে। পরম পুরুষের দীর্ঘ জীবনের সৃষ্টিশীল প্রত্যাশা শুধু পূরণ হবে না বরং তাঁর প্রত্যাশাকে ভিত্তি করে আমরা বিপুল পূণ্য সঞ্চয়ের সৌভাগ্যলাভ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বলে তিনি আমাদের মহাকল্যাণ মিত্রের আসন গ্রহণ করে আছেন সবার অন্তরে। মহাপুরুষ মাত্রই মহা মানবীয় গুণের মূর্ত প্রতীক হিসেবে জীবিতাবস্থায়ও সর্ব প্রাণীর কল্যাণমিত্র এবং মহাপ্রয়াণের পরও আরো বড় মাপের কল্যাণমিত্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন – এটাই বাস্তবতা। আমরা যদি তাঁর মহা জীবন ও বাণীর নীতিমালাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলন ঘটানোর দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হই তাতে করে আত্মকল্যাণও হবে পর কল্যাণেও বাতাবরণ তৈরি হবে। তিনি (বনভন্তে) আজ এমন উচ্চ মার্গের জ্ঞানতাপস এবং সাধক পুণ্যপুরুষ যাকে এক পলক দর্শন, পুজো, ও মুখঃনিসৃতবাণী শ্রবণের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসতে দেখা যায় অসংখ্য ভক্তপ্রাণ নর-নারীদেরকে। যেখানে সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক মুক্ত চিন্তা-চেতনাকে অন্তরে লালন করে মহামিলন মেলায় পরিণত করেছে। অথচ তাঁর সব কথা ও দেশনার বিষয়বস্তু বোধগম্যে আনায়ন করা সকলের পক্ষে সম্ভব না হলেও অন্তরের গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা, পুজো উপকরণ প্রদানে কোন রকমের কুন্ঠাবোধ পরিলক্ষিত হয়নি। এখানেই পরিষ্কার ভাষায় বলতে দ্বিধা নেই জীবিত বনভন্তের চেয়ে নশ্বর দেহত্যাগী বনভন্তে এখন অনেক অনেক বড় বললেও অত্যুক্তি হয় না। তাঁর সাধন জীবন ও ব্রহ্মচর্য জীবনের কৃত সংকল্প এখনো পর্যন্ত কোনটাই অপূর্ণ হয় নি। দৈব শক্তির ন্যায় একটার পর একটা আশ্চর্যজনকভাবে পরিপূর্ণতা লাভ করে চলেছে। এটা বর্তমান এবং জন্মজন্মান্তরের অসীম ত্যাগ ও সাধন ভজনের প্রত্যক্ষ সুফল বলা যায়।

         বিশ্বায়নের যুগ-সন্ধিক্ষণে তাঁর মহান ভিক্ষুত্ব জীবনের একটি মহাপরিকল্পনা ছিল তাঁরই সাধনপীঠে ‘বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা’ প্রতিষ্ঠা করা। যাতে করে সর্ব সম্প্রদায়ের মানুষের মহামিলনের মাধ্যমে পরষ্পরের মধ্যে সম্প্রীতিভাব, মৈত্রী চেতনা সৌভ্রাত্বের সেতু বন্ধন তৈরী হবে। থাকবে না পরষ্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্ধ-সংঘাত ও অমৈত্রীসুলভ আচার-আচরণ। দূর্ভাগ্যবশত তাঁর জীবর্দশায় এই শান্তির প্যাগোডা দেখে যেতে না পারলেও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসুরী, অসংখ্য ভক্তপ্রাণ, ধনাঢ্য সরলপ্রাণ ব্যক্তিদের বদান্যতা এবং বর্তমান লেখকের আন্তরিক সহায়তায় দেশী-বিদেশী অনেক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক সহযোগীতায় আশা করি তাঁর এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতিময়তা লাভ করবে। উল্লেখ্য যে, মহামান্য ১০ম সঙ্ঘরাজ মহাপন্ডিত শ্রীমৎ জ্যোতিপাল মহাথের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বৌদ্ধ শ্মশানে ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বহুদিন আগে থেকে গ্রহণ করলেও তা এখনো বাস্তবরূপ পায় নি তাছাড়াও চৈত্যভূমি নামে খ্যাত বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বুকে ‘বুডিস্ট রিসার্চ এন্ড পাবলিকেশন সেন্টার – বাংলাদেশ’ এর পক্ষে বৌদ্ধ দেশ থাইল্যান্ড এর ধর্মকায়া ফাউন্ডেশনের সার্বিক সহায়তায় আরেকটি বিশ্বশান্তি প্যাগোডা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হাতে নেওয়া হয়েছে কয়েক বছর আগে থেকে। আশা করি এই উদ্যোগ কিছু দিনের মধ্যে বাস্তবায়নে কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এ ব্যাপারে একটি অভিনব নকশা ও মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বরাবরে অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে।

          বলাবাহুল্য রাজ বন বিহারে বর্তমান যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এটা পূণ্যপুরুষের অপ্রমেয় পূণ্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবে দ্রুত রূপ লাভ করবে বলতে পারি। এই মহাপুরুষের মুখের প্রচারিত অমূল্য বাণী একদিকে অসুন্দর জীবনে সুন্দর, পথভ্রষ্ট জীবনকে সত্য পথে, অকল্যাণজনক চিন্তা-চেতনাকে মঙ্গল ও কল্যাণের পথে, দুঃখময় জীবনকে আত্মজয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার সোপান তৈরীর দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন আমৃত্যু তিনি। আজ তিনি মৃত্যুঞ্জয়ীর পথ উন্মুক্ত করার দৃষ্টান্ত যেমনি রেখে গেছেন তেমনি বিশ্বশান্তি প্যাগোডা গড়ে উঠার পেছনে সবাইকে আশীর্বাদ দানেও পরিতৃপ্তি প্রদান করেছেন। মৈত্রী চেতনা ব্যতীত এ মহাপরিকল্পনা বাস্তব রূপ লাভ করা খুবই কঠিন। সবাই আসুন পরষ্পরের মৈত্রী চেতনাকে অন্তরে পোষণ করে মহান গুরুর মহাপরিকল্পনাকে সবার কাছে উপস্থাপন করি এটাই সময়ের দাবী। শান্তি মুখে নয় কাজে, ত্যাগে ও মহানুভবতায়। সর্বোপরি পূণ্য পুরুষের আশীর্বাদপুষ্টের মাঝেই মহাশান্তি, মহাক্ষেম/ মহাপূণ্য, মহাপ্রেম। এ প্রসঙ্গে কাব্যিক ছন্দে বলতে হয় –

বঙ্গভূমি, অপার বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কীর্তিগাথা।
বিশ্বশান্তি প্যাগোডা অপার আনন্দের তীর্থভূমি
সবার মিলনক্ষেত্র, নেই কোন হিংসা–বিদ্বেষ
জাতি নেই, ধর্ম নেই, বর্ণ নেই, নেই কোন সাম্প্রদায়িকতা,
আসুন, চলুন, বসুন, সবাই কিছুক্ষণ আনন্দানুভব করি।
অপূর্ব প্রশান্তি, এমনতর শান্তিনীড় কোথায় খূঁজে পাই।
ভোগাবিলাসে মত্ত যারা অশান্তি পান তারা
কামনা-বাসনা, লোভ-দ্বেষ-মোহে আচ্ছন্ন সদাচঞ্চল তারা।
হীন চেতনা, হীন দৃষ্টি মানুষকে করে ভ্রান্ত।
সৎ চেতনা, শুভ বুদ্ধি না জাগে তাদের অন্তরে
মানবতা, মনুষ্যত্ব মানবপ্রেম হয় ভূলুন্ঠিত।
জগতে আবির্ভূত হল – সিদ্ধার্থ গৌতম
ত্যাগ-সাধনা, নির্লিপ্ত বৈরাগ্য জীবন করল বরণ।
অর্জিত হল – বুদ্ধ জ্ঞান, প্রচারিল শান্তির বাণী।
বিশ্বশান্তি, বিশ্ববার্তা জাগালো জগত মাঝে
প্যাগোডা হল – পীঠভূমি, শান্তির অমিয় বারতা।
জাপান-ভারত-বঙ্গভূমিতে নির্মিত হল বহু প্যাগোডা
রাজবন বিহার অতি পবিত্র, সর্বজনীন এক মহাপুণ্যতীর্থ
নবরূপ লভ তব ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’,
আজি তব নব ইতিহাস হল – শুভ সূচনা
শান্তির বার্তাবাহী আজ পবিত্র তীর্থ হল ধন্য।
জয় হোক তব জয়।

লেখকঃ গবেষক, আন্তর্জাতিক সাংঘিক ব্যক্তিত্ব, প্রাবন্ধিক, প্রফেসর ড. জিনবোধি ভিক্ষু। মোবাঃ ০১৮১৮০৯৫৩৭১।

 

Print Friendly, PDF & Email