log1

সুরা বা মদের উৎপত্তির কথা

 সুরা বা মদের উৎ601565_278585238940492_203288907_nপত্তির কথা

           শাস্তা জেতবনে অবস্থিতিকালে বিশাখার পঞ্চশত সুরাপায়িনী সখীগণকে কেন্দ্র করে বিশাখার প্রশ্নের উত্তরে বুদ্ধ এই সুরা উৎপত্তির কথা বলিয়াছিলেন। শুনা যায়, একদা শ্রাবস্তী নগরে সুরোৎসব ঘোষিত হইয়াছিল। ঐ পঞ্চশত রমণী উৎসবান্তে স্বীয় স্বীয় স্বামী পানার্থে তীক্ষ্ণ সুরার আয়োজন করিয়া নিজেরাও উৎসবে আমোদ-প্রমোদ করিবার অভিপ্রায়ে বিশাখার নিকট গমন করিয়াছিল এবং বলিয়াছিল, “সখি, এসো আমরা এই উৎসবে একটু আমোদ-প্রমোদ করি।” বিশাখা বলিয়াছিলেন, “ইহাই তোমাদের সুরোৎসব! আমি সুরাপান করিব না।” “বেশ, তুমি সম্যক সম্বুদ্ধকে দান দিতে থাক, আমরাই গিয়া উৎসব করিব।” “বেশ, তাহাই করা যাউক” বলিয়া বিশাখা তাহাদিগকে বিদায় দিয়াছিলেন।

         অনন্তর বিশাখা শাস্তাকে নিমন্ত্রণ করিয়া মহাদান দিলেন এবং সায়ংকালে বহু গন্ধমালা লইয়া ঐ সকল রমণীর সঙ্গে জেতবনাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তাহারা পথেই সুরাপান করিতে করিতে চলিল এবং বিহারের দ্বারকোষ্ঠকে গিয়াও সুরাপান করিল। অনন্তর বিশাখার সঙ্গে তাহারা শাস্তার নিকট উপস্থিত হইল। বিশাখা শাস্তাকে প্রণাম করিয়া একান্তে উপবিষ্ট হইলেন। অন্য রমণীরা উন্মত্ত হইয়া কেহ কেহ শাস্তার সম্মুখে নৃত্য আরম্ভ করিল, কেহ কেহ গান করিতে লাগিল, কেহ কেহ অতি অশ্লীলভাবে হস্তপদ চালনা করিতে লাগিল, কেহ কেহ বা কলহে প্রবৃত্ত হইল। তাহাদিগের ত্রাস জন্মাইবার জন্য শাস্তা নিজের ভ্রূলোমাবলী হইতে রশ্মি নিঃসারণ করিলেন; তাহাতে ভয়ানক অন্ধকার হইল। ঐ রমণীরা মরণভয়ে ভীত হইল এবং তাহাদের মত্ততা দূর হইল। এদিকে শাস্তা যেই পালঙ্কে উপবেশন করিয়াছিলেন, সেখান হইতে অন্তর্হিত হইলেন এবং সুমেরুর শিখরোপরি উপবিষ্ট হইয়া ভ্রূযুগল মধ্যস্থ লোমরাজি হইতে রশ্মি নিঃসারণ করিলেন। ইহাতে বোধ হইল যেন যুগপৎ সহস্র চন্দ্র উদিত হইতেছে। তিনি সেখানে অবস্থিত হইয়াই ঐ রমণীদিগের উদ্বেগ উৎপাদন করিবার উদ্দেশ্যে বলিলেন-

১। পুড়িতেছে এ জগৎ নিত্য রাগ-দ্বেষাদির   ভীষণ জ্বালাই;

হাস্যের কী আনন্দের        অবসর কিছু, কী হে, আছে হেথা, হায়?

চৌদিকে অজ্ঞানরূপ        নিবিড় তিমিররাশি   রয়েছে ঘিরিয়া;

নাশিতে তাহারে তবু        জ্ঞানরূপদীপ কেহ     দেখে না খুঁঁজিয়া।

       এই গাথা শুনিয়া উক্ত পঞ্চশত রমণী স্রোতাপত্তিফলে প্রতিষ্ঠিত হইল। শাস্তাও প্রত্যাগমনপূর্র্বক গন্ধকুটিরের ছায়ায় বুদ্ধাসনে উপবেশন করিলেন। তখন বিশাখা তাঁহাকে প্রণাম করিয়া বলিলেন, “ভদন্ত, এই সুরাপানের অভ্যাসের ফলে লোকে এত নির্লজ্জ হয়, যাহাতে বিশ্বাস বা হিতাহিত জ্ঞান পর্যন্ত বিলুপ্ত হইয়া যায়! ভদন্ত, এই কুপ্রথা কখন প্রথম দেখা দিয়াছিল?” বিশাখার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য শাস্তা এক অতীত বৃত্তান্ত বলিতে লাগিলেন।

         পুরাকালে বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের সময়ে কাশীরাজ্যবাসী সুর নামক এক বনচর বিক্রয়োপযোগী দ্রব্য সংগ্রহের জন্য হিমালয়ে প্রবেশ করিয়াছিল। হিমালয়ে তখন এমন একটি বৃক্ষ ছিল যাহার কাণ্ড মানুষপ্রমাণ উচ্চ হইয়া তিনটি শাখায় বিভক্ত হইয়াছিল। যেখান হইতে এই শাখা তিনটি উদ্‌গত হইয়াছিল সেখানে সুরাচাটি (গামলা)-প্রমাণ একটা গর্ত হইয়াছিল। বৃষ্টি হইলে এই গর্তটি জলপূর্ণ হইত। ঐ বৃক্ষের চতুর্দিকে হরীতকী ও আমলকী বৃক্ষ এবং মরিচের গুল্ম ছিল। তাহাদের পক্ষফলগুলি বৃন্তচ্যুত হইয়া গর্তটার মধ্যে পড়িত। অদূরে স্বয়ংজাত  শালি (ধান) জন্মিত। শুকেরা সেখান হইতে শালির শীষ আনিয়া যখন ঐ বৃক্ষে বসিয়া খাইত, তখন তাহাদের মুখভ্রষ্ট শালি এবং তণ্ডুলও সেখানে পড়িত। এই সমস্ত সূর্যোত্তাপে পচিলে গর্তের জল রক্তবর্ণ হইত। গ্রীষ্মকালে পিপাসার্ত শুকেরা (টিয়া পাখিরা) ঐ জল পান করিয়া এমন মত্ত হইত যে, তাহারা বৃক্ষমূলে পড়িয়া যাইত এবং কিয়ৎক্ষণ সেইভাবে ঘুমাইয়া কূজন করিতে করিতে চলিয়া যাইত। বন্য কুক্কুর, মর্কট প্রভৃতিরও এই দশা ঘটিত। ইহা দেখিয়া উক্ত বনচর ভাবিল, ‘এই জল যদি বিষ হইত, তাহা হইলে এই সকল প্রাণী মরিয়া যাইত। ইহারা কিন্তু অল্পক্ষণ ঘুমাইয়া যথাসুখে চলিয়া যায়। অতএব ইহা বিষ নহে।’এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া সে নিজেও ঐ জল পান করিল এবং মত্ত হইয়া মাংস খাইবার ইচ্ছা করিল। আগুন জ্বালিয়া বৃক্ষমূলে পতিত তিত্তির-কুক্কুটাদি মারিয়া তাহাদের মাংস অঙ্গারে পাক করিল। তৎপর এক হাত তুলিয়া নাচিতে আরম্ভ করিল এবং এক হাতে মাংস খাইতে লাগিল। এইভাবে মাংস খাইয়া সে দুই-একদিন সেই স্থানে অবস্থিতি করিল।

          ঐ স্থানের নিকটে বরুণ নামক এক তাপস থাকিতেন। বনচর পূর্বে সময়ে সময়ে তাঁহার নিকটে যাইত। এখন সে মনে করিল, ‘তাপসের সঙ্গে বসিয়া এই পানীয় পান করিতে হইবে।’ সে একটি বাঁশের নালিতে ঐ পানীয় পূর্ণ করিল, তাহার সহিত কিছু পক্ষ মাংসও লইল এবং তাপসের পর্ণশালায় গিয়া বলিল, “ভদন্ত আসুন, আমরা দুইজনে এই মাংস খাই ও রস পান করি।” সুর ও বরুণ কর্তৃক প্রথম দৃষ্ট হইল বলিয়া এই পানীয়ের ‘সুরা’ ও ‘বারুণী’ নাম হইল।

         তাপস ও বনচর উভয়েই ভাবিল, ‘উত্তম উপায় জুটিয়াছে।’ তাহারা অনেকগুলি বাঁশের নালি সুরাপূর্ণ করিল। সেগুলি বাঁকে ঝুলাইয়া কোনো এক প্রত্যন্ত নগরে গেল এবং রাজার নিকট সংবাদ দিল যে, দুইজন পানাগারিক (মদ্যবিক্রয়কারী) আসিয়াছে। রাজা তাহাদিগকে ডাকাইলেন, তাহারা তাঁহার সম্মুখে সুরাপাত্র ধরিল; রাজা দুই তিনবার পান করিয়া প্রমত্ত হইলেন। তিনি যে সুরা পাইলেন, তাহাতে দুই একদিন চলিল মাত্র। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “আর আছে?” বনচরেরা উত্তর দিল, “আছে, মহারাজ।” “কোথায় আছে?” “হিমালয়ে।” “বেশ, আনো গিয়া।” তাহারা গিয়া দুই একবার সুরা আনয়ন করিল, তাহার পর ভাবিল ‘কতবার যাতায়াত করিব?’ তাহারা সুরার উপাদানগুলি লক্ষ করিয়া সমস্ত সংগ্রহ করিল এবং নগরে ফিরিয়া ঐ বৃক্ষের ত্বক ও অন্য সমস্ত উপকরণ পাত্রে ফেলিয়া সুরা প্রস্তুত করিল। নগরবাসীরা সুরাপান করিয়া স্বীয় স্বীয় কার্যে অনবহিত এবং নিতান্ত দুর্দশাপন্ন হইল। ইহাতে সমস্ত নগর জনহীনবৎ প্রতীয়মান হইতে লাগিল। তখন শৌণ্ডিকদ্বয় (সুর ও বরুণ) পলায়ন করিয়া বারাণসীতে গেল এবং সেখানেও রাজাকে নিজেদের আগমনবার্তা জানাইল। রাজা তাহাদিগকে ডাকাইয়া অর্থ দিলেন; তাহারা সেখানেও সুরা প্রস্তুত করিল। এইরূপে বারাণসী নগরেরও সর্বনাশ ঘটাইল। তাহার পর শৌণ্ডিকেরা পলাইয়া সাকেত এবং সাকেত হইতে শ্রাবস্তীতে গেল। তখন শ্রাবস্তীতে সব্বমিত্র নামক এক রাজা ছিলেন। তিনি শৌণ্ডিকদ্বয়ের প্রতি দয়াপরবশ হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা কী চাও?” তাহারা বলিল, “তণ্ডুলচূর্ণ, অন্য সমস্ত উপকরণ এবং পাঁচশ চাটি।” রাজা তাহাদিগকে এই সমস্তই দেওয়াইলেন। তাহারা সেই পাঁচশ চাটিতে সুরা পুরিল এবং সেইগুলি রক্ষা করিবার নিমিত্ত প্রত্যেক চাটির কাছে একটা বিড়াল বান্ধিয়া রাখিল। অনন্তর যখন চাটিগুলির সমস্ত দ্রব্য পচিয়া উথলিয়া পড়িল, তখন বিড়ালেরা চাটির অভ্যন্তর হইতে নিঃসৃত সুরা পান করিয়া মত্ত ও নিদ্রাভিভূত হইল। মূষিকেরা (ইঁদুর) তাহাদের নাক, কান, দাড়ি ও লাঙ্গুল (লেজ) কামড়াইয়া খাইল। ইহা দেখিয়া রাজার নিযুক্ত লোকে গিয়া তাহাকে জানাইল যে, বিড়ালগুলি সুরাপান করিয়া মারা গিয়াছে। রাজা ভাবিলেন, ‘লোক দুটা তবে বিষ প্রস্তুত করে’। তিনি তাহাদের দুইজনেরই শিরশ্ছেদ করাইলেন। মৃত্যুকালেও তাহারা ‘সুরা দাও, মধু দাও’ বলিয়া প্রার্থনা করিয়াছিল।

         শৌণ্ডিকদ্বয়ের প্রাণবধ করাইয়া রাজা চাটিগুলি ভাঙ্গিতে আদেশ দিলেন। এদিকে বিড়ালগুলির নেশা ভাঙ্গিয়াছিল; তাহারা উঠিয়া ইতস্তত খেলা করিয়া বেড়াইতেছিল। ইহা দেখিয়া রাজপুরুষেরা রাজাকে আবার সংবাদ দিল। রাজা ভাবিলেন, ‘যদি ঐ দ্রব্য বিষ হইত, তাহা হইলে বিড়ালেরা নিশ্চয়ই মারা যাইত। উহা বিষ নয়, বোধ হয় কোনো মধুর দ্রব্য হইবে। অতএব পান করিয়া দেখা যাউক।’ অনন্তর তিনি নগর অলংকৃত করাইলেন, রাজাঙ্গনে মণ্ডপ নির্মাণ করাইলেন, তাহা উত্তমরূপে সাজাইলেন এবং সেখানে সমুচ্ছ্রিত শ্বেতচ্ছত্রতলে রাজপালঙ্কে উপবেশনপূর্বক অমাত্যগণ পরিবৃত হইয়া সুরাপানে প্রবৃত্ত হইলেন।

         এই সময়ে দেবরাজ শক্র ভাবিতেছিলেন, ‘পৃথিবীতে এখন এমন কে আছে যে মাতৃসেবা ইত্যাদি ধর্মে অপ্রমত্ত হইয়া ত্রিবিধ সুচরিতে ভূষিত হইয়াছে। তিনি পৃথিবীর দিকে অবলোকন করিয়া দেখিতে পাইলেন, শ্রাবস্তীরাজ রাজোদ্যানে বসিয়া সুরাপান করিতেছেন। ইহাতে তাহার মনে হইল, ‘এই রাজা যদি সুরাসক্ত হন, তাহা হইলে সমস্ত জম্বুদ্বীপে সর্বনাশ হইবে। অতএব যাহাতে ইনি সুরাপান না করেন আমি তাহার ব্যবস্থা করিব।’ এই সংকল্প করিয়া তিনি হস্ততলে এক সুরাপূর্ণ কুম্ভ লইলেন এবং ব্রাহ্মণবেশে রাজার পুরোভাগে আকাশস্থ হইয়া বলিতে লাগিলেন, “এই কুম্ভ ক্রয় কর, এই কুম্ভ ক্রয় কর।” তিনি আকাশস্থিত হইয়া এইরূপ বলিতেছেন দেখিয়া রাজা সর্বমিত্র ভাবিলেন, এই ব্রাহ্মণ কোথা হইতে আসিল? তিনি তিনটি গাথায় শক্রের সহিত আলাপ করিলেন :–

১। কে তুমি ত্রিদিব হ’তে             প্রাদুর্ভূত হলে নভস্তলে?

চন্দ্রের উদয়ে যথা                          তমোহীনা শর্বরী উজলে!

গাত্র হ’তে কী সুন্দর              হইতেছে রশ্মি নিঃসরণ,

অন্তরিক্ষে মেঘপাশে              হয় যেন বিদ্যুৎ স্ফুরণ।

২। বায়ুহীন মহাশূন্যে                           করিতেছ তুমি বিচরণ!

ব্যোমে যাতায়াত-স্থিতি                   দেখিলে বিস্মিত হয় মন!

ঋদ্ধি করতলগত                          দেখিতেছি সুস্পষ্ট তোমার।

অপাদবিক্ষেপে গতি              সাধ্য শুধু পক্ষে দেবতার।

৩। আসিয়া আকাশপথে             করিতেছ শূন্যে অবস্থান,

‘কর কুম্ভ ক্রয়’বলি                          করিতেছ সবাই আহ্বান।

কে তুমি? কী দ্রব্য তব        আছে কুম্ভে, বল তুমি, শুনি,

বিক্রয় করিতে যাহা             এত ব্যগ্র হইয়াছ তুমি।

শক্র ‘তবে শুনুন’ বলিয়া এই গাথাগুলির দ্বারা সুরার দোষ প্রদর্শন করিলেন।

৪। এ নয় ঘৃতের কুম্ভ অথবা তৈলের,

মধু কিংবা গুড় নাই ভিতরে ইহার;

ভূরি ভূরি অনর্থের এ কুম্ভ আধার;

বলিতেছি, শুন কত শত দোষ এর।

৫।  এ কুম্ভের দ্রব্য কেহ পান যদি করে   পাটলি প্রপাত হ’তে পড়ি সেই মরে;

 কিংবা পূতিগর্তে পড়ি হাবুডুবু খায়,                        অভক্ষ্য ভক্ষণ করে পাগলের ন্যায়।

একাধারে এতগুণ আর কোথা নাই;          পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

৬।  পান যদি করে কেহ এ কুম্ভের রস,              রবে না শরীর, চিত্ত তার আত্মবশ।

বেড়াবে গরুর মত খাবার খুঁজিয়া,              অথবা উন্মত্তবৎ নাচিয়া গাহিয়া।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

৭।  এই রসপানে লোকে ঘুরে পথে পথে      বিবস্ত্র নাগার মত-লজ্জা নাই তাতে!

কাণ্ডাকাণ্ডজ্ঞান তার থাকে না তখন;       মধ্যাহ্ন পর্যন্ত রয় নিদ্রায় মগন।

একাধারে এতগুণ আর কোথা নাই; পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

৮।  খেলে ইহা উঠি লোকে থরথর কাঁপে,     নাড়ে মাথা, ছোঁড়ে হাত ইহার প্রভাবে;

কলের পুতুল প্রায় নাচিয়া বেড়ায়;        সে দশা তাদের দেখি বড় হাসি পায়।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;     পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

৯।  খেলে ইহা হবে লোকে হেন অচেতন,    শয্যার আগুনে পড়ি ত্যজিবে জীবন;

শৃগাল, কুক্কুর কিংবা মাংস ছিঁড়ি খাবে,   তথাপি যে যাতনা সে টের নাহি পাবে।

কারাদণ্ড, প্রাণনাশ, বিত্ত পরিক্ষয়    এ রস পানের ফলে সমস্তই হয়।

একাধারে এতগুণ আর কোথা নাই; পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১০। অবক্তব্য বলে ইহা খাই যেই জন,   সভামধ্যে বসে গিয়া হ’য়ে বিবসন;

বমন করিয়া বাস্তু দ্রব্যে কিন্নকায়    বিষন্নবদনে বসি ফ্যালফ্যাল চায়।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১১। এ রসে আবিল চক্ষে ভাবে লোকে মনে,  আমার সমান কেহ নাই ত্রিভুবনে।

আমারি নিজস্ব এই বিপুলা ধরণী;               আসমুদ্র ক্ষিতিপতি-তুচ্ছ তারে গণি।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১২। সুরার অশেষ গুণ দম্ভের জননী,     নিয়ত কলহ পরনিন্দা-প্রসবিনী,

কুরূপা, নির্লজ্জা, সদা শঙ্কাপ্রপীড়িতা,            ধূর্ত চৌর প্রভৃতির একান্ত সেবিতা।

একাধারে এতগুণ আর কোথা নাই; পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১৩। থাকুক সমৃদ্ধিযুক্ত কুলের গৌরব,   অনেক সহস্রমিত বিপুল বিভব

 পৈতৃক সম্পত্তি সব বিনাশ করিতে,             সুরাসম আর কিছু পাই না দেখিতে।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১৪। ধন, ধান্য, মণি, মুক্তা, রজত, কাঞ্চন,   গো, ভূমি, সকল যায় সুরার কারণ।

 বিত্তনাশ, কুলক্ষয় ঘটে সুরাপানে     সুরার প্রভাব এই সর্ব লোকে জানে।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১৫। সুরাপানে দর্পভরে কটু ভাষে নর,   মাতা, পিতা, গুরুজনে গর্জে নিরন্তর;

‘এ বুঝি কলত্র মোর’ ভাবি ইহা মনে  শ্বশ্রূ-্লুষা-দুহিতার হাত ধরি টানে।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১৬। সুরাপানে মত্ত যদি হয় নারীগণ,    দর্পভরে করে শ্বশ্রূ স্বামীরে তর্জন,

   দাসভৃত্যসহ রত হয় ব্যভিচারে।        সুরার মাহাত্ম্য যত বর্ণিতে কে পারে?

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১৭। বধে লোকে মত্ত হয়ে করি সুরাপান      ধার্মিক শ্রমণ আর ব্রাহ্মণের প্রাণ।

      এই দুষ্কৃতির ফলে শেষে মতিহীন      অপায়ে জনম লভি পচে চিরদিন।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১৮। সুরায় আসক্ত হ’য়ে নরাধম যত                কায়ে, মনে, বাক্যে সদা অপকর্মে রত।

যাবৎ জীবন তারা পাপ পথে চরি    নরকে জনম লভে এদেহ পরিহরি।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

১৯। প্রচুর সুবর্ণদানে, কাতর বচনে       যাচিলেও যে জন না মিথ্যা কভু ভণে,

সুরাসক্ত হয় যদি পরে সেই জন,      অকুণ্ঠিতচিত্তে বলে অলীক বচন।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;     পূর্ণ কুম্ভ এই তব কিনি লও, ভাই।

২০। প্রেরিত হইলে কোন কার্যসিদ্ধিতরে,      উদ্দেশ্যটি সুরাপায়ী বিস্মরণ করে।

যতই জরুরি কেন কাজ তার হাতে,      শুধালেও বলিতে না পারে কোন মতে।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

২১। স্বভাবত লজ্জাশীল, প্রভাবে সুরার     হইয়া উন্মত্ত করে লজ্জা পরিহার।

স্বভাবত ধীর বলি লোকে যারে জানে,    অনর্গল প্রলাপ করিবে সুরাপানে।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

২২। এ রস করিয়া পান চণ্ডাল, ব্রাহ্মণ   শূকরশাবকবৎ একত্র শয়ন

করে পানাগারে শুধু মাটির উপর;         অনাহারে ক্রমে ভগ্ন হয় কলেবর,

অঙ্গশ্রী বিনষ্ট হয় এসব কারণ;       হয় তারা সকলের ধিক্কার ভাজন।

   একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;      পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

২৩। করিলে গরুর মাথে দারুণ প্রহার               পড়ে সে ভূতলে যথা-সাধ্য নাহি তার

উঠিতে আবার; হায় ঠিক সেই মত            ভূতলে পড়িয়া থাকে সুরাপায়ী যত।

বারুণীর বেগ হায় বড়ই ভীষণ;          সহিতে তা’ কভু কহে পারে কোন জন?

২৪। ঘোরবিষ সর্পবৎ ভাবি যারে মনে   নিয়ত বর্জন করে সুধী সর্বজনে,

যে বিষ করিতে পান, মানুষ যে জন,     ইচ্ছা কি করিতে ভবে পরে হে কখন?

২৫। বৃষ্ণিপুত্র, অন্ধকেরা হয়ে সুরামত্ত    হইল সাগর তীরে কলহে প্রবৃত্ত;

মুষল লইয়া হাতে করে মহারণ,                 জ্ঞাতিরা নাশিল পরস্পরের জীবন।

একাধারে এত গুণ আর কোথা নাই;            পূর্ণ কুম্ভ এই তবে কিনি লও, ভাই।

২৬। অসুরেরা, মহারাজ, পান করি সুরা            শাশ্বত ত্রিদিব হ’েত চ্যুত হ’ল পুরা।

সুরার অনর্থ এত জানি শুনি কেবা  সে সর্বনাশীর বল, করিবে হে সেবা?

২৭। দধি কিংবা মধু, ভুপ, এ কুম্ভেতে নাই;   ইহাতে যে দ্রব্য আছে, আমি তব ঠাঁই

বলিলাম, সর্বমিত্র, গুণ তার যত;         জানি, কিনি লও, আর খাও ইচ্ছামত।

ইহা শুনিয়া রাজা সুরার অনিষ্টকারিতা বুঝিতে পারিলেন এবং তুষ্ট হইয়া দুইটি গাথায় শক্রের স্তুতি করিলেন :–

২৮। মাতা বল, পিতা বল, কেহই আমার    হিতকারী নয়, বিপ্র, সদৃশ তোমার।

সাধিতে আমার তুমি পরম কল্যাণ      দয়াবশে উপদেশ করিয়াছ দান।

সাবধানে অতঃপর করিব পালন        আজ্ঞা তব; হব আমি কল্যাণ ভাজন।

২৯। সুবৃহৎ পঞ্চ গ্রাম, দাসী একশত,

সপ্ত শত গো তোমায় করিলাম দান,

আর এই রমণীয় রথ দশখান

 উৎকৃষ্ট তুরকযুক্ত পুষ্পরথ মত।

 আচার্য আমার তুমি; কল্যাণ অশেষ

   ঘটিল আমার লভি তব উপদেশ।

ইহা শুনিয়া শক্র নিজের দেবভাব প্রকটিত করিলেন এবং পূর্ববৎ আকাশস্থ হইয়াই দুইটি গাথায় আত্মপরিচয় দিলেন :–

৩০। দাসী শত, গ্রাম পঞ্চ, গবাদি যে ধন,    থাকুক সে সব তব ভোগের কারণ।

তুমিই করহে ভোগ রথগুলি তব,            বহন যা’ করে সব অশ্ব মনোজব।

    আমি শক্র দেবরাজ, শুন হে রাজন, এ সকল দ্রব্যে মোর নাই প্রয়োজন।

৩১। পলান্ন, পায়স, সর্পি করহে ভক্ষণ;     মধুযুক্ত পূপে কর রসনা তর্পণ;

    নাই তায় দোষ; থাকে ধর্মে যেন মতি;   পাইবে প্রশংসা, শেষে স্বর্গ হবে গতি।

শক্র রাজাকে এই উপদেশ দিয়া স্বর্গে প্রতিগমন করিলেন। রাজাও আর সুরাপান না করিয়া সুরাভাণ্ডগুলি ভগ্ন করাইলেন এবং শীল গ্রহণপূর্বক দানে রত ও স্বর্গবাসের উপযুক্ত হইলেন। কিন্তু সুরাপানের সেই অভ্যাস জম্বুদ্বীপে ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পাইল। এই সর্বনাশী পানাভ্যাস পৃথিবী থেকে এখনো বিলুপ্ত হয় নাই। মানুষ এখনো অতীতের সেই কু-অভ্যাস ভুলিতে পারে নাই। বর্তমান সময়েও জনসমাজে এই সুরা সর্বনাশ করিয়া চলিয়াছে।

এখন দেখা যাক, নেশা মানুষের জীবনে কী কী ক্ষতিসাধন করিয়া থাকে : নেশা হচ্ছে পাপের জননী। নেশা মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটায়, দেহের ক্ষয়সাধন করে। নেশা মানুষকে মাতাল, উন্মত্ত, লজ্জা ও ভয়শূন্য করে। নেশাপানকারীর শুচি-অশুচি জ্ঞান থাকে না, মাতাপিতা ও ভ্রাতা-ভগ্নীর মধ্যে ভেদাভেদ জ্ঞান থাকে না, অর্থাৎ ভালো-মন্দ বা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়। জটিল ব্যাধিগ্রস্ত হয়; এবং সকলের নিন্দার ও হাস্যের পাত্র হয় এবং মৃত্যুর পর নরকে উৎপন্ন হয়।

নেশাপানে মানবদেহে কী কী ক্ষতিসাধিত হয় সেই সম্বন্ধে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা করিয়া যাহা প্রমাণ করিয়াছেন, তাহা এইখানে প্রদত্ত হইল।

যে-কোনো ব্যক্তি যদি মাদকসেবনে পা বাড়ায়- প্রথমে সে মাদক দ্রব্য খায়, পরে মাদক দ্রব্যই তাহাকে খাইয়া ফেলে। নেশাপায়ীর দৃষ্টিশক্তি কমিয়া যায়, মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তীব্র মাথা ব্যাথা হয়, স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, স্ত্রীর যৌন ক্ষমতা হ্রাস পায়, রক্তস্বল্পতা হয়, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়, ক্ষুধামন্দা হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হয়, নিদ্রাহীনতা, হতাশা, বিষন্নতা, উত্তেজনা, অস্থিরতা ও উগ্র মেজাজ হয়, কায় কৃশ হয়, ত্বক কুঁচকে যায়, চুলকানি হয়, পাকস্থলীতে ক্ষতি করে। তাহা ছাড়াও নেশাসেবনে শরীরে নানাপ্রকার ক্ষতি হইয়া থাকে।

ভগবান বুদ্ধ বলিয়াছিলেন- নেশাসেবনে ইহজীবনে নেশাপায়ীর ছয় প্রকার দোষ বা ক্ষতি সাধিত হয়, যেমন- সঞ্চিত সম্পত্তি বা উৎপাদিত ধন ক্ষয় হয়, কলহ বৃদ্ধি হয়, দেহ ব্যাধির ক্ষেত্রে পরিণত হয় অর্থাৎ দেহ রোগবহুল হয়, অকীর্তি লাভ বা নিন্দা বিঘোষিত হয়, লজ্জাহীন হয় এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়।

Print Friendly, PDF & Email