log1

পুরুষ-দুর্লভ আর্বিভাব-তিরোভাব প্রসঙ্গ

পুরুষ-দুর্লভ আবির্ভাব-তিরোভাব প্রসঙ্গ

প্রজ্ঞাবংশ মহাথের

 বহু গ্রন্থ প্রণেতা, পিটকীয় গ্রন্থের অনুবাদক,

প্রাবন্ধিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৌদ্ধ পন্ডিত।

যদি বলি কালের দাবিতেই মহাপুরুষগণের আবির্ভাব, সেই নিরিখে বনভন্তের মূল্যায়ন কেমন হওয়া উচিত? বনভন্তের জন্ম ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি আমাদের বলতেন, কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী তাঁদের গ্রাম মোরঘোনায় তখন প্রায় সময় হিন্দু বৈরাগী আর ব্রাহ্মণদের আগমন ঘটত। গ্রামের মানুষ তাঁদের গান কীর্তন সুরে রামায়ণ-মহাভারতের কথাগুলো এবং ব্রাহ্মণের গণা-পড়া ও আচার বিধির উপদেশকে পরম ধর্মজ্ঞানে বিশ্বাস করতেন আর মান্য করতেন। ‘মা লক্ষ্মী-মার’ পূজাদির সাথে বৌদ্ধ তান্ত্রিক লুরীদের (বড়–য়াদের রাউলী) উপদিষ্ট গাং পূজা, শিবপূজা, থানমানা পূজা, ভাদ্যা পূজা, মরা-জেদা ফারগ গরনা পূজাদিতে বহু শুকর আর মুরগীর বলিদান প্রথা এবং ঝাড়-ফুক, তাবিজ-টোনা-চালান (আঙ) ছিল তৎকালীন চাকমা সমাজের ধর্ম-সংষ্কৃতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। গ্রামের বা পাড়ায় কোথাও কোথাও ছোট আকারে ব্রোঞ্জ-পিতল অথবা শ্বেতপাথরের বুদ্ধমূর্তি পূজার জন্যে একটি চূড়া ও তিনটি কক্ষবিশিষ্ট ছোট আকারের ক্যাং ঘর (বুদ্ধমন্দির বা বিহার) ছিল। তাতে মধ্য কক্ষে উঁচু আসনে বুদ্ধমূর্তির অবস্থান আর তাঁর উভয় পাশের একটি কক্ষে ভিক্ষু, অপর কক্ষে মইসাং (শ্রামণ) বা কারগা (সেবক) থাকতেন। চাকমাদের বিহারগুলোতে অনিয়মিতভাবে মারমা ভিক্ষুই থাকতেন, কদাচিৎ বড়–য়া ভিক্ষু দু-একজনের আনাগোনা দেখা যেত। তবে সেই মারমা ও   বড়–য়া ভিক্ষুরা ধর্ম-বিনয় সম্পর্কে ছিলেন অজ্ঞ, অনভিজ্ঞ। লুরীগণই ছিলেন চাকমা বংশজাত ধর্মগুরু। তারা কখনো বৈদ্য, কখনো লুরী দীক্ষা নিতেন বিহারবাসী ভিক্ষুদের থেকেই। শ্রামণ্য দীক্ষা নেয়ার পর বিহার থেকে সময়-সুযোগে পলায়ন করে নিজেদের লুরী বলে পরিচয় দিতেন। তখন তাঁরা দাবী করতেন যে, তাঁরা

রাহুলের ধর্মই পালন করছেন এবং এটা পুরুষের ধর্ম। তাই তাঁরা চীবরকে ধুতির মতো করে কোমরে গোঁজ দিয়েই পরিধান করতেন। অপরদিকে ভিক্ষুরা বুদ্ধের নামে যেই ধর্মপলান করেন তা হচ্ছে মেয়েদের ধর্ম। তাই তাঁরা চীবর পরিধান করেন মেয়েদের মতো করে। চাকমাদের আরো একটি বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, ভিক্ষুজীবন গ্রহণ করতে হয় বৃদ্ধকালে, যৌবনে বা অল্প বয়সে ভিক্ষুত্ব গ্রহণ অনুচিত। এ জাতীয় ধারণাটা সনাতন বৈদিক সমাজের চারি আশ্রম (চতুরাশ্রম) প্রথার বানপ্রস্থ ধারণাপ্রসূত বলা চলে।

ধর্ম সামাজিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ঊনত্রিশ বছরের ভরা যৌবনের তেজোদ্দীপ্ত রথীন্দ্র নামে এক যুবক চাকমা সমাজ হতে এই প্রথম শ্রামণ (?) প্রব্রজ্যা গ্রহণে এলেন চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রিয় বৌদ্ধ মন্দির নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহার (চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার) এর তৎকালীন অধ্যক্ষ বঙ্গীয় ভিক্ষু সমাজের প্রথম আধুনিক শিক্ষায় বিএ পাশ ভিক্ষু ভদন্ত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের নিকটে। তৎকালীন বড়–য়া সমাজের ভিক্ষু-জীবনের ধ্যান-ধারণাটা কোন পর্যায়ে ছিল, এবং বড়–য়াদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট কোন পর্যায়ে ছিল, তাও এখানে বিচার্য বৈকি?

mainpromo

এটা প্রশ্নাতীত যে ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানের মহামান্য সংঘরাজ ভদন্ত সারমেধ মহাথের কর্তৃক মৌলিক বুদ্ধধর্ম থেরোবাদের যেই পরশ সমগ্র বাঙালীর ঊনবিংশ শতকের নবজাগরণের যুগে চট্টগ্রামী বড়–য়া সমাজ লাভ করেছিলেন, তা রাঙ্গুনীয়ার রাজানগরের চাকমারাণী কালিন্দী কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করলেও চাকমা সমাজ সামগ্রিকভাবে তার প্রকৃত পরশধন্য হতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল বুদ্ধশাসনে পূজ্য বনভন্তের আবির্ভাবলগ্ন পর্যন্ত। আর সে সময়ে বড়–য়া ভিক্ষু ও গৃহীসমাজ ধর্মীয় মতাদর্শের কয়েক পর্যায়ে দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি অতিক্রম করছিলেন। প্রথমত, পূজ্য বনভন্তের শৈশব ও যৌবনকালে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে চাকমা সমাজ যে পর্যায়ে অবস্থান করছিল, ঠিক সমতলের বড়–য়া সমাজটিও সংঘরাজ সারমেধ মহাস্থবিরের আবির্ভাবপূর্ব সেই ১৮৬৪ থেকে আরও প্রায় দুই দশকব্যাপী অবিকল তেমনই ছিল। ফলে সংঘরাজ সারমেধ কর্তৃক বড়ুয়া সমাজে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের যেই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল তা নানা কারণে প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতার শিকার হয়ে বড়–য়া সমাজে যেই দুটি দলের জন্ম হয়েছিল তা হচ্ছে সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরর আহ্বানে নব আদর্শের অনুসারী সংঘরাজ দল, আর প্রাচীনপন্থীর অনুরাগী মাথের দল (সদ্ধর্মরতœাকরে উল্লিখিত মাথে, কামে পাঞ্জা)। সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরর অনুসারীগণ উত্তর চট্টগ্রামের মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে পালি ভাষা ও পালি ত্রিপিটকের ধর্ম-বিনয় শিক্ষা গ্রহণে মনযোগী হলেন। তাঁরা লঙ্কা-বার্মায় গিয়ে ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত, ছোট ছাদাং (আষাঢ়ী পূর্ণিমা), মধু পূর্ণিমা (শ্রাবণী পূর্ণিমা), বড় ছাদাং (প্রবারণা) ও ভিক্ষু-গৃহীর উপোসথ ব্রত এবং সাময়িক প্রব্রজ্যাগ্রহণ প্রথা, বিদর্শন ভাবনা ইত্যাদি চট্টগ্রামের বুকে প্রবর্তন করলেন বার্মার ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাবে। কঠিন চীবরদান, পরিত্রাণ সূত্র পাঠ, সীবলী পূজা, বুদ্ধপূজা, সংঘদান, অষ্ট পরিষ্কার দান, বোধিবৃক্ষ পূজা, এবং বৈশাখী পূর্ণিমা উদ্যাপনাদির প্রবর্তন করলেন শ্রীলঙ্কান ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাবে। দুই একজন গৃহীও বার্মা এবং শ্যামদেশ তথা থাইল্যান্ড গিয়ে পালি ভাষা শিক্ষা করে উপোসথশীল (ভিক্ষু-প্রাতিমোক্ষ), হস্তসার (পূজা, বন্দনা, পরিত্রাণ সূত্রসম্বলিত গ্রন্থ), এবং অভিধর্মার্থ-সংগ্রহাদি গ্রন্থের অনুবাদ করলেন। চট্টগ্রামী বৌদ্ধ সমাজে তাঁরা এ সকল নব-বিধান প্রবর্তন করতে গিয়ে পূর্বে ব্রাহ্মণ দ্বারা প্রচলিত মনসা পূজা, শনি পূজা, লক্ষ্মী পূজা, সরস্বতী পূজা, কার্তিক পূজা, রামায়ণ, মহাভারত, প্রশান্তির পাট্টলী পাঠ এবং বড়–য়া রাউলী ঠাকুর প্রচলিত ধর্মক্ষেত্র তথা     . . . মা মগধেশ্বরী (প্রাণীহত্যাদি দ্বারা) পূজা, মাতাপিতার শ্রাদ্ধ নামক ধর্মকামে লাঠির প্রহার দ্বারা চেলা শুকর হত্যা করে (শুকর ঠেঙানী) ভূরি ভোজনদান প্রথাসমূহের উচ্ছেদ আন্দোলনে ব্রতী হলেন।

অপরদিকে প্রতিক্রিয়াশীল মনোবৃত্তির শিকার হয়ে কিছু প্রাচীন পন্থীরা এর বিরোধীতা করে অপরিবর্তনীয় থাকার চেষ্টায় রত হলেন। কিন্তু পশ্চিমা ভাব দ্বারা প্রভাবিত ঊনবিংশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁর আধুনিকতা, আধুনিক শিক্ষা-প্রভাবিত চট্টগ্রামী বড়–য়া সমাজও তখন স্পর্শ করায় প্রাচীনপন্থী রক্ষণশীলেরা ক্রমে ম্রিয়মান হয়ে পরিবর্তনকেই মেনে নিতে বাধ্য হলেন।

এই পরিবর্তনের দ্বিতীয় পর্যায় চট্টগ্রামী বড়–য়া সমাজে শুরু হয়েছিল ১৯২০-৩০ দশকের দিকে। সে সময়ে বড়–য়া সমাজের কিছু ভিক্ষু ধর্ম-বিনয় শিক্ষার পাশাপাশি ব্রিটিশ শিক্ষা পদ্ধতির প্রতি অনুরাগী হয়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জনমুখী হতে শুরু করলেন। এ নিয়েও ভিক্ষু-সমাজে এক নীরব দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছিল। বাংলার বৌদ্ধ সদ্ধর্ম-শাসনে পূজ্য বনভন্তের আবির্ভাব এই দ্বান্দ্বিক পর্বেই ঘটে। তখনকার এই মানসিক দ্বন্দ্ব বাংলার বৌদ্ধ ভিক্ষু-গৃহী সমাজে ক্রমে এই ধারণা বিশ্বাসই প্রবল করে তুলল যে, মাতাপিতা যে-সকল সন্তানকে ঘরে রেখে স্কুল-কলেজের লেখা পড়ার খরচ যোগাতে অক্ষম, তারা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে সেই শিক্ষা লাভের সুযোগ গ্রহণ করুক। এই শিক্ষা সমাপ্ত করে তারা প্রব্রজ্যা জীবনে থেকে গেলেও ভালো, আর গৃহে ফিরে গেলেও সমাজের বোঝা না হয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মান্যগণ্য ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভে সক্ষম হবে। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ পার্থিব রাজকীয় ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে উচ্চতম বৈরাগ্যম-িত যেই প্রব্রজ্যাকে আমৃত্যু মাথার মুকুট করে নিয়েছিলেন, তাঁর সেই মহনীয় ত্যাগাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তী সময়ে শত শত, হাজার হাজার রাজা-মহারাজা, ধনী-শ্রেষ্ঠীর সন্তানদের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত, এমনকি দীন ভিখারীর সন্তান পর্যন্ত সেই একই ত্যাগবিরাগ চিত্তেই দুর্লভ প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে বুদ্ধ-উপদিষ্ট শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার সাধনা অনুশীলনেই জীবনকে নিবেদিত করেছিলেন।

আর সেক্ষেত্রে ১৯২০-৩০ দশকের বাংলার ভিক্ষু-গৃহী সমাজ বুদ্ধ-প্রবর্তিত সেই প্রব্রজ্যার মূল্যায়নটা করে বসলেন উল্লিখিত দৃষ্টিকোণ থেকে। ভিক্ষু-গৃহী সমাজের তৎকালীন এই দৃষ্টি-বিকৃতির অভিশাপেই এদেশের প্রব্রজ্জিতগণ ক্রমে ধর্ম-বিনয় শিক্ষা ও অনুশীলনকে গুরুত্বহীন বলে বিশ্বাস করতে শুরু করলেন। এবং দুঃখমুক্তি নির্বাণ এই জন্মে অসম্ভব, আড়াই হাজার বছর আগেকার ত্যাগময় ভিক্ষু-জীবন এই আধুনিক যুগের জন্যে অচল ইত্যাদি জাতীয় বিশ্বাস যেন স্বতঃসিদ্ধের মতো তারা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন।

কর্ণফুলী নদের কাপ্তাই অঞ্চলের মগবান মৌজার মোরঘোনা নামক গ্রামের মধ্যবিত্ত চাকমা পরিবারের সন্তান যুবক রথীন্দ্র প্রব্রজ্জিত সমাজে বিরাজমান সেই জীবন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রব্রজ্যা জীবন গ্রহণ করেননি। বাংলা ভাষায় লেখা পড়ায় পারদর্শী এই মেধাবী ব্যক্তি কিশোরজীবন থেকেই পাঠে ও মননে ছিলেন বৈজ্ঞানিক মানসিকতায় কৌতুহলী অনুসন্ধিৎসু। তাই বাংলা ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের, ধর্ম-দর্শনের যত বই তৎকালের রাঙামাটিতে পাওয়া যেত তা যে-কোনো মূল্যে সংগ্রহ করে শ্রমসাধ্য কর্মজীবনের পাশাপাশি অধ্যয়ন করতেন। কৈশোরে পিতৃহারা পরিবারের প্রথম সন্তান কিশোর রথীন্দ্র পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের কষাঘাতের অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করেছিলেন ২৯ বছরের ভরা যৌবন পর্যন্ত। রাঙামাটির রিজার্ভ বাজারে বিরাজ মোহন দেওয়ানের তেলের ডিপোতে চাকুরিকালে সৌভাগ্যক্রমে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল বুদ্ধধর্মে অভিজ্ঞ বিরাগচিত্তসম্পন্ন ডাক্তার গজেন্দ্র লাল বড়–য়ার সাথে। পাহাড়তলী মহামুনি হাইস্কুলের শিক্ষক মোহনীরঞ্জন বড়–য়া লিখিত বুদ্ধ সন্ন্যাস কীর্তন আর সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ নাটকের অভিনয় দর্শন এ সকল উপাদান তাঁকে প্রব্রজ্যাজীবন গ্রহণে উদ্বুদ্ধ যেমন করেছিল, সেই সাথে উচ্চশিক্ষিত হিন্দুদের লেখা বুদ্ধ ও বুদ্ধধর্মীয় গ্রন্থাবলীতে বুদ্ধজ্ঞানের উচ্চপ্রশংসাও তাঁকে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে বুদ্ধজ্ঞান গবেষণা করতে কম উদ্বুদ্ধ করেনি। তাই তিনি বিজ্ঞানী নিউটন, জর্জ স্টিফেনের জীবন-সাধনার প্রণালীতে বুদ্ধের জীবন-দর্শনকে নিয়ে গবেষণা করতে বেছে নিয়েছিলেন বুদ্ধ-প্রশংসিত জনশূন্য নির্জন অরণ্যের একাকী জীবন ঠিক রাজসন্ন্যাসী সিদ্ধার্থের মতোই। বুদ্ধ ও তাঁর জীবন-দর্শনকে নিয়ে তাঁর এভাবে নিবিড় গবেষণা চলে সুদীর্ঘ ২২টি বছর। বৌদ্ধ সাধনাবিষয়ক গ্রন্থ শান্তিপদ প্রজ্ঞাদর্শনাদি গ্রন্থের আলোকে দেহ ও মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দৈহিক ষড়েন্দ্রিয় চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, দেহ ও মনের মাধ্যমে যা ঘটে তৎসমুদয়কে বুদ্ধ-উপদিষ্ট লোভ-দ্বেষ-মোহের ক্ষয় সাধনে নির্বাণ নামক পরম শান্তি-সুখ অর্জনের লক্ষ্যেই পরিচালিত করেছিলেন তিনি। দেখা গেছে তাঁর সেই আরণ্যিক জীবনের সেই প্রয়াসজাত অভ্যাসটি আমরণ তিনি ধারণ করেছিলেন স্বীয় জীবনে। পূজ্য বনভন্তে তাঁর শিষ্যগণকে প্রাত্যহিক ভোরের ধর্মদেশনায় মাঝে মধ্যে বলতেন, চাকমারা বুদ্ধের প্রকৃত ধর্ম সম্পর্কে যেমন অনভিজ্ঞ ছিল, তেমনি ছিল দরিদ্র। আর একারণেই তাঁর অরণ্যবাস জীবনের ২২টি বছরে ধনপাতায় ও দীঘিনালায় বহুকাল অন্ন বস্ত্র ও কুটিরের অভাবে বৃষ্টিতে, রোদে, শীতে কষ্ট পেয়েছেন, ভিক্ষান্ন সংগ্রহে গিয়ে বহুবার উপোস থেকেছেন, আর রোগে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার উপক্রমও হয়েছেন। সে কারণে জীবন ধারণজনিত দুঃখসত্যকে তিনি অতিগভীরভাবে এবং সহজে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দেখা গেছে, রাঙামাটি রাজবন বিহারে ভক্তজনদের অগাধ দান আর সুখ-সুবিধার প্রাচুর্যগুলো দেখে দেখে তিনি কোনো কোনো সময়ে এমন মন্তব্যও করতে শুনেছি চাকমারা যে তখন গরিব ছিল, ভালোই হয়েছে। তারা ধনী হলে বনভন্তে বুদ্ধজ্ঞান লাভ করতে পারত না। তোমরা আমার শিষ্যরা এখন যেই সুখ-সুবিধা ভোগ করছ, তাতে আমার মনে হচ্ছে মহাদুর্ভিক্ষে ৩/৪ দিন যদি উপোস থাকতে হয়, জানি না কয়জন প্রব্রজ্যা জীবনে থাকবে।

মহাজ্ঞানীদের ইহাই স্বভাব-ধর্ম যে, বহু কষ্টে তাঁরা যেই জ্ঞান অভিজ্ঞান লাভ করেন তা কখনো ব্যক্তি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সামগ্রী করে রাখেন না। মেঘ যেভাবে তিল তিল করে জল বাষ্প সংগ্রহ করে করে সমৃদ্ধ হওয়ার পরে বারি বর্ষণ শুরু করতে বাধ্য হয়, আর সেই বর্ষণ চলে সকলের জন্যে সমানভাবে, মহাজ্ঞানী মহাপুরুষদের অতিকষ্টে জীবনের সমগ্র অর্জনটুকুও ঠিক ভারী মেঘের মতোই উজাড় করে বিতরণে তাঁরা বাধ্য হয়ে থাকেন নিজেরই প্রাণের তাগিদে। তাই তো পূজ্য বনভন্তেকে দেখেছি, দিবা-রাত্র অবিশ্রান্তভাবে অপরকে তাঁর অধীত জ্ঞানভান্ডার উজাড় করে বিতরণ করতে বিশাল জনসভায় যেমন, ভোজনশালায়, ¯œানাগারে, একান্ত বিশ্রাম কক্ষেও তেমন অবিরাম বর্ষণমুখর ছিল তাঁর ধর্মদেশনা। আমি এমনও বহুবার দেখেছি, তাঁর বিশ্রাম কক্ষে সেদিন শুধুমাত্র এক ছোট্ট শ্রামণ পাখা হাতে বাতাস করছে; আর পূজ্য বনভন্তে সেই শ্রামণটিকে বুদ্ধের গম্ভীর অথচ জীবনধর্মী ধর্মদেশনা করে চলেছেন। তখন আমিও নিঃশব্দে নীরবে বসে অনেক্ষণ সেই ধর্মদেশনা শুনে শুনে নিজেকে ধন্য সার্থক জ্ঞান যেমন করেছি, সেই সাথে ক্ষৌর কর্মরত নাপিতকে এশিয়ার প্রথম ডিলিট উপাধিপ্রাপ্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর বেণীমাধব বড়–য়ার গভীর দর্শন তাত্ত্বিক ভাষণদানের ঘটনাকে স্মরণ করে মনে মনে হেঁসেছিও অনেকবার।

যুগদুর্লভ এই মহাপুুরুষের প্রায় পঞ্চাশ বছরের এই অবিরাম, ধর্মবারি বর্ষণ হতে এদেশের এই অতিসংখ্যালঘু বৌদ্ধ সমাজটি যা পেল, তার কী-ই বা ধারণ করতে সক্ষম হলো, এখন সেই মূল্যায়নের সময় এসেছে।

১। আমি ঘটনাচক্রে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে খ্রিষ্টান মিশনারির এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এর শিকার হয়ে পড়ি। চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকার সমুদ্র তীরবর্তী জনগণ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে তখন এক ভয়ঙ্কর বেদনাবিধুর পরিস্থিতির শিকার হয়ে পড়েছিল। অন্যান্যদের ন্যায় আমরা কিছু ভিক্ষু-গৃহী মৈত্রী-করুণাচিত্তে সেই দুর্যোগকবলিত বেঁচে যাওয়া মানুষদের মাঝে ওষুধ, পথ্য, খাদ্য ও পানীয় জল বিতরণ করে যেদিন চট্টগ্রাম বৌদ্ধ মন্দিরে আমার কক্ষে ফিরে আসি ঠিক সেদিনই পড়ন্ত বিকেলে ফাদার লুইজী লুপি নামক ইতালীয়ান মিশনারি লোকটি হঠাৎ করে আমার দরজার সামনে উপস্থিত হন। সেই থেকে ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই লোক আমাকে নিয়ে বড়–য়া-চাকমা সমাজের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রী এবং অনাথালয়গুলোতে আর্থিক সহযোগিতা-মূলক প্রায় ৮/১০ কোটি টাকা ফেলে দেন। মিশনারি লোকটির সাথে আমার এই ঘনিষ্ঠতার সূত্রে আমি দিবালোকের মতো দেখতে পেলাম সেই ব্রিটিশ আমল থেকে পূর্বভারতের মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, আরাকান হয়ে থাই সীমান্ত পর্যন্ত তাদের খ্রিষ্টান ধর্মরাজ্য স্থাপনের যেই নীল নকশা প্রণীত হয়, ফাদার লুইজী লুপি বর্তমানে তার এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করছেন। সেই লক্ষ্যে তিনি অতিস্বল্পতম সময়ে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রুমা/থানসি/আলীকদম/নাইখ্যংছড়ি/সোনাইছড়ির মতো অতিদুর্গম এলাকায় পর্যন্ত অবাধে বিচরণ করে অনাথাশ্রমাদি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খ্রিষ্টধর্মের ক্রমবর্ধমান এক ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। সেই খ্রিষ্টান মিশনারির পাশাপাশি বর্তমানে ইসলামি মিশনও তথায় কম কর্মতৎপর নন। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ এই পার্বত্য অঞ্চলে সেই তুলনায় বহুকাল ধরে তেমন শক্তিশালী কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষুর আবির্ভাব ঘটেনি। বাংলা ও চাকমা ভাষায় অদক্ষ চিৎমরম মহাবিহার হতে শিক্ষা-দীক্ষাপ্রাপ্ত মুষ্টিমেয় ভিক্ষুরা কোনো প্রকারে যৎকিঞ্চিত বুদ্ধধর্মের শিখাটুকু এই পার্বত্য অঞ্চলে এতদিন যাবৎ ধারণ করেছিলেন। পূজ্য বনভন্তের আবির্ভাবের পূর্বে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের সন্তান চাকমা রাজগুরু ভদন্ত অগ্রবংশ মহাস্থবির এবং সমতলীয় বড়–য়া সমাজের সন্তান উপসংঘরাজ ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির এই দুই মেধাবী ভিক্ষুর অক্লান্ত প্রয়াসে চাকমা সমাজ হতে কিছু সংখ্যক তরুণ প্রবীণ ভিক্ষুর জন্মদানে তাঁরা সক্ষম হন এবং তাঁদের প্রভাবে ক্ষুদ্র আকৃতির কয়েকটি বিহার পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সমাজে জন্ম নেয়। ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের প্রভাবে দীঘিনালার বোয়ালখালী এবং রাঙামাটির রাঙ্গাপানি এলাকায় আধুনিক স্কুল কলেজ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার উপযোগী দুটি বৃহদাকার বৌদ্ধ অনাথাশ্রম গড়ে উঠে। এই প্রক্রিয়ায় পার্বত্য অঞ্চলের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় চাকমা সমাজই যৎকিঞ্চিত ধর্মীয় সামাজিক ও আধুনিক শিক্ষায় অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। কিন্তু পার্বত্য তিন জেলায় অপর বৃহৎ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী মারমা এবং ক্ষুদ্র তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, মুরুং জনগোষ্ঠী পূর্বাপর একই অসহায়তার মাঝে থেকে যায়। তাদের মাঝে বর্তমানে বান্দরবানের মারমা সমাজের কীর্তিমান মেধাবী সন্তান উচাহ্লা মহোদয় ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করে মারমা সমাজকে কিছুটা সংহত করতে প্রয়াসী হয়েছেন বটে, কিন্তু তিনি বুদ্ধধর্মের মধ্যযুগীয় তান্ত্রিকতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষের মনে প্রকৃত বুদ্ধধর্মের আলো দানের পরিবর্তে ভাগ্যনির্ভর অলৌকিকতার অন্ধকারই ছড়াচ্ছেন। ফলে আধুনিক প্রগতির যুগে মনোবিজ্ঞানধর্মী বুদ্ধের চারি আর্যসত্যজ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক প্রয়োগবাদী প্রক্রিয়ায় পরিবেশন না করে আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা ও ঞবীঃ ইড়ী: মেঘ যেভাবে তিল তিল করে জল বাষ্প সংগ্রহ করে করে সমৃদ্ধ হওয়ার পরে বারি বর্ষণ শুরু করতে বাধ্য হয়, আর সেই বর্ষণ চলে সকলের জন্যে সমানভাবে, মহাজ্ঞানী মহাপুরুষদের অতিকষ্টে জীবনের সমগ্র অর্জনটুকুও ঠিক ভারী মেঘের মতোই উজাড় করে বিতরণে তাঁরা বাধ্য হয়ে থাকেন নিজেরই প্রাণের তাগিদে। তাই তো পূজ্য বনভন্তেকে দেখেছি, দিবা-রাত্র অবিশ্রান্তভাবে অপরকে তাঁর অধীত জ্ঞানভা-ার উজাড় করে বিতরণ করতে বিশাল জনসভায় যেমন, ভোজনশালায়, ¯œানাগারে,<নৎ /><নৎ /><নৎ /><নৎ /> একান্ত বিশ্রাম কক্ষেও তেমন অবিরাম বর্ষণমুখর ছিল তাঁর ধর্মদেশনা।<নৎ /><নৎ /><নৎ /><নৎ /> জ্ঞানবিজ্ঞানে অতি পশ্চাৎপদ পার্বত্য জনগোষ্ঠীকে উচাহ্লা মহোদয় অসংখ্য পূজা-প্রার্থনানির্ভর পথে যাচ্ছেন তাতে তারা জীবনদুঃখের অবসানে কর্মমুখর হওয়ার পরিবর্তে রামায়ণের রাম-রাবণ যুদ্ধে বানর হনুমান সৈনিক হওয়ার জন্যেই সর্বশেষে উদ্বুদ্ধ, আর তিনি গৌতম বুদ্ধের নৌকায় চড়েও তাঁকে অস্বীকার করে বহুকল্প পরের রামবুদ্ধের ডানের উজীর, বামের উজী হওয়ার মিথ্যা স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েছেন। তাঁর এই পশ্চাৎমুখী কার্যক্রম এদেশের অতি সংখ্যালঘু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্যে সত্যি মস্ত বড় এক দুর্ভাগ্য।

এদেশে বহুকালধরে বুদ্ধধর্মের এই আলো-আঁধারি পরিস্থিতিতে পূজ্য বনভন্তের আবির্ভাব বলতে গেলে অকুলে কুল পাওয়ার মতো। এই মহতো মহানের অবদানেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর বৌদ্ধজন গোষ্ঠী চাকমা সমাজ প্রায় পাঁচ শত যুবক ভিক্ষু এবং সেই পরিমাণ কিশোর ও যুবকেরা শ্রামণ্য ধর্মে আজ দীক্ষিত হয়েছে। বাংলার মাটিতে একহাজার বছরের ইতিহাসে এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত। বাংলার মাটিতে বুদ্ধধর্মের দেড় হাজার বছরের অন্ধকার যুগ অতিক্রম করে ঊনবিংশ শতকের বাঙালি জাগরণের যুগের পরশ-ধন্য হওয়ার এবং মহামান্য সংঘরাজ সারমেধ মহাস্থবির-সূচিত সদ্ধর্মের পুনরুত্থান পরশধন্য হওয়া সত্ত্বেও বাংলা-ভারতে লঙ্কা-বার্মার ন্যায় উপযুক্ত যুগোপ্রযোগী বৌদ্ধ বিদ্যাপীঠ গড়ে না উঠায়, দেশ বিভাগের কালে বৃহত্তর চট্টগ্রামী বৌদ্ধ মেধাবীদের ভারতে চলে যাওয়ায়, এ দেশের বৌদ্ধ সমাজে যেই ধস নেমে আসে, তারই কারণে পূর্ববঙ্গের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একাংশ ত্রিপিটক শিক্ষার পরিবর্তে গৃহীসুলভ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দিকে ধাবিত হয়ে পড়ে, একাংশ খ্রিষ্টান মিশনারিসুলভ অনাথাশ্রমী কাজে ব্যপৃত হয়ে পড়ে, একাংশ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গৃহীসুলভ বেতনভোগী শিক্ষকতা পেশায় জড়িত হয়ে পড়ে, একাংশ ধনী দেশান্তরে পাড়ি জমিয়ে চীবর ত্যাগ করার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, আর সর্বশেষ অংশ পুরোহিত ব্রাহ্মণতুল্য ২/৪ জন বিপথগামী শিষ্যের অধিকারী হয়ে দায়ক পরিচালিত বিহারের পুরোহিত ভিক্ষুত্বকে বরণ করে নিয়ে তিথি-শ্রাদ্ধ আর সংঘদানের দান-দক্ষিণাজীবী অতিবাহিত করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা প্রত্যেকেই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে শিখেন যে এই জন্মে লোভ-দ্বেষ-মোহ ক্ষয় করে মার্গফল নির্বাণ পাওয়া অসম্ভব, তাই ধ্যান-সমাধি পরিবর্তে যতটুকু সম্ভব শীলপালন করে আগামী বুদ্ধের সাক্ষাতে যা কিছু পাওয়ার সেই আশায় যেন তেন প্রকারে এই জীবনটুকু কাটিয়ে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সদ্ধর্মের পুনরুত্থান শুরু হতে না হতে মাত্র শত বছরের ব্যবধানে এমন বিপদগামীতার শিকার হওয়া, এদেশের বৌদ্ধ সংঘের জন্যে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। সেই দুর্ভাগ্যের অন্ধকারে পরম আত্মবিশ্বাসভরা আশার আলো হয়ে দেখা দিলেন মহান আর্যপুরুষ বনভন্তে। তাঁরই জীবনাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আজ এক ঝাঁক যুবক বুদ্ধ-প্রশংসিত আরণ্যিক জীবন, পাত্র-চীবরধারী পি-পাতিক জীবন, শ্মাশান অরণ্যের ধুতাঙ্গ-জীবন, যথেচ্ছ দ্রব্যসঞ্চয় আর টাকা-পয়সার স্পর্শবিরতি জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তাঁরা গ্রাম ও নগরকেন্দ্রিক ভিক্ষুদের মন-মানসিকতা হতে দূরে থেকে অনেক বেশি ধর্ম-বিনয়ের প্রতি গুরু-গারবতাসম্পন্ন এবং ত্যাগ-বৈরাগ্যের প্রতি যতœশীল। তারা শমথ-বিদর্শন ভাবনায় যতটুকু আগ্রহী, ঠিক তেমন পিটকীয় গ্রন্থসমূহের অনুবাদ এবং অধ্যয়নে সমধিক রুচিবান। তাঁদের ধর্মদেশনা বুদ্ধযুগের ভিক্ষুগণের ন্যায় ধর্মানুকূল নির্বাণমুখী এবং প্রাণবন্ত।

পূজ্য বনভন্তের প্রভাবে বর্তমান ভিক্ষুসংঘের সামান্য একটি অংশের এই আলোকিত দিকটির পাশাপাশি কিছু কালো মেঘের উত্থানও কিন্তু ইদানিং বিপদ-সংকেতরূপে প্রতীয়মান হচ্ছে। ধুতাঙ্গশীল, বিদর্শন সাধনা-ভাবনা ও আধ্যাত্মিক ধ্যান-ভাবনার নামে শ্মশানে, অরণ্যে ও ভাবনা কেন্দ্রে অবস্থানকারী এ সকল ভিক্ষু-শ্রামণের আপন মনের অবিদ্যা-তৃষ্ণা তথা লোভ-দ্বেষ-মোহকে জানা আর তাদের মূল উৎপাটনে গভীর আন্তরিকতার সাথে নিবেদিত হওয়ার পরিবর্তে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করা, আপন আরাম-আয়াসের উপকরণ বৃদ্ধি করা, নিজের নাম-যশ, প্রভাব-প্রতিপত্তি আর লাভ-সৎকার বৃদ্ধির নিত্য নতুন উপায় উদ্ভাবন করা ইত্যাদিকে সমধিক গুরুত্ব প্রদানের লক্ষণ কারো কারো মাঝে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে চর্চা করতে দেখা যাচ্ছে। তারা দুর্গম এলাকার উঁচু পাহাড় শীর্ষে একাকী অবস্থান করে সেখানে নানা উপলক্ষ সৃষ্টি করে জনসমাবেশ ঘটানো, বড় বড় সমাবেশে যক্ষরক্ষের উপদ্রব দমন, স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্র, চারিলোকপাল দেবতাদের সাথে সাক্ষাৎ, আলাপ-পরামর্শ ইত্যাদি আষাঢ়ের গল্প বলা। স্বপ্নে পাওয়া ওষধ দেবতাদের দেওয়া, ওষধ-পথ্যে কঠিন রোগের নিরাময়ের নিশ্চয়তা প্রদানসহ আপন নামের সাথে নানাবিধ উপাধির সমাবেশ ঘটানোয় সবিশেষ উৎসাহী হয়ে উঠেছেন।

রাজপুত্র সিদ্ধার্থ রাজকীয় ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে জীর্ণবস্ত্র, ভিক্ষাপাত্র ধারণ করলেন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে নয়, অভাব-অনটনে ভরা সাধারণ জীবনে দুঃখের দাহন-জ্বালার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্যে।

কঠোর কৃচ্ছ্রাতা অনুশীলন করে মরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলেন কৌতুহলী জনতার বিশাল সমাবেশ ঘটানো জন্যে এই দেহ ও মনটি স্বীয় জীবনে দুঃখের জন্ম দেয় কীভাবে সেই রহস্য উদ্ঘাটনের তীব্র ইচ্ছার বশে।

একালের অকৃত্রিম বুদ্ধপ্রেমী আমাদের বনভন্তে, লোকের কৌতুহল উদ্রেকের জন্যে অরণ্যে প্রবেশ করেননি, নির্জন অরণ্যে আপন দেহ-মনের প্রকৃত স্বভাব-চরিত্রকে সহজে বুঝতে পারার অনুকূল পরিবেশ পওয়ার জন্যেই তিনি কিছু ভিক্ষুদের উৎসাহে অরণ্যে প্রবেশ করেছিলেন। ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করে জীবনধারণের সংকল্প তিনি নিয়েছিলেন গ্রাম্য বিহারের ভিক্ষুদের বিপথগামীতা আর আয়াসী জীবন যাত্রায়, তিথি-শ্রাদ্ধের দান-দক্ষিণার বিনিময়ে বিহার নির্মাণ, বিহার পরিচর্যা, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির দায়বদ্ধতার ভারমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ শীল, সমাধি আর প্রজ্ঞাময় জীবন গঠনে অধিক সময় দেওয়ার সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে। তিনি এই আরণ্যিক জীবনে দীর্ঘ ২২টি বছর শ্রামণরূপে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন ভিক্ষুর শীল-বিনয়সংক্রান্ত ঝামেলা মুক্ত থাকা, আর ওয়া-বর্ষাবাসের সংখ্যা বৃদ্ধিজনিত অহমিকামুক্ত থাকার জন্যে। শুধু তাই নয়, আমাদের সমাজে ভিক্ষু হলে বিহার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে, তিথি-শ্রাদ্ধ সংঘদানের ফাং এ এবং ভিক্ষুদের সভা-সংগঠনে, জয়ন্তী-মরন্তী ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ বাধ্য না হওয়ার জন্যে। শ্রামণ হয়ে থাকলে এসবের বালাই আর থাকে না। তাই ২৯ বছর প্রব্রজ্যা নিয়েও তাড়াহুড়া করে ভিক্ষু না হয়ে তিনি দীর্ঘ ২২টি বছর শ্রামণরূপেই জীবন অতিবাহিত করলেন। এমনকি শিষ্য-প্রশিষ্যে দল ভারী করার বিন্দুমাত্র অভিলাষও এই বন শ্রামণের মনে তখন ছিল না। তাই দীঘিনালার অরণ্যে অবস্থানকালে তাঁকে ভিক্ষুত্ববরণে রাজি করাতে বহু কষ্ট করতে হয়েছিল বলে নানা মুখে শুনেছি। তিনি ২২ বছরের এই আরণ্যিক জীবন শ্রামণরূপে একাকীই ছিলেন। কোনো সঙ্গী রাখেননি কেন? আমার গুরুদেব ভদন্ত প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাস্থবির খুবই ইচ্ছা করেছিলেন ধনপাতায় একসাথে থাকতে। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে এই প্রস্তাবে মোটেই রাজি হননি। দুজন এক সাথে থাকলে, একে অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়, পরস্পরে প্রায় সময় দেখা-দেখি হয়, দেখা-দেখি হলে নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনার ইচ্ছা জাগে। এভাবে অরণ্যে থেকেও নিজের অজান্তেই একটি ঘরোয়া পরিবেশের জন্ম হয়ে যায়। তখন আপন দেহ-মনের রহস্য অবিষ্কার, কায়-জীবনের মমতা ত্যাগ করে ধ্যানের গভীরে ডুব দেয়ার সেই আগ্রহ তেমন বিশেষ আর থাকে না। আমি আমার চার বছরের আরণ্যিক জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই এই সত্য অভিজ্ঞতা আজ এখানে প্রকাশ করলাম বলে ক্ষমাপ্রার্থী। পূজ্য বনভন্তে এ কারণেই হয়তো তাঁর আরণ্যিক জীবনে দ্বিতীয় কোনো সঙ্গীকে স্থান দেননি।

ঞবীঃ ইড়ী: বনভন্তে বলতেন, ‘আমার যখন যৌবন ছিল তখন লোকে বনভন্তেকে বিশ্বাস করেনি বলে এভাবে দান দেয়নি। বনভন্তে তো রাজপুত্র সিদ্ধার্থ ছিল না। সে গরিব চাকমার সন্তান। তাই লোকে তাঁর প্রব্রজ্যাকে বিশ্বাস করেনি। আর এ কারণে বনভন্তেও মানুষকে কোনোদিন বলেনি আমাকে দান দাও, বিল্ডিং করে দাও।’ তিনি আমাদের আয়াসী-বিলাসী মনোভাব লক্ষ্য করে বলতেন, ‘এই যে তোমরা প্রব্রজ্যা নিয়েছ, মহাদুর্ভিক্ষে পড়লে চার-পাঁচদিন খেতে না পেলে, জানি না কয়জনে গায়ে চীবর রাখ।’</ঢ়><নৎ /><নৎ /><নৎ /> <ঢ়>সেদিনের বন শ্রামণ আমাদের আজকের বনভন্তে তাঁর আরণ্যিক জীবন বহুদিন ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে রাতদিন অতিবাহিত করেছিলেন। এটা তাঁর মধ্যপন্থী মানসিকাতায় বিপরীত লোক-দেখানো ইচ্ছাকৃত কৃচ্ছ্বসাধনার অভিলাষে নয়। লোকে তাঁকে সামান্য একটি কুঠিরও করে দেয়নি বলে নিজে করতে গেলে শীল ভঙ্গ হবে—এই ভয়ও তাঁর মনে ছিল—এমন কথাও তিনি আমাদের শুনিয়েছেন। আর একই কারণে বর্ষায় ও শীত বস্ত্রের অভাবে বহু কষ্ট পেয়েছেন, ভিক্ষান্ন সংগ্রহে গিয়েও যথা সময়ে ভিক্ষা না পেয়ে বহু বার তিনি উপোষ থেকেছেন, প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি নির্জন অরণ্যে মরণাপন্ন দশায় উপনীত হয়েছেন। তবুও মুখে মানুষকে বলেননি তাঁর কোনো অভাব-অভিযোগের কথা। কারণ, কেউই তাঁকে বিনয়সম্মতভাবে স্বেচ্ছায় আমন্ত্রণ করেননি জীবন ধারণের এই অনিবার্য চারি প্রত্যয়ের সুব্যস্থা করার। পিটকে উল্লিখিত বুদ্ধসমকালীন প্রব্রজ্যা জীবনের নিখুঁত ছবিটি এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভোগসর্বস্ব যুগে জন্ম নেয়া একজন অকৃত্রিম বুদ্ধপ্রেমী এভাবেই ধারণ করতে জীবনপণ করেছিলেন আপন জীবনে। তাই তো বনভন্তে সিংহনাদ করে বলতেন, ‘আমি বুদ্ধধর্মের ইঞ্জিনিয়ার, খাঁটি বুদ্ধধর্ম এখানেই পাওয়া যাবে। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারি ত্রিপিটকের কোনটি বুদ্ধ বাণী, কোনটি বুদ্ধ বাণী নয়।’

রাঙামাটি রাজবন বিহারে বর্তমানের ঝমকালো রমরমা অবস্থা দেখে বনভন্তে বলতেন, ‘আমার যখন যৌবন ছিল তখন লোকে বনভন্তেকে বিশ্বাস করেনি বলে এভাবে দান দেয়নি। বনভন্তে তো রাজপুত্র সিদ্ধার্থ ছিল না। সে গরিব চাকমার সন্তান। তাই লোকে তাঁর প্রব্রজ্যাকে বিশ্বাস করেনি। আর এ কারণে বনভন্তেও মানুষকে কোনোদিন বলেনি আমাকে দান দাও, বিল্ডিং করে দাও।’ তিনি আমাদের আয়াসী-বিলাসী মনোভাব লক্ষ্য করে বলতেন, ‘এই যে তোমরা প্রব্রজ্যা নিয়েছ, মহাদুর্ভিক্ষে পড়লে চার-পাঁচদিন খেতে না পেলে, জানি না কয়জনে গায়ে চীবর রাখ।’

অপ্রিয় সত্যবাদী বনভন্তে কারো দোষ স্বচক্ষে দেখলে অকুতভয়ী বীরের মতো সামনাসামনি বলে দিতেন। পরোক্ষে কারো দোষের কথা শুনলে, তা যদি অন্যদের জন্যে শিক্ষণীয় হয়, তখন তা নাম-ঠিকানাসহ ছোট বড়ো যে-কোনো সমাবেশে বার বার উল্লেখ করতেন। বুদ্ধ দোষগ্রস্ত ব্যক্তিকে বহুজনের সামনে ডাকতেন, জিজ্ঞাসা করতেন, তেমন দোষ সে করেছে কি না। দোষী নিজের দোষ স্বীকার করলে তার দোষের দ্বারা বর্তমান ও ভবিষ্যতে কী কী ক্ষতি হবে, তা তাকে ভর্ৎসনার বাক্যে বুঝিয়ে দিতেন। আর উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে তার বর্তমানে দোষের জন্যে অতীতের শিক্ষণীয় কোনো হেতু থাকলে জাতকের গল্পাকারে তা উল্লেখ করতেন। এতে দোষী ও উপস্থিত জনতার মনে সংবেগ জাগ্রত হতো। ঠিক সেই মৃদুচিত্ত মুহূর্তে তিনি শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বুদ্ধগণের চরম ও অন্তিম দেশনা চারি আর্যসত্য বিশদভাবে দেশনা করতেন। এতে বহুজনের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হতো। আমাদের বনভন্তে এক্ষেত্রে অক্ষম ছিলেন বলে তিনি মাঝে মধ্যে হতাশা ব্যক্ত করে বলতেন, আমি বুদ্ধ সারিপুত্র, আনন্দ, মহাকাস্যপের মতো নই; আমি সাধারণ বনভন্তে। তবুও আমার শক্তি প্রমাণে চেষ্টা করছি বুদ্ধ কী, তাঁর ধর্মটা কী, তা বুঝাতে। কিন্তু পারলাম কই? হাজার হাজার লোক আমার কাছে আসে, আমার কথা শোনে। কিন্তু বুঝল কয়জনে? সারা বাংলাদেশে বুদ্ধকে বুঝতে পেরেছে এমন একজনও তো খুঁজে পেলাম না। তবুও তিনি এই চেষ্টায় কোনো দিন বিরতি দেননি।

একদিন আমাকে ডেকে তিনি একটি পত্র পড়তে দিলেন। দেখলাম পত্র লেখকের কোনো নাম ঠিকানা নেই; আর আমার বিরুদ্ধে বানোয়াটি কিছু অভিযোগে ভরা এটি। পড়া শেষ হলে ভন্তে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এ সকল কাজ করে আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছ? আমি বললাম, ভন্তে, এ সকল অভিযোগ তো প্রমাণসাপেক্ষ। অথচ পত্রটি লেখকের কোনো নাম-ঠিকানার উল্লেখ নেই। যদি থাকত তাকে ডেকে এনে উপযুক্ত প্রমাণসাপেক্ষে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারলে, আপনি যেই বিচারিক সিদ্ধান্ত দিতেন, আমি তা মাথা পেতে নিতাম। ভন্তে আমার এই বাক্য শুনে বললেন, তুমি কি সত্যই তেমন কিছু করেছ? ভন্তে, এখানে উল্লিখিত অভিযোগসমূহের সাথে স্বপ্নেও আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তখন বললেন, তুমি যদি সৎ হও, জগৎসুদ্ধ তোমাকে অসৎ বললে তুমি কি অসৎ হবে? কখনো না ভন্তে। যদি তুমি অসৎ হও, জগৎসুদ্ধ তোমাকে সৎ বললে, তুমি কি সৎ হবে? তাও না ভন্তে। তুমি ঠিক আছো তো? ভন্তে, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষী। বড়–য়া সমাজের কল্যাণ কামনায় কিছু তাদের উপকারমূলক কাজ করতে গিয়ে, কিছু পরশ্রীকাতর লোভী আত্মসর্বস্ব মানুষদের রোষানলে পড়েছি। আর তারাই আজ আমার বিরুদ্ধে আপনার কাছে এই সেই মিথ্যা অভিযোগ এনেছে বলে আমার বিশ্বাস। ভন্তে বললেন, তুমি যদি ঠিক থাক তা হলে যাও, এসবে কান দেবে না। ধ্যান-সাধানায় উদ্যোগী হও, মিথ্যা সময় নষ্ট কর না। এভাবে উপদেশ দিয়ে তিনি সেদিন আমাকে বিদায় দিলেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অনগ্রসর পাহাড়িদের অস্থিত্ব রক্ষায় জন্ম নেয়া বর্তমান আন্দোলন তিনি বুদ্ধ-প্রণীত পঞ্চশীলভিত্তিক গণচেতনা জাগরণের মাধ্যমে উত্তোরণের পক্ষপাতী ছিলেন, সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন না। তবুও যেদিন খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিচুক্তির ভিত্তিতে শান্তিবাহিনী অস্ত্রসমর্পণ করছিলেন, সেদিন আমি পূজ্য বনভন্তের সামনে বসা ছিলাম। কথা প্রসঙ্গে বনভন্তে তখন উক্তি করলেন, ‘আজ থেকে সন্তুরা দাঁড়-ভাঙা কাঁকরায় পরিণত হলো। তারা যা পারবে না, সে-কাজ করতে গিয়েই আজ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি সেটেলার দ্বারা ভরিয়ে দিল, আর্মিতে ভরিয়ে দিল। রাজশক্তি, অস্ত্রশক্তি, ধনশক্তি, জনশক্তির মধ্যে কোন শক্তিতে তারা বাংলাদেশ সরকারের চেয়ে বলবান বল দেখি? যাদের এ সকল শক্তি নেই, তাদের টিকে থাকতে হলে জ্ঞান, বুদ্ধি, কৌশল—এ তিনের আশ্রয়েই টিকে থাকতে হয়। এই শান্তিচুক্তির বিপক্ষ নিয়েছে এখন নিজেদেরই লোক। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এখন এই চুক্তি মানছে না। পাহাড়িদের এই বিভাজন ভবিষ্যতে আরও দুঃখ ডেকে আনবে। সরকার কি সত্যি সত্যি তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে? কখনো না। একই আমগাছে কি এক শাখায় মিষ্টি আম, এক শাখায় টক আম ধরে? খালেদা জিয়া টক আম, আর শেখ হাসিনা কি মিষ্টি আম হবে বলে বিশ্বাস করো?’

বনভন্তের সেদিনের এ সকল উক্তি আরও বহু বার বহু সমাবেশে তিনি বলেছেন। বাবু সন্তু লারমা আর বাবু প্রসিত খীসাকে সে সকল সমাবেশে, তারা অনুপস্থিত থাকলেও বনভন্তে পুনঃ পুনঃ আহ্বান করেছেন তারা উভয়ে বনভন্তের কাছে আসতে। ভন্তে বলতেন, ‘তারা আসলে আমি চেষ্টা করে দেখতাম, বনভন্তের শক্তিতে তাদের উদ্ধার করা যায় কি না। যদি তাদের মাথা পর্যন্ত ডুবে যায়, তাহলে বনভন্তের শক্তি নেই যে তাদের উদ্ধার করতে পারবে। যদি গলা পর্যন্ত ডুবে, তা হলে বনভন্তে পারবে।’ ভন্তের পারা না পারার মধ্যে এই গলা আর মাথা শব্দদ্বয়ের ব্যবহারে বিশেষ মর্মার্থ বিদ্যমান। যদি মাথা পর্যন্ত ডুবে, তা হলে বনভন্তে উভয়ের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি ও একতার জন্মদানে যেই শিক্ষা-উপদেশ দেবেন, তা তারা বুঝতে পারবে। হায়! ভন্তের জীবৎকালে উভয়পক্ষের সেই সৌভাগ্য কোনো দিনই হলো না। এমন এক মহাকল্যাণমিত্রহারা সমাজে বর্তমান দ্বন্দ্বের অবসান কবে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর এখন আর কারো জানা নেই।

পূজ্য বনভন্তের বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষা-উপদেশকে পিটকের পৃষ্ঠা থেকে নিজের ও অন্যের প্রত্যক্ষ জীবনে প্রতিনিয়ত অবিষ্কারের গবেষণায় নিমজ্জিত থাকতেন। আর তাতেই মানুষের কাছে তাঁর প্রতিটি বক্তব্য অভিনব রূপ ধারণ করত। শ্রোতা চমৎকৃত হতেন অতি সামান্য লেখাপড়া জানা একজন ব্যক্তির মুখ থেকে গুরুগম্ভীর অর্থসংযুক্ত বিষয় এত সহজবোধ্য ও অভিনব উপমা ব্যাখ্যায় উপস্থাপন হয় কী করে! এ প্রসঙ্গে একদিনের এক ঘটনার কথা বলি।

শ্রদ্ধেয় বনভন্তের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব সম্পর্ক ছিল এমন এক মহাস্থবির বহুকাল পর একদিন তিনি বনবিহারে বেড়াতে এলেন। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে প্রতিদিন ভোরে শিষ্যদের দেশনা করেন। এদিনও তিনি ধর্মদেশনা করছেন, আর আমরা শুনছি। অতিথি মহাস্থবিরকে সবার আগে বনভন্তের অতিনিকটে বসার আসন করে দিয়েছি। বনভন্তে সেদিন দেশনা প্রসঙ্গে হঠাৎ সন্তু-প্রসিতের দ্বন্দ্বে বহু চাকমা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে নিহত হতে হচ্ছে, সে বিষয়ের উপর অতি উত্তোজিতভাবে বহুক্ষণ কথা বলছিলেন। এতে অতিথি ভন্তে মনক্ষুন্ন হয়ে বললেন, ভন্তে, আপনি চারি আর্যসত্যের উপরে কিছু বলেন না। আমি এসেছি আপনার কাছে চারি আর্যসত্যের উপর কিছু শুনতে। তখন বনভন্তে বললেন, তুমি তো চারি আর্যসত্যকে শুধু বইয়ের মধ্যেই দেখতে অভ্যস্ত। জীবনের মধ্যে তাকে না দেখলে সত্য উপলব্ধি হবে কী করে? এই যে, এতক্ষণ আমি চাকমাদের নিয়ে এত কথা বলছি, তা কোন সত্যের মধ্যে পড়ে? তা দুঃখসত্য নয় কি? ঠিক এভাবেই বুদ্ধজ্ঞানকে প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞায় অভিজ্ঞ ছিলেন পূজ্য বনভন্তে। তাঁর এই জীবনদৃষ্টি অন্তরের গভীর আন্তরিকতায় এতই একাকার হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি মানুষের চলমান জীবনে বিপথগামী কোনো আচরণ দেখলেই ভীষণ উত্তোজিত হয়ে পড়তেন সহজে। ফলে কেউ কেউ এ কারণে বনভন্তেকে ভুল বুঝতেন। তারা বলেন, ‘বনভন্তে যদি অর্হৎ হয়ে থাকেন, তাহলে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েন কেন?’

একদিন এ প্রশ্নটি আমি ভন্তেকে জানালাম। তিনি বললেন, ‘প্রজ্ঞাবংশ, বড়–য়া-চাকমাদের মধ্যে বুদ্ধের প্রকৃত ধর্ম দীর্ঘকাল ধরে চর্চাহীনতায় তাদের মনে অবিদ্যা-তৃষ্ণা এত গভীরে চলে গেছে যে, এই অবিদ্যার মরিচা দূর করতে এখন কামারের মতো হাতুড়ি পেটাতে হচ্ছে। তারা যদি সোনার টুকুরো হতো, তাহলে বনভন্তেকে বাইন্যার মতো মৃদু আঘাতেই অলংকার তৈরি সম্ভব হতো। আমি তো তাদের প্রতি গভীর মৈত্রী-করুণায় উত্তেজিতভাব ধারণ করি। এটা কি আমার ক্রোধ?’

বাস্তবিক, মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর এই কৃত্রিম উত্তেজিতভাব সম্পূর্ণ উদাও হয়ে যেত। এমনকি কখনো তিনি যখন ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়তেন, তখনও আমি খেয়াল করে দেখেছি, তাঁর সুনীল নেত্রের গভীরে রাগের কোনো ছাপ নেই।

পূজ্য বনভন্তে আমাদের এই দুর্লভ মহাকল্যাণমিত্রটি উচাহ্লাপ্রমুখ কিছু বিপথগামী ভিক্ষুর কর্মকা- নিয়ে মাঝে মধ্যে কথা বলতেন। ফলে তারা বনভন্তের প্রতি ক্রোধান্বিত হয়ে কেউ বনভন্তেকে বনের পশুদের সাথে তুলনা করে জনসমাবেশে বক্তব্য রাখেন, কেউ ‘বারো বেশি, না তেরো বেশি’ এই নামে পুস্তিকা বিলি করেন। আর এখন তেমন ভিক্ষুরাই সোচ্চার হয়ে বলছেন, “বনভন্তে ছিলেন পঁচা মাছ। আর তোমরা বড়–য়ারা তাঁকে অর্হৎ বলে বিশ্বাস করে এতদিন পর্যন্ত তাঁর পেছনে খুব দৌঁড়াচ্ছ। মাছের পঁচন রোধে যেমন ফরমালিন দিতে হয়, বনভন্তের শিষ্যরাও তাই ফরমালিন প্রয়োগ করে গুরুর মরদেহ রক্ষায় কোমর বেঁধেছে। আমি বহু পূর্বেই তোমাদের বলিনি, বাংলাদেশে কোনো অর্হৎ নেই। অর্হৎ আছেন শুধু বার্মায়। অর্হতের দেহ কোনোদিন পঁচন লাগে না। বনভন্তের শিষ্যরা কোনোদিন তার দেহ পোড়াবে না। কারণ, এই দেহ পোড়ালে কখনো সেই দেহের অস্থি অর্হতের ধাতুরূপ গ্রহণ করবে না। আর তখন আবারো প্রামাণিত হবে যে, বনভন্তে কখনো অর্হৎ ছিলেন না।’

এই মাত্র কয়দিন আগে বান্দবানের ভদন্ত উচাহ্লা মহোদয় এ কথাগুলো বান্দরবানে এবং চট্টগ্রামের মুসলিম ইনিস্টিটিউটের সমাবেশে বড়–য়াদের উদ্দেশে বলেছেন বলে বেশ কিছু দায়ক আমাকে জানালেন। তখন আমি তাদের বললাম, উচাহ্লা মহোদয়কে সুত্তপিটকের দীর্ঘনিকায়ভুক্ত ‘মহাপরিনিব্বান সুত্ত’টি ভালো করে পড়তে পরামর্শ দেবে। সেখানে সেবক আনন্দ ভন্তে বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তথাগতের পরিনির্বাণের পর দেহ-সৎকার কীভাবে করতে হবে? তার উত্তরে বুদ্ধ রাজ চক্রবর্তীর দেহ-সৎকার সদৃশ করে তথাগতের দেহ-সৎকার কর্তব্য বলেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ কর্তৃক যে-সকল তৈলাধার প্রক্রিয়ার কথা সেখানে বর্ণিত হয়েছে, তা সে যুগের ফর্মালিনসদৃশ বলা যায় কি না তা পরীক্ষা করতে আবুসো উচাহ্লাকে কুশীনগরের শ্মশান মৃত্তিকা-গবেষণায় যেতে পরামর্শ দেয়া কর্তব্য।

কথায় কথায় উচাহ্লা মহোদয় বার্মার কৃতিত্ব প্রকাশ করতে খুবই উৎসাহ বোধ করেন। ১৯৯৫ সালে আমরা মহামান্য অষ্টম সংঘরাজ শীলালঙ্কার মহাস্থবির মহোদয়ের সাথে ২০ জনের একটি গ্রুপ ১৮ দিনের সফরে মায়ানমারতে সরকারি আমন্ত্রণে গমন করি। একদিন আমাদের জানান হলো, আজকে এমন এক অর্হতের মৃতদেহ দর্শনে নিয়ে যাওয়া হবে, যার দেহে বিগত একশত বছর ধরে কোনো পঁচন ধরেনি এবং সজীব তরতাজা এই দেহটির ক্রমবর্ধমান চুল-গোঁফ-নখ প্রতিমাসে একবার করে কাটতে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে সবিশেষ কৌতুহলী হয়ে সেদিন এই অর্হতের দেহটি দর্শনে গেলাম। দেহটির জরাজীর্ণ ও ধুলি-ময়লায় ভরা বৃহদাকার এক কাঠের ঘরে আয়নাযুক্ত বাক্সে পা ও মাথা দেখা যায় মতো করে চীবর জড়ায়ে রাখা হয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণ ভিক্ষুদের শবদেহকে এক বছর কাল চা-পাতা, তামাক পাতা, চুন ও কাঠ-কয়লা দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে দেহটি যেই অবস্থা প্রাপ্ত হয়, কথিত এই অর্হতের দেহটির অবস্থাও অবিকল তেমনই হয়েছে। অধিকন্তু, দেহটিতে মাথার চুল, মুখের গোঁফ বা পায়ের নখ বৃদ্ধির কোনো লক্ষণই যখন দেখতে পেলাম না, তখন এগুলোর কর্তনের কাহিনিটি বিশ্বাস করি কী করে? অধিকন্তু, এমন অনেক মৃতদেহ সেই তুলসী পাতাতুল্য পবিত্র বার্মায় বা থাইল্যান্ড যেই লক্ষ্য, যেই উদ্দেশ্যে দাহ না করে রেখে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশে বনভন্তের শিষ্য অনুরাগীরা সেই একই চেতনায় রাখতে গেলে উচাহ্লা মহোদয়ের বর্তমান রাম-রামায়ণ প্রীতির মহনীয়তা ম্লান হয়ে যাওয়ার তেমন কোনো সম্ভবনা আছে বলে আতঙ্কিত হওয়ার কারণও তো খুঁজে পাই না। অতএব, এত সব অবাস্তব বিষয় নিয়ে এত চেঁচামেচি করার কী-ই বা আছে? মনে রাখা দরকার আমরা বর্তমানে ১৬/১৭ কোটির মধ্যে অধিকাংশ ভয়ানক ভাববাদী জন সমুদ্রে ডুবে থাকা মাত্র কয়েক লাখ বৌদ্ধ নামধারী আছি। অতএব, আপনার ভাববাদী খাদ্যই এদেশে সমাদৃত হবে সবচেয়ে বেশি। বুদ্ধের চারি আর্যসত্যবাদ অত বেশিজনের মনে ঠাঁই পাবে বলে তো মনে হয় না। স্বয়ং বুদ্ধ এজন্যেই বলেছেন, ‘পচ্চত্তং বেদিতব্বো বিঞ্ঞূহী’তি এসো ধম্মো’—একমাত্র প্রাজ্ঞজনই ধর্ম বুঝতে সক্ষম হবে।

এই ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাস আমি চিকিৎসা ও ধ্যানের উদ্দেশ্যে ব্যাংকক আর য়াংগুনে অবস্থান করি। য়াংগুন অবস্থানকালে ঞযবৎড়াধফধ ইঁফফযরংঃ গরহহরড়হৎু টহরাবৎংরঃু-তে অধ্যয়নরত ¯েœহের জ্যোতিসার ভিক্ষু একদিন আমাকে নিয়ে গেলে বুদ্ধধাতু মিউজিয়াম দেখানোর জন্যে। বিরাট গ্লাস কেইসে ভর্তি প্রচুর নুঁড়িপাথরগুলোকে বুদ্ধের পবিত্র অস্থি বলে দাবী করার যুক্তি কী জিজ্ঞাসা করলে, সেই মিউজিয়ামের যুগপৎ মালিক ও তত্ত্বাবধায়ক মহোদয় বললেন, আমার কাছে সামান্য খাঁটি বুদ্ধাস্থি আছে তা এক একটি নুঁড়িপাথর ভা-ে কিছুদিন করে রাখি। আর তাতেই সমস্ত নুড়িপাথরগুলো মূল বুদ্ধাস্থির গুণসম্পন্ন হয়ে যায়। তত্ত্ববধায়ক ভদন্ত মহোদয়ের এই বর্ণনা শুনতে শুনতে সংঘরাজ জ্যোতিপাল ভন্তেকে প্রদত্ত বড় বোতল ভর্তি বুদ্ধধাতুগুলোতে ১৯৯৫ সালে নুঁড়িপাথর আর ঝর্ণার ক্ষুদে শামুকের খোলসের সন্ধান পাওয়ার কৌতুহলটি নিবৃত্ত হলো আমার। মানুষের সরল ধর্মবিশ্বাসকে নিয়ে যুগে যুগে ধর্মব্যবসায়ীরা এতসব কা-কারখানার ফাঁদই পেতে বসেন। অতএব, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র বৌদ্ধ সমাজে সেই ব্যবসায়ীদের অভাব হবে কেন?

লোকমুখে নানা কথা শুনতে শুনতে একদিন আমি বান্দরবানে স্বর্ণজাদিটি দেখতে গমন করি। দেখলাম ছোট একটি সাইন বোর্ডে দিকনির্দেশনামূলক লেখা আছে ‘দেবতার পুকুর’। কৌতুহলী হয়ে তথায় উপস্থিত হয়ে দেখলাম এটি পুকুর নয়, পাহাড়ের ঢালুতে একটি খনন করা কূপ। কেয়ার-টেকারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এটি কে খনন করেছেন?’ উত্তরে বললেন, ‘উচাহ্লা ভন্তে!’ মনে মনে ভাবলাম, নিজে খনন করে দেবতার ঘাঁড়ে চাপানোর বুদ্ধিটি জর্জের পক্ষে সম্ভব হলো কী করে? শুনতে পাচ্ছি তিনি দেবতা-ব্রহ্মা-রামঠাকুরদের নিয়ে এসব গল্প বলায় এখন আরো বেশি মুখর হয়ে উঠেছেন।

যেমন গুরু, তেমন শিষ্যভক্তের জন্ম হওয়াই স্বাভাবিক। তাই উনার এক নম্বর শিষ্য আবুসো উঃ পঞ্ঞাচাক্কা ভিক্ষুও আমার প্রসঙ্গে নানা কথা বলছেন বলে শুনতে পাচ্ছি। আমি নাকি ভিক্ষু মহোদয়কে তার গুরু থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করেছি। ঘটনাটি হচ্ছে অসুস্থ বুদ্ধরক্ষিত ভন্তেকে দেখতে একদিন আমি আঁধার মানিক যাই। ইচ্ছা হলো ফেরার পথে পঞ্ঞাচক্কার প্রতিষ্ঠানটি দেখে যাব। তথায় নানা প্রসঙ্গে আলোচনা বললাম, ভাই তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এই ঝাড়-ফুক্-তুক্-তাকের দিকে রুচিবান হলে কেন? এসব তো বৌদ্ধজাতির অন্ধকার যুগের বিষয়। বন্ধু মহোদয় তখন অকপটে বললেন, ভন্তে, আপনারা হচ্ছেন সতিপট্ঠান আর বিদর্শনমার্গের লোক। আর আমরা হলাম শমথ মার্গের। এই পথেও তো বহুলোকের উপকার করতে পারছি। বুদ্ধ-প্রদর্শিত শমথমার্গটি কী—এ নিয়ে সেদিন আর তর্ক না বাড়িয়ে বিদায় নিলাম। এতে গুরু-শিষ্যে বিচ্ছেদের আতঙ্ক কেন?

গৃহীদের প্রতি পূজ্য বনভন্তের উপদেশ ছিল, মনে-প্রাণে পঞ্চশীলকে স্বীয় জীবনে সামাজিক জীবনে ও জাতীয় জীবনে ধারণ করা। এ প্রসঙ্গে তিনি একান্ত নিশ্চয়তা দিয়ে বলতেন, ‘এই মুখে বলছি চাকমা-বড়–য়া-মারমারা যদি মনে-প্রাণে মাত্র তিনটি বছর পঞ্চশীলকে রক্ষা করে, দেখবে তাদের কেউই আর গরিব থাকবে না। এখন রাজবন বিহারে সারা বছর রাজমিস্ত্রীর কাজ চলছে, মানুষ অকাতরে দান দিচ্ছে কেন জান? বনভন্তে নিখুঁতভাবে শীল পালন করছে বলে। বনভন্তে বুদ্ধের ধন দেখেছে। বনভন্তে বুদ্ধের ধন পেয়েছে। তাই বনভন্তে সত্যিকার ধনী। বুদ্ধের যেই ধন আছে একটি আমেরিকারও সেই ধন নেই। এদেশের চাকমারা গরিব, ঞবীঃ ইড়ী: আসলে কি জান? এদেশের চাকমা, বড়–য়া, মারমাদের মনে বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা-বিশ্বাস নেই, একথা বললে ভুল হবে। বুদ্ধের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা-বিশ্বাস আছে, তবে তা অতিসামান্য। যেমন দেখ, বর্ষাকালে জমিগুলোতে জল থাকে।<নৎ /><নৎ /><নৎ /><নৎ /> কিন্তু সেই জলে তো ছোট একটি নৌকাও চলে না, জাহাজ চলবে কী করে?<নৎ /><নৎ /><নৎ /><নৎ /> বিশাল জ্ঞানরতœ ও প্রজ্ঞারতেœ পরিপূর্ণ বুদ্ধের ধর্মজাহাজ চলতে হলে মনসমুদ্রে তো<নৎ /><নৎ /><নৎ /><নৎ /> চার-পাঁচ শ হাত গভীর শ্রদ্ধাজল দরকার।<নৎ /><নৎ /><নৎ /><নৎ /> বড়–য়ারা গরিব, মারমারা গরিব। অথচ তারা বৌদ্ধ বলে পরিচয় দেয়। এতে বনভন্তে লজ্জা পায়। কেন? হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টানেরা এই চাকমা, বড়–য়া, মারমাদের এমন দুরাবস্থা দেখে দেখে বলার সুযোগ পাচ্ছে, ‘দেখ না, বুদ্ধকে বিশ্বাস করলে, তাঁর শিক্ষা উপদেশ মানলে এই বড়–য়া, চাকমা, মারমারদের মতো গরিব থাকতে হয়। আর আমাদের আল্লাহকে, ঈশ্বরকে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বিশ্বাস করলে, তাঁদের শিক্ষা উপদেশ মান্য করলে ধনের অধিকারী, রাজ্যের অধিকারী হওয়া যায়।

আসলে কি জান? এদেশের চাকমা, বড়–য়া, মারমাদের মনে বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা-বিশ্বাস নেই, একথা বললে ভুল হবে। বুদ্ধের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা-বিশ্বাস আছে, তবে তা অতিসামান্য। যেমন দেখ, বর্ষাকালে জমিগুলোতে জল থাকে। কিন্তু সেই জলে তো ছোট একটি নৌকাও চলে না, জাহাজ চলবে কী করে? বিশাল জ্ঞানরতœ ও প্রজ্ঞারতেœ পরিপূর্ণ বুদ্ধের ধর্মজাহাজ চলতে হলে মনসমুদ্রে তো চার-পাঁচ শ হাত গভীর শ্রদ্ধাজল দরকার। কিন্তু এদেশের চাকমা, বড়–য়া, মারমাদের মনে শ্রদ্ধা আছে মাত্র এক ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি। তাই বুদ্ধের ধর্মজাহাজ তাদের মাঝে অচল হয়ে পড়েছে। এখন তাদের প্রয়োজন বুদ্ধের প্রতি, ধর্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস, গভীর শ্রদ্ধা। বুদ্ধের জ্ঞানরতœ ও প্রজ্ঞারতেœর তুলনা অন্যান্য ধর্মে জ্ঞান-প্রজ্ঞা লোহা, সিসা ও তামার তুল্য মূল্যবান। অথচ, সেই সকল ধর্ম সামান্য মূল্যের হয়েও তাদের গভীর শ্রদ্ধা-বিশ্বাসের জোরেই আজ এসব ধর্মের প্রভাব-প্রতিপত্তি কেমন হয়ে উঠেছে দেখ।

পূজ্য বনভন্তে আদর্শ বৌদ্ধ জীবন ও আদর্শ বৌদ্ধ গৃহীর স্বপ্ন দেখতেন, তাদের শীলসম্পদ, জ্ঞান-বুদ্ধি-কৌশলসম্পদ এবং স্বাস্থ্য-সম্পদের মাধ্যমে। তিনি আদর্শ বৌদ্ধপল্লীর স্বপ্ন দেখতে সুপরিসর পীচঢালা পথের দুই পাশে কুল-ফলের বাগানযুক্ত সুরক্ষিত প্রাচীরের তোরণে বাড়ির কর্তার নামফলক আর কলিং-বেলযুক্ত বিদ্যুৎ, জল ইত্যাদির সুব্যস্থাসম্পন্ন সারিবদ্ধ বাড়ির সজ্জিত বৌদ্ধপল্লীর স্বপ্ন দেখতেন। তিনি আদর্শ বৌদ্ধ সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, পঞ্চশীলনীতি আর মৈত্রী-করুণা-মুদিতা-উপেক্ষা গুণের অনুশীলনভিত্তিক সমাজ জীবনের মধ্যে। তিনি বলতেন, আদর্শ বৌদ্ধ সমাজে ও জাতিতে গৃহী-প্রব্রজ্জিত উভয়ে স্ব স্ব শীল-বিনয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত থেকে পঞ্চবিধ পাপ-উৎপাদক নিষিদ্ধ বাণিজ্য পরিত্যাগপূর্বক (প্রাণী, মাংস, নেশা, বিষ, অস্ত্র ইত্যাদি বাণিজ্য) অন্য যে-কোনো জীবিকায় সুশৃঙ্খল (দান-শীল-ভাবনা, আর শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা) জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া। মিথ্যাদান, মিথ্যাশীল, মিথ্যা-ভাবনা, মিথ্যা-সমাধি, মিথ্যা-প্রজ্ঞার শিকার না হওয়া।

প্রব্রজিত জীবনের স্বরূপ :

গৃহীরা বস্তুনির্ভর জীবিকা অবলম্বন করবে। তাতে তারা অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা—এই চারি প্রত্যয় নামক জীবনের অনিবার্য প্রয়োজন যেমন মেটাবে, সেই সাথে দানের মাধ্যমে প্রব্রজ্জিতদের জন্যেও উক্ত চাহিদার যোগান দেবে। যেহেতু তারা জানবে যে এই প্রব্রজিতগণ বহুজনের হিত ও কল্যাণে জীবন উৎসর্গীকৃত। অপর দিকে প্রব্রজ্জিতগণ (ভিক্ষু-শ্রামণ-অনাগারিক) শীল-সমাধি আর প্রজ্ঞার অনুশীলন করে স্থির-শান্ত-দান্ত জ্ঞানময় প্রজ্ঞাবিম-িত উন্নত আদর্শের ত্যাগময় যেই জীবন গঠন করবেন, সেই জীবনই হবে অস্থির, অশান্ত, স্বার্থ-বিক্ষুব্ধ গৃহী জীবনের সামনে এক পরম শান্তির প্রতীক আর নির্ভরযোগ্য স্বস্তির আশ্রয়স্থল। তাই শীল-সমাধি-প্রজ্ঞাবিম-িত এই প্রব্রজ্জিত জীবনগুলো প্রত্যেকটি হবে গৃহীদের জীবনে দেব-মানবের সুমহান শিক্ষক বুদ্ধের আদর্শ প্রতিনিধিস্বরূপ। দেব-মানবের শিক্ষক বুদ্ধ দশধর্ম সূত্রে প্রব্রজ্জিতদের উদ্দেশ্যে সেই জীবনের অবকাঠামো এভাবেই নির্দেশ করেছেন :

১) প্রব্রজ্জিত হয়ে আমি গৃহীর চাকচিক্যপূর্ণ দৈহিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারী তৃষ্ণা-আকাক্সক্ষাযুক্ত বস্ত্র-অলংকার ত্যাগ করে, আর্যশ্রাবক অর্হৎগণের শোভনীয় শুধুমাত্র লজ্জানিবারণ আর শীততাপ, ডংস-মশকাদির উপদ্রব থেকে দেহ আচ্ছাদনের লক্ষ্যে এই গৈরিক বস্ত্র ধারণ করেছি।

২) আমি গৃহীসুলভ জীবন-জীবিকা বর্জন করে ন্যূন্যতম চাহিদায় সীমাবদ্ধ থেকে শুধুমাত্র ক্ষুধারূপ মহাব্যাধির ওষধরূপে ভিক্ষান্নলব্ধ খাদ্য দ্বারা জীবন-ধারণের জন্যই এই প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছি। আমার এই প্রব্রজ্যাগ্রহণ শুধুমাত্র শীল, সমাধি আর প্রজ্ঞার পরিপূর্ণতা লাভের সহায়তা আর আনুকূল্যতা লাভের স্বার্থে। এই শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার চর্চায় অধীত আমার জ্ঞান-প্রজ্ঞা শুধু নিজের কলহ নয়; অধিকন্তু যাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান আর চিকিৎসা সহায়তায় লাভ হলো তাঁদের ঋণ শোধসহ সমগ্র বিশ্বের কল্যাণে কৃতজ্ঞ চিত্তে বিতরণের জন্যেই।

৩) অন্যের নিন্দনীয় এমন কোনো কাজ, এমন কোনো আচরণ যেন আমার দ্বারা না হয়—এ বিষয়ে আমি যেন সর্বক্ষণ সতর্ক থাকি।

৪) আমার দ্বারা প্রব্রজ্জিতের শীলসংযমতা লঙ্ঘিত হচ্ছে আমি দুঃশীল অপবাদ যেন না হয়—এ বিষয়ে যেন সর্বদা সতর্ক থাকি।

৫) বিজ্ঞ অনুসন্ধানী সব্রহ্মচারীগণ দ্বারাও যেন আমার এমন নিন্দাবাদ কখনো করা না হয় যে, আমি ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র শীল-সংযমতার প্রতি উদাসীন।

৬) আমার কাছে যে-সকল বস্তু, ব্যক্তি বা বিষয় বর্তমানে প্রিয় বলে গণ্য হচ্ছে, সে-সকল একান্তই অনিত্যধর্মী, একান্তই পরিবর্তনশীলতার অধীন—এই ধারণা ও বিশ্বাস যেন সর্বদা আমার মনে অটুট থাকে।

৭) আমি স্বীয় কর্মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমি আমারই কৃতকর্মের একমাত্র উত্তরাধিকারী। আমার কর্মই আমাকে জন্মগ্রহণে বাধ্য করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। ভালোকর্ম এবং মন্দকর্ম যেই কাজই আমি করি না কেন সব কর্মের উত্তরাধিকারী আমাকেই হতে হবে। একজন প্রব্রজ্জিত আপন কর্ম সম্পর্কে এভাবে সচেতন থেকে স্বীয় কায়কর্ম, বাক্যকর্ম ও মনোকর্মতে সতর্ক ও সাবধানতার সাথে সম্পাদন করতে হবে; যাতে দুঃখফলদায়ী কোনো মন্দকর্ম নিজের দ্বারা সম্পাদিত না হয়।

৮) একজন প্রব্রজ্যিত সর্বদা নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে হবে, ‘আমি কীভাবে রাতদিন অতিবাহিত করছি। এভাবে আত্মবীক্ষণের মাধ্যমে তিনি সর্বদা সতর্ক-সাবধান থেকে আপন শীল-সংযমতা অনুশীলন, চিত্তের চঞ্চল-বিক্ষিপ্তভাবের অপনোদন এবং মনের তথা চিত্তের শান্ত-দান্ত-স্থির-একাগ্রতার শক্তি বৃদ্ধির জন্য সদা উদ্যম-উৎসাহসহকারে অক্ষুন্নভাবে সংরক্ষণ করবেন। এভাবে নিজেকে অপ্রমত্ত রেখে তিনি চক্ষু-কর্ণ-জিহ্বাদি ছয় অনুভূতি পথে আগত বিষয়াবলীকে সতর্ক ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আপন যাবতীয় কর্তব্য-কর্ম সম্পাদন করবেন।

৯। সেই প্রব্রজ্জিত উল্লিখিত গুণাবলী অর্জনের জন্যে তাঁর প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে তিনি যখন যেখানে অবস্থান করেন তাঁর সেই সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, বিষয় ও স্থানের প্রতি দায়-দায়িত্বসমূহ নিখুঁতভাবে সম্পাদন করা। এই অবস্থানকালটি পথ চলার সময়ে প্রতি কদমে, পথ অতিক্রমের মুহূর্তটি অথবা কারো সাথে বাক্যালাপের সময়টি অথবা দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সংকোচন-প্রসারণ মুহূর্তটির প্রতি পর্যন্ত আপন কর্তব্য কী, তা খুঁজে বের করে একান্ত মনে তা সম্পাদন করবেন। ইহাকেই বলে প্রব্রজ্জিতের ব্রতকর্ম। বিনয়পিটকের মহাবর্গ গ্রন্থে উক্ত ব্রত সম্পাদনের সময়েও নিজের মনে এই উৎকণ্ঠাভাব বজায় রাখতে হবে যে, আমি এ সকল ব্রত-দায়িত্ব সমাপ্ত করে কখন সেই নির্জন স্থানে বা শূন্যাগারে প্রবেশপূর্বক মনের স্থির-শান্ত-দান্তভাবের মধ্যে নিমজ্জিত হবে এতক্ষণ যাবৎ নানা কর্তব্য-কর্ম সম্পাদন করতে গিয়ে আপন মনের হারানো অনাসক্ত-নিরপক্ষভাব বজায় রাখার শক্তি বৃদ্ধিতে কখন আমি ধ্যান-সাধনায় রত হব।

১০) সেই প্রব্রজ্জিত এভাবে আদর্শ জীবন অনুশীলনকালে বরাবর এই আকাক্সক্ষা আপন মনে পোষণ করবেন যে, আমার জীবনের অন্তিম মুহূর্তে সব্রহ্মচারীগণের কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, বন্ধু, এই দুর্লভ প্রব্রজ্যা জীবনে আপনি বুদ্ধ-প্রশংসিত চারি মার্গ ফলের কোনো একটি অধিগত করতে সক্ষম হয়েছেন কি? সাথীদের এই প্রশ্নে, সে সময়ে যেন স্বীয় ব্যর্থতার দায়ে আমাকে নীরব থাকতে না হয়।

বুদ্ধের অন্তিম শয্যার পাশে উপবিষ্ট প্রধান সেবক আনন্দ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ভগবান তথাগতের অবর্তমানে কে হবেন ভিক্ষুসংঘের শাস্তা তথা শিক্ষক এবং কে হবেন পরিচালক?

এ প্রশ্নে বুদ্ধ বলেছেন, পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে তিনি ভিক্ষুসংঘকে যেই শিক্ষা-উপদেশ দিয়েছেন, সেই ধর্ম-বিনয়ই তখন তাদের শিক্ষক, সংঘই হবেন এই ধর্ম-বিনয়ের ধারক এবং তদনুযায়ী সংঘের পরিচালক।

মঙ্গল সূত্র বয়োজ্যেষ্ঠগণকে সেবা-যতœ, সম্মান-গৌরবদানের উপদেশ আছে, কিন্তু উপসম্পদা গ্রহণে যিনি জ্যেষ্ঠ তিনি অন্যান্য গুণে কনিষ্ঠের চেয়ে দুর্বল হলে অবশ্যই সাংঘিক নিয়ন্ত্রণে তাকে প্রধানরূপে বিবেচনা করা অনুচিত এই উদাহরণ তথাগত বুদ্ধ নিজেই রেখে গেছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ শিষ্য পঞ্চবর্গীয়দের পরিবর্তে ভদন্ত সারিপুত্র ও মোগ্গল্লানকে অগ্রশ্রাবকত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। বুদ্ধের জীবিতকালে ভদন্ত আনন্দ ধর্ম এবং বিনয়—এই দুয়ের শিক্ষায় ও আচরণে ভদন্ত উপালির চেয়ে কম ছিলেন না। কিন্তু, ভদন্ত উপালি সেই বিনয় দ্বারা অপরকে শিক্ষা-অনুশাসন দানে দক্ষতাসম্পন্ন ছিলেন বলে স্বয়ং বুদ্ধ তথাগত ভদন্ত উপালীকে বিনয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অভিষিক্ত করে গেলেন। তাই প্রথম ধর্ম সঙ্গায়নে সমবেত সংঘকর্তৃক ভদন্ত উপালীকেই বিনয়-সংগ্রহের দায়িত্ব এবং ভদন্ত আনন্দকে ধর্ম-সংগ্রহের দায়িত্ব প্রদান করা হলো; যদিও ধর্ম-বিনয় উভয়টি এককভাবে সংগ্রহ করা ভদন্ত আনন্দ থেরো কর্তৃক সম্ভব ছিল। তাই বুদ্ধ তথাগত ভদন্ত আনন্দকে ধর্মভা-াগারিক বলতেন।

বুদ্ধের অবর্তমানে বুদ্ধের মতো সর্বগুণসম্পন্ন দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। অনুবুদ্ধ ভদন্ত সারিপুত্র ও বুদ্ধের আগেই দেহত্যাগ করেছিলেন। বাস্তবে প্রত্যেক ক্ষেত্রে ইহাই প্রতীয়মান হয় যে, একজন ব্যক্তি তাঁর দেহ-মনের নিজস্ব জিনগত উপাদানের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বৌদ্ধ পরিভাষায় ইহাকে সংস্কারের সাথে তুলনা করা যায়। সেই জিনগত উপাদানের সুনিয়ন্ত্রিত বিকাশের এক উচ্চতম পর্যায়ে যখন কোনো ব্যক্তি পৌঁছে যায়, তখন তিনি তাঁর সেই অর্জন তথা গুণ-বৈশিষ্ট্যকে অপ্রমেয় মৈত্রী-করুণা-মুদিতা-উপেক্ষা—এই চারি সর্বোত্তম মানবীয় গুণাবলী দ্বারা অভিষিক্ত করতে সক্ষম হলে তিনি জগতে মহামানবরূপে স্বীকৃতি লাভ করেন। তার পরেও জিন তথা সংস্কারগত তারতম্য প্রত্যেক মানুষের থেকেই যায়, এমনকি যমজ সন্তানের মায়েও আর একারণেই বুদ্ধগণের মধ্যে চারি আর্যসত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ঐক্যতা থাকলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে বহু ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সেই কারণেই বুদ্ধ একক প্রতিভায় বুদ্ধশাসনের জন্যে যা অর্জন করেছিলেন, তাঁর অবর্তমানে এই সকল আর্জনকে অক্ষুণœ রাখতে ও অভিবৃদ্ধিদান করতে সংঘ তথা সমষ্টির উপর নির্ভরশীল থাকতে বলেছিলেন। আর সেই সংঘ সদস্যগণ হতে প্রয়োজনীয় গুণাবলী সংগ্রহ করতে বুদ্ধ এবং ধর্ম এই দুই হতে শিক্ষা আদর্শ গুণাবলী ও বৈশিষ্টকে মানদ-রূপে ধারণ করে আদর্শ সংঘের জন্মদান করে সেই সংঘের আদর্শ নেতৃত্ব মনোনয়ন কর্তব্য।

পূজ্য বনভন্তে স্বকীয় জিন তথা সংস্কারের বিকাশে বর্তমান যুগে একজন আদর্শ মহাপুরুষরূপে সর্বজন স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব। বর্তমানে তিনি কালগত। আমরা নিশ্চিতভাবে তাঁর কোনো শিষ্যের মধ্যে হুবহু বনভন্তের সমস্ত গুণের প্রতিফলন তাই দেখতে পাব না। আর এ কারণেই পূজ্য বনভন্তের বিশিষ্ট গুণাবলী তাঁর ধ্যান-দর্শন, স্বপ্ন-ভাবনা, আদর্শ-উদ্দেশ্যসহ শ্রদ্ধেয় ভন্তের অনাসক্ত ত্যাগময় আচার-আচরণসমূহের অধিকাংশের উপস্থিতি যে সকল শিষ্যগণের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিফলিত হতে কম-বেশি দেখা যায়, তাদের সামষ্টিক তথা সংঘবদ্ধ উদ্যোগেই সম্ভব হবে পূজ্য বনভন্তের শূন্যস্থান পূরণ এবং তাঁর সৃষ্ট প্রকৃত বুদ্ধধর্মের নবজাগরণকে ধরে রাখার একমাত্র উপায়।

লেখক : প্রজ্ঞাবংশ মহাথের, বহু গ্রন্থ প্রণেতা, পিটকীয় গ্রন্থের অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৌদ্ধ প-িত, রাংউ রাংকুট, রামু, কক্সবাজার

বহু গ্রন্থ প্রণেতা, পিটকীয় গ্রন্থের অনুবাদক,

প্রাবন্ধিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৌদ্ধ পন্ডিত

Print Friendly, PDF & Email