log1

কীর্তিমান আর্যপুরুষ বনভন্তের লোকোত্তর ধর্মচিন্তা ও সংক্ষিপ্ত জীবনদর্শন (১৯২০-২০১২)

ড. জিনবোধি ভিক্ষু

27
যুগে যুগে এ ধরাধামে অনেক আধ্যাত্মিক সাধক পুণ্যপুরুষদের আবির্ভাব হয়েছে। যাঁদের পরশে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতির প্রেক্ষাপটে অনেকটা মানবিক, কল্যাণজনক আত্মশুদ্ধির ও আত্মমুক্তির পরিবর্তন সূচীত হয়েছে। আর্যপুরুষ শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তে (১৯২০-২০১২) সেই তথাগত বুদ্ধের মহান আদর্শ চিন্তা-চেতনার একজন মূর্ত প্রতীক ও যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন। যাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল অভিনব এবং শিক্ষামূলক। বাস্তবতা ও সংস্কারমূলক মুক্তচিন্তা-চেতনা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো সম্মোহনী শক্তি পরিলক্ষিত হয়েছে তাঁর অপূর্ব মোহনীয় দেশনায়। আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি কাব্যিক ছন্দ দিয়ে বুঝানোর মতো জ্ঞানশক্তি ছিল অভূতপূর্ব! কারো তুষ্টি ও প্রশংসাসূচক উক্তি তাঁর দেশনার মধ্যে ছিলই না; বরং স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় ভুলত্রুটির সমালোচনা এবং মানবের জীবনদর্শনের বিষয়বস্তু বার বার উচ্চারণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতেন। এমনকি শ্রোতাদের কাছ থেকে তাঁর দেশিত বিষয়বস্তু বুঝতে পেরেছেন কি না জিজ্ঞেস করতেন। তাঁর তেজশক্তি ও বীর্যশক্তি ছিল অসাধারণ। তাঁর কাছে কে রাজা, কে প্রজা, কে ধনী, কে গরিব ছোট-বড় ভেদাভেদ ছিল না। সবাই তাঁর কাছে সমান তো বটেই, সবাই তাঁর অনুভূতিজাত ও সংবেদনশীল কথাবার্তাগুলো পরিষ্কার ভাষায় বলতে শুনেছি। বলা যায়, এগুলো মহাপুরুষদের লক্ষণ। সমুদ্রের তলদেশে
যেমন কিছুই রেখে দেয় না, তদ্রƒপ বনভন্তেও তথাগত বুদ্ধের মতো রেখে ঢেকে যে-কোনো কিছুই বলেননি। উপস্থিত স্মৃতিপটে যা জেগেছে তা উদাত্ত কণ্ঠে প্রকাশ করেছেন নির্দ্বিধায় সকলের উদ্দেশ্যে। লৌকিক জগতের কথা সময়ে সময়ে বললেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেহতত্ত্ব-মনস্তত্ত্ব বিষয়কে প্রাধান্য ও আধ্যাত্মিক ধ্যান-সাধনার দ্বারা অর্জিত বিদ্যার অনুভব এবং অনুভূতির বিষয় বহিঃপ্রকাশে ছিল তাঁর জীবনের মহান ব্রত। তাঁর অনুভূতিশীল অগাধ জ্ঞান, সুগভীর আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি, বৈচিত্রময় বক্তব্য, ত্যাগদীপ্ত চেতনা এবং বীর্যবান সিংহপুরুষ সুদর্শন চেহারা তাঁকে সবার কাছে অতিপ্রিয় করে তুলেছিল। এখানেই তাঁর অধীত বিদ্যার শত মহিমার প্রকাশ বলা যায়। আজ তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা-জীবন ও কর্মপ্রতিভার পর্যবেক্ষণই আলোচনার উপজীব্য বিষয়।
‘জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো’—এ বিরল আপ্তবাক্যকে নিজের জীবনে প্রমাণ করেছিলেন আধ্যাত্মিক সাধকপুরুষ ও জ্ঞানতাপস। কঠোর ব্রতচারিতা, অপার মহিমা, সংযতেন্দ্রিয়, অসাধারণ ধীশক্তি ও তুখোড় বাগ্মীতা জোরে কিনি সর্বজনীনভাবে শ্রদ্ধেয় ও খ্যাতিমান হয়েছিলেন। তাঁর কাব্যিক মননশীলতা ছিল এক কথায় অপূর্ব! কথায় কথায় পদ্যছন্দে কবিতা রচনা করে সবাইকে মুগ্ধ করার মতো ক্ষমতা এবং মুক্তবুদ্ধির প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়েছে। স্পষ্টভাষিতার প্রভাব অহরহ দেখা যেত। জীবনদর্শনে এবং লোকোত্তর মার্গের বিষয় নিয়ে আলোচনা অনেকের পক্ষে তা বুঝতে কষ্ট হলেও সামান্য যা বুঝতে সক্ষম হয়েছে, তাতে অনেকের জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হয়েছে মনে হয়। অসাধারণ বোধশক্তি এবং জীবনসত্য উপলব্ধির সমস্যা সমাধানের জটিল যুক্তিজাল রচনাশক্তির যথেষ্ট পরিচয় আছে তাঁর উক্তিসমূহে। বাস্তবতা, যুক্তিনির্ভর, মানবতাবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক শিক্ষার আলো থেকে দূরে থেকেও আধ্যাত্মিক ধ্যান-সাধনার দ্বারা কী অর্জন করা যায়, তা প্রমাণে বনভন্তে শুধু জ্বলন্ত উদাহরণই নন, অধীত বিদ্যাগুণে আধ্যাত্মিক জগতে অদ্বিতীয় পুণ্যপুরুষ হিসেবে দিবালোকের মতো প্রতিভাত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বিশ্বমানবতা ও বিশ্বশান্তির মূল বার্তা হলো সর্বজীবে মৈত্রী চেতনা। সংযমতা, ধৈর্য্য, ত্যাগ ও স্থিরচিত্ত একজন মানুষকে কতটুকু উন্নত মার্গে নিয়ে যেতে পারে তিনি তাঁর জীবনসাধনা দ্বারা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
ভারত-বাংলা উপমহাদেশে তথা আধুনিক বিশ্বের অনন্য সাধক বনভন্তে জীবনদর্শন উপলব্ধির মূল অনুপ্রেরণার অন্যতম দূত হিসেবে বিবেচিত হবেন। বুদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে শুধু নয়, অসাম্প্রদায়িকভাবে তিনি একজন অলৌকিক শক্তিধর সাধকপুরুষ এবং নতুনত্ব সৃষ্টিকারী ধর্মীয় আদর্শের অন্যতম প্রচারক ছিলেন। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সমগ্র মানব সমাজে তিনি মহামানব বুদ্ধের অমিয় শান্তি ও দুঃখমুক্তির বাণীর অনন্য প্রচারক হিসেবে বিচরণ করতেন এবং মানবজীবনের পূর্ণতার ক্ষেত্রে জীবনের বাস্তবতাকে জানার জন্য ত্যাগ ও সাধনাকে গুরুত্ব দিতেন বেশি। বনভন্তের আধ্যাত্মিক কর্মপরিধি যদিও বঙ্গদেশে সীমাবদ্ধ হলেও বলা যায় আন্তর্জাতিক বলয়ে তাঁর প্রভাব এবং সাধনা-জীবনের অপার মহিমা ছিল পরিব্যাপ্ত।
একজন সত্যিকারের মানবহিতৈষী হিসেবে তিনি বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন এবং সর্বব্যাপী আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে শান্তি ও মঙ্গলের কথা প্রচার করেছিলেন আমৃত্যু। তা ছাড়াও একজন উচ্চতর পর্যায়ের বৌদ্ধসাধক হিসেবে তিনি তাঁর জ্ঞানের অফুরন্ত ভা-ার থেকে নব নব ধারণাগুলো তুলে আনতেন এবং সর্বস্তরের মানুষের অন্তরকে নাড়া দেওয়ার মতো কাব্যিক ভাষায় তা প্রচার করতেন। আধ্যাত্মিক মুক্ত-চেতনাকে সামনে রেখে স্বজাতির ধর্মীয় সংস্কারেও বিরল অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
পারিবারিক পটভূমি : আধ্যাত্মিক সাধকপুরুষ বনভন্তের গৃহী নাম ছিল রথীন্দ্র লাল চাকমা। তিনি ১৯২০ সালের ৮ জানুয়ারি রাঙামাটিস্থ মগবান মৌজার মোরঘোনা নামক গ্রামের এক মধ্যবিত্ত ও ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শ্রী হারুমোহন চাকমা একজন বিশিষ্ট কৃষিজীবী ও সরলপ্রাণ উপাসক ছিলেন। মাতা পুণ্যশীলা পতিব্রতা ও অতিথিবৎসল শ্রীমতি বীরপুদি চাকমা। তাঁদের আনন্দময় সোনার সংসারে আরও পাঁচ সন্তান ছিল, যথাক্রমে (১) বৈকর্তন চাকমা, (২) পদ্মাঙ্গিণী চাকমা, (৩) জওহর লাল চাকমা, (৪) মনোরঞ্জন (ভূপেন্দ্র লাল) চাকমা (৫) অমৃকা রঞ্জন চাকমা (বাবুল চাকমা)।
রথীন্দ্র বংশ-পরিচয়মতে ধামাই-গোজার পিড়াভাঙ্গা গোত্রের (গুত্থির) বংশধর। পিতৃবংশের রথীন্দ্র ছিলেন চাকমা সমাজের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ও উচ্চবংশীয়। খীসা উপাধি যা ব্রিটিশ সরকার-প্রদত্ত খেতাপ। জাতিগত পরিচয়ে তিনি চাকমা উপাধি ব্যবহার করতেন। ক্ষমতা ও প্রভাবশালী ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান রথীন্দ্র ছোটবেলা থেকে একটু শান্ত, ভাবুক ও ধ্যান-সাধনার প্রতি আকর্ষণ ছিল একটু বেশি। পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। নীরব ও নির্জনবাসই তাঁর পছন্দ ছিল। গ্রামের অন্যান্য ছেলেমেয়ের মতো খেলাধুলায় তেমন একটা আগ্রহ দেখা যেত না; বরং জঙ্গলের পাশে গাছতলায় বসে নীরব জীবনযাপনই তাঁর প্রিয় ছিল। পিতা-মাতা আধুনিক শিক্ষায় বেশি সুশিক্ষিত না হলেও শিশু রথীন্দ্রকে শিক্ষিত করার মানসে স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। স্কুল-জীবনে শিক্ষার হাতেকড়ি হলেও কোনো রকমে প্রাথমিক স্কুলের পাঠ চুকিয়ে উচ্চশিক্ষায় তেমন একটা অভিপ্রায় দেখা না যাওয়ায় এখানেই বিদ্যালয়ের পাঠে যবনিকা পড়ে।
তবে প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে ভালোবাসতেন। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন বই, বিশেষত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল, কবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত, ভূপেন হাজারিকার গান, বুদ্ধকীর্তন ইত্যাদির প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল প্রবল। বুদ্ধকীর্তনই তাঁর বৈরাগ্যজীবনের বীজ বপন করে দিয়েছে। প্রায় সময়ে তাঁর মুখে শুনা যেত ‘মায়ার খেলা ছাড় রে ভাই, ভবের খেলা সাঙ্গ হবে’। যৌবনে তাঁর এ জাতীয় চিন্তা-ভাবনা সত্যিই ভাববার বিষয় ছিল। পিতা-মাতার সঙ্গে বিহারে গিয়ে বুদ্ধমূর্তির সামনে বন্দনা, পূজা করা এবং বুদ্ধমূর্তির সামনে শান্ত মনে বসে থাকা এবং গুরুকে শ্রদ্ধা করা পারিবারিক ব্রত ও দৈনন্দিন ধর্মীয় কর্ম ছিল। গ্রামের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাঁকে অনেক বিব্রত করে তুলেছিল। কারণ, নেশাপান ও অলস জীবন তাঁর স্বভাববিরোধী ছিল তখন থেকে। গ্রাম্য লোকদের এ জাতীয় আচরণ তিনি মেনে নিতে পারতেন না বলে লোকালয়ের বাইরে গিয়ে অবস্থান করতেন এবং ভাবতেন জীবনে কী হবে, কী করা দরকার। এসব বিষয়াবলী কাউকে বুঝানোর মতো মন-মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের বড় অভাব বলে মানব জীবনে এতসব দুঃখ কষ্ট-যন্ত্রণা। অপার ভোগ-বিলাসে মত্ত হলেও আসলে মানুষ প্রকৃত সুখ-শান্তি পাচ্ছে কতটুকু। কিন্তু সমাধান কোথায়, কে দেবে সঠিক পথের সন্ধান—এ ছিল তাঁর কোমল মনের আকুতি। কিন্তু তথাগত বুদ্ধের জীবন ও ইতিহাসের বাণী সদা-সর্বদা উচ্চারণ ও অনুশীলন করতেন বলে মনে আনন্দ-স্বস্তি পেতেন নিজে নিজে। পারিবারিক বিষয়ে উদাসীনতা বরাবর লক্ষণীয় ছিল তাঁর জীবনে।

দুর্যোগের ঘনঘটা :
বয়স মাত্র তেইশ। পিতা-মাতার সঙ্গে পারিবারিক দায়-দায়িত্ব পালনেও তেমন বিমুখ ছিলেন না। চাষাবাদ ও নিজস্ব জমির খাদ্যশষ্য উৎপাদন করে দিয়ে সুন্দর ও স্বচ্ছল জীবনযাপন মোটামুটিভাবে সুখী জীবনে পরিণত করেছিল। দুর্ভাগ্যবশত জন্মদাতা পিতা আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তখন ১৯৪৩ সাল। তখন সারা দেশে দুর্ভিক্ষের হাহাকার চলছিল ব্যাপকভাবে। ১৯৪৩ সালকে দুর্ভিক্ষের সাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ দুঃসময়ে পিতার অবর্তমানে মাতার সঙ্গে পারিবারের হাল ধরতে হয়েছে তাঁকে। জুমচাষসহ নিজস্ব উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বাজারে বিক্রয় করে পারিবারিক চাহিদা পূরণে পরিতৃপ্ত হন। সে কাজেও তাঁর বেশিদিন মন স্থির হলো না বলে কিছুদিন দোকানে চাকরি নেন। সেখানে মালিকের আচার-আচরণ ব্যবসায়িক কার্যক্রম তরুণ রথীন্দ্রকে ভাবিয়ে তুলেছিল। নানা উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাত, শারীরিক ও মানসিক দুঃখকষ্টের মাঝেও বিচলিত না হয়ে অবসর সময়ে সৎগ্রন্থ পাঠ এবং নানা জ্ঞানার্জনে রত থাকতেন। বাল্যকালে ধ্যান-সমাধি অনুশীলন বিষয়ে তাঁকে যেন পিছন থেকে কে যেন ডাকতেন। সেখানে কয়েকবছর পারিবারিক ও অর্থনৈতিক কর্মজীবনে সম্পৃক্ত থেকে হঠাৎ করে অজানা-অচেনা জীবন দর্শনের খোঁজে বের হয়ে পড়লেন।

শ্রীমৎ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাস্থবিরের সঙ্গে পরিচয় :
যৌবনের শুরুতে রথীন্দ্রের জীবনে দুটি দিক প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল। প্রথমত, পিতার অবর্তমানে পারিবারিক দায়িত্ব পালন করা। দ্বিতীয়ত, আধ্যাত্মিক ধ্যান-সাধনায় রত হওয়ার অদম্য স্পৃহা। এ দুটি কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় সম্পৃক্ত রথীন্দ্র বেছে নেন সংসারত্যাগী বৈরাগ্যজীবন। তাঁরই কল্যাণমিত্র সুহৃদ পটিয়া নিবাসী গজেন্দ্র লাল বড়–য়ার সুপরামর্শে চট্টগ্রামস্থ নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে এসে সাক্ষাৎ লাভ করলেন তৎকালীন অধ্যক্ষ বঙ্গীয় বৌদ্ধ সাংঘিক সমাজের আলোকিত এবং আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত শ্রীমৎ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাস্থবিরের। পরস্পরের আলাপচারিতায় মুগ্ধ হলেন উদীয়মান ভাবুক রথীন্দ্র। প্রার্থনা করে বুদ্ধশাসনে দীক্ষা নিলেন রথীন্দ্র। নতুন নামকরণ হলো ‘শ্রামণ রথীন্দ্র’। তখন ১৯৪৯ সাল। আর এক নবজীবন লাভ এবং গৈরিকবসন ধারণ সত্যিই প্রকৃত জীবন-দর্শনের শ্রেষ্ঠ ব্রত। রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম যেমনি ২৯ বছর বয়সে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হয়ে জগতে বুদ্ধজ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তেমনি রথীন্দ্র ঠিক একই বয়সে নিজেকে বুদ্ধশাসনে আত্মোৎসর্গ করে একইভাবে ধ্যান-সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং পরবর্তী সময়ে সাধন-জগতে প্রখ্যাত সাধক ভিক্ষু ও আধ্যাত্মিক জগতে উন্নতমার্গের মনীষী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। গুরুদেবের কাছে তাঁর প্রত্যহ ত্রিপিটক শাস্ত্রের ধর্ম-বিনয় শিক্ষা এবং ব্রতপালন নিত্য কর্মে পরিণত হয়। আর নতুন শ্রামণ রথীন্দ্র হেমসেন লেনসহ বড়–য়া বৌদ্ধ পরিবারে ভিক্ষালব্ধ অন্নে পবিত্র ব্রহ্মচর্য জীবন যাপনে অনেকটা পরিতৃপ্ত ছিলেন। সতীর্থ ছিলেন শ্রামণ রবীন্দ্র বিজয়। দুজনের মধ্যে মধুর সম্পর্ক এবং আন্তরিকতাপূর্ণ সহাবস্থান হলেও ব্রতপালনের দিক থেকে একটু মতভিন্নতা দেখা দেওয়ায় উভয়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ক্রমে এই বিহারে ভিক্ষু-শ্রামণদের অনুকূল পরিবেশের সমস্যা দেখা দেওয়ায় গুরুদেবের অনুমতি নিয়ে রাঙ্গুনীয়া বেতাগী গ্রামের পুণ্যতীর্থ বেতাগী বনাশ্রমে গিয়ে উঠেন। সুউচ্চ পাহাড় টিলায় মনোরম পরিবেশে বুদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত। ধ্যান-সাধনার অনুকূল পরিবেশ। অধ্যক্ষ ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাধকপুরুষ শ্রীমৎ আনন্দমিত্র মহাস্থবির। তাঁর সাধন-জ্ঞান অবগত হয়ে শ্রামণ রথীন্দ্র তো মহা খুশি হলেন। আচার্যদেবের কাছে ধ্যান-সমাধি অনুশীলনের রীতি-নীতি স্মৃতিপ্রস্থান সূত্র, অনিত্য, দুঃখ, অনাত্মজ্ঞান, চতুরার্যসত্য জ্ঞান, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গজ্ঞান ইত্যাদি বুদ্ধদর্শনের গভীর তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা পেয়ে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ধ্যানস্পৃহা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠে। শ্রামণ রথীন্দ্রের জ্ঞানতৃষ্ণা অনেকটা উন্মুক্ত হলো প্রত্যক্ষ আলোচনায়। আরও অধিকতর উচ্চতর জ্ঞান অন্বেষণের প্রত্যাশায় সেখান থেকেও আশীর্বাদ নিয়ে ছুটে গেলেন বঙ্গীয় বৌদ্ধদের প্রাচীন পুণ্যতীর্থ চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারে। সেখানে তখন অধ্যক্ষ ছিলেন মহাপ-িত উঃ প-িতা মহাস্থবির। তাঁর দর্শন পেয়ে মুগ্ধ হয়ে গুরুবন্দনা করলেন। আচার্য শ্রামণের শ্রদ্ধা-ভক্তি দেখে আনন্দিত হলেন। শ্রামণ রথীন্দ্রও এ জাতীয় মহাপ্রাজ্ঞ মহাপ-িতের স্নেহসান্নিধ্য লাভে আশান্বিত হলেন যে, আরও বুদ্ধদর্শনের নতুন নতুন অনেক কিছু জানতে পারবেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থানকালে বুদ্ধের ধর্ম-বিনয়ের পাশাপাশি লৌকিক ও লোকোত্তর জ্ঞানের মূল বিষয় চিত্ত, চৈতসিক, রূপ ও নির্বাণ বিষয় তথা গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের ব্যাখ্যা শ্রবণ করে জীবন-দর্শনের আর কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলেন। শাস্ত্রে আছে ‘গুণী গুণং বেত্তি’। গুণীজনেরাই গুণীর কদর করতে জানেন। মহাপ-িত মহাস্থবির শ্রামণ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, অতীত জন্মের পুণ্যপারমী এবং আধ্যাত্মিক চেতনার অপূর্ব লক্ষণ রয়েছে শ্রামণ রথীন্দ্রের মধ্যে। এমনকি শ্রামণ রথীন্দ্রের ধ্যান-সমাধিতে অধিকতর উচ্চমার্গের প্রভাবও বিদ্যমান। তা ছাড়া বলেছিলেন, বন-জঙ্গলে ধ্যান করতে গিয়ে তুমি নানান প্রকার নিমিত্ত দেখবে। সে নিমিত্ত দেখে ভয় পেলে চলবে না এবং ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তোমাকে এ ব্যাপারে সাহস সঞ্চয় করতে হবে এবং সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। এভাবে সেখানে যত দিন ছিলেন আরও প্রয়োজনীয় হিতোপদেশ শুনার সৌভাগ্য হয়েছিল। অতীতের বুদ্ধশিষ্যদের কঠোর ধ্যান ও জ্ঞানসাধনার কথা স্মরণ করে আচার্যের আশীর্বাদ নিয়ে যাত্রা শুরু করে অজানা-অচেনা পথে পাড়ি জমালেন। দৃঢ়তা যেখানে প্রবল, নিষ্ঠা সেখানে গভীর; সেখানে ধ্যান অনুশীলনে কোনো রকমের শিথিলতা নেই। সকাল-দুপুর যা ভিক্ষান্ন পেয়েছেন তাতে তুষ্ট থেকে ধ্যান আর ধ্যানে রত থাকতেন। অনেক সময় বনের ফলমূল খেয়ে ধ্যানসুখ উপভোগ করতেন। কাপ্তাই ধনপাতার ছড়ার তীরে নির্জন বনে ছিল তাঁর ধ্যানতীর্থ। ১৯৪৯-১৯৬০ সাল পর্যন্ত ক্রমাগত এগার বছর কঠোর তপস্যায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছিলেন সেখানে। বনের হিংস্র জন্তুরা তাঁকে তেমন কোনো রকমের ক্ষতি করেনি। প্রবাদ আছে, কেউ যদি অন্য কাউকে ক্ষতি না করে তাহলে নিজের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। গভীর মৈত্রী চেতনার বলে হিংস্র পশুরা তাঁর পাশে এসে চলে যেতেন বলে অনেকের প্রত্যক্ষ অভিমত। তথাগত বুদ্ধ তাঁর ধর্মপদ গ্রন্থে পরিষ্কার ভাষায় উচ্চারণ করেছেন যে, ধ্যান ছাড়া জ্ঞান হয় না। জ্ঞান ব্যতীত মানবের জাগতিক ও আত্যন্তিক দুঃখকে বুঝা যায় না। তা বুঝতে না পারলে মানবের ভবমুক্তি সুদূর পরাহত। তাই বলতে হয়, ধ্যানেই জ্ঞানার্জনের সোপান বিশেষ। সকাম ধ্যান নয়, নিষ্কাম ধ্যানেই জ্ঞান অর্জন হয়। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান নিয়ে তখন থেকে অনেকেই অনেকভাবে পরীক্ষাও করেছিলেন। তিনি তাঁর ধ্যানেই থাকতেন। বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি বলেই তাঁর অর্জন ও সফলতা লক্ষণীয় ছিল। তাঁর সাধনা-জীবন থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। নতুবা যে তিমিরে আছি সে তিমিরেই থাকতে হবে। পূজা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজস্ব অর্জনকে গুরুত্ব দিতেন বেশি।

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ :
১৯৬০ সালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্মাণ করা হয় কাপ্তাই বাঁধ। হাজার হাজার একর জমি ঘর-বাড়ি, এমনকি রাঙামাটি রাজবাড়িও জলমগ্ন হয়ে যায়। পার্বত্যবাসীদের জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপে পরিণত হয়। তখন জনবসতিও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বন শ্রামণের ধ্যান-সাধনার জায়গাও জলমগ্ন হলে অনেক কষ্টে কিছুদিন কাটানোর পর দীঘিনালার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তথায় একটি বিহার ছিল নাম বোয়ালখালী রাজবিহার। সেখানেও কিছুদিন থেকে পুনরায় অরণ্য কুটির নির্মিত হলে সেখানে চলে যান। তিনি তাঁর নিজস্ব ধ্যান-সাধনায় রত থাকতেন। চাহিদা বলতে তেমন কিছুই ছিল না। যথালাভে সন্তুষ্ট থাকতেন। বরং আশে-পাশে ভিক্ষু-শ্রামণদের প্রচ- লোভ-মানসিকতা দেখে তিনি সমালোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। শ্রামণ্য ও ভিক্ষুত্ব জীবন লোভ ত্যাগের জন্য, মৈত্রীভাব পোষণের জন্য, মোহ ক্ষয় করার জন্য। অথচ সামান্য লোভ ত্যাগ করেতে পারছে না। তাহলে ত্যাগের কথা বলে লাভ কী? এই ছিল বন শ্রামণের আদর্শ ব্রত। চেয়ে পূজা নেওয়া লোভের নামান্তর। এই ছিল সাধনা-জীবনে তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ।
শুভ উপসম্পদা গ্রহণ :
১৯৬১ সাল। অনেক ভক্তপ্রাণ উপাসক-উপাসিকাদের একান্ত অনুরোধ ও প্রার্থনায় বন শ্রামণকে উপসম্পদা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পবিত্র সীমা হিসেবে বোয়ালখালীস্থ মাইনী নদীর ‘উদকসীমা’ অতি উত্তম এবং বুদ্ধের বিনয়সম্মত। সঙ্গীতিকারক সাতজন কর্মবাচ্য পাঠক ১ম, ২য়, ৩য় হিসেবে ছয়জন এবং উপাধ্যায় গুরু ছিলেন প-িত শ্রীমৎ গুণালঙ্কার মহাস্থবির। আরও জ্ঞানী-গুণীদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন যথাক্রমে শ্রীমৎ অরিন্দম মহাস্থবির, অগ্রবংশ মহাস্থবির, শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির, শ্রীমৎ প্রিয়দর্শী ভিক্ষু এবং শ্রীমৎ ধর্মদর্শী ভিক্ষুপ্রমুখ। বন শ্রামণ তখন থেকে শ্রীমৎ সাধনানন্দ ভিক্ষু প্রকাশ বনভন্তে নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি সাধারণ উপাসক-উপাসিকাদের লক্ষ করে বলতেন, ত্যাগ কর, ত্যাগেই সুখ এবং ত্যাগেই মুক্তি। আরও বলতেন, শীল পালন কর, ভাবনা কর এবং প্রজ্ঞা উৎপন্ন কর, তাহলে তুমি নিজেই বুঝতে পারবে মানবজীবন কঠিন হলেও কত সুন্দর, কত আনন্দ এবং কত সুখের। কঠিন বিষয় অতি সাধারণ কথায়, স্বল্প কথায় বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর উপদেশের ক্ষেত্রে বড় বৈশিষ্ট ছিল এই যে, তিনি যা বলেছেন শ্রোতা তা বুঝতে পেরেছে কি না বার বার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন। প্রয়োজনে মুখে মুখে বলতে বলতেন। তিনি প্রকৃত কল্যাণমিত্র বলেই এভাবে বুঝা না-বুঝা বিষয়ে চিন্তা করে বারংবার বলে বুঝিয়ে দিতেন। বুঝেছি বললে তখন ‘এখন যাও’ বলে বিদায় দিতে তাঁকে দেখা যেত। প্রবাদ আছে, পরশমণির সংস্পর্শে লৌহখ- যেমন স্বর্ণে পরিণত হয়, তেমনি অনেক সাধু-সন্ত, জ্ঞানী-গুণী, সাধকশ্রেষ্ঠ পুণ্যপুরুষের সংস্পর্শে এসে অনেক পথভ্রষ্ট মানুষ সৎপথে এসে স্বীয় জীবনসত্য জ্ঞাত হয়ে দুর্লভ মানবজন্ম ধন্য করেন। এ মহান সাধকশ্রেষ্ঠ পুণ্যপুরুষের ছত্রছায়ায় সমতলীয় ও পার্বত্য এলাকার জাতি, বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অগণিত মানুষ তাঁর পুণ্যপরশে ধন্য হয়েছেন। এখনও সেই প্রভাব অব্যাহত। যেখানেই তিনি গেছেন এবং কিছুদিন অবস্থান করেছেন, তা ঐতিহাসিক পুণ্যতীর্থ ভূমিতে পরিণত হযেছে। বলা যায়, পার্বত্যবাসী অতীতে ধর্ম-কর্মে, নৈতিক চেতনায়, মানবিক মূল্যবোধে, ধ্যানে-জ্ঞানে ও ধর্মীয় ভাবাদর্শে কোথায় ছিল আর এখন কোথায়! সবই আর্যপুরুষ বনভন্তের প্রভাব ও অবদান বলা যায়। বলতে দ্বিধা নেই, বনভন্তের কথা সর্বদা পার্বত্যবাসী বুঝতে না পারলেও যারা তাঁর সাহচর্যে এসেছেন, তাদের ধ্যান-জ্ঞান বেশি না হলেও ধর্মচেতনা অতি প্রবল। অনেকে তাঁর নিকট বকা খেয়েছেন, তবে মঙ্গল হয়েছে এবং জীবনে সৎপথ বেছে নিয়েছেন অনেকে। আজ নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতি, শিশু-কিশোর সবাই তাঁকে দেবতা জ্ঞানে পূজা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে দেখা যায়। এ জাতীয় মন-মানসিকতা যে-কোনো সমাজ ও জাতির জন্য অত্যন্ত শুভ ও মঙ্গলজনক বলা যায়। বোয়ালখালী দীঘিনালা এলাকায় প্রায় দশ বছর বনে-জঙ্গলে ধ্যান, সমাধি অনুশীলন করে ১৯৭০ সালে সেখান থেকে লংগদু তিনটিলা আগমন করেন। তথাগত বুদ্ধের অমৃতময় উপদেশ-বাণীর দিকনির্দেশনা ছিল ‘বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়’—এ মহান আদর্শের মূর্তপ্রতীক হিসেবে দিকে দিকে ধর্মপ্রচার করে স্বীয় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ধর্মপ্রাণ উপাসক শ্রী অনিল বিহারী চাকমাসহ অনেক ভক্তপ্রাণ দায়ক-দায়িকাদের আন্তরিক অনুরোধে লংগদুর তিনটিলা বনবিহারে অবস্থানের জন্য ফাং গ্রহণ করেন। তখন ১৯৭০ সাল। সেখানে তাঁর আগমনকে ভিত্তি করে নতুন করে শুরু হয়েছিল ধর্মের আন্দোলন। সত্য ও সদ্ধর্ম ব্যতীত মানবতা ও মানবকল্যাণ অসম্ভব। শান্তি-সুখ আধ্যাত্মিক ধ্যান-সাধনার উপর অনেকটাই নির্ভর করে। আজ লংগদুর তিনটিলা বনবিহার মহাপুণ্যতীর্থ।

স্বাধীনতা যুদ্ধ :
১৯৭১ সাল। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাক-সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত সাধারণ জনগণের উপর নানা নির্যাতন, অত্যাচার, ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকা- চালিয়ে যান। পবিত্র এ বিহারেও অপবিত্রতার প্রভাব পড়ে মুর্খ-অজ্ঞানী শাসক কর্মকর্তাদের আচরণে। তখনই তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অত্যাচারীদের পরাজয় সন্নিকট, দেশ স্বাধীন হবে। তোমরা সত্য পথে থাক। মিথ্যা পরিত্যাগ কর। স্বাধীনতা অর্জন হবে। যথেষ্ট ত্যাগ ও স্বদেশপ্রেমের চেতনায় উদ্দীপ্ত মানুষেরাই স্বাধীন জাতিতে পরিণত হয়। বাঙালি জাতি যুগে যুগে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে এসেছেন। পরাধীন হলেও পরাজয়ের নজির নেই। সম্মিলিত জাতিমাত্রই জয়ের পতাকা বহন করে। এ প্রত্যয় তিনি ব্যক্ত করেছিলেন। একটু সময়ের ব্যাপার মাত্র। সিদ্ধপুরুষের বাক্য ব্যর্থ হয় না। আজ আমরা স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিক। স্বাধীনভাবে বসবাস করার সুযোগ-সুবিধা দিলে দেশের সুখ-শান্তি বিরাজ করবে অবশ্যই।

রাজবন বিহার প্রতিষ্ঠা :
১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে রাজ পরিবারের আমন্ত্রণে রাজবন বিহারে চলে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম শুভাগমনে রাঙামাটি নতুন করে মহাপুণ্যতীর্থে পরিণত হতে শুরু করে। নতুন করে মহাজাগরণের সৃষ্টি হয় এহেন ধর্মীয় ভাবাদর্শে। ভক্তপ্রাণ নরনারীদের সমাবেশ ছিল অভূতপূর্ব। এভাবে কয়েক বছর আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকলেও ১৯৭৭ সালের শুভ বৈশাখী পূর্ণিমার কিছুকাল আগে থেকে স্থায়ীভাবে অবস্থান শুরু করেন। রাঙামাটি রাজবন বিহারে বৈশাখী পূর্ণিমার (বুদ্ধপূর্ণিমার) ¯িœগ্ধ সূর্যরশ্মি যেমন সমগ্র পৃথিবীকে আলোয় আলোকিত করে তেমন সাধকশ্রেষ্ঠ পুণ্যপুরুষের পুণ্যতেজে এবং প্রজ্ঞাজ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে অনেকেই জ্ঞানালোকের সন্ধান লাভে পরিতুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। আজ রাজবন বিহার আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত এবং সর্বজনীনভাবে মহামিলনের মহাপুণ্যতীর্থে পরিণত হয়েছে। বিশ্বায়নের যুগসন্ধিক্ষণে তাঁর আজীবন আবাসভূমি হিসেবে খ্যাত রাজবন বিহার জাতীয় ইতিহাসে একটি অনন্য ঐতিহাসিক তীর্থস্থান হিসেবে প্রতিভাত হবে।

নতুন করে ধর্মপ্রচারে ব্রতী :
‘বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়’—তথাগত বুদ্ধের এই মহান দেশনাকে অন্তরে ধারণ করে সবার মহাকল্যাণমিত্র সর্বজন শ্রদ্ধেয় বনভন্তে তাঁর মননশীল ও সাধন-জগতের অর্জিত বিদ্যা দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে সর্বস্তরের মানুষের অন্তর জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেখান থেকে যাত্রা শুরু করে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে তাঁর উপস্থিতি ছিল জনজোয়ারের শুভ সূচনা। ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে বিশেষত জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে সমাবেশ ছিল সাড়া জাগানোর মতো। তাঁর হিতোপদেশ ছিল, জীবনদুঃখ এবং জীবনদুঃখ থেকে মুক্তির পথ। সাধারণ জীবন বা পরিবার ও সমাজ জীবন যাতে শান্তি-সুখের হয়, তজ্জন্য তিনি বুদ্ধের মানবতা ও নৈতিকতার মর্মবাণী পঞ্চনীতি পালন এবং মানুষের হীনচিন্তা লোভ-দ্বেষ মোহান্ধতা ক্রমিক পরিহার করার জন্য কঠোর ভাষায় নির্দেশ প্রদান করতেন। এমনকি বুদ্ধের বিনয়বিরোধী কার্যক্রমে রত ভিক্ষু-শ্রামণ এবং সাধারণ ব্যক্তিদের সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। কিন্তু যুক্তি, বাস্তবতা ও প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার মতো অভিনব প্রতিভা ছিল তাঁর। তাঁর কাছে রাজা, মন্ত্রী, সমাজপতি, অতি সাধারণ মানুষদের মধ্যে কোনো রকমের পার্থক্য দেখা যেত না। উপদেশদান এবং ভুলপথ অবলম্বনকারীদের যথার্থ পথের নির্দেশনা প্রদান করাই তাঁর মহান ব্রত ও আদর্শ। সমতলীয় অনেক বৌদ্ধ বিহারে তাঁর আগমন দেখেছি। বুদ্ধের বিনয়বিরোধী কার্যক্রম দেখলে সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার ভাষায় প্রকাশ করে সংশোধন করিয়ে দিতেন। তাঁর বহুমুখী কল্যাণকামীতা ব্যক্তি এবং পারিবারিক ধর্মীয় ভাবাদর্শ তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিরল ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে। চাওয়া বলতে তেমন কিছুই ছিল না বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি আকর্ষণ ছিল ব্যাপক। তাঁর নির্লিপ্ত-চেতনা অনেককে প্রভাবিত করেছিল। বর্তমান সময়ে তাঁর মতো আধ্যাত্মিক ধর্মীয় প্রবক্তা সত্যিই বিরল বললেও অত্যুক্তি হয় না। কথা বলতেন স্বল্প, যা বলতেন জীবন উপলব্ধির কথাই বলতেন। যা সচরাচর দ্বিতীয় কারো কাছে থেকে পাওয়া কঠিন ছিল। এখানেই গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পরিচয় মেলে তাঁর। লৌকিক সত্য বিষয়ে সংবেদনশীলতা ছিল বলেই লোকোত্তর-সত্য বিষয়ে সম্যক ধারণা দেওয়া সহজ ছিল। সাধনমার্গের উচ্চতর জ্ঞানের বিষয়টি পরিস্ফুট হয়েছিল তাঁর জীবনাদর্শে। যখন মানুষ নিজের সম্পর্কে বাস্তবতার নিরিখে পর্যবেক্ষণ করার অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। তাঁর মুক্তচিন্তা-চেতনার মধ্যে আলাদা একটি বিষয় সব সময়ে লক্ষণীয় ছিল, যা নিজস্ব উপলব্ধিজাত বলা যায়। তাই তিনি লোকোত্তর সত্যকে জ্ঞাত করানোর জন্য গুরুত্ব দিতেন বেশি। তাঁর ধর্মদেশনার গ্রন্থগুলোই এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এগুলোর অমৃতময় রতেœর আকর গ্রন্থ বলা যায়। সকলকে এগুলো নিত্যপাঠ করার আহ্বান জানাই। বোধগম্যে আনতে পারলে মঙ্গল ও স্বস্তি শুধু নয়, পরম সুখ-শান্তিও পাওয়া যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

সমাজ সংস্কার :
মানুষমাত্রই সমাজিক জীব। পরিবার থেকে সমাজের ক্রমবিকাশ। সমাজের উত্থানে জাতি বা দেশ নামে পরিব্যাপ্তি ঘটে। কিন্তু ব্যক্তি-জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। ব্যক্তি-জীবনের শুদ্ধিতা-শুচিতা, সৎ ও সদ্ধর্মচেতনা মানুষের মানবীয় চেতনাকে শতধারায় মহিমান্বিত করে। তখন তার পরিবার হয়ে উঠে আদর্শ ও ধার্মিক পরিবার। সমাজ জীবন হয় সুশৃঙ্খল ও নীতিবদ্ধ, যা সুশীল সমাজ নামেও প্রতিভাত হয়। সাধকশ্রেষ্ঠ বনভন্তে মিথ্যাদৃষ্টি, কুসংস্কার, অধর্মাচারণ, অসম্মান ও গৌরবজনক মন-মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে গেছেন, যা সত্যিই এক মহাকল্যাণমিত্রের পরিচয় বহন করে। বলতে দ্বিধা নেই, এখনও অনেকের মধ্যে প্রকৃত ধর্মজ্ঞান বেশি না হলেও ধর্মচেতনা, ধর্মভাব ও ধর্মনিষ্ঠা যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, এটা যে-কোনো জাতির জন্য মহাকল্যাণজনক বলা যায়। অভূতপূর্বভাবে ত্যাগ-চেতনা এবং গুরুগত ভক্তি-শ্রদ্ধা এত প্রবলভাবে দেখা যায় যে, যা পরস্পরকে আন্তরিকতাপূর্ণ ভালোবাসার চিন্তা-চেতনাকে লালন করে চলেছে। এই এলাকার দায়ক-দায়িকাদের দৈনন্দিন জীবনে যতটুকু আহার্যসামগ্রী বিদ্যমান থাকে, এর থেকে কিছু না কিছু গুরুকে না দিয়ে তারা ভোজন করে না। ভোর ৪/৫ টা এবং দুপুর ১০/১১টায় চলে যায়, যার যতটুকু আছে সাধ্যমত ত্যাগকর্মে নিজেদের সম্পৃক্ত করার জন্য। অধুনা তাঁর অনেক অনেক শিষ্যম-লী সে আদর্শকে ধারণ ও লালন করে চলেছেন বলে এ জাগরণ অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ধর্মগ্রন্থ প্রকাশ ও প্রচার :
সমাজ ও জাতিকে জাগাতে হলে ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশ ও প্রচার হচ্ছে অন্যতম মাধ্যম। মুখে বললে যতটুকু বলা হয় অতটুকুতে শেষ হয়ে যায়। কেউ স্মরণে রাখতে পারে, কেউ পারে না। প্রবাদ আছে, পদ্মপত্রে পতিত জলসদৃশ। জ্ঞানতাপস বনভন্তে তথাগত বুদ্ধের অমৃতময় বাণীসম্বলিত সতিপট্ঠান সূত্র গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ করে জনসমক্ষে বিলি করার নির্দেশ প্রদান করেন বিনা পয়সায়। এই মহাগ্রন্থ প্রকাশে বর্তমান লেখকের কিঞ্চিৎ সহায়ক ভূমিকা ছিল বলে আনন্দ হয়। তাঁর একান্ত অনুগত ভক্ত ডা. অরবিন্দ বড়–য়া দীর্ঘদিন মেধা ও শ্রম ব্যয় করে অমৃতময় রসসুধা গুরুবাক্যগুলো লিপিবদ্ধ করে প্রাঞ্জল ভাষায় শ্রুতিমধুর করে মোট তিন খ- প্রকাশ করে জনসমক্ষে প্রচার করেন। আজ তাঁর অসংখ্য শিষ্যম-লী, বিশেষত শ্রীমৎ ইন্দ্রগুপ্ত মহাস্থবির, শ্রীমৎ আনন্দমিত্র স্থবির ও শ্রীমৎ শোভিত ভিক্ষুসহ অনেক শাস্ত্রজ্ঞ ও সুলেখক ভিক্ষুসংঘ একত্রিত হয়ে ত্রিপিটক শাস্ত্রের বহুমূল্যবান গ্রন্থাবলী অনুবাদসহ বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে অমূল্য সম্পদ উপহার দিয়ে চলেছেন। এ ব্যাপারে ভিক্ষুসংঘের সুন্দর ও রুচিশীল পরিকল্পনা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। শাস্ত্রজ্ঞ অগ্রমহাপ-িত শ্রীমৎ প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির এবং রেঙ্গুন বৌদ্ধ মিশন প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা, ভারতের ধর্মাধার বৌদ্ধগ্রন্থ প্রকাশনী, কলিকাতা, পরবর্তী সময়ে সাধকশ্রেষ্ঠ বনভন্তের শিষ্যসংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বনভন্তে প্রকাশনী থেকে স্বল্প সময়ে অসংখ্য ত্রিপিটক শাস্ত্রের অনূদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যা কল্পনারও অতীত বললে অত্যুক্তি হয় না। এটি সম্ভব হয়েছে পরম পুরুষের আশীর্বাদ ও সঠিক দিকনির্দেশনার কারণে। সবচেয়ে গৌরবের বিষয় হলো, তাঁর বহুশিষ্য ত্রিপিটক শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ পালি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করার মতো যোগ্যতা অর্জন করেছেন। ভবিষ্যতে এ মহান কাজ আরও ব্যাপকতর রূপ লাভ করবে। চট্টগ্রামের বুডিষ্ট রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেন্টার-বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে কিছু কিছু এ বিষয়ে কাজ হচ্ছে। বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজের প্রায় দেড়শ বছরের মহাজাগরণের ইতিহাসে বনভন্তে প্রকাশনী শত শত অমূল্য গ্রন্থ প্রকাশের কার্যক্রম অদ্বিতীয় স্থান দখল করেছে বললে ভুল হবে না। ভবিষ্যতে এ জাতীয় বিশাল কর্মকা- দিন দিন আরও গতিশীল হয়ে অক্ষয় কীর্তি রাখতে সক্ষম হবে।
রাজবন বিহার ও শাখা বনবিহার :
সাধকপুরুষের তপোবন হিসেবে রাজবন বিহারে তাঁর আগমনের সাথে সাথে অন্যতম পুণ্যভূমিতে রূপ লাভ করতে শুরু করেছে শুধু তাই নয়, ইহা প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক তীর্থে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় গৌরবময় ইতিহাসে দেশি-বিদেশিদের কাছে অনন্য আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে খ্যাত। বাংলাদেশে এবং পুণ্যভূমি ভারতে যে সকল শাখা বনবিহার তৈরি হচ্ছে সবই কয়েক শ একক জমি নিয়ে সত্যিই এক একটি অভূতপূর্ব তপোবনতুল্য। বিগত কয়েক শ বছর আগে থেকে গাঙ্গেয় বদ্বীপে এ পর্যন্ত যত বিহার সৃষ্টি হয়েছে সব বিহারই মাত্র কয়েক একর জমি মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি এক কানি বা মাত্র কয়েক কানি জমি নিয়ে তৈরি বিধায় তেমন দৃষ্টান্তমূলক বিহারে রূপ লাভ করতে পারেনি। উখিয়া, টেকনাফ, পটুয়াখালী, রংপুর, বরিশাল, কক্সবাজার, কুমিল্লা, বিশেষ করে সমতলীয় বৌদ্ধদের মধ্যে যে-কয়টি বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শুধুমাত্র ধর্মীয় কার্যাদি পরিচালনা হয় মতো নির্মিত হয়েছে বলা যায়। আর পুণ্যপুরুষ বনভন্তের আদর্শকে সামনে রেখে পার্বত্য এলাকাসহ দেশে-বিদেশে যে কয়টি বিহার তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও হবে সবই বলা যায় কয়েক শ একর জমি নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে তাঁর চিন্তা-চেতনা ছিল অতি ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী, যা বঙ্গীয় বড়–য়া বৌদ্ধ সমাজের জন্য কল্পনাতীত। একদিকে সুউচ্চ পাহাড়ি টিলা, অন্যদিকে বিভিন্ন জাতের গাছের বাগান, যা সত্যিই অভিনব ও দৃষ্টিনন্দন! এ পর্যন্ত রাজবন বিহারসহ প্রায় শতাধিক শাখা বিহার ও অরণ্য কুটির গড়ে উঠেছে, যা অতীতের ন্যায় বুদ্ধের ধর্ম-দর্শন ও সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

শিষ্যমন্ডলী :
তথাগত বুদ্ধ তাঁর দীর্ঘ সাধনালব্ধ জ্ঞান জীব-জগতের হিত-সুখ কামনা এবং জীবনদুঃখের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার মানসে প্রথম পঞ্চবর্গীয় শিষ্যসমেত সর্বমোট ৬১ জন অর্হৎ শিষ্যম-লী তৈরি করেছিলেন। বুদ্ধ এবং অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী, সাধক, শাস্ত্রজ্ঞ প-িত শিষ্যদের প্রভাবে দীর্ঘ আড়াই হাজার বছরের অধিককাল অতিক্রান্ত হলেও বুদ্ধের মানবতা, মানবপ্রেম, বিশ্বশান্তি এবং দুঃখমুক্তির অমিয় বাণী দিকে দিকে পরিস্ফুট রয়েছে। আর্যপুরুষ নামে খ্যাত বনভন্তের কঠোর তপস্যা, আত্মত্যাগ এবং অর্জিত বিদ্যাগুণে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক সাধক শাস্ত্রজ্ঞ, লেখক ও ধুতাঙ্গসাধক শিষ্যম-লী তৈরি করে গেছেন। তাঁর এ অবদান শাসন-সদ্ধর্মের প্রভূত কল্যাণে, বিশেষত বুদ্ধবাণীর নবজাগরণে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখবে যুগ যুগ ধরে। ভারত-বাংলা উপমহাদেশের এককভাবে অতজন শিষ্য তৈরি করা অতীব দুরূহ কাজ। তিনি (বনভন্তে) যেমন প্রেরণা, উৎসাহ, সুবুদ্ধি ও সুপরামর্শ দিয়েছেন, তেমন শিষ্যম-লীদের মধ্যে অনেকে স্বীয় উদ্যোগে গুরুদেবের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে উক্ত কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে তুলেছেন। বুদ্ধ ও তাঁর ধর্মবাণীর বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত হওয়ার মূলে শিষ্যম-লীর অবদান ছিল অতুলনীয়। আজ বিশ্বায়নের যুগসন্ধিক্ষণে আর্যপুরুষ বনভন্তে আরও বেশি অমরত্ব লাভ করবেন, যদি তাঁর শিষ্যম-লীদের সমন্বয়, বোঝাপড়া, স্ব স্ব দায়িত্ব কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা, গুরুর আদর্শ চিন্তা-চেতনাকে মনেপ্রাণে লালন ও পালন করে যান। যদি সমতলীয় মহান সংঘগুরু তথা অন্যান্য গুরুদের মধ্যেও এ জাতীয় চেতনার উন্মেষ হয়, তাহলে সমাজ ও জাতির জন্য অতীব মঙ্গলজনক শুভ সংবাদ। আন্তরিকতা, আত্মবিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ, আত্মত্যাগ, অপরিসীম ধৈর্য্য ও সংযমতা থাকলেই আত্মোৎসর্গ ও সাধনমার্গের উচ্চতর জ্ঞানার্জন অতি সহজ হয়, যা গৃহী ও সংঘসমাজে যথেষ্ট কল্যাণ বয়ে আনবে।

বিশ্বশান্তি প্যাগোডা প্রতিষ্ঠা :
সাধকপুরুষের কোনো রকমের প্রত্যাশা থাকে না। তথাগত বুদ্ধের ভক্তপ্রাণ অনুসারীরা যেমন অনেক স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে তাঁর স্মৃতিকে সর্বস্তরের জনমানসের অন্তরে মহাপুণ্যময় জাগরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তেমন আর্যপুরুষ লৌকিক জগতে অবস্থান করতে গিয়ে সর্বসাধারণের মঙ্গলময় পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্বশান্তি প্যাগোডা প্রতিষ্ঠার একটি মহৎ সংকল্প অন্তরে পোষণ করেছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলবার্তা বয়ে আনবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বৌদ্ধ দেশ থাইল্যান্ডের ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহাপ-িত ভদন্ত ফ্রারাজ ভাবনাবিসুধের আন্তরিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অভিনব নকশা তৈরি হয়েছে ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের প্রকৌশলীবৃন্দের সহায়তায়। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দকে বর্তমান লেখক বাংলাদেশে প্রথম এনেছিলেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সমগ্র বাংলাদেশে সর্বমোট ২৫০ টি অষ্টধাতু-নির্মিত বুদ্ধমূর্তি দানও করেন। তন্মধ্যে বনভন্তের শাখা বিহারসমূহে ৮৩/৮৪ টি বুদ্ধমূর্তি প্রদান করা হয়েছিল, যা অতীব আনন্দের বিষয়। কারুকার্য খচিত দৃষ্টিনন্দন এবং শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যম-িত বিশ্বশান্তি প্যাগোডা এদেশের জন্য দুর্লভ সম্পদ। এদেশের ভক্তপ্রাণ দায়ক-দায়িকাদের এ ব্যাপারে উদার হস্ত প্রসারিত করার আহ্বান জানাই। ১৯৭৭ সাল থেকে শারীরিক অসুস্থ থাকার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সাধকশ্রেষ্ঠ বনভন্তের রাজবন বিহারের সমুজ্জ্বলতাদানের ক্ষেত্রে যে-ভূমিকা রেখেছিলেন তা অতুলনীয় এবং ইতিহাসখ্যাত।

মাতৃজাতির প্রতি তাঁর উপদেশ :
ব্রহ্মচর্য জীবনে সাধকপুরুষ বনভন্তে মাতৃজাতি হতে দূরে থাকার নির্দেশ প্রদান করলেও অবমূল্যায়ন করেননি কোনোদিন। তথাগত বুদ্ধই বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে ভিক্ষুদের পাশাপাশি নারীদের ভিক্ষুণী-ধর্মে প্রবেশাধিকার দিয়েছিলেন। প্রবেশের মূলে কঠোর কিছু রীতি-নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন। নারীরা সেবায়, ত্যাগে, উদারতায় এবং ধর্মীয় চেতনায় অনেকটা অগ্রগামী। তবু নারীর জীবন অত্যন্ত দুঃখকষ্টের। পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা সব সময় অবহেলিত। তাই তিনি পরিবার, সমাজ ও জাতি পিছিয়ে রয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। নারীজাতির প্রতি মর্যাদা, গৌরব, সম্মান যত বেশি হয়, পরিবার, সমাজ ও জাতি তত বেশি উন্নত হয়। দেখা যায়, পরিবার, সমাজ ও জাতীয় জীবনে নারীরা যে-কোনো কাজ নিষ্ঠার সাথে ও আগ্রহ নিয়ে সম্পন্ন করে, তুলনামূলকভাবে পুরুষেরা তা করে না। এটাই বাস্তবতা। পার্বত্যবাসী নারীরা খুবই কর্মঠ ও পরিশ্রমী। পুরুষেরা অনেকটা অলস প্রকৃতির বলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও গরিব। ধর্ম-কর্মেও অনেকটা পিছিয়ে। নারী-পুরুষ সকলকে শ্রমনিষ্ঠ হওয়ার জন্যে এবং সুন্দর ও স্বচ্ছল জাতি গঠন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করতেন তিনি। বিশেষত ধর্মীয় জীবনযাপনের প্রতি গুরুত্ব দিতেন বেশি। ধর্মজীবনই সুখী ও উন্নত জীবন। আজ সমগ্র পার্বত্যবাসীর জীবনে অনেকটা পরিবর্তন ও ধর্মীয় জাগরণ সূচীত হয়েছে, তাঁর অমূল্য উপদেশবাণীর প্রভাবে। এটা তাঁর অসাধারণ অবদান ও আশীর্বাদও বটে।

তরুণ-তরুণীদের জাগৃতি :
পরিবার, সমাজ ও জাতির সার্বিক উন্নয়ন অর্থাৎ সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, ভাষা ইত্যাদির ক্ষেত্রে তরুণ-তরুণীদের ভূমিকাই অগ্রণী। পার্বত্যবাসী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ধর্মীয় বা নৈতিক চেতনার পরিবর্তনের মূলে বনভন্তের সুদূরপ্রসারী সত্যনিষ্ঠ চিন্তা-চেতনা অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে বলা যায়। প্রতিদিন রাজবন বিহার এবং শাখা বনবিহারে সকাল-সন্ধ্যা তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতির সংখ্যা লক্ষণীয়। সমবেত প্রার্থনা, গুরুবন্দনা, আকাশ প্রদীপ উত্তোলন সত্যিই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করে চলেছে। অসংখ্য তরুণ ভিক্ষু-শ্রামণ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে শাসন-সদ্ধর্মের প্রভূত কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন, এর জ্বলন্ত উদাহরণ রাজবন বিহার ও শাখা বনবিহারে অবস্থানরত শত শত ভিক্ষুসংঘ। সমতলীয় বৌদ্ধ তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও অনেকটা তাঁর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এটা যে-কোনো জাতির জন্য অতীব শুভ লক্ষণ। রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমও পরিপূর্ণ যৌবনদীপ্ত জীবনকে আত্মত্যাগী ও সাধনা-জীবনে আত্মসমর্পণ করে আজ বিশ্ব্যখ্যাত মহামানব এবং বিমুক্ত মহাপুরুষ। সাধকপুরষ বনভন্তেও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরির পদাঙ্ক অনুসরণ করে সর্বজনপূজ্য আর্যপুরুষ নামে পরিচিত হয়েছেন। বর্তমান তরুণ-তরুণীরা সমাজ ও সদ্ধর্মের জয়পতাকা বহু ধারায় উড্ডীন করে সুুশীল সমাজ বিনির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এটা সাধকপুরুষের আন্তরিক প্রত্যাশা ছিল বলে আজ অনেকটা পরিবর্তনের ঢেউ দেখা যায়, যা সময়ের দাবিও বটে।

লোকোত্তর চেতনা :
মানব জীবনমাত্রই লৌকিক চিন্তা-চেতনায় সম্পৃক্ত। সাধারণত আমি, তুমি, সে হলো লৌকিক দৃষ্টি অর্থাৎ সেখানে লোভ-দ্বেষ-মোহ শুধু নয়, আত্ম-অহংকার, আত্মাভিমান এবং আমিত্বভাব প্রবল। তজ্জন্য সবই আমি এবং আমার বলে হাহাকার করে নানা দুঃখ-যন্ত্রণায় কালাতিপাত করতে দেখা যায়। তথাগত বুদ্ধ রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম থাকাকালীন উপর্যুক্ত বাস্তব সত্য উপলব্ধি করে সংসারবিরাগী হয়ে আত্মমুক্তির পথকে উন্মুক্ত করেছিলেন। সাধকপুরষ বনভন্তে তথাগত বুদ্ধের সেই জ্ঞান-সাধনায় সুদীর্ঘকাল গভীরভাবে নিমগ্ন হয়ে আজ সাধকপুরুষই শুধু নন, আর্যপুরুষ হিসেবে লোকোত্তর সাধনমার্গে উন্নীত হতে সক্ষম হয়েছেন বলেই উচ্চমার্গের জ্ঞানের বিষয় স্বাভাবিকভাবে তাঁর কথায়, জীবনে, মননে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রতিটি বাক্য লোকোত্তর-মার্গকে জাগিয়ে দেয়। যেখানে অলোভ, অদ্বেষ ও অমোহচেতনা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। কথায় কথায় অন্তরের মলিনতা ত্যাগ করে বাহ্যিক আকর্ষণীয় বস্তুকে পরিত্যাগ করার কথাই তিনি বলতেন। তাঁর সাধনাময় জীবনে চাহিদা বলতে তেমন কিছুই ছিল বলে কাউকে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করার প্রশ্নই আসে না। তিনি সদা সর্বদা মৈত্রীপরায়ণ ছিলেন। সর্বজীবে মৈত্রী পোষণ মহত্ত্বতার লক্ষণ। তাঁর ত্যাগচেতনা এবং সাধনা-জীবন সবই অজ্ঞানান্ধকার দূরীভূত করার জন্য। মোহান্ধতা মানুষকে ধ্বংস করে। ত্যাগ ও সাধনা করলে তা ধ্বংস করা যায়। এই বস্তুনিষ্ঠ চিন্তা-চেতনাকে আজীবন লালন ও ধারণ করেছে বলেই তিনি মুক্তপুরষ নামে খ্যাত। সব সময় তিনি বন্ধন-মুক্তির কথাই সকলকে উপদেশ দিতেন। তাই বলতেন,
আমি যেখানে দুঃখ সেখানে।
আমার ধারণা মাত্রই বন্ধনের সৃষ্টি,
বন্ধনের কারণে মানবের মুক্তি নেই।
দুঃখসত্য না বুঝা জন্মান্তর বৃদ্ধি হয়।
দুঃখ জয়ের সাধনা কর,
নির্বাণ শান্তি লাভ কর।

এই ছিল তাঁর মহান উপদেশ। এগুলো লোকোত্তর সত্যের ইঙ্গিত বহন করে। লৌকিক জগতের বিষয় প্রত্যক্ষ হয়ে লোকোত্তর-জ্ঞান অর্জনই ছিল তাঁর মূখ্য বিষয়। আজ তিনি লোকোত্তর জ্ঞানজগতের অনন্য পথিক। তাই তিনি বলতেন, ‘চর্মচক্ষুর মধ্য দিয়ে জ্ঞানচক্ষু উন্মোলিত কর। আত্মজয়ী হতে পারবে। এই জয় দুঃখের অনন্ত সাগর থেকে মুক্তিলাভের জয়। আর জন্মান্তর-দুঃখ ভোগ করতে হবে না’। সবার প্রতি তাঁর প্রতিনিয়ত এই আহবান ছিল।

সমাধি :
২০১২ সালের জানুয়ারি মাস। দীর্ঘ ৯৩ বৎসর বয়স ও শারীরিক বার্ধক্যজনিত কারণে দুর্বল হয়ে যায় অনেকটা। দেহরক্ষার জন্য আহার, সুস্থতার জন্য সামান্যতম ওষধ গ্রহণও তাঁর কাছে উপভোগ্য ছিল না। স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং ধ্যানসুখ উপভোগই ছিল একমাত্র আহার। আমার শ্রামণ্য ও ভিক্ষুত্ব জীবনের সূচনা থেকে এ মহান সাধকপুরুষের স্নেহসান্নিধ্য পাওয়ার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল।
একদিন ভোরে তাঁকে দর্শন ও শ্রদ্ধা জানাতে রাজবন বিহারে উপস্থিত হয়ে তাঁর শারীরিক অসুস্থতার এবং আহারবিহীন অবস্থার বিষয় অবগত হয়ে প্রার্থনা করলাম, উষ্ণজল দিয়ে এক, দুই চামচ মধুজল পান করার। আমার নিজের হাতে আমি তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় মধুজল পান করালাম। অপার আনন্দ পেলাম। শিষ্যম-লীরাও সুখী হলেন। এ মাসের শেষে আরও দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়লে শিষ্যম-লী ও ভক্তম-লীর একান্ত প্রার্থনায় উন্নততর চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টার যোগে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। নামমাত্র চিকিৎসা নিলেও মূলত তিনি তাঁর ধ্যানসুখেই অবস্থান করেছিলেন।
অসুস্থ অবস্থায় দেখতে এসেছিলেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপমুনি, শিল্পমন্ত্রী দীলিপ বড়–য়া, প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার, রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ আরও নাম না-জানা গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও মন্ত্রীবর্গ। তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং ৩০/০১/২০১২ তারিখে ৯৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ‘নিব্বানং পরমং সুখং’। আমি অধম সেবক হিসেবে তাঁর অসংখ্য শিষ্য ও ভক্তম-লীর সঙ্গে প্রথম দিন থেকে হাসপাতালে অবস্থান এবং তাঁর সাধনপীঠ রাজবন বিহারে পৌঁছানো পর্যন্ত সেবকের দায়িত্ব পালনের দুর্লভ আমার সুযোগ হয়েছিল। সরকারি-বেসরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হাজার হাজার ভক্তপ্রাণ নরনারী, বুদ্ধিজীবী, রাজধানী ঢাকা থেকে রাঙামাটি পৌঁছানোর সময় রাস্তায় রাস্তায় জনতার সমাবেশ সত্যিই অভূতপূর্ব! যা প্রত্যক্ষ না করলে ব্যাখ্যা করে বোঝানো কঠিন।

সগৌরবে বলা যায়, তিনি যে কত বড় মাপের সাধক পুণ্যপুরুষ ছিলেন। এখনও হাজার হাজার ভক্তপ্রাণ জনতার ভিড় অব্যাহত। থাইল্যান্ডের ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মূল্যবান পেটিকাসহ দেহসংরক্ষণের ভৈষজ্য দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। আমরা তাঁদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁর আধ্যাত্মিক ধ্যান-সাধনা, কর্মপ্রতিভা ও সৃষ্টিশীল মুক্তচিন্তা তাঁকে কীর্তিমান আর্যপুরুষে চিরঞ্জীব করে রাখবে সুদূর ভবিষ্যৎ অবধি। জয়তু বনভন্তে! 

লেখক :  অধ্যাপক, প্রাচ্যভাষা (পালি ও সংস্কৃত) বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

Print Friendly, PDF & Email