log1

আধ্যাত্মিক গুরু বনভন্তে

ড. মানিক লাল দেওয়ান

21আমার মনে হয় বনভন্তে সকলের কাছে পূজ্য ও বিশ্বাসযোগ্য। কারণ, তিনি আধ্যাত্মিক (ঝঢ়ৎরঃঁধষ) গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁকে বিশ্বাস বা স্মরণ করলে কিছু না কিছু অলৌকিক ভালো ফলাফল পাওয়া যায়, যা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যায় না।
এই মহামানব বনভন্তের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ আমার হয়েছে ১৯৭২ সালে অর্থাৎ সোভিয়েট ইউনিয়ন থেকে পিএইসডি (চঐউ) ডিগ্রী অর্জন করে দেশে ফেরার পর। তখন চারিদিকে বনভন্তের জয়গান শুরু হয়েছে। দলে দলে লোকজন ভন্তের শরণাপন্ন হতে শুরু করেছে। ভন্তে তখন লংগদুর তিনটিলা বনবিহারে অবস্থান করছিলেন। আমার সহধর্মিণী কল্যাণী ভন্তের একজন অসাধারণ ভক্ত। কিন্তু আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী ছিলাম না। কল্যাণীর ও কিছু আত্মীয় স্বজনের অনুরোধে তিনটিলায় গিয়ে বনভন্তের দর্শন করতে রাজী হয়ে গেলাম।

একদিন (তারিখ মনে নেই) সকালে কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবসহ রাঙামাটিস্থ শ্বশুর বাড়ি থেকে তিনটিলার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। রিজার্ভ বাজার থেকে লঞ্চে করে তিনটিলা যেতে হয়। আমি রিজার্ভ বাজারস্থ পূবালী ব্যাংক থেকে টাকা তোলার জন্য তার সই করা একটি চেক নিয়ে আগেভাগে পূবালী ব্যাংকে চলে গেলাম। চেকটি অগ্রহণযোগ্য বলে ফেরত দেওয়া হলো। কারণ, আমানতকারীকে নিজে এসে টাকা তুলতে হবে। আমি প্রতিবাদ না করে সোজা লঞ্চঘাটে চলে গেলাম। লংগদুগামী লঞ্চে উঠে তন্ন তন্ন করে আমার সফর সঙ্গীদের খুঁজলাম, কিন্তু দেখা পেলাম না। উপরে উঠে রিজার্ভ বাজারে খুঁজেও তাদের দেখা পেলাম না।
আবার নিচে নামতে গিয়ে দেখি লঞ্চটি ছেড়ে গেছে। বিফল মনোরথ হয়ে উপরে উঠতে যাব সে সময় আমার চোখের চশমা ভেঙে দু-ভাগ হয়ে গেল। একটি বেবিটেক্সি নিয়ে বাসায় ফিরে আসলাম। আমার শ্বাশুড়ী মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে টেক্সির ভাড়া দিয়ে দিলাম। কল্যাণী ও সফর সঙ্গীরা তিনটিলা চলে গেছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম। মনে মনে বিশ্বাস করলাম যে, বনভন্তের প্রতি আমার অগাধ আগ্রহ ও বিশ্বাস না থাকার জন্যই তাঁর সান্নিধ্য লাভে ব্যর্থ হয়েছি। এরপর তন্তের প্রতি আমার আগ্রহ ও ভয় দুটিই বাড়তে লাগল।

ভন্তের একনিষ্ঠ পূজারী বাবু সমর বিজয় চাকমা একদিন সিয়ং-এর ঠালাটি আমার হাতে দিয়ে বনভন্তেকে গছিয়ে দিতে বললেন। লক্ষ করলাম, ভন্তে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু সিয়ং গ্রহণ করতে ভিতরে আসতেছেন না। আমি সিয়ং-এর পাত্রটি হাতে নিয়ে কায়-মনো-বাক্যে আমার দোষ-ত্রুটির জন্য নীরবে ক্ষমা প্রার্থনা করার সাথে সাথে তিনি ভিতরে প্রবেশ করে সিয়ং গ্রহণ করলেন এবং আমার ও পারিবারিক খবরাখবর নিলেন। সেই দিন থেকে আমার প্রতি ভন্তের আগ্রহ ও সহানুভূতি লক্ষ করলাম। আমার কর্মস্থল ময়মনসিংহ থেকে রাঙামাটি আসলে বনভন্তের সাক্ষাৎ লাভ করতে চেষ্টা করতাম।
১৯৮৭ সালে বাবার মৃত্যুর পর আমার মানিকছড়িস্থ বাড়িতে আমার বিধবা ছোটবোন একা থাকতে ভয় করত। সে এক পর্যায়ে বাড়ি পারিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। ফলে মানিকছড়ির সম্পত্তি রক্ষায় সমস্যা দেখা দিল। আমি ও আমার সহধর্মিণী কল্যাণী বনভন্তেকে ফাং করে ১৯৯৬ সালে আমাদের রাঙামাটির বাসায় নিয়ে আসি তিনি আমার পারিবারিক সমস্যা জানতে চাইলে আমি বাবার অবর্তমানে মানিকছড়ির বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে উদ্ভূত সমস্যার কথা বলাতে প্রথমে তিনি কিছুক্ষণ মৌনব্রত অবলম্বন করলেন। তার পর অনেক উপদেশ দিলেন।
পরের দিন আমার শেলক পরিতোষ সস্ত্রীক আমার বাসায় হাজির। খাগড়াছড়ির প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা তার স্ত্রী রাঙামাটি টিচার্স ট্রেনিং সেন্টারে ১ বছরকাল ট্রেনিং গ্রহণের জন্য। রাঙামাটি শহরে একটি বাসা ভাড়া করতে হবে। মানিকছড়িস্থ আমার বাসায় বিনা ভাড়ায় থাকা ও জমির এক বছরের উৎপাদিত ধান ভোগ করা প্রস্তাব দিলে সে সানন্দে রাজি হয়ে গেল। এতে মানিকছড়িস্থ বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্পদ রক্ষা করার সমস্যা আপাতত দূরীভূত হলো। আমার ছোট বোন যে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল সেও বাড়ি ফিরে আসল।

২০০২-২০০৭ সময়ে আমি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার চেয়ারম্যান থাকাকালে আমি প্রায়ই ভন্তের দর্শন লাভে বনবিহারে গমন করতাম। এবং তাঁর অমূল্য উপদেশ শুনতাম ও পালন করার চেষ্টা করতাম। যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ ও নীতিগতভাবে পরিষদের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করতাম। বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি পূজনীয় ভন্তে নাকি লোকজনকে বলতেন, এ চেয়ারম্যানের আমলে জনসাধারণ মিষ্টি আম খেতে পাবে। উল্লেখ্য, আমার আমলে স্বল্পমূল্যে অসংখ্য আ¤্রপালী আমের কাটিং জনসাধারণের কাছে বিতরণ করি। তদুপরি অনেক জনহিতকর কাজসহ নিরপেক্ষভাবে বিনা পয়সায় ১০২০টি বিভিন্ন পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি। পরিষদের এইসব নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য অবৈধভাবে নিয়োগ না পাওয়া কিছু বিএনপির কর্মী আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে। তারা প্রাক্তন চেয়ারম্যান বরীন্দ্র লাল চাকমাকে নিয়ে আমাকে অপসারণ করার জন্য ঢাকার বিএনপির কেন্দ্রিয় নেতৃত্বের কাছে দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু করে দিল। তার জলন্ত প্রমাণ পেলাম। আমি ও সহধর্মিণী কল্যাণী একদিন সমস্যার লিখিত বক্তব্য নিয়ে ভন্তের শরণাপন্ন হলাম। শ্রদ্ধেয় ভন্তে মনযোগ দিয়ে পড়ে বললেন, এটা তাদের ফাজিলামি, ফাজিলামি। আমরা ভন্তেকে প্রণাম করে বাড়ি চলে আসলাম। পরের দিন বিএনপির কর্মীরা দু-গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেল এবং এক গ্রুপ আমার পক্ষ হয়ে আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল। এক পর্যায়ে দু-গ্রুপের সংঘর্ষও হলো। বিএনপি সরকার সম্ভবত ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন বন্ধ করে দিল। পরিষদের কাজে শান্তি ফিরে এল।
উপর্যুক্ত ঘটনাবলী নিয়ে চিন্তা করলে অপার বিস্ময়ে বলতে হয়, কী মহান ও অদ্ভুত বনভন্তের আধ্যাত্মিক শক্তি! 

লেখক : ড. মানেক লাল দেওয়ান, অধ্যাপক (অব.) ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক জেলাপরিষদ চেয়ারম্যান, রাঙামাটি

Print Friendly, PDF & Email