log1

শাসন করে যে, সোহাগ করে সে

Untitled-1শ্রীমৎ শাসন রক্ষিত মহাস্থবির-

অামার বাবার নাম সুবল চন্দ্র চাকমা। খুব সাদাসিধা প্রকৃতির লোক। সাংসারিক জীবনের প্রথম ভাগে তৎকালীন মারমা-চাকমা ভিক্ষুদের কথাবার্তা ও আচার-আচরণে বিরক্ত হয়ে বিহারবিমূখ ও ভিক্ষুসংঘের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন। কেন? তৎকালীন ভিক্ষুরা নাকি দানানুষ্ঠানে গেলে, দানীয়সামগ্রী কাড়াকাড়ি করে। তা দেখে তাঁর মন খারাপ হয়। ভিক্ষুদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার পরিহানি হয়। তাতে তাঁর পাপ হয়। তাই কোনো দানানুষ্ঠানেই যেতে চান না।
বিহারে যান না কেন? এক মারমা ভিক্ষুর দেশনায় শুনেছিলেন : বার্মার (মায়ানমার) এক বৌদ্ধ বিহারে সাতশত ভিক্ষু থাকতেন। বিহার অধ্যক্ষ একদিন নিমন্ত্রণে (ফাং) গেলেন। অপরাপর ভিক্ষুরা এমন ঝগড়া বাঁধালো যে, পরস্পর পরস্পরকে দ- দিয়ে মাথায় আঘাত করে, অনেক ভিক্ষুর মাথা ফেটে গেল। সেই বিহারের তত্ত্বাবধায়ক (কিয়ং ঠাগা) খবর পেয়ে বিহারে গেলেন। দেখলেন, অনেক ভিক্ষু মাথা ফাটা-ফাটি করে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। সেই দৃশ্য দেখে, কিয়ং ঠাগা ক্ষোভে-অপমানে বললেন, ‘বড় শুকরটা কোথায় গেছে? ছোট শুকরেরা দাঁত মারামারি করতেছে।’ বড় ভন্তে ফাংয়ে গেছেন। তাঁর কী দোষ! ছোট ভন্তেরা মারামারি করেছে, তারা না হয় নিন্দার ভাজন হয়েছে। বড় ভন্তেকে এভাবে গালি দিবেন কেন? তাই সেই বাচনিক পাপের কারণে সারা জীবন কিয়ং-ঠাগাগিরি করেও, মরণের পরে বিহারের পাশে শুকর হয়ে জন্ম নিলেন। এই পাপের ভয়ে আমার বাবা বিহার বিমূখ হলেন।

কিন্তু ১৯৭৪ সালে চেঙ্গী উপত্যকার ‘লোগাং বনবিহারে’ শ্রদ্ধেয় বনভন্তেকে আনা হয়। ফেরার পথে ‘পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে’ এক রাত অবস্থান করে ফাং করে রাখা হয়। সেদিন আমার বাবা আর বিহার বিমূখ, ভন্তে বিমূখ হয়ে থাকতে পারলেন না। শ্রদ্ধেয় বনভন্তের আগমনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সাধুবাদ দিতে দিতে উভয় সারিতে খুঁজতে লাগলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে কোন সারিতে দাঁড়িয়ে আছে?’ কিন্তু কোথাও নেই। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বিদ্যালয়ে এসে বললেন, ‘তোমরা এখন বাড়িতে যাও। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে সন্ধ্যে বেলায় এসো। তখন ধর্মদেশনা করব।’ তাই আমার বাবা তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসলেন। সেদিন দুপুর বেলায় আমার এক জ্ঞাতিভাই বলল, ‘চল, আমাদের জমির পাশে একটা মৌচাক আছে; ঐটা ভাঙিয়ে মধু খাই।’ আমি বললাম, ‘ভয় লাগে।’ তখন সে বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই, তুমি শুধু আমাকে সহযোগিতা করবে। সব কাজ আমিই করব।’ তার সেই কথায় আমি সম্মতি দিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে।’ কিন্তু হায়! গিয়ে দেখি, সেই মৌচাকে মধু নেই। আছে শুধু পোকা। সে ওই পোকাযুক্ত মৌচাক পেচিয়ে রস বের করল। আমাকে একাংশ দিল। সেই অংশ বাড়িতে এনে আমার মাকে দিলাম। মা রান্না করে দিলেন। বিকেলে ভাত খাওয়ার সময় বাবা মাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেটা কি?’ মৌচাকের রস। ‘কোথায় পেলে?’ তোমার ছেলে এনেছে। মায়ের উত্তর শুনে বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী! আমি তো শ্রদ্ধেয় বনভন্তের আগমনে দ-ায়মান সারিগুলোতে দাঁড়িয়ে খুঁজতেছিলাম, আমার ছেলে সাধুবাদ দিতে দিতে কোন সারিতে দাঁড়িয়ে আছে? তুমি গেছ মৌচাক ভাঙতে।’ তখন আমার মা বাবাকে বললেন, ‘তুমি কি ছেলের মন বুঝতে পারছ না?’ এরপর বাবা চুপ হয়ে গেলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর আমাকেও পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের দেশনা শুনতে নিয়ে গেলেন।

সারাদিন রোদে ঘুরাঘুরি করেছিলাম। তাই শ্রদ্ধেয় বনভন্তে মঞ্চে আসন গ্রহণ করতে না করতেই, তাঁকে এক পলক দেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। শ্রদ্ধেয় বনভন্তের চেহারা মনে রাখতে পারলাম না। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে আমার সেই নয় বছরের কৈশোরের দুরন্ত মনকে নাড়া দিতে পারলেন না। কিন্তু আমার বাবার মনকে বদলে দিলেন। এর আগে আমার বাবা একটু একটু মদ্যপান করতেন, মাছ-কাঁকড়া ধরতেন। এগুলো সব বাদ দিলেন। বড় হয়ে একসময় আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বাবা, আপনি তো আগে মদ্যপান করতেন, মাছ ধরতেন; এগুলো এখন করেন না কেন?’ তখন বাবা আমাকে বললেন যে, শ্রদ্ধেয় বনভন্তে নাকি ধর্মদেশনায় বলেছিলেন, ‘ধর্ম কোথায়? মন-চিত্তে। পাপ কোথায়? মন-চিত্তে। বিহার-মন্দির কোথায়? মন-চিত্তে। মন যদি সোজা হয়, ঋজু হয়; সব সেখানে। বেশ, আর লাগবে না।’ শ্রদ্ধেয় বনভন্তের এক দেশনাতেই বাবার মন পরিবর্তন হলো। কিন্তু ছেলের মনে কোনো ছোঁয়া লাগল না। তবে আমি মনে করি, সেই প্রথম দর্শনের রেশ আমার মনে রয়ে গেছে। মনে মনে ভাবতাম, বড় হলে হয় ভন্তে হব, না হয় শান্তিবাহিনীতে যাব। আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম, তখন আমার বাবার দুটি চোখই অন্ধ হয়ে গেল। সেই থেকে পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়ল। তার পর নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাবার একচোখ অস্ত্রোপচার করে দিলাম, আর দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আরেক চোখ। বাবা তখন একটু একটু কাজ করতে পারতেন। বাবার অবস্থা দেখে বাবার জন্য খুবই মায়া জাগত (করুণার উদ্রেক হতো)। ফলে আমার ভন্তে হওয়া বা শান্তিবাহিনীতে যাওয়ার ইচ্ছা, সব মনসমুদ্রের অতল তলে তলিয়ে গেছে।

১৯৮৬ সালে হঠাৎ পার্বত্য এলাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠল। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থী হওয়ার পথে যেতে যেতে ফিরে এলাম। পরে আস্তে করে পানছড়ি উপজেলার লতিবান গ্রামে আস্তানা করলাম। একদিন আমাদের গরুগুলো মাঠে চড়াচ্ছিলাম। মাঠের পাশে এক টুকরো কাগজ দেখলাম। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখি, রাঙামাটি রাজবন বিহার থেকে কঠিন চীবরদান উপলক্ষে প্রকাশিত একটি স্মরণিকার ছেড়া কাগজ। হাতে তুলে নিয়ে পড়ি; বনভন্তের হিতোপদেশ, বনভন্তের অলৌকিক ক্ষমতার কথা, অনেক কিছু লেখা আছে। তখন আমার মনে এক বিতর্ক উৎপন্ন হলো: ‘তুমি তো কত কিছু গবেষণা কর, ধর্মকে নিয়ে তো একবারও গবেষণা করে দেখলে না। তোমার অবশ্যই ধর্মকে নিয়ে গবেষণা করা উচিত।’ সেই থেকে আমার মনে শুরু হয়ে গেল ধর্ম নিয়ে গবেষণা। নয় বছর বয়সে প্রথম শ্রদ্ধেয় বনভন্তেকে চোখ দিয়ে দেখেছিলাম। তার পর তেইশ বছর বয়সে মন দিয়ে দেখতে শুরু করলাম। সে সময় লতিবান আদর্শ বৌদ্ধ বিহারে শ্রদ্ধেয় বিপর্শ্বী ভন্তে থাকতেন। তিনি শ্রদ্ধেয় বনভন্তের নিকট উপসম্পদাপ্রাপ্ত ও আশ্রিত শিষ্য। তাঁর নিকট শ্রদ্ধেয় বনভন্তের কথা শুনতাম। বিশেষ করে মহাসতিপট্ঠান সুত্তন্ত বইটি পড়ে বৌদ্ধ সাধনার দিকে অগ্রসর হলাম। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, ‘আমি প্রব্রজ্যা নেব; শ্রদ্ধেয় বনভন্তের শিষ্য হব।’ তাই মা-বাবার কাছে প্রস্তাব দিলাম, ‘মা-বাবা, আমি প্রব্রজ্যা নেব।’ সাথে সাথে মা-বাবা রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু যখন বললাম, ‘চিরদিনের জন্যে?’ না, হবে না। ‘সাত বছর?’ না, হবে না। ‘পাঁচ বছর?’ না, হবে না।

পরে শুনলাম, শ্রদ্ধেয় বনভন্তে সশিষ্যে খাগড়াছড়িতে আগমন করেছেন। তাই ভন্তের সাথে দেখা করতে গেলাম। প্রথমে বাবু উপেন্দ্র লাল চাকমার বাসায় গেলাম। সুযোগ পেলাম না। তার পর জনবল বৌদ্ধ বিহারে গেলাম। শ্রদ্ধেয় ভন্তে খোলা বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন। সোজা ভন্তের সামনে গিয়ে নিবেদন করলাম, ‘ভন্তে, আমি এক বাপের এক ছেলে, আমরা শুধু দুই ভাই-বোন। আমি আপনার নিকট প্রব্রজ্যা নিতে চাই, কিন্তু মা-বাবা রাজি নয়। এহেন অবস্থায় আমি আপনার কাছে প্রব্রজ্যা নিতে পারব?’ তখন ভন্তে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লেখাপড়া কতটুকু করেছ?’ ‘উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছি’ এই বলে প্রত্যুত্তর দিলাম। শ্রদ্ধেয় ভন্তে সে বিষয়ে আর কোনো কথা বললেন না। অন্য বিষয়ে দেশনা দেয়া শুরু করলেন। সেদিন শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে প্রাণভরে দেখলাম আর মনভরে দেশনা শুনলাম। বহুদিন পর মা-বাবাকে বললাম, ‘মা-বাবা, আজীবনের জন্যেও দিলেন না, সাত বছরের জন্যেও দিলেন না, পাঁচ বছরের জন্যেও দিলেন না। কয়েক মাসের জন্যেও দিবেন না?’ তখন তাঁরা সম্মতি দিলেন, ‘ঠিক আছে, কয়েক মাসের জন্যে প্রব্রজ্যা নিতে পার।’ পরদিন শুনতে পেলাম, শ্রদ্ধেয় বোধিপাল ভন্তে ‘লোগাং বনবিহার’ থেকে আগামীকাল রাঙামাটি রাজবন বিহারে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের কাছে যাবেন। আমিও তাঁর সাথে রাঙামাটি গিয়ে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের নিকট প্রব্রজ্যা নেওয়ার জন্যে পরদিন খুব সকালে মা-বাবাকে নমস্কার করে বিদায় নিলাম। বাবু শান্তি রঞ্জন কার্বারীকেও নমস্কার করতে গেলাম। তাঁকে বললাম, ‘দাদা, আজ বোধিপাল ভন্তের সাথে রাঙামাটি গিয়ে প্রব্রজ্যা নিতে যাচ্ছি।’ এ কথা শুনার পর তিনি পরামর্শ দিলেন, ‘ভাই, তুমি যদি রাঙামাটি গিয়ে প্রব্রজ্যা নাও; চাচা-চাচিরা (আমার মা-বাবারা) জল ঢেলে তোমাকে বুদ্ধশাসনে পুত্রদান করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। তুমি এই লতিবান আদর্শ বৌদ্ধ বিহারে শ্রদ্ধেয় বিপর্শ্বী স্থবির মহোদয়ের নিকট প্রব্রজ্যা নিয়ে রাঙামাটি যাও। কারণ, শ্রদ্ধেয় বনভন্তে এখন নিজ হাতে কাউকে প্রব্রজ্যা দেন না, তাঁর শিষ্যগণই প্রব্রজ্যা দেন। ইনিও শ্রদ্ধেয় বনভন্তের অন্তেবাসী শিষ্য। শ্রদ্ধেয় বনভন্তের কাছে উপসম্পদা নিয়ে তাঁর সাথে ক-বছর অবস্থান করেছিলেন।’ তখন চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, ‘দাদার প্রস্তাব ঠিক আছে।’ তাই সেদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯ সালে লতিবান আদর্শ বৌদ্ধ বিহারে বিপর্শ্বী ভন্তের নিকট প্রব্রজ্যা নিলাম। কয়েক দিন পর রাঙামাটি রাজবন বিহারে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের নিকটে গিয়ে বিপর্শী ভন্তে বললেন, ‘শ্রদ্ধেয় ভন্তে, এই শ্রামণ আপনার সান্নিধ্যে থাকতে চাই; আপনার কাছে থেকে ধর্ম ও বিনয় শিখতে চায়।’ তখন ভন্তে বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। শ্রামণদের সাথে পাঠাও।’

সেই থেকে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের সান্নিধ্যে অবস্থান শুরু হয়ে গেল। গৃহী জীবনে থাকাকালীন ‘একাসনিক ও একপাত্রিক ধুতাঙ্গ’ অনুশীলন করতে গিয়ে গ্যাস্ট্রিক ব্যাধির উপদ্রব বেড়ে গিয়েছিল। তবুও গ্যাস্ট্রিকের যন্ত্রনা নিয়ে মাঝে মাঝে গুরু সেবা করতে যেতাম। শ্রদ্ধেয় ভন্তে সে সময় আমার দিকে কেবল তাকিয়ে থাকতেন, নাম ধরে কিছুই বলতেন না। একদিন শ্রদ্ধেয় ভন্তের খুব দাঁতের ব্যথা করছিল এবং একটা দাঁত ভেঙে গেল। রক্ত পড়ার কারণে মুখ বন্ধ করে রাখলেন। আমাকে কিছু পরিমাণ ঠা-া পানিতে গরম পানি ঢালতে ইঙ্গিত দিলেন। শ্রদ্ধেয় ভন্তে মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারছিলেন না। তাই হাত দিয়ে আমার মাথায় সামান্য জোরে চাপ দিলেন। আমি বুঝলাম, শ্রদ্ধেয় ভন্তে তাড়াতাড়ি ঢালতে বলছেন। আমিও তাড়াতড়ি ঢেলে তাঁকে কুসুম কুসুম গরম পানি দিলাম। তিনি সেই পানি দিয়ে মুখ কুলি করলেন। কিছুক্ষণ পর ‘সুদূর’ নামক শ্রামণ খালি প্লেট নিয়ে তাঁর কাছে আসল। তখন ভন্তে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দাঁতটা কই?’ শ্রামণ উত্তর দিল, ‘ভন্তে, ধুয়ে-মুছে ফেলে দিয়েছি।’ ‘তুমি কেন ফেলে দিলে? অমুক উপাসক আমার কাছে প্রার্থনা করেছিল, ভন্তে, আপনার যদি দাঁত ভাঙে, আমার জন্যে রেখে দিবেন, আমি সযতেœ রাখব, গৌরব-সৎকার করব’Íএভাবে বলতে বলতে আমাদের বকুনি দেয়া শুরু করলেন। আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দাঁতটা খুঁজতে গেলাম। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলাম। শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে দিয়ে দিলাম। তিনি দাঁতটা যতœসহকারে রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পর এক দায়ক এসে অন্যান্য দানীয়সামগ্রীর সাথে এক বোতল ‘মিনারেল ওয়াটার’ গোছালেন। অনেকদিন ধরে তাঁর সেবা-যতেœ আছি, কিন্তু কাউকেই বোতলজাত পানি গোছাতে দেখিনি। সেদিনই দেখলাম। তার পর তিনি দুটি গ্লাস আনতে বললেন। তাঁর জন্যে এক গ্লাস ভরতে নির্দেশ দিলেন। ওই গ্লাসের পানি পানের পর আমাকে বললেন, ‘শ্রামণ, তুমিও একগ্লাস বোতলের পানি পান কর।’ তখন আমি মনে করেছিলাম খুব মিষ্টি হবে। পান করে দেখলাম, যেই পানি সেই পানিই, এর অতিরিক্ত কোনো স্বাদ নেই। কিন্তু আমার মন ভরে গেছে। এই প্রথম বোতলজাত পানি পান করলাম। সেদিন যে মাথায় ধাক্কা খেলাম, বকুনি খেলাম, সব ঠা-া হয়ে গেছে। গুরু তো গুরুই। এভাবে কত বকুনি দিবেন, কত স্নেহ করবেন। সব মিলিয়ে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় প্রত্যেকের নিজের মনকে কোমল রাখতে হয়।

১৯৮৯ সনের গ্রীষ্ম ঋতুর অষ্টম উপোসথের দিনে বিকেল বেলায় উপোসথের পর শ্রদ্ধেয় ভন্তে আমার কামরায় আসলেন। বললেন, ‘শাসনালঙ্কার, তুমি কি বর্ষাবাস অধিষ্ঠান করেছ? (শ্রদ্ধেয় ভন্তে আমার নামটা ঠিকভাবে জানতেন না। কারণ, তখন আমি নব উপসম্পদাপ্রাপ্ত ভিক্ষু ছিলাম।)’ ‘না, ভন্তে, এখনও করিনি।’ এরপর শ্রদ্ধেয় ভন্তে আমার পালঙ্কের উপর বসে নির্দেশ দিলেন, ‘কই, তোমার বর্ষাবাসিক স্নানবস্ত্র বের কর। স্নানবস্ত্রে আগে ‘কপ্পবিন্দু’ কর। তার পর বস্ত্র ধরে অধিষ্ঠান কর।’ আমিও ভয়ে এবং শ্রদ্ধায় কাঁপতে কাঁপতে ‘কপ্পবিন্দু ও অধিষ্ঠান’ করলাম। তার পর অপরাপর ব্যবহার্য বস্ত্রাদিও অধিষ্ঠান করতে বললেন। এরপর মনে মনে রাজবন বিহারের সীমানা নিরীক্ষণ করে ‘ইমস্মিং বিহারে ইমং তেমাসং বস্সং উপেমি, ইধ বস্সং উপেমি’ বলে বর্ষাবাস অধিষ্ঠান করতে বললেন। তবে প্রথমে বুদ্ধবন্দনা করবে, এভাবে নির্দেশ দিয়ে তিনি আমার কামরা থেকে বের হয়ে গেলেন। সে সময় আমার মন শ্রদ্ধায় ও ভয়ে ভরপুর ছিল বিধায় তাঁর এ রকম ব্যবহারে পুলকিত হইনি। পরে যখন জানলাম, শ্রদ্ধেয় ভন্তে সহজে কাউকে এভাবে বর্ষাবাস অধিষ্ঠান শিখিয়ে দেন না। আমাকে তো শিখিয়ে দিলেন। এই চিন্তা করে আমার মনে পুলক শিহরণ জাগল।
কিন্তু সে বছর ‘স্থানীয় সরকার পরিষদ’ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ সরকার ও জনসংহতি সমিতির জেদাজেদির কারণে একশত পঁচাত্তর জন কুলপুত্র রাজবন বিহারে প্রব্রজিত হয়েছিল। তাদের রাত্রিযাপনের জন্য জায়গার সংকুলান হচ্ছিল না। তাই বড় বিল্ডিংয়ের নীচতলায় দক্ষিণ কামরায় আমার সাথে অনেক শ্রামণ থাকত। পরে শ্রদ্ধেয় ভন্তে যখন জানতে পারলেন আমার কামরায় অনেক শ্রামণ থাকে; তখন আমাকে ‘তুমি কি জান, একজন ভিক্ষু-শ্রামণের সাথে দুই রাত্রির অধিক রাত্রিযাপন করতে পারে না?’ বলে বিনয় লঙ্ঘনজনিত অনেক বকা দিলেন। সেই সময় থেকে দিনের বেলায় কামরায় থাকি, রাতের বেলায় শ্রদ্ধেয় বশিষ্ট ভন্তের কামরায় গিয়ে থাকি।
সেই বছর বর্ষার শেষে হেমন্ত আসল। একটু একটু শীত পড়তে শুরু করল। একদিন বিকেল বেলায় আমি কামরা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলাম। বাইরের বারান্দায় গিয়ে দেখি, শ্রদ্ধেয় ভন্তে ‘সুদূর’ শ্রামণকে নিয়ে বড় বিল্ডিংয়ের ছাদের উপর তাঁর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় উঠতে যাচ্ছিলেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন, ‘শাসনালংকার, দাঁড়াও।’ সুদূর শ্রামণকে বললেন, ‘শ্রামণ, ওই রোদে দেওয়া উলের কাপড় নিয়ে আস।’ শ্রামণ এনে দেওয়ার পর বললেন, ‘শাসনালংকার, ধরো, এটা তুমি শীতের সময় গায়ে দিও।’ উলের কাপড় নিয়ে শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে বন্দনা করে কামরায় ফিরে গেলাম। সেই কাপড়টি যখন নিচ্ছিলাম, শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় আমার মন প্লাবিত হয়েছিল। সেই দিনের স্মৃতি স্মরণে আসলে, এখনও আমার মন খুশিতে ভরে যায়। আমি যতবার শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে বন্দনা করি, ততবার সেই দিনের স্মৃতি আমি স্মরণ করি। এভাবে গুরুভন্তের প্রতি আমার চিত্ত কোমল রাখি। আমি মনে করি, গুরুভন্তের প্রতি কখনও ক্ষোভ জমা করে রাখা উচিত নয়। কারণ, ক্ষোভ জমা করে রাখলে, তাঁর কাছ থেকে নিজের মন অনেক দূরে সরে যায়। তাঁর আদেশ-উপদেশ মানতে ইচ্ছে হয় না। যা নিজের জীবনকে অধঃপতনে নিয়ে যায়। যদিও আমার অনেক দোষ-ত্রুটির কারণে গুরুভন্তে আমাকে অনেক বকাবকি করেছিলেন; আমার মনেও সে মুহূর্তে তীব্র ক্ষোভ উৎপন্ন হয়েছিল; যা গুরুভন্তে নিজেও বুঝতে পারতেন, আমার সতীর্থ ভাইয়েরাও (অপরাপর ভিক্ষু-শ্রামণগণ) বুঝতে পারতেন। পরে বুঝলাম, শ্রদ্ধেয় ভন্তে যদি আমার দোষ-ত্রুটির কারণে বকাবকি না করতেন, তাহলে আমার জেদ উৎপন্ন হতো না, আমার দোষ-ত্রুটিসমূহ দূর করতাম না। আমার অনেক দোষ-ত্রুটি থেকে যেত। যার কারণে আমি প্রব্রজ্জিত জীবনে অনেক কষ্ট পেতাম। এখন মাঝে মাঝে যদি ওই বকাবকির স্মৃতিগুলো স্মরণে আসে, বকুনির সময় কী রকম ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম, জেদ করে কীভাবে ওই দোষ-ত্রুটি ছাড়লাম, এসব মনে পড়লে আমার মন গুরুভন্তের প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে উঠে। তখন ভগবান বুদ্ধের কথা মনে পড়ে। ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন :

নিধিনং ব পবত্তারং, যং পস্সে বজ্জদস্সিনং,
নিগ্গয্হবাদিং মেধাবিং, তাদিসং পন্ডিতং ভজে;
তাদিসং ভজমানস্স সেয্যো হোতি, ন পাপিয়ো।’

বঙ্গানুবাদ : যিনি গুপ্তধন দেখিয়ে দেন, তাঁকে লোকে যেমন ভজনা করে; যিনি কোন কাজ বর্জনীয় তা বলে দেন, দোষ দেখলে তিরস্কার করেন, সেই জ্ঞানী প-িতকেও সেই রকম শ্রদ্ধা করবে। তাতে মঙ্গলই হবে, অনিষ্ট হবে না।

একসময় ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থানকালে ‘রাধ’কে লক্ষ্য করে এ গাথা বলেছিলেন। ‘রাধ’ নামে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ জেতবন বিহারে বাস করতেন। ভিক্ষুসংঘের প্রয়োজনীয় কাজ-কর্মাদি করে দিতেন। তার বিনিময়ে ভিক্ষুগণ তাঁকে খাদ্য ও কাপড় দিতেন। ভিক্ষুসংঘের খাদ্য ও কাপড় ব্যবহারের প্রাচুর্যতা দেখে নিজেও ভিক্ষু হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। কিন্তু ভিক্ষুগণ তাঁকে প্রব্রজ্যা দিতেন না। একদিন ভগবান বুদ্ধ দিব্যজ্ঞানে দেখতে পেলেন, ওই ‘রাধ’ ব্রাহ্মণের মনে অর্হত্ত্ব লাভের হেতু সঞ্চিত আছে। ব্রাহ্মণের নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, তোমার কি প্রব্রজ্যা নিতে ইচ্ছা হয় না?’ ‘হ্যাঁ, ভগবান। আমি তো প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষা নিতে চাই। কিন্তু ভিক্ষুগণ আমাকে প্রব্রজ্যা দিতে চান না।’ তখন ভগবান বুদ্ধ সকল ভিক্ষুগণকে ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাউকে কোনো উপকার করেছে? কে স্মরণ করতে পারে?’ ‘আমি পারি’ বলে সারিপুত্র ভন্তে জবাব দিলেন। ‘কী পার, বল তো?’ ‘এই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ একবার আমাকে এক চামচ ভাত দান করেছেন।’ ‘বেশ, সারিপুত্র, তুমি তোমার উপকারীকে কোনো উপকার করতে পার না?’ ‘হ্যাঁ ভগবান, পারি।’ ‘তুমি তাঁকে প্রব্রজ্যা দাও।’ এরপর সারিপুত্র ভন্তে ‘রাধ’ ব্রাহ্মণকে প্রব্রজ্যা দিলেন। সারিপুত্র ভন্তে কর্তৃক প্রব্রজিত বিধায় তাড়াতাড়ি উপসম্পদাও লাভ করলেন।

‘রাধ’ ভিক্ষু সারিপুত্র ভন্তের এত অনুগত, বাধ্যগত ছিলেন যে, গুরু যা বলতেন, তা কষ্টকর ও অসহনীয় হলেও পালন করতেন। এভাবে চলতে চলতে একসময় ‘রাধ’ ভিক্ষুর মনে প্রব্রজ্যা ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণা উৎপন্ন হলো। প্রব্রজ্যাধর্ম ত্যাগ করে, গৃহী ধর্মে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা হলো। একদিন ভগবান বুদ্ধ তাঁকে ডেকে বললেন, ‘হে ভিক্ষু, তুমি আগের জন্মে যুদ্ধে জয় লাভ করে, উক্ত রাজ্যে সদ্যজাত শিশুকে দান করেছিলে। এখন কেন হীনবীর্য ও নিরুৎসাহিত হয়েছ?’ অতঃপর ভগবান বুদ্ধ সেই অতীত জন্মের কাহিনি বলতে শুরু করলেন। অতীতকালে বারাণসী রাজ্যে এক সূত্রধর গ্রামে পাঁচশত সূত্রধর বাস করত। তারা নদীর উজানে গিয়ে গৃহ নির্মাণোপযোগী আড়া, তক্তা ইত্যাদি চিড়ত। একদিন জঙ্গলে গিয়ে দেখে একটা মস্ত বড় দাঁতওয়ালা হস্তী মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখে হস্তীর এক পা ফোলা এবং মাংসের মধ্যে কাঠের টুকরো বিদ্ধ হয়ে আছে। তারা মাংস চিড়ে কাঠের টুকরোটি বের করে সুতা দিয়ে ভালো করে বেঁধে দিল। পূঁজ-রক্ত পরিষ্কার করে অবস্থানুযায়ী ওষধ লাগাল। হস্তী আরোগ্য লাভ করে চিন্তা করল, ‘এ সূত্রধরেরা আমার প্রাণ বাঁচাল। অতএব, তাদের উপকার করা উচিত।’ সেই থেকে তাদের নানাভাবে উপকার করতে লাগল। এভাবে কাজ করতে করতে একদিন চিন্তা করল, ‘আমার অনেক বয়স হয়েছে। শরীর দুর্বল হয়েছে। অতএব, আমার ছেলেকে এনে তাদের কাজ-কর্মে লাগিয়ে আমি স্বচ্ছন্দে ঘুরতে পারব।’ তাই কাউকে কিছু না বলে, সেই হস্তী জঙ্গলের ভেতর চলে গেল। তার ছেলেকে নিয়ে আবার ফিরে এল। তার পর ছেলেকে উপদেশ-আদেশ দিল, ‘পুত্র, এই সূত্রধরেরা আমার প্রাণ রক্ষা করেছিল। আমি বুড়ো হয়েছি। তুমি তাদের কাজ-কর্ম একান্ত অনুগত হয়ে করবে।’ সেই হস্তীশাবক হলো আজানেয় শ্বেতহস্তী। হস্তীশাবকও তার বাবার মতো একান্ত অনুগত হয়ে সূত্রধরদের উপকার করতে লাগল। কাজের ফাঁকে জলকেলি করত, সূত্রধর ছেলে-মেয়েদের সাথে খেলা করত।

একদিন অতিবৃষ্টিতে নদী প্লাবিত হয়ে হস্তীশাবকের শুকনো মল প্লাবনের পানিতে ভেসে গেল। বারাণসী রাজার রাজঘাটে লতাগুল্মে আটকে রইল। রাজার হস্তী মাহুতেরা যখন হাতিগুলো নদীতে স্নানের জন্যে নিয়ে গেল, তখন হাতিগুলো নদীতে নামতে নামতে দৌঁড়াতে শুরু করল। তারা গজাচার্য্যরে কাছে গিয়ে বলল, ‘নদীর পানিতে দোষ ঘটেছে।’ সেচন করে তারা সেই আজানেয় শ্বেতহস্তীর শক্ত মল পেল। গজাচার্য রাজাকে বলল, ‘মহারাজ, নদীর উজানে মহৈশ্বর্যসম্পন্ন আজানেয় শ্বেতহস্তী আছে। আপনি তা গ্রহণ করুন।’ রাজাও তার কথায় সাঁয় দিয়ে হস্তী আনতে গেলেন। সূত্রধরেরা রাজাকে দেখে বলল, ‘মহারাজ, আপনার যদি কাঠের প্রয়োজন হয়, আপনি রাজধানীতে বসে আমাদের হুকুম দিতে পারতেন; অনর্থক কষ্ট করে কেন এসেছেন।’ ‘না, আমি কাঠের জন্যে আসিনি। তোদের এই শ্বেতহস্তীর জন্যে এসেছি।’ ‘ঠিক আছে, মহারাজ, আপনি আমাদের প্রভূ; আপনি নিয়ে যান।’ কিন্তু শ্বেতহস্তী রাজার সাথে যেতে চায় না। তখন হস্তীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে বলল, ‘এই সূত্রধরেরা আমাকে অনেক কষ্টে লালন-পালন করেছে। তাদের সেই মূল্য দিতে হবে।’ রাজার আদেশে হস্তীর চার পায়ে চার লক্ষ টাকার চারটি পুটলি, শুঁড়ে-লেজে ও দু-কানে চার লক্ষ টাকার চারটি পুটলি বেঁধে দেয়া হলো। তবুও নড়ে না। তার পর সূত্রধর ও তাদের স্ত্রী-পুত্র কন্যাদের সবাইকে কাপড়-চোপড় দিলে, হস্তী চলতে শুরু করল। রাজা এই মহৈশ্বর্যসম্পন্ন আজানেয় শ্বেতহস্তীকে পাওয়ার পর সমস্ত জম্বুদ্বীপে আধিপত্য লাভ করলেন। কিন্তু হায়! কর্মের কী নির্মম পরিহাস! রাজমহিষী সন্তান সম্ভবা অবস্থায় রাজা অসুস্থতাবশত মারা গেলেন। তখন পার্শ্ববর্তী কোশলরাজা চিন্তা করলেন, ‘এবারই সুযোগ বারাণসী রাজ্য অধিকার করার।’ কোশলরাজা বহু সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বারাণসী নগর অবরোধ করল। নগরবাসীরা কোশলরাজাকে খবর পাঠাল, ‘আমাদের রাজমহিষী এক সপ্তাহ পর সন্তান প্রসব করবেন। যদি পুত্র সন্তান হয়, আপনার সাথে যুদ্ধ করব। কন্যা সন্তান হলে, আপনাকে বিনাযুদ্ধে রাজ্য দিব।’ কোশলরাজাও এ প্রস্তাবে রাজি হলেন। এক সপ্তাহ পর পুত্রসন্তান হলো। সবাই অত্যুৎসাহে যুদ্ধে গেল। কিন্তু যুদ্ধে অধিনায়কের অভাবে তারা পরাজিত হতে লাগল। তখন অমাত্যরা রাজমহিষীর কাছে গিয়ে বলল, ‘রাণী মা, সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে মহারাজার সুহৃদ আজানেয় শ্বেতহস্তীকে মহারাজার মৃত্যু ও বর্তমান যুদ্ধাবস্থা সম্পর্কে জানানো উচিত।’ রানীও সম্মত হলেন। ছেলেকে মহামূল্যবান কাপড়ে মুড়িয়ে হস্তীর পদতলে রেখে বললেন, ‘প্রভু, আপনার সুহৃদ মহারাজা অসুস্থতার কারণে মারা গেছেন। এই সুযোগে পার্শ্ববর্তী কোশলরাজা আপনার সুহৃদের রাজ্য আক্রমণ করেছে। হয় শত্রুকে পরাজিত করে, আপনার সুহৃদের পুত্রকে রাজ্য দান করুন; না হয় পুত্রকে মেরে ফেলুন।’ রাজার মৃত্যুর সংবাদ শুনে শ্বেতহস্তী কিছুক্ষণ শোক সন্তপ্ত হলো। তার পর রাজপুত্রকে শুঁড় দিয়ে চাপড়িয়ে আদর-সোহাগ করে, যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হলো। অমাত্যরাও হস্তীকে বর্ম পড়িয়ে যুদ্ধার্থ সাজে সজ্জিত করল।

সেই আজানেয় হস্তী বৃংহতি করতে করতে শুঁড়-লেজ ও কান উঁচিয়ে বের হলো। অপরাপর সৈন্য-সামন্তগণ তার পিছনে পিছনে ছুটতে শুরু করল। আজানেয় হস্তীর বৃংহতি শুনে কোশলরাজার যুদ্ধার্থ হস্তীগুলো পালাতে শুরু করল। অন্যান্য যুদ্ধার্থীগণও পালাতে লাগল। পলায়নরত কোশলরাজাকে ধরে এনে, সদ্যজাত সুহৃদ পুত্রের পায়ের নিচের দিকে বসিয়ে রাখলেন। তখন বারাণসী রাজার সৈন্যগণ কোশলরাজাকে প্রাণসংহার করতে উদ্ধত হলো। কিন্তু আজানেয় হস্তী তাদের বারণ করে মারতে দিল না। কোশল রাজাকে উপদেশ দিয়ে ছেড়ে দিলেন, ‘মহারাজ, এখন থেকে সতর্ক হয়ে চলবেন। বারাণসী রাজকুমারকে শিশু বলে মনে করবেন না যে, এ রাজ্য আপনি অধিকার করতে পারবেন।’ পরবর্তীতে বারাণসীর রাজকুমার সমস্ত জম্বুদ্বীপের আধিপত্য লাভ করলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে শত্রুতাচরণ করতে পারে এমন কেউ রইল না। অতঃপর ভগবান বুদ্ধ ‘রাধ’ ভিক্ষুকে বললেন, ‘তখন তুমি ছিলে সেই হস্তীশাবক, আর সারিপুত্র ছিল সেই হস্তীজনক, আমি ছিলাম সেই রাজকুমার, বর্তমান মহামায়া ও শুদ্ধোধন রাজা ছিলেন সেই স্বর্গীয় মহারাজা ও রাজমহিষী। দেখ ভিক্ষু, তখন তো তুমি একাই কোশলরাজাকে পরাজিত করে, বারাণসী রাজকুমারকে রাজ্য দান করেছিলে। তবে কেন এখন হীনবীর্য হয়েছ? বিচক্ষণ দৃঢ়বীর্য ভিক্ষুগণ সৌভাগ্যক্রমে ত্রিশরণ লাভ করে নির্বাণ লাভের জন্যে সর্বদা ধ্যানানুশীলন করেন। কুশল চিন্তা করতে করতে কোনো একসময় সংসার বন্ধন ছিন্ন করেন।’ এভাবে বলার পর ভগবান চারি আর্যসত্য ব্যাখ্যা করলেন। সাথে সাথে উৎকন্ঠিত হীনবীর্য ‘রাধ’ ভিক্ষু অর্হত্ত্বমার্গফলে অধিষ্ঠিত হলেন।

ভগবান বুদ্ধ ও সারিপুত্র ভন্তের ন্যায় শ্রদ্ধেয় বনভন্তেও আমাকে বহুবার কঠোর হাতে শাসন করেছিলেন এবং বকাঝকা দিয়েছিলেন। তার পাশাপাশি প্রীতিসুলভ কথা বলে ও প্রয়োজনীয় ব্যবহার্যসামগ্রী দিয়ে আমাকে অনেক স্নেহ করেছিলেন। শ্রদ্ধেয় ভন্তে যখন আমাকে বকাঝকা করতেন, তখন তো আমি বুঝতাম না। শ্রদ্ধেয় ভন্তের উপর অনেক ক্ষোভ করে থাকতাম। তাতে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। অনেক পাপও সঞ্চয় করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে অবশ্যই বুঝেছিলাম, শ্রদ্ধেয় ভন্তে যদি আমাকে কড়াকড়িভাবে শাসন না করতেন, তাহলে আমি সেই দোষগুলো শোধরাতে পারতাম না। তখন থেকে আমার মনটা শ্রদ্ধেয় বনভন্তের প্রতি শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় ভরপুর করে রাখতাম। সব সময় শ্রদ্ধেয় ভন্তে আমাকে যেভাবে সোহাগ করতেন, তা স্মরণ করে আমার মনটা খুশিতে প্লাবিত করতাম। যা এখনও আমি চর্চা করে যাচ্ছি। তাই আমি সব সময় একটা কথা বলি, ‘মাতা-পিতা, শিক্ষক ও ধর্মগুরুর প্রতি কখনও মনে ক্ষোভ জমিয়ে রাখবেন না; যা দ্বারা নিজেরই ক্ষতি হয়। মাতা-পিতা, শিক্ষক ও ধর্মগুরুর প্রতি নিজের মনকে প্রসন্ন রাখতে পারলে নিজের সুখ হয়, উন্নতি-শ্রীবৃদ্ধি হয়। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে আমাকে শাসন করেছিলেন কঠোর হাতে, আর সোহাগ করেছিলেন মুক্তহস্তে। তাই শাসন করে যে, সোহাগ করে সে। বাস্তবে তিনিই হচ্ছেন ‘বনভন্তে’। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু। 

লেখক : শ্রীমৎ শাসন রক্ষিত মহাস্থবির, অধ্যক্ষ, শান্তিপুর অরণ্য কুটির, পানছড়ি, খাগড়াছড়ি।

Print Friendly, PDF & Email