log1

তোমরা ভগবান বুদ্ধকে গুরু মানো

DHA_2002বনভন্তে-

           এক সময় শ্রদ্ধেয় বনভন্তে নিজ আবাসিক ভবনে ভিক্ষুসঙ্ঘকে ধর্মদেশনা প্রদান প্রসঙ্গে বলেন- ভগবান বুদ্ধ বলেছেন সঙ্ঘের একতা সুখদায়ক। বর্তমানে সঙ্ঘের একতা বা ঐক্য কোথায়? সর্বক্ষেত্রেই অনৈক্যের চিত্র সুপ্রকট। এসব কেন হচ্ছে জান? বর্তমান ভিক্ষুসঙ্ঘ সুখ ভোগে নিয়োজিত রয়েছে বলে; সুখ ভোগ পরিত্যাগ করতে পারছে না বলে একতা থাকতে সমর্থ হচ্ছে না। সুখ ভোগ পরিত্যাগ করতে না পারলে, ভোগাসক্ত চিত্তে অবস্থান করলে এবং ইন্দ্রিয় সমূহকে সুখ ভোগের বিষয়ে আকৃষ্ট রাখলে কিছুতেই একতা থাকা সম্ভব হয় না। সুখ ভোগে রত থাকলে চিত্তের মধ্যে মার দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয় ফলে চিত্ত দুঃখগ্রস্ত হবে। এবং নানা মত, নানা পথে বিচরণ করতঃ সুখ ভোগ প্রত্যাশী হবে। তখন কে কোন পথে, কে কোন মতে কাঙ্খিত সুখ ভোগপূরণ করতে চেষ্ঠিত হয় তার ইয়ত্ত্বা থাকে না। ফলশ্রুতিতে আর একতা থাকা সম্ভবপর হয় উঠে না। সামনে উপবিষ্ট ভিক্ষুদিগকে দেখায়ে দিয়ে বনভন্তে বলেন, তোমরাও যদি সুখভোগে রত থাক তাহলে তোমরা মার। আর সেই অবস্থায় কিছুতেই একতা থাকতে পারবে না। ‘তুমি একটা কাজ করবে বা একটা বিষয়ে মনোযোগী হবে’, ‘সে অন্য আরো একটা বিষয়ে মনোযোগী হবে’। আচ্ছা, তখন কি আর একতা থাকা সম্ভব হবে? হবে না। অন্যদিকে তোমরা প্রত্যেকে যদি সুখ ভোগ ত্যাগ কর তাহলে একতা থাকতে পারবে। মনে রাখবে, সুখ ভোগ ত্যাগ করলে নির্বাণ সুখ উপলব্ধি হয়। এবং সেই সুখে একতা থাকা যায়। কিভাবে সুখ ত্যাগ করবে? স্বল্প সুখ পরিত্যাগ হেতু যদি বিপুল সুখের সম্ভাবনা দেখা যায় তবে অবশ্যই জ্ঞানী ব্যক্তি স্বল্প সুখ পরিত্যাগ করবে। বিপুল সুখ হল নির্বাণ,  আর সংসারে বিবিধ তৃষ্ণা (লালসা) জনিত লৌকিক সুখ হল স্বল্প সুখ। লৌকিক সুখের মধ্যে শতকরা নিরানব্বই ভাগ দুঃখ থাকে, বাকী একভাগ মাত্র সুখ। বিপুল সুখ নির্বাণে একশত ভাগই সুখ। অথচ অজ্ঞানীরা নিজেদের অজ্ঞতার কারণে লৌকিক সুখে সন্তুষ্ঠ থাকে। তারা ভূলে যায় সেই লৌকিক সুখ ত্যাগ করতে সমর্থ হলে বিপুল সুখ নির্বাণ উপলব্ধি হওয়ার কথা। জ্ঞানী ব্যক্তিরা বিপুল সুখ নির্বাণ প্রত্যক্ষের আশায় সংসারে লালসা জনিত স্বল্প সুখ প্রত্যাখ্যান করেন। অর্থাৎ নির্বাণ সুখ লাভের জন্য তিনি নিজকে কোন প্রকার তৃষ্ণায় জড়িত করেন না; সর্বদা নির্বাণ প্রত্যাশী হয়ে অবস্থান করেন। এবম্বিধ ত্যাগের ফলে তিনি বিপুল সুখ নির্বাণ লাভে সমর্থ হন। কিভাবে ভোগ ত্যাগ করবে? ভোগ ত্যাগ করা সহজ কথা নয়। মহারাজ বিম্বিসার বুদ্ধকে প্রশ্ন করেছিলেন- ভন্তে, আপনি কিভাবে ভোগ ত্যাগ করেছেন? বুদ্ধ বলেছিলেন- আমি দুইটি কারণে ভোগ ত্যাগ করেছি। ভোগী মানুষ গরীব ও কৃপণ হয়। তোমরাও ভোগের সেই দোষগুলো দর্শন করে ভোগ ত্যাগ করবে। ভোগ করলে দুঃখ অনিবার্য একথা সর্বদা স্মরণ রাখবে। কি, স্মরণ থাকবে তো? হ্যাঁ, ভন্তে থাকবে। আমার সাথে বলো “আমরা ভোগ ত্যাগ করব; কখনো ভোগী হয়ে অবস্থান করব না। এতে আমরা পরম সুখে অবস্থান করতে সমর্থ হবো।”

               ভগবান বুদ্ধ অনন্ত জ্ঞানের অধিকারী। বুদ্ধের অসীম জ্ঞানবল। তাই তিনি জোর করে অপরকে মাররাজ্য থেকে নির্বাণরাজ্যে চালিত করতে পারেন। কোন শক্তিমান পুরুষ যেমন ছোট ছেলেকে গলায় ধরে যথা ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারেন বুদ্ধও সেভাবে অপরকে নির্বাণরাজ্যে নিয়ে যেতেন। এখানে অপরকে জোর করার অর্থ হল, তাদের অবাধ্য চিত্তকে বাধ্য এবং নির্বাণগামী হবার অনিচ্ছা ভাবকে জোর করা। আমার পক্ষে তো সেরূপ করা সম্ভব নয়। তাই বলছি, বর্তমানে তোমাদেরকেই স্বীয় অবাধ্য চিত্তকে বাধ্য এবং নির্বাণগামী হবার অনিচ্ছা ভাবকে দূর করতে হবে। মার তোমাদের চিত্তে প্রবিষ্ট হয়ে তোমাদেরকে নির্বাণ যেতে বারণ করে, নির্বাণ সুখ উপলব্ধি করতে দেয় না। চিত্তকে বলে, তুমি নির্বাণরাজ্যে যেও না; নির্বাণ উপলব্ধি করো না। আমার রাজ্যে থাক। আমাররাজ্যে কতো সুখেই না অবস্থান করতেছ। কেন নির্বাণরাজ্যে যাবে? নির্বাণরাজ্যে গেলে শুধু শুধু দুঃখই পাবে সার। তাই তোমাদের পক্ষে নির্বাণ পথে চালিত হওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। এই অবস্থায় তোমাদেরকে কি করতে হবে জান? চিত্তকে বাধ্য করতে হবে। কিভাবে করবে? ‘হে চিত্ত! তুমি মাররাজ্যে থেকো না, নির্বাণরাজ্যে চলে যাও। নির্বাণরাজ্যে গিয়ে নির্বাণ সুখেই অবস্থান করো।’ এই বলে চিত্তকে সংযত, নিজের বশীভূত করে মাররাজ্য হতে বাহির করে নির্বাণরাজ্যে নিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে চিত্ত যদি মারাজ্যে অবস্থান করতঃ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে তাহলে অতিশয় দুঃখ পায়। দুঃখে অস্থির হয়ে উঠে। চিত্ত তখন মাররাজ্য ছাড়বার জন্য ছট্ফট্ করেÑ জল থেকে ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতন। তাই ধর্মপদে বলা হয়েছে-

তেমনি সেই মাররাজ্য ছাড়িবার তরে
এই চিত্ত নিরন্তর ছট্ফট্ করে।

চিত্ত দুঃখ পেলে মাররাজ্য ছাড়বার বা অতিক্রম করবার জন্য ব্যাকুল হয়। জলের মাছকে ডাঙ্গায় তুললে মাছ যেমন পুনরায় জলে প্রবেশের জন্য ছট্ফট্ করে তেমনি মাররাজ্যের বন্ধন (দুঃখাবস্থা) থেকে মুক্তির জন্য মানুষের চিত্তও ব্যাকুল হয়ে উঠে, অস্থির হয়। সেই অস্থির চিত্ত কিভাবে শান্ত, সুস্থির ও সুখী হবে? যদি চিত্ত মাররাজ্য অতিক্রম করে নির্বাণরাজ্যে উপনীত হওতঃ নির্বাণ সুখে øাত হতে সক্ষম হয়। তাই জ্ঞানী ব্যক্তিরা মারাজ্যে স্পৃহাশূন্য হয়ে বিচরণ করেন। তারা মররাজ্যের কামনা-বাসনায় আবদ্ধ হন না। তোমরা স্বীয় চিত্তকে মাররাজ্যের বাইরে নিয়ে গিয়ে নির্বাণ উপলব্ধির দিকে চালিত কর।

            পূজ্য ভন্তে বলেন- তোমরা ভগবান বুদ্ধকে গুরু মানো, বুদ্ধের শিক্ষা গ্রহণ কর। তাহলে পরম সুখী হতে পারবে। কলেজ, ভার্সিটির প্রফেসার, প্রিন্সিপালকে গুরু মানবে না। তবে বর্তমান মানুষ বিশ্বাস করে প্রফেসার, প্রিন্সিপালরা প্রকৃত গুরু। এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রীধারী হলেই তারা শিক্ষিত হয়, জ্ঞানী হয়, মান-সম্মান বৃদ্ধি পায়, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে সমর্থ হয়। তাই তারা কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়। বুদ্ধের শিক্ষাকে অবহেলা করে, স্বীকার করতে চায় না। মানুষের এধারণা মস্তবড় ভূল। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তারা বড় বড় ডিগ্রীর অধিকারী হয় অথচ জ্ঞানের অধিকারী হয় না। মানুষ অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত বলে প্রকৃত গুরু ও প্রকৃত জ্ঞানকে জানতে পারছে না। বাংলাদেশের যত শিক্ষিত প্রফেসার, প্রিন্সিপাল অনেকেই আমার কাছে এসেছেন, আমি তাদেরকে বলেছি আপনাদের শিক্ষা সাধারণ শিক্ষা এবং আপনাদের জ্ঞানও সাধারণ। তারা আমার কাছে সকলেই স্বীকার করেছে, হ্যাঁ ভন্তে আমরা সাধারণ। আমাদের জ্ঞানও সাধারণ। আমাদের কর্তৃক যেই শিক্ষা দেওয়া হয় তাও সাধারণ শিক্ষা। কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষাকে আমি কখনো প্রকৃত শিক্ষা বলি না। সে গুলো সাধারণ শিক্ষা মাত্র। প্রকৃত শিক্ষা কি জান? যে শিক্ষা জীবন দুঃখের চির অবসান ঘটায় তাই প্রকৃত শিক্ষা। এই শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারলে হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, দ্বন্দ-সংঘাত, অশান্তি কিছুই থাকতে পারে না। প্রকৃত গুরু কে? যিনি নিজে জীবন দুঃখের অবসান ঘটায়ে অপরকেও সেই শিক্ষা প্রদান করতে সমর্থ তাকে প্রকৃত গুরু বলা হয়। প্রফেসার, প্রিন্সিপালেরা কি সেরূপ শিক্ষা দিতে সমর্থ হন? কখনো হন না। এই জন্যেই আমি বার বার বলছি, তোমরা কলেজ ভার্সিটির শিক্ষাকে প্রাধান্য দেবে না এবং প্রফেসার, প্রিন্সিপালকে গুরু মানবে না। বর্তমান অনেক ভিক্ষুই কলেজ ভার্সিটির শিক্ষাকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং প্রফেসার, প্রিন্সিপালগণকে গুরু মানছে। ইহা কি লজ্জার বিষয় নয়? তারা নিজেকে বুদ্ধের পুত্র বলে দাবী করে অথচ বুদ্ধের অসাধারণ শিক্ষাকে অবহেলা করে কলেজ, ভার্সিটিতে গিয়ে প্রফেসার প্রিন্সিপালের নিকট অতি সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করছে। এসব কেন হচ্ছে? ভিক্ষুদের অজ্ঞানতার কারণে। তাদের যদি জ্ঞান (সম্যক জ্ঞান) থাকতো এসব হতো না। মনে রাখবে বুদ্ধই আমাদের প্রকৃত গুরু, বুদ্ধের শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। বুদ্ধের শিক্ষায় শিক্ষিত হলে জীবন দুঃখের অবসান ঘটে। এবং একমাত্র বুদ্ধ গুরুই দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভের দিক নির্দেশনা প্রদান করতে সক্ষম। বুদ্ধের শিক্ষা ভিন্ন অন্য শিক্ষায় জীবন দুঃখের চির অবসান হয় না, দুঃখমুক্তি নির্বাণ সাক্ষাৎ করা যায় না। আমার সাথে বলো “আমরা একমাত্র বুদ্ধকেই প্রকৃত গুরু বলে মানবো। বুদ্ধের শিক্ষাকেই প্রকৃত শিক্ষা মেনে তা’ আয়ত্ত্ব করতে তৎপর থাকব। বুদ্ধ ব্যতীত কাউকে গুরু বলে মানব না; বুদ্ধের শিক্ষা ব্যতীত অন্য কোন শিক্ষা গ্রহণ করব না।” ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করে পূজ্য বনভন্তে বলেন, কাকে প্রকৃত গুরু মানবে? কার শিক্ষাকে প্রকৃত শিক্ষারূপে গ্রহণ করবে? ভিক্ষুসঙ্ঘ- একমাত্র ভগবান বুদ্ধকেই গুরুরূপে মানবো এবং বুদ্ধের শিক্ষাকেই প্রকৃত শিক্ষা, সত্যিকার শিক্ষা বলে গ্রহণ করবো। বনভন্তে- হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এভাবেই তোমরা প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতঃ নির্বাণ উপলব্ধির সাধনা কর।

               যারা জ্ঞানী তারাই বৌদ্ধধর্ম বুঝতে সমর্থ হন। অজ্ঞানীদের পক্ষে বৌদ্ধধর্ম বুঝা সম্ভব নয়। বৌদ্ধধর্ম বুঝতে হলে তোমাদেরকেও জ্ঞানী হতে হবে; অজ্ঞানী হলে বৌদ্ধধর্ম বুঝতে পারবে না। তোমরা যদি অজ্ঞানী হও তাহলে আমার এ’ধর্মদেশনা তোমাদের কোন কাজে আসবে না অর্থাৎ তোমরা বুঝতে পারবে না। বুদ্ধ বলেছেন, মূর্খ ব্যক্তি আজীবন প-িতের সনে বাস করলেও ধর্ম কি তা বুঝতে পারে না। মূর্খ ব্যক্তিরা চামচের সদৃশ। চামচ যেমন চিরকাল সূপরসের মধ্যে ডুবে থাকলেও সূপরস আস্বাদন করতে পারে না, ঠিক তেমনি মূর্খ ব্যক্তিরা আজীবন প-িতের সনে বাস করলেও ধর্ম (বৌদ্ধধর্ম) কি তা’ বুঝতে সমর্থ হয় না। জ্ঞানী ব্যক্তিরা জিহ্বার সদৃশ। জিহ্বা যেমন মুহুর্তেই (মুখে পড়া মাত্রেই) সূপরসের আস্বাদন অবগত হতে সমর্থ হয়, ঠিক তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তি অল্পকাল প-িতের সঙ্গে থাকলেই ধর্ম কি তা’ উপলব্ধি করতে পারেন। তাই বলি, বৌদ্ধধর্ম বুঝতে হলে তোমাদেরকে জ্ঞানী হতে হবে। বৌদ্ধধর্ম বুঝার অর্থ হল জগতের সব কিছুতেই অসারত্ব দেখা, দুঃখ বলে জানা এবং অনাসক্তভাবে অবস্থান করা।  চিত্তকে ত্যাগধর্মে অধিষ্ঠিত করতঃ সর্বদা অনাসক্তভাবে অবস্থান করতে সমর্থ হলে নির্বাণ অধিগত হয়। আমার উপদেশ হল, তোমরা সকলে মনুষ্যধর্ম ত্যাগ করে নির্বাণধর্ম শিক্ষা কর; নির্বাণধর্ম সুদৃঢ়ভাবে গ্রহণ কর। নির্বাণ সুখ, শান্তি অধিগত কর। এই নির্বাণ সুখ এবং শান্তিই সকলের কাম্য হওয়া উচিত। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন- তোমরা কি ধর্ম ত্যাগ করে কি ধর্ম গ্রহণ করবে? ভিক্ষুসঙ্ঘ- ভন্তে, মনুষ্যধর্ম ত্যাগ করে নির্বাণধর্ম গ্রহণ করব। মনুষ্যধর্ম হল লৌকিক ধর্ম, নির্বাণ ধর্ম হল লোকোত্তর ধর্ম। লোকোত্তর ধর্মই একমাত্র সুখ, শান্তি, মুক্ত, স্বাধীন, নির্ভয় ও নিরাপত্তা বয়ে আনে। তোমরা যদি লৌকিক ধর্ম ত্যাগ করে লোকোত্তর ধর্ম গ্রহণ কর তাহলে সুখ, মুক্ত, স্বাধীন, নিরাপত্তা ও নির্ভয় অবস্থায় অধিষ্ঠিত হতে পারবে। মনে রাখবে লৌকিক ধর্মে সুখ নেই, শান্তি নেই, মুক্তি নেই, নিরাপত্তা নেই। লৌকিক ধর্ম সর্বদা পরাধীন ও ভয়পূর্ণ অবস্থা। আমার সাথে সাথে বলো “আমরা লৌকিক ধর্ম ত্যাগ করে লোকোত্তর ধর্ম গ্রহণ করব। এতে আমাদের সুখ, শান্তি, মুক্তি, নিরাপত্তা ও স্বাধীন লাভ হবে।

          তিনি আরো বলেন- তোমরা বর্তমান গৌতম বুদ্ধের শাসনকালেই নির্বাণ লাভের চেষ্টা কর। এখনো দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করার সময় রয়েছে; তৃষ্ণা ক্ষয় করার, চারি আর্য সত্য বুঝবার সময় রয়েছে। দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করার, তৃষ্ণা ক্ষয় করার, চারি আর্য সত্য বুঝবার সময় পেরিয়ে যায়নি। কাজেই ‘আর্যমিত্র বুদ্ধকে সাক্ষাৎ করে তবেই নির্বাণ লাভ করব’ এই চিন্তা করে সময় ক্ষেপণের কোন প্রয়োজন নেই। আর্যমিত্র বুদ্ধের সাক্ষাৎ প্রত্যাশী হয়ে থাকতে থাকতে তোমাদেরকে ভবচক্রে কতোই যে দুর্বিসহ দুঃখ ভোগ করতে হবে তা বর্ণনাতীত। কখনো মনুষ্যকুলে, কখনো পশু পক্ষীকুলে, কখনো প্রেতকুলে, কখনো অসুরকুলে জন্মধারণ করে দুঃখ ভোগ করতে হবে। উপরন্তু আর্যমিত্র বুদ্ধের আবির্ভাব কাল এখনো বহু বহু দূরে। এই সময়ের মধ্যে ঘোরতর পাপকর্ম সম্পাদন করার ফলে অনন্তকালের জন্য মহানিরয়ে পতিত হলে কি আর আর্যমিত্র বুদ্ধের সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব হবে? কিছুতেই হবে না। সুতরাং বর্তমান গৌতম বুদ্ধের শাসনকালে নির্বাণ লাভের জন্য জীবন-মরণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে অবস্থান কর। কাল ক্ষেপণ করবে না। হেলায় সময় নষ্ট করা উচিত হবে না। আমিও গৌতম বুদ্ধের শাসনকালে নির্বাণ অধিগত করার জন্য সংকল্প নিয়ে প্রব্রজিত হয়েছিলাম। আমার আরণ্যিক জীবনে অনেকেই আমাকে বলেছিল, নির্বাণ লাভের জন্য এতো তাড়াহুড়ো করছ কেন? আর্যমিত্র বুদ্ধের সহিত সাক্ষাৎ করে তাঁর মুখে ধর্মদেশনা শ্রবণ করতঃ নির্বাণ লাভ করলে হয় না? আমি তাদের কথায় কর্ণপাত করিনি, একচুলও লক্ষ্য চ্যূত হইনি। বর্তমানে নির্বাণ লাভ করার প্রচেষ্টা না করে আর্যমিত্র বুদ্ধকে বিশেষ আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করার যৌক্তিকতা আছে বলে আমার মনে হয় না। তাই আবারো বলছি, তোমারা বর্তমান গৌতম বুদ্ধের শাসনকালেই নির্বাণ লাভের জন্য তৎপর থাক। কোন প্রকার কালক্ষেপণ করবে না। এখনো দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভের সময় রয়েছে এসব কথা বইয়ে লেখা ছিল বলে আমি প্রব্রজিত হয়েছিলাম। নির্বাণ অধিগত করার জন্য অদম্য প্রচেষ্টা করেছিলাম। যদি বইয়ে লেখা থাকত ‘এখন নির্বাণ লাভ করার, তৃষ্ণা ক্ষয় করার সময় নেই’; তাহলে আমি প্রব্রজিত হতাম না। ‘অনাগতে আর্যমিত্র বুদ্ধের সময়, তাঁর সাক্ষাতে আমরা নির্বাণলাভী হবো’ একথাটির মধ্যে মার থাকে। তজ্জন্য আমি আর্যমিত্র বুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করার কথা বলি না। যদিও বা আর্যমিত্র বুদ্ধের সময়কালিন কথা আমি স্বঅভিজ্ঞায় জানতে পারি, দেখতে পাই। তখন জনসাধারণ সবাই হবে বৌদ্ধ। অধার্মিক, পাপী; চোর, ডাকাত এবং দীন-হীন, বিকলাঙ্গ ব্যক্তি থাকবে না। সবাই শীলবান, প্রজ্ঞাবান, ধার্মিক, কৃতজ্ঞ, অকৃপণ, পাপে লজ্জা-ভয়শীল এবং ধনশালী, উৎকৃষ্ট খাদ্য-ভোজ্য, অন্ন-পানীয় ও মনোজ্ঞ পোষাক-পরিচ্ছদ লাভী হবে। সুন্দর, সৌষ্ঠব্যময় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয় সমূহ সুপ্রসন্ন, রূপ-লাবণ্যময় দেহধারী হবে। বাণিজ্য ও কৃষি কাজে নিয়োজিত না হয়েও সুস্বাদু ভাত খেয়ে কোন রোগ-ব্যাধি ছাড়া স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করবে। পরিপূর্ণ বয়স অতিক্রান্ত না হয়ে কেহ অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করবে না। সকলের বয়স আশি হাজার বৎসর হবে। পাঁচ হাজার বৎসরে যৌবনে পদার্পণ করে বিবাহ যোগ্য হবে। অতঃপর পঁচাত্তর হাজার বৎসর পর্যন্ত গৃহীধর্ম পালন করে মৃত্যুবরণ করবে। বর্তমান অনেকেই আমাকে বলে থাকে ‘ভন্তে, সেই সুদীর্ঘ আয়ুষ্কাল ব্যাপি বেঁচে থাকাটা ভালো লাগবে না, খুব বেশী বলে মনে হবে’। তা’ কি ঠিক? (বনভন্তে এ প্রশ্ন বহু বার করতে থাকেন)। ভিক্ষুসঙ্ঘ- সে সময় কালে সেই আয়ুষ্কাল অস্বাভাবিক লাগার তো কোন কারণ নেই। তখন সময়োপযোগী বৃষ্টিপাত হবে, বাতাস অতি উষ্ণ হবে না, অতি শীতল হবে না। নদ-নদী ও পুষ্করিণীতে জল পূর্ণ থাকবে। সমস্ত দেশ সর্ব ঋতুতে ফল ও পুষ্পে সুশোভিত হবে। নগরে, গ্রামে সহাবস্থানে জনসাধারণ নিরাপদ, শান্ত এবং নিঃশঙ্কায় বসবাস করতে পারবে। চক্রবর্তী রাজা শঙ্খের সুশাসনে প্রজাগণ সুখে, শান্তিতে, নিরাপদে ও নিরুপদ্রবে জীবন যাপন করবে। রাজা বিনা অস্ত্রে, বিনা যুদ্ধে ধর্মানুসারে সসাগরা জম্বুদীপ জয় করবেন। পরবর্তীতে শঙ্খরাজাও প্রব্রজিত হয়ে অরহত্ব লাভ করবেন। বর্তমান এই সময় অপেক্ষা অধিকতর বহু সুখে  শান্তিতে ধর্মাচরণ করতঃ তারা সহজে দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করতে পারবে, তৃষ্ণাক্ষয় করতে পারবে। কিন্তু সেই দিনগুলো আসতে অনেক অনেক সময় বাকী রয়েছে। বর্তমান গৌতম বুদ্ধের শাসনকালে নির্বাণ লাভ করতে পারলে কেনই বা অনাগতের দিকে চেয়ে থাকবে? সুতরাং গৌতম বুদ্ধের শাসকালে নির্বাণ লাভের জন্য মরণ-পণ চেষ্টা কর।

           পরিশেষে তিনি বলেন- তোমরা অবিদ্যাচ্ছন্ন চিত্তে অবস্থান করবে না। চিত্ত থেকে অবিদ্যা বের করে দাও। অর্থাৎ অবিদ্যামুক্ত চিত্তে অবস্থান কর। চিত্তের মধ্যে অবিদ্যা থাকলে দুঃখ পেতে হয়; সুখ লাভ করা যায় না। তোমাদের সবাইকে বলছি, তোমরা অবিদ্যাযুক্ত চিত্তে অবস্থান করবে না। অবিদ্যার সহিত অবস্থান করাকে দুঃখ বলে জানবে। চিত্তে বিদ্যা উৎপত্তি কর। যদি বিদ্যা উৎপত্তি করতে পার তাহলে পরম সুখের সহিত অবস্থান করবে। যেই ভিক্ষুতে বিদ্যা উৎপত্তি হয়েছে সেই ভিক্ষু কুশল সংস্কারও করে না, অকুশল সংস্কারও করে না এবং আনেঞ্জা সংস্কারও করে না। সেই ভিক্ষু সুখী, স্বাধীন ও মুক্ত এবং ইহলোকে নির্বাণ প্রত্যক্ষকারী হয়। তোমরা প্রত্যেকে সেইরূপ ভিক্ষু হয়ে যাও। যাতে চির সুখী, মুক্ত ও স্বাধীন হওতঃ নির্বাণ অধিগত করতে সমর্থ হও।

সাধু সাধু সাধু।

আর্যশ্রাবক বনভন্তের ধর্মদেশনা

সিরিজ-৪

সংকলনে- শ্রীমৎ ইন্দ্রগুপ্ত ভিক্ষু

Print Friendly, PDF & Email