log1

যুগপুরুষ : সাধনানন্দ মহাস্থবির

যুগপুরুষ : সাধনানন্দ মহাস্থবির

শ্রী ননী গোপাল দাস-

DIGITAL CAMERA    প্রারব্ধের কর্মফল জ্ঞানী-অজ্ঞানী উভয়কেই ভোগ করতে হয়। এই প্রারব্ধের কর্মফল থেকে কেউ রক্ষা পায়নি, পাবেও না। সামান্য আপাতমধুর অকুশল সুখের জন্য মানুষ যথেচ্ছাচারী হয়ে তার অর্জিত অশুভফল জন্ম- জন্মান্তরে ভোগ করতে বাধ্য হয়। আর কুশল তথা শুভ কর্ম বাহ্যত দুঃখপূর্ণ দৃষ্ট হলেও তেতো ওষধের মতো শুভঙ্কর। কামনার বশে মানুষ কামনার দাস বনে যায়। ফলে জন্ম-জন্মান্তরে দুঃখময় ও যাতনাময় দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ করতে হয়। তাই ত্যাগেই মুক্তি। স্বয়ং সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ বোধিজ্ঞান লাভের পূর্বে বহুজন্ম কঠোর সাধনা শেষে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন—এ কথা তিনি তাঁর শিষ্য ও উপাসক-উপাসিকাদের বলেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :

“হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাইনি
তারে দেখতে আমি পাইনি
বাহির পানে চেয়েছি হায়
ভেতর পানে চাইনি।”

সত্যিই তো মায়াময় বাহ্যিক জগৎ আমাদের বারংবার বিড়ম্বিত করে, প্রতারিত করে; অথচ ভেতরে পরম পুরুষের সন্ধান না করে, আত্মধ্যানে নিমগ্ন না হয়ে মিথ্যার বেসাতির চাকচিক্যময় দৃশ্যে বিভ্রান্ত হয়ে স্বতঃই নি¤œগতি প্রাপ্ত হই।
সাধকগণ সহজাত-প্রবৃত্তির বশে চিত্তের মলিনতাবিহীন কুশল কর্মের ফলে স্বচ্ছ দর্পণের মতো পূর্বজন্মের শুভ প্রভাবে আত্মদর্শন করে মোক্ষ লাভ করেন। পরার্থে
নিজের জীবন উৎসর্গ করে অক্ষয় খ্যাতির অধিকারী হন। এ ক্ষেত্রে বোধি সাধকগণ অগ্রগণ্য বটে।
হিমালয়ের পাদদেশে কপিলাবস্তু রাজ্যে শাক্যবংশীয় রাজা শুদ্ধোধনের রাজগৃহে শুভ আবির্ভাব হয়েছিল সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান গৌতম বুদ্ধের। তাঁর জন্মের পূর্বে তাঁর গর্ভধারিনী দর্শন করেন নানা শুভ লক্ষণের, গর্ভকালীনও বিবিধ শুভ লক্ষণ প্রকাশ হতে থাকলে রাজ্যময় আনন্দলহরী ছড়িয়ে পড়ে।
যথাসময়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর জ্যোতিষের গণনায় সংসার জীবনে রাজাধিরাজ এবং সংসারত্যাগী হলে সর্বজ্ঞ বুদ্ধত্ব অর্জন করে বিশ্বব্রহ্মা-ময় পূজিত হবেন বিধায় গৃহত্যাগের কারণসমূহ হতে রক্ষা করায় সচেষ্ট ছিলেন রাজা শুদ্ধোধন।

যিনি সংসার তারণের জন্য এসেছেন, সংসারের সামান্য বন্ধন কি তাঁকে আবদ্ধ করতে পারে? তিনি জরা, ব্যাধি, মৃত্যু ইত্যাদি দর্শনে পুত্র-পরিজন ত্যাগ করে গৃহত্যাগে মন স্থির করেন এবং এক নিশুতি রাতে স্ত্রী গোপা, পুত্র রাহুলসহ রাজপুরী, রাজ-ঐশ্বর্য হেলায় ত্যাগ করে চলে যান সাধনার উদ্দেশ্যে। নানা স্থানে ঘুরে বোধিবৃক্ষ মূলে কঠোর সাধনায় লাভ করেন বুদ্ধত্ব।

এই বুদ্ধত্ব অর্জন সহজ নয়। জগতের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মন্ত্র বুদ্ধের গুণ—অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ, অনুত্তর পুরুষদমনকারী সারথি, দেব-মানবের শাস্তা, বুদ্ধ এবং ভগবান। সুকঠিন সাধনায় বুদ্ধের অর্জিত এই নয়গুণ স্মরণ এক মহামন্ত্র; দেব, দৈত্য, যক্ষ, দানব, মানবসহ ব্রহ্মা-ের কারো শক্তি নেই এই নয়গুণ স্মরণকারীর কোনো প্রকার ক্ষতি করে। যিনি এই নয়গুণের অধিকারী তাঁর মাহাত্ম্য কতটুকু তা সহজেই অনুমেয়।
বিজ্ঞান প্রবাহে মনের অশান্ত বা অতৃপ্তির কারণে চিত্তবৈকল্য উপস্থিত হলে মানুষ কামনার দাস হয়। সেই কামনার বশে মানুষকে পুনঃপুন জন্মধারণ করতে হয়। জন্মে দুঃখ, গর্ভবাসে দুঃখ, জীবন ধারণে দুঃখ, মৃত্যু দুঃখ—এই অমোঘ সত্যগুলো সাধনাবিহীন সাধারণ মানুষ ভুলে গিয়ে মায়ার ফাঁদে পড়ে বারেবারে জন্ম-মৃত্যু যাতনা ভোগ করে থাকে। এই জন্ম-মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পওয়ার মোক্ষম অস্ত্র বা উপায় চতুরার্যসত্য, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, ত্রিলক্ষণ জ্ঞান, প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি। এই মতে যারা বিশ্বাসী বা আস্থাশীল বুদ্ধ মতানুসারে তারা আস্তিক; এই মতে যারা প্রতিষ্ঠিত, বিশ্বাসী বা আস্থাশীল নয় বুদ্ধমতে তারাই নাস্তিক।

ভগবান বুদ্ধ সম্যকসম্বোধি লাভের পর প্রচলিত প্রথার মিথ্যাত্ব, বুদ্ধজ্ঞানের সত্যতা ও যথার্থতা সাধারণ মানুষকে বিলিয়ে দেয়ার জন্য বেদভাষার পরিবর্তে সাধারণের বোধগম্য সহজ প্রাকৃত ভাষায় দেশনা করতেন। সেই হৃদয়গ্রাহী বাস্তবমুখী দেশনায় দেব-দত্য-দানব, তস্কর, দস্যু, দুষ্কৃতিকারী সকলেই ধীরে ধীরে সত্যে দীক্ষিত হয়ে বুদ্ধধর্মের জয়গাঁথা গাইতে থাকেন। পৃথিবীতে বয়ে গেল বৌদ্ধ মতবাদের অহিংস নীতির মহাপ্লাবণ। তখনকার সময়ে বহু বেদান্ত প-িত ঋষি ও জনসাধারণ বৌদ্ধ মতবাদে আকৃষ্ট হয়ে বুদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন। ফলে অনোন্যোপায় হয়ে পুরাণকারগণ বুদ্ধকে ভগবানের অবতাররূপে স্বীকৃতি দিয়ে একাঙ্গীভূত করে নেন। তাই সনাতন ধর্মের অবতারবৃন্দের মধ্যে ভগবান বুদ্ধও একজন অবতার হিসেবে বরিষ্ঠ।

তিনি ধর্ম, আচার ও সমাজের সংস্কার করে মানব সমাজের অশেষ কল্যাণ সাধন করেন। তাঁর নির্দেশিত সাধন পন্থায় অনেক সাধক সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে পরম যশস্বী, প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। তাঁদেরই অগ্রগণ্য সাধক শিরোমণি পূর্বজন্মার্জিত কর্মফলের পারমী পূরণকল্পে জাগতিক প্রকাশ রথীন্দ্রনাথ চাকমা। কালে স্বতোজ্জ্বল অলৌকিক সাধনায় সিদ্ধ বনভন্তের প্রসঙ্গ আসতেই শ্রী ভগবত গীতার বহু বিশ্রুত শ্লোকটি স্মৃতিপটে ভেসে উঠে—

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানিভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধমস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।।
পরিত্রানায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্ম সংস্থাপনাথায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।”

“যখন ধর্মের গ্লানী হয় এবং অধর্মের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন সাধুদের পরিত্রাণের জন্য ও দুষ্কৃতদের শান্তিদানের জন্য আমার আবির্ভাব ঘটে।”
ইতিহাস বা পুরাণ এই শ্লোকের যথার্থতার প্রমাণ দিয়েছে বারেবারে। মহামানবদের আবির্ভাবে কুসংস্কার, স্বেচ্ছাচার, অনাচার, পাপাচার ইত্যাদি বিদূরীত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধর্মরাজ্যের। এই মহামানবদের কেউ বলেছেন ¯্রষ্টার বরপুত্র, কেউ বলেছেন ¯্রষ্টার সখ্য বা বন্ধু, কেউ বলেছেন ¯্রষ্টার সংবাদবাহক, আবার কেউ কেউ এঁদেরকে স্বয়ং ¯্রষ্টার মানব তথা অবতাররূপে বরণ করে সশ্রদ্ধ অনুসরণ করে এক একটি মতবাদের প্রবর্তন করেছেন। মূলত এইসব মহামানবদের অক্ষয় কীর্তি হলো মানুষকে সত্যের পথে, ধর্মের পথে, ন্যায়ের পথে তথা শান্তির রাজ্যে ফিরিয়ে আনা। এই সংস্কার কাজটুকু কখনো কোনো মহামানব বাধা বিঘœ ছাড়া অনায়াসে করতে পারেননি, পারেননি কঠোর সাধনার সত্য উপলব্দি অমোঘ শক্তি অর্জন ব্যতিরেকে।

সিদ্ধপুরুষ মহামানব শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তে মহোদয়ও এর ব্যতিক্রম নন। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় শিক্ষায় অনগ্রসর আদিবাসী সমাজে এহেন যুগন্ধর মহামানবের আবির্ভাব একদিকে যেমন অকল্পনীয়, অপরদিকে তেমনি চরম বিষ্ময়করও বটে।

আদিবাসী এলাকায় শিক্ষকতা করার সময়ে তাদের কার্যক্রম দেখেছি, তারা সদ্ধর্ম ভুলে উপধর্ম, শ্রুতধর্ম, লোকাচার ও তান্ত্রিকতার সমন্বয়ে এক জগাখিচুড়ি কৃষ্টি, দীর্ঘদিন না হোক অনেক দিনের অভ্যাস, আচরণ থেকে তাদের পরিবর্তন সহজে সম্ভব হতো না; যদি সাধনানন্দ মহাস্থবির তথা বনভন্তের আবির্ভাব না হতো।
জন্ম-জন্মান্তরের সাধনায় ঋদ্ধ সাধনানন্দ মহাস্থবির নামের সার্থক প্রকাশ। এক জনমে বা এক বারের প্রয়াসেই তিনি শ্রাবকবুদ্ধত্ব অর্জন করেননি। এজন্য তাঁর রয়েছে বহুজন্মের প্রয়াস। পরম কারুণিক ¯্রষ্টার ইচ্ছাতেই তিনি সেই অনগ্রসর সমাজে আবির্ভূত হয়ে নিজের সাধনায় উৎকর্ষ সাধন যেমন করেছেন, তেমনি বিভ্রান্ত সমাজকে এনেছেন সুপথে, দিয়েছেন শীলসম্পদ তথা সঠিক পথের দিশা।

এই মহামানবকে পৃথিবীতে অবতরণ করানোর ক্ষেত্রে তাঁর মাতাপিতার অবদানও অকিঞ্চিৎকর নয়। কেননা তিন প্রকারের সুক্ষ জীবদেহ সম্বলিত আত্মার দুর্বল সুক্ষ্মদেহ সংস্কারবিহীন দীনগৃহে জন্মলাভ করে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়া, সবল সুক্ষ্ম দেহগৃহে জন্ম নেয়, মহাবল সুক্ষ্ম দেহটি দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর নীতিবান সশ্রদ্ধ পিতামাতার গৃহে অবতরণ করেন যুগের প্রয়োজনে। তাই দেখা যায়, মহামানবদের পিতামাতারাও যথার্থই ন্যায়পরায়ণ, সত্যধর্মের অনুসারী, দানশীল ও সদাচারসম্পন্ন হন। পরম শ্রদ্ধেয় বনভন্তের পিতৃকুল ও মাতৃকুল একদিকে যেমন মর্যাদাশীল বংশের অধিকারী, তেমনি নিশ্চিতই তারা সদাচার, ন্যায়পরায়ণ ও সত্যধর্মে উদ্বোধিত ছিলেন, তা না হলে ঐ মহাভাগ্যবান পিতামাতার গৃহে বনভন্তের মতো মহামানবের আবির্ভাব সম্ভব হতো না। এ জন্য অকুণ্ঠ চিত্তে সেই পুণ্যবান পিতামাতাকেও জানাতে হয় সশ্রদ্ধ প্রণতি।

সংসার জীবনের প্রথমে রথীন্দ্র পিতার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে সংসারের দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়ে রক্ষা করেছেন সংসার, মা ও ভাইবোনদের। কালক্রমে পূর্বসংস্কারবশে, ত্যাগপূর্ণ বৈরাগ্য মন ভগবান বুদ্ধের মতো সংসারের অনিত্যতা ও দুঃখময়তাকে অনুভব করে সিদ্ধান্ত নেন প্রব্রজ্যা গ্রহণের। প্রব্রজ্যা গ্রহণের প্রথম দিকে পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুকূলে না থাকায় নানা স্থানে ইতস্তত ভ্রমণ করতে থাকেন। আহরণ করার চেষ্টা করেন প্রকৃত অমৃতের স্বাদ। বুভুক্ষু প্রাণ কোথাও শান্তি পায়নি। সমাধান পায়নি অনন্ত জিজ্ঞাসার। তাই গুরুবিহীন অবস্থায় সিদ্ধিপ্রাপ্ত বুদ্ধ, বুদ্ধশ্রাবকদের নীতি আদর্শই হয় তাঁর সাধন জগতের গুরু। কালে এই সাধন পন্থায় তাঁকে এনে দিয়েছে চুড়ান্ত সিদ্ধি। ভগবানের উপর একান্ত নির্ভরশীলতা, শীল-সমাধিতে পারঙ্গমতা অর্জন করে তিনিও হয়েছেন শ্রাবকবুদ্ধ। চরম প্রাপ্তি ঘটেছে মানব জনমের।
জুরাছড়িতে ভুবঞ্জয় স্কুলে শিক্ষকতাকালীন কল্যাণমিত্র বাবু ধলকুমার মহোদয়ের সাহচর্যে প্রথম জানতে পারি পরম সিদ্ধসাধক যুগন্ধর মহামানব বনভন্তের কথা। তাঁর সাধন সংগ্রামকালীন পার্থিব ও অপার্থিব মারগণ তাঁকে সাধন বিচ্যুত করার বহু চেষ্টা করেও বিফল হন। এ ঘটনার অনেক প্রত্যক্ষদর্শী এখনও বর্তমান আছেন। তারাও মহাভাগ্যবান বটে।

জুরাছড়ির অদূরে ঘন বনের মধ্যে দুটি পাথর আনার নির্দেশ দিয়েছেন বনভন্তে। অল্প খোঁজাখুঁজির পর নির্দেশিত পাথর দুটি পাওয়া গেলে দেখা যায় একটিতে দীর্ঘ যুগ যোগাসন করে বসে থাকলে তপস্যার তাপে পাথরও ক্ষয় হয় তার প্রমাণ স্পষ্ট। যেন দীর্ঘ যুগ ধরে কোনো মহাতাপস এ পাথরে বসে সাধনা করায় তাঁর পবিত্র আসনের ছাপ সুস্পষ্ট। অপর পাথরটি হয়তো সেই সাধকের অন্য কোনো প্রয়োজনে নিত্য ব্যবহার্য ছিল। বনভন্তে সেই পাথর দুটি আনার নির্দেশ দিয়ে সম্ভবত ঈঙ্গিত করলেন তাঁর পূর্বাপূর্ব জন্মের সাধনার ধারা।

প্রকৃত সাধকগণ কখনো সাধনার্জিত অনিমা, লঘিমা, ঈশিত্ব, বশিত্ব, প্রাকাম্য ইত্যাদির করেন না। বুদ্ধ মতবাদে তো এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোনো সাধক তপঃসিদ্ধির কারণে অর্জিত শক্তির প্রকাশ ঘটাবেন না। কারণ সাধক যখন সাধন শক্তির প্রকাশ ঘটান তখন তাঁর মধ্যে দেখা দেয় অহংকার, আর এই অহংকারই পতনের মূল। সাধনার প্রধান অন্তরায় সাধনবিঘœ। তাই প্রকৃত সাধকগণ কখনো নিজের সাধন বিভূতির প্রকাশ না ঘটিয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধি অবধি ধৈর্য ধারণ করে সাধনায় অগ্রসর হন। পরম পূজ্য বনভন্তে যেহেতু সাধক শিরোমণি মৌদ্গল্লায়ন, মহাকাশ্যপ ইত্যাদির সাধনপ্রণালী অনুসরণ করে অযাচক শীল-সমাধিতে নির্ভরশীল হয়ে সাধন মুখে চলেছেন, তখন তাঁর গুরুবৃন্দই তাঁকে সর্বদা সচেতন থাকার নির্দেশ দিচ্ছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি সশ্রদ্ধ চিত্তে সেই নির্দেশ পালনে কখনো বিরত থাকেননি, ফলে অধুনা সেই মহাসাধকের পরিণতি সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তে শ্রাবকবুদ্ধ রূপে জগৎপূজ্য হয়ে রইলেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন।

সাধকগণ প্রয়োজনে সাধন-ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন লোকশিক্ষার্থে। সেই ইঙ্গিত বোদ্ধাগণ সহজে অনুমান করতে পারেন। সেই বেদভাষার ইঙ্গিতময় স্বল্প কথার বিস্তারিত ভাষ্য। শ্রদ্ধেয় বনভন্তেও মাঝে মাঝে সাধনার ইঙ্গিতও দিতেন। কালক্রমে যখন সাধনায় তিনি পূর্ণসিদ্ধি লাভ করে নিশ্চল দূর অবস্থানে অবস্থিত হয়েছেন তখন অনেক সময় সাধনকালের কষ্টের কথা, ধৈর্যধারনের কথা দায়কদের সম্মুখে প্রকাশ করে উদ্বোধিত করার চেষ্টা করতেন, যাতে প্রকৃত অনুসারীগণ সাধনায় অগ্রসর হতে পারেন।
অনেক অলৌকিক ঘটনার প্রকাশ তাঁর সাধনকালীন শোনা যায়। তাঁর ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, সাধন সময়ে যেমন মারগণ বিঘœ সৃষ্টির চেষ্টা করেন, তেমনি সৎদেবতাগণ সেই সাধককে সর্বপ্রকার বিঘœ থেকে রক্ষায়ও সচেষ্ট থাকেন। এই অলৌকিক প্রকাশগুলো সেই সদ্দেবতাদের কর্ম।

সাধক আত্মধর্মে প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি পরম ¯্রষ্টার সাথে একীভূত হয়ে যান। তখন ¯্রষ্টার গুণের সাথে তাঁর তেমন কোনো তারতম্য থাকে না। একাসনে বসে তিনি বিশ্বব্রহ্মা-কে অবলোকন করতে পারেন। অজ্ঞাত থাকে না কারো মনোবৃত্তি। তাই সাধারণ মানুষ ধর্ণা দেয় সেই মহাপুরুষদের পদতলে, সেই সাধনা লাভের চেষ্টায় কিংবা জাগতিক দুঃখ থেকে পরিত্রাণের আশায়। শুধু মানুষ নন, দেবতারাও এই ঋদ্ধিবান সাধকের উপদেশ বা দেশনা শোনা কিংবা দর্শনের জন্য তাঁদের পদপ্রান্তে উপস্থিত হয়ে থাকেন।
শ্রদ্ধেয় ভন্তে যখন দেশনা দিতেন তখন অনেক দেবতাগণও সেই দেশনা শোনার জন্য আসতেন। তৎকালীন যারা শীলবান দায়ক-দায়িকা কিংবা অনুসারী ও সশ্রদ্ধ শ্রোতা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই সেই দেবতাদের আগমণ উপস্থিতি টের পেয়েছেন। জ্যোতির্ময় দেবতাগণ জ্যোতি প্রকাশ করে দেশনা শেষে চলে যেতেন। বনভন্তে শুধু মানুষের জন্য দেশনা বা সদ্ধর্ম উপদেশ দেননি, তিনি দেবতাদেরও মান্য হয়েছিলেন, তাঁদেরও তিনি সদ্ধর্ম দেশনা দিতেন।
মিতিঙ্গাছড়ি থেকে সংগৃহীত প্রস্তরদ্বয় তাঁর পূর্বাপূর্ব জন্মের কঠোর সাধনার ইঙ্গিতবহ বাস্তব সাক্ষ্য ও প্রমাণ বহন করে, এতে সন্দেহ নেই। এই জন্মে সাধন অবশিষ্ট পারমী পূর্ণ করার জন্যই তাঁর মানব প্রকাশ।

সাধনার শেষ স্তরে তিনি কখনো কখনো নারী-পুরুষের ভেদ করতেন। সিদ্ধি লাভের পর তাঁর এই ভাব কেটে যায়। কেননা স্ত্রী মতির মতো

“যাঁহা যাঁহা নেত্র পড়ে
তাঁহা তাঁহা কৃষ্ণ স্ফুরে।”

‘সর্ব্বম খঞ্চিদং ব্রহ্ম’—সর্বত্রই প্রকাশহেতু সিদ্ধি লাভের পর তাঁর মধ্যে আর নারী-পুরুষ, উচ্চ-নীচ কোনো ভেদ আর থাকেনি। এই কথা তাঁর দেশনার সময়ও শ্রোতা ও অনুসারীদের মধ্যে মাঝে মাঝে উল্লেখ করতেন।

পরম পূজ্যষ্পাদ বনভন্তে কঠোর ধুতাঙ্গ সাধন করে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন। শুধু মানুষ বা জীব জগতের উপর তাঁর প্রভুত অর্জিত হয়েছিল। তাঁর দেশনাকালীন ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো প্রকার বিঘœ সৃষ্টি হতো না। আমি নিজেই এর বাস্তব প্রমাণ দেখেছি। এই অলৌকিক শক্তির অধিকারী শ্রাবকবুদ্ধকে শনৈ শনৈ জানাই অন্তরের ভক্তিমিশ্রিত আভূমিলুণ্ঠিত প্রণাম।

পূজ্য বনভন্তের অক্ষয় কীর্তিসমূহের মধ্যে অন্যতম মহাকঠিন চীবর দান। ভগবান বুদ্ধের সাধিকা বিশাখা-প্রবর্তিত মহাকঠিন চীবর দান এতই সুকঠিন ছিল যে, দীর্ঘদিন অবধি সাধারণ মানুষের নিকট ইহা একান্তই দূরধিগম্য, দুর্জ্ঞেয় ও মহাকঠিন ব্রত বলে গণ্য হতো। তাই কেউ সাহস করে এই মহাকঠিন ব্রত পালনের সাহস দেখাতেন না। মহাসাধক বনভন্তে সেই সুকঠিন মহাব্রতকে অলৌকিক সাধনা-সঞ্জাত জ্ঞান ও ঋদ্ধিবলে মানুষের চাক্ষুস করে তাঁর শ্রাবকবুদ্ধত্ব প্রকাশ করলেন। অহর্নিশ দেশনার মাধ্যমে উদ্ধার করলেন ভাগ্যবান দায়ক-দায়িকাদের। ফলে তিনি হলেন পতিত পাবন। পরশ পাথরের ছোঁয়ায় লোহা সোনা হয়। আগুনের পরশে কয়লা লাল হয়। তেমনি পাপ চিত্তাধিকারীদের পাপচিন্তা দূর করে আলোকিত করেছেন অজ¯্র জনমানবকে।

দেশে-বিদেশে এই মহামানবের অনুসৃত মতবাদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য বিহার। পূজিত হচ্ছেন অজ¯্র দেবমানবের ঘরে ঘরে। স্মরণীয় হয়ে আছেন অজ¯্র বৌদ্ধ মতাবলম্বী ছাড়া অন্য মতবাদীদের মধ্যেও। বহু হিন্দুর আসন মন্দিরেও পরম পূজ্য বনভন্তের ছবি দেখা যায়। তিনি সশ্রদ্ধে পূজিত হন।
পরম পূজ্যষ্পাদ ভন্তের শ্রীপদে প্রার্থনা করি তাঁর অনুসৃত নীতি, ধর্ম ‘যাবৎ পৃথ্বি, চন্দ্র-সূর্য বায়ু স্থিতি তদবধি ঘোষিত হোক ‘বুদ্ধ-ধর্ম-সংঘ নীতি’। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক! 

লেখক : শ্রী ননী গোপাল দাস, উপপরিচালক (অবঃ), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা

Print Friendly, PDF & Email