log1

ভিক্ষুদের প্রকৃত আবাসস্থল গভীর অরণ্যের গাছতলা বাঁশতলা

101_0366বনভন্তে-

       এক সময় পরম পূজ্য শ্রদ্ধেয় বনভন্তে নিজ আবাসিক ভবনে সমবেত ভিক্ষুসঙ্ঘের উদ্দেশ্যে ধর্মদেশনা প্রসঙ্গে বলেন- নির্বাণ যেতে হলে তোমাদেরকে সর্ব বিষয়ের প্রতি অনাসক্তভাব বজায় রাখতে হবে। আমি, আমার, আমিত্ব ত্যাগ করতে হবে। আমার মা আছে, বাবা আছে, ভাই আছে, বোন আছে, আÍীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আছে, সম্পত্তি আছে, ঘর-বাড়ি, অর্থ-বিত্ত আছে এ সব বলা যাবে না। বরং মা নেই, বাবা নেই, ভাই নেই, বোন নেই, আÍীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নেই, পাড়া-প্রতিবেশী নেই, ঘর-বাড়ি নেই, জায়গা-জমি নেই, সম্পত্তি নেই, অর্থ-বিত্ত কোন কিছু নেই বলে থাকতে হবে। এটাকেই বলে নির্বাণ (বা নির্বাণের চিত্ত)। প্রশ্ন আসতে পারে, নেই বলে থাকাটা কিরূপ সুখ? এটা জ্ঞানত (নির্বাণ) সুখ। নেই বলে থাকাটাই জ্ঞান এবং এতেই প্রকৃত সুখ লাভ হয়। আছে বলাটা অজ্ঞান ও দুঃখ। আমি নন্দন কানন বৌদ্ধ বিহারে থাকাকালিন বড়ো বড়ো মহাস্থবিরদের নিকট জিজ্ঞাসা করেছিলাম-ভিক্ষুদের প্রকৃত আবাসস্থল কোথায়? তারা বলেছিলেন-গহীন অরণ্যের গাছতলায়, বাঁশতলায়। ‘তাহলে ভিক্ষুরা কেন এখানে অবস্থান করতেছে’ প্রশ্ন করলে তারা বলেছিলেন, দায়ক-দায়িকারা এসব দিচ্ছে এবং থাকতে বলতেছে বলেই থাকছি। কাজেই তোমাদেরকেও বলছি, বর্তমানে তোমরা বিহারে থাকলেও একথা মনে রাখবে যে, গভীর অরণ্যের গাছতলা, বাঁশতলায় হল তোমাদের প্রকৃত আবাসস্থল। কিছুতেই এসব ভূলে যাবে না। পূজ্য ভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন-তোমাদের প্রকৃত আবাসস্থল কোথায়? ভন্তে, গভীর অরণ্যের গাছতলা, বাঁশতলা। ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষুসঙ্ঘকে গভীর অরণ্যের গাছতলায়, বাঁশতলায় ঝরা পাতা বিছায়ে থাকতে উপদেশ দিয়েছেন। তোমরা তো বিল্ডিং বিহারেই অবস্থান করতেছ। আবার বিল্ডিং বিহারের ভেতর থেকেও মনচিত্তকে যদি গভীর অরণ্যের গাছতলা, বাঁশতলায় রাখতে পার তাহলে অসুবিধা নেই। অন্যদিকে, গভীর অরণ্যের গাছতলা, বাঁশতলায় অবস্থান করার পরও মনচিত্ত যদি বাইরের রং তামাশায় প্রমত্ত থাকে তাহলে অরণ্যে অবস্থানের সার্থকতা অর্জিত হয় না। কারন মনচিত্তই আসল; দেহের ভূমিকা এখানে গৌণ। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বলেন, তোমরা অরণ্যের মধ্যে অবস্থান করলেও তোমাদের মনচিত্ত বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারে নয় কি? অবশ্যই পারে। যেমন ধর (একজন ভিক্ষু দেখায়ে দিয়ে) তুমি অরণ্যে অবস্থান করতেছ, অথচ তোমার মনচিত্তের মধ্যে সারাক্ষণ রাঙ্গামাটির (বা অন্য স্থানের) এক যুবতীর কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। তখন কি ভাবনা হবে? নাকি বৈরাগ্য সুখ হবে? কিছুই হবে না। বরং অরণ্যে অবস্থান জনিত দুঃখই সার হবে মাত্র। তাই শুধুমাত্র অবস্থান করলে চলবে না, অনাসক্ত চিত্তেই অবস্থান করা চাই। আমি অরণ্যে অবস্থান করার সময় সবকিছুতে অনাসক্ত চিত্তে অবিচল ছিলাম। তোমাদেরকে বলছি, তোমরাও যেখানে (বিহারে কিংবা অরণ্য কুটিরে) অবস্থান কর না কেন সর্বদা অনাসক্ত চিত্তে অবস্থান করতে সচেষ্ট থাকবে। অনাসক্ত চিত্তে অবস্থান করার মাধ্যমে সুখ লাভ হয়। সেটা বিহারে হোক বা অরণ্যে হোক। অবশ্য একথা সঠিক যে, অনাসক্তভাবে অবস্থানের জন্য বিহার অপেক্ষা অরণ্যই সহায়ক স্থান।

          আমাকে অনেকেই বলে থাকে- ভন্তে, একটু অলৌকিক শক্তি প্রদর্শন কর”ন। অলৌকিক কিছু না হলে অধর্মবাদীদেরকে বুঝানো সম্ভব নয়। সেভাবে অলৌকিক শক্তি প্রদর্শন করা যুক্তিসঙ্গত নয়। অলৌকিক শক্তি দ্বারা সেরূপ কিছু করলে সেটা কি রকম হবে জান? কোন বলবান পুর”ষ দুর্বল ব্যক্তিকে স্বীয় বল প্রদর্শন করনার্থে ‘তোমকে আছাড় মারব’, ‘তোমাকে শাস্তি দেবো’, ‘তোমাকে মেরে ফেলব’ ইত্যাদি বলে ভয় দেখানোর ন্যায় হবে। উপরন্তু দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার বা বল প্রয়োগ করার ন্যায় হবে। ভগবান বুদ্ধ অলৌকিক শক্তি প্রদর্শন না করতে বলেছেন। অধর্মবাদীদের অবস্থা দেখে মহাঋদ্ধিমান মৌদ্গলায়ন স্থবিরও নাকি ভগবান বুদ্ধকে বলতেন, ভগবান আমাকে অনুমতি দিন এ’ পৃথিবীকে (তথা পৃথিবীর মনুষ্যদিগকে) মহাসমুদ্রে ডুবিয়ে রাখি। কেনই তারা এত অকুশল পাপকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। একটু বুঝতে চেষ্টা কর”ক। তৎশ্রবণে ভগবান বুদ্ধ মৃদু হেঁসে বলতেন, পৃথিবীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে রাখলে কেহ জীবিত থাকবে কি? আর তুমি কাকে ধর্মদেশনা করবে? অরহতের মুখে এরূপ উক্তি মানায় না। বনভন্তে বলেন, ষড়াভিজ্ঞা অরহতগণ স্বীয় ঋদ্ধিশক্তির প্রভাবে সমস্ত পৃথিবীকে মহাসমুদ্রে পরিণত করতে পারে। একটি কমলালেবু হাতে নিয়ে খেলা করা মানুষের পক্ষে যেমন অসম্ভব ব্যাপার নয় তেমনি সমস্ত পৃথিবীকে হাতে ধরে ইচ্ছামত কিছু করাও অরহতগণের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। এমন কি এক নিমিষেই পৃথিবীকে চূর্ন বিচূর্ন করে ধ্বংস করতে পারেন। মনে রাখবে, ষড়াভিজ্ঞ অরহতগণের ঋদ্ধিশক্তির নিকট সর্বশক্তিই অসহায়। কোন ষড়াভিজ্ঞা অরহতের ঋদ্ধিশক্তি পরীক্ষার্থে যদি বর্তমান পরাশক্তিধর আমেরিকা তার বোমার” বিমান দিয়ে বোমা বর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতেও আসে সে এসব কোন কিছুই ফেলতে পারবে না। বরং সেই বোমার” বিমানগুলোকে আকাশেই থাক্ বললে সেখানে অচল অবস্থায় থাকতে হবে। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করতঃ ক্ষমা প্রার্থনা না করবে এক ইঞ্চিও নড়তে পারবে না। অন্যদিকে, ষড়াভিজ্ঞা অর্হৎ স্বীয় ঋদ্ধিশক্তি প্রয়োগ করলে নিমিষেই আমেরিকার মত রাষ্ট্রকে ছাঁই করে দিতে পারবে। কিন্তু অর্হৎগণ তা’ করেন না।

       শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বলেন- ভগবান বুদ্ধ বলেছেন নির্দয় রাজা, প্রবল শত্র”, হিংস্র জন্তু যতখানি ক্ষতি (অনিষ্ট) করবে, মিথ্যাপথে আকৃষ্ট চিত্ত মানুষের তদপেক্ষা অধিক ক্ষতি করবে। অন্যদিকে, মাতা-পিতা, বন্ধু-বান্ধব, জ্ঞাতিবর্গ যে উপকার করবে, সত্যপথে নিবিষ্ট চিত্ত মানুষের ততোবিধ উপকার মঙ্গল করবে। তাই তোমরা বাঘ, ভল্ল¬ুক, হাতি প্রভৃতি হিংস্র জন্তু জানোয়ারকে ভয় না করে, মিথ্যায় আকৃষ্ট চিত্তকে ভয় করবে। আমি যখন জঙ্গলে ছিলাম, কই তখন তো কোন বাঘ, ভল্ল¬ুক, হাতি, হিংস্র জন্তুই আমাকে ক্ষতি সাধন করতে পারেনি। সবাই আমার সাথে বলো “নির্দয় রাজা, প্রবল শত্র”, হিংস্র জন্তু এরা কি অনিষ্ট করবে, কি ক্ষতি করবে, মিথ্যাপথে আকৃষ্ট চিত্ত তদপেক্ষা অধিক অনিষ্ট, ক্ষতি সাধন করবে”। মাতা-পিতা, বন্ধু-বান্ধব, জ্ঞাতিবর্গ তারা যে উপকার করবে, সত্যপথে নিবিষ্ট চিত্ত তদপেক্ষা উপকার করবে। তোমাদের চিত্ত যদি সত্যপথে নিবিষ্ট থাকে তাহলে তোমাদের উপকার হবে, মঙ্গল হবে। আর চিত্ত যদি মিথ্যাপথে ধাবিত হয় তাহলে অনিষ্ট ক্ষতি সাধনই হবে বলে জানবে। তাই তোমাদের কাজ হল স্বীয় চিত্তকে নিরীক্ষণ করা; চিত্ত সত্যপথে যাচ্ছে, নাকি মিথ্যাপথে যাচ্ছে? চিত্ত মিথ্যাপথে গেলে সেটাকে সত্যপথে ফিরিয়ে আন। মনে রাখবে, চিত্ত সত্যপথে গেলে পরম উপকার, মঙ্গল, সুখ; কিন্তু মিথ্যাপথে গেলে মহাক্ষতি, অনিষ্ট। চিত্ত যদি সত্যপথে চলে, তবে মানুষ উন্নতির চরম শিখরে উঠতে পারে। আর মিথ্যাপথে গেলে ঘটে তার চরম অধঃপতন। তজ্জন্য বলা হয়েছে, সত্যগামী মনের ন্যায় বন্ধু নেই, মিথ্যাগামী মনের ন্যায় শত্র” নেই। এভাবেই মনচিত্ত তোমাদের বন্ধুও হতে পারে, শত্র”ও হতে পারে। চিত্ত সত্যপথে গেলে বন্ধু, মিথ্যাপথে গেলে শত্র”। পূজ্য বনভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করে বলেন; তোমাদের চিত্ত সত্যপথে যাচ্ছে, নাকি মিথ্যাপথে যাচ্ছে, সে সম্বন্ধে অবগত রয়েছ কি? ভন্তে, কখনো অবগত হতে পারি, কখনো পারি না। সে সম্বন্ধে সম্যক অবগত হবার জন্য তোমাদেরকে ধ্যান করতঃ জ্ঞানের সহিত অবস্থান করতে হবে। এক কথায় ধ্যান করতে হবে, জ্ঞান করতে হবে। জ্ঞান ও ধ্যানানুশীলনের মাধ্যমে চিত্তকে জানতে হয়। সারা রাত্রি না ঘুমিয়ে তোমরা জ্ঞান ও ধ্যানানুশীলন কর, তাহলে তোমাদের মনচিত্ত কি করে? কোথায় ঘুরে বেড়ায়? কি আলম্বনে অবস্থান করে? সবকিছুই জানতে পারবে। জ্ঞান ও ধ্যানানুশীলন ব্যতিরেকে মনচিত্তকে জানা সম্ভব নয়। তাই সাধারণ মানুষ সহজে নিজের মনচিত্তকে জানতে পারে না। মনে রাখবে, মানুষের (সত্ত্বগণের) মনচিত্তই প্রধান। মন হতেই সব উৎপাদিত হয়। মনের দ্বারাই শরীর (দেহ) পরিচালিত হয়ে থাকে। সাধারণতঃ দেহকে কার্য-বাক্য সম্পাদন করতে দেখা যায় বটে, কিন্তু আসলে মনই দেহকে চালিত করে কথা বলায়, কাজ করায়। যদিও বলা হয় সে পাপকর্ম সম্পাদন করতেছে। প্রকৃতপক্ষে অমুক ব্যক্তি নয়, তার মনই পাপকর্ম সম্পাদন করতেছে। সমুক ব্যক্তি পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতেছে। প্রকৃতপক্ষে সমুক ব্যক্তি নয়, তার মনই পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতেছে। সবকিছুই নির্ভর করে চিত্তের উপর। পূজ্য বনভন্তে পলিথিনের একটি ব্যাগ দেখায়ে দিয়ে বলেন- দেখ, ঐ পলিথিন ব্যাগটি বাতাসে উড়তেছে; এক স্থান হতে অন্য স্থানে চলে যাচ্ছে। আচ্ছা, বল তো দেখি, সত্যিই কি পলিথিনের ব্যাগটি নিজে নিজে উড়ে যাচ্ছে? নাকি বাতাসে উড়ায়ে নিয়ে যাচ্ছে? বাতাসেই নিয়ে যাচ্ছে। এটাই প্রকৃত সত্য কথা। বাতাসে নিয়ে যাচ্ছে বলে ব্যাগটি যাচ্ছে; নতুবা এক স্থান হতে অন্য স্থানে উড়ে যাবার মত ব্যাগটির কোন শক্তি, সামর্থ নেই। এখানেও ঠিক তদ্র”প দেহ পলিথিন ব্যাগ আর মন হল বাতাস। মনই দেহকে কর্ম-বাক্য সম্পাদনে নিয়োজিত করতেছে। মন হচ্ছে সব কিছুর উৎপত্তির উৎস। দেহ সম্পূর্ণ মনের উপর নির্ভরশীল। তোমরা সবাই স্বীয় মনচিত্ত সম্বন্ধে সম্যক অবগত থাক। তোমাদের চিত্ত সত্যপথে যাচ্ছে, নাকি মিথ্যাপথে যাচ্ছে সে বিষয়ে আÍপরীক্ষক হয়ে অবস্থান কর। আর যদি দেখ যে, মনচিত্ত মিথ্যাপথে ধাবিত হচ্ছে, তখন সে মিথ্যাপথগামী চিত্তকে তৎক্ষণাৎ সম্যক পথে ফিরায়ে আনবে, এবং ভবিষ্যতের জন্য হুঁশিয়ারী করে দিবে ‘হে মন! খবরদার কখনো মিথ্যাপথে যাবে না। মনচিত্ত মুক্ত হতে না পারলে মিথ্যাপথে ধাবিত হয়ে নানা কর্ম, নানা বাক্য সম্পাদন করতঃ নানা স্থানে ঘুরে বেড়ায়। কিসের হতে মুক্ত? আসব হতে মুক্ত। মনচিত্ত আসব থেকে মুক্ত হতে না পারলে নানা স্থানে ঘুরাঘুরি করতে থাকে। তজ্জন্য বুদ্ধ বলেছেন-

আসবের ক্ষয়কাল না হয় যতদিন,
এসব বিশ্বাস ভিক্ষু করিও না ততদিন।

আসব ক্ষয় না হয় পর্যন্ত কোন ভিক্ষু-শ্রামণই (সম্পূর্ণরূপে) বিশ্বাসের যোগ্য হতে পারে না। কারণ আসব ক্ষয় না হলে চিত্ত দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারে না, তথা দুঃখের মধ্যে থাকে। আর তখন নানা কর্ম, নানা বাক্য সম্পাদন করতঃ একত্রিশ প্রকার লোকভূমিতে ঘুরে বেড়ায়। ঠিক যেমন রকেটের মতন। রকেট নানা স্থানে ঘুরে বেড়ায় নয় কি? হ্যাঁ, ভন্তে বেড়ায়। তেমনিভাবে চিত্তও যদি আসব থেকে মুক্ত হতে না পারে তাহলে কখনো দেবতা, কখনো মনুষ্য, কখনো ভূত-প্রেত-পিশাচ, কখনো বা কুকুর, গর”, ছাগল, পশু-পক্ষী প্রভৃতি যোনিতে জন্মগ্রহণ করতঃ ঘুরে বেড়ায়।

          তিনি আবারো বলেন- তোমরা যদি ঠিকভাবে বুঝতে পার, তাহলে এখানে (প্রব্রজিত অবস্থায়) থাকতে পারবে। সেই ঠিকভাবে বুঝতে পারাটা কি? চারি আর্য সত্য ও প্রতীত্য সমুৎপাদনীতি বুঝতে পারলে আর কোন কিছু বুঝার প্রয়োজন হয় না। তাই যারা চারি আর্যসত্য ও প্রতীত্য সমুৎপাদনীতিকে বুঝতে সক্ষম হয়েছে তাদেরকে অন্য কিছু বুঝার দরকার নেই। কারন তারা প্রকৃত সত্যকে বুঝে ফেলেছে। তাদের নিকট কোন প্রকার মিথ্যা থাকতে পারে না। তারা সংসার দুঃখকে অতিক্রম করে নির্বাণ সুখের সাগরে পতিত হয়। তাদেরকে আমি বলি-“ঠিক বুঝেছে, ঠিক বুঝেছে আর বুঝতে হবে না”। দুঃখসত্য, সমুদয় সত্য, নিরোধ সত্য, মার্গসত্য-এ’ চারি আর্যসত্য বুঝতে পারলে নির্বাণ লাভ হয়। আবার, কেহ যদি বলে চারি আর্য সত্যের মধ্যে কেবল দুঃখসত্য বুঝেছি, অপর তিন সত্য বুঝিনি তা’ মিথ্যাদৃষ্টি; দুঃখসত্য-সমুদয় সত্য এ’ দুই সত্য বুঝেছি, অপর দুই সত্য বুঝিনি তা’ মিথ্যাদৃষ্টি; দুঃখসত্য-সমুদয় সত্য-নিরোধ সত্য এ’ তিন সত্য বুঝেছি, অপর এক সত্য বুঝিনি তাও মিথ্যাদৃষ্টি। চারি আর্য সত্যকে সম্পূর্ণরূপে বুঝতে না পারলে মিথ্যাদৃষ্টি দূরীভূত হয় না। বলা বাহুল্য, চারি আর্য সত্যকে সম্পূর্ণরূপে বুঝতে না পারা পর্যন্ত সম্যকদৃষ্টি সম্পন্ন হতে পারে না। যিনি চারি আর্য সত্যকে বুঝতে পারেন তার চিরতরে চারি অপায় বন্ধ হয়ে যায়।

        ধর্ম তিন প্রকারে শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকে। কি কি? মার্গ, ফল, নির্বাণ। যেই ধর্মে মার্গ নেই, ফল নেই, নির্বাণ নেই সেই ধর্ম শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। বৌদ্ধধর্মে মার্গ আছে, ফল আছে, নির্বাণ আছে। তোমরা সেই মার্গ, ফল, নির্বাণ ধর্মে নিজকে প্রতিষ্ঠিত কর। কিভাবে করবে? চারি মার্গ, চারি ফলযুক্ত আর্য পুদ্গল হয়ে। স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী, অরহত, মার্গস্থ, ফলস্থ ভেদে চারি মার্গ, চারি ফলযুক্ত অষ্ট আর্য পুদ্গল। যদি তোমরা (ভিক্ষুসঙ্ঘ) সবাই অনাগামী, অরহত এবং দায়ক-দায়িকারা স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী হতে পারতো তাহলে কারো আর অকুশল পাপ হতে পারত না। ‘আমি চলে যাচ্ছি, আমি চলে যাচ্ছি’ বলে চিরতরে বিদায় নিতো। ভগবান বুদ্ধের সময়কালিন তেমনই হয়েছিল। তোমরা আমার সাথে বলো “আমরা শ্রেষ্ঠধর্ম আচরণ করব, উত্তমধর্ম সম্পাদন করব। যেই ধর্মে মার্গ নেই, ফল নেই, নির্বাণ নেই সেই ধর্ম দুঃখ এবং পাপধর্ম বলেই জানবে। আমরা সে ধর্ম করব না। নব লোকোত্তর ধর্মই করব”। ভগবান বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মই নব লোকোত্তর ধর্ম। স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী, অরহত, মার্গস্থ, ফলস্থ আর নির্বাণ-এই নয়টি হলো নব লোকোত্তর ধর্ম। নব লোকোত্তর ধর্মই প্রকৃত সুখ। পূজ্য ভন্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন- ভগবান বুদ্ধ কি ধর্ম প্রচার করেছেন? নবলোকোত্তর ধর্ম। তাই বলা হয়েছে-

সম্যক সম্বুদ্ধ যিনি গুণের ভা-ার,
মুক্তির সঠিক পথ করিল প্রচার।
ঠিক যে প্রণালী যথা হইল বর্ণন,
আর্যগণ যেই পথে করেছে গমন।
আর্যনীতি আচরণে স্থির যেবা রয়,
ইহ-পরকাল তার তিনি শান্তি সুখ হয়।
স্মৃতি বিদর্শনে যিনি স্থির বীর্য হন,
সম্ভবে সপ্তম দিনে নির্বাণ দর্শন॥

পরিশেষে তিনি বলেন- আÍ উৎকর্ষ সাধনার চরম লক্ষ্য। আÍ উৎকর্ষ শব্দের অর্থ আপন উন্নতি, আপন শ্রেষ্ঠত্ব, স্বকীয় উৎকৃষ্টতা। অর্থাৎ আমি কিভাবে উন্নতি করব, শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে উন্নীত হবো, উৎকৃষ্ট লাভে সক্ষম হবো সেই ব্যাপারে সদা তৎপর হয়ে অবস্থান করা। তোমরাও সবাই সেই রকম উন্নতি, শ্রেষ্ঠত্ব, উৎকৃষ্টতা লাভের দিক নির্দেশনা মনে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে চলো। তাহলে দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভে সক্ষম হবে। সর্বদা উচ্চমনা, উচ্চাকাক্সক্ষা, উচ্চতর জ্ঞান অর্জনে তৎপর থাক। কখনো হীনমনা হবে না, নি” আকাক্সক্ষা করবে না, হীন জ্ঞানের চর্চা করবে না। মনে রাখবে, উচ্চমনা, উচ্চাকাক্সক্ষা, উচ্চতর জ্ঞান লাভ করতে পারলে আপন উন্নতি, আপন শ্রেষ্ঠত্ব, স্বকীয় উৎকৃষ্টতা সাধনে সমর্থ হবে। আমার সাথে বলো “আমরা উচ্চমনা হবো, উচ্চাকাক্সক্ষা করবো, উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করবো, উচ্চতর সাধনা করবো। কখনো হীনমনা হবো না, নি” আকাক্সক্ষা করব না, হীন জ্ঞানের চর্চা করব না, নি”স্তরের  সাধনা করব না”। তাহলে অবশ্যই তোমাদের দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ হবে।

সাধু   সাধু   সাধু

আর্যশ্রাবক বনভন্তের ধর্মদেশনা

সিরিজ-৩

সংকলক: শ্রীমৎ ইন্দ্রগুপ্ত ভিক্ষু

Print Friendly, PDF & Email