log1

ধন্য সে নরকুলে

Jinapriya Bhante

জিনপ্রিয় ভিক্ষু

কবির ভাষায়

                  এমন জীবন করিবে গঠন

                  মরণের পরে হাঁসিবে তুমি

                  কাঁদিবে ভুবন

 যাঁকে ভিত্তি করে কবিতার এই পঙক্তি, তিনি দেব-মানব তথা আমার আপনার সকলের পূজ্য, লোকোত্তর ধর্মের পথপ্রদর্শক শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তে যিনি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান দেশি-বিদেশি সকলের নিকট বনভন্তেনামেই সমধিক পরিচিত সাধনানন্দ মহাস্থবির আসল নাম হলেও এ নামে পরিচিত না হয়ে বনভন্তেনামেই বেশি পরিচিতবনভন্তেনামই বা কেন হলো?

পাহাড় ঘেরা সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, সবুজে বেষ্টিত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি পার্বত্য চট্টলা তার বুক চিড়ে স্বচ্ছ সলিল বয়ে চলা মিজোরামের লুসাই পাহাড়ে উৎপন্ন হওয়া কর্ণফুলী নদীর তীরে বর্তমান রাঙামাটি পার্বত্য জেলা সদরের ১১৫নং মগবান মৌজার মোরঘোনা নামক গ্রামে ৮ জানুয়ারি ১৯২০ ইংরেজিতে জন্মগ্রহণ করেন পারমীসম্ভার পরিপূর্ণ এক পুণ্যাত্মা (নবজাতকের নাম রাখা হয় রথীন্দ্র লাল চাকমা)

পুণ্যাত্মা এ মানব শিশুর আগমন অন্য দশ শিশুদের মতো নয় শিশুটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁর কিছু আশ্চর্যজনক লক্ষণ দেখে ধাত্রী নিজেই হতবাক! আবারও সামাজিক প্রথা অনুসারে মাঙ্গলিক কর্ম সম্পাদন করে ¯œান করিয়ে নবজাতককে

মায়ের কোলে তুলে দেয়া হলো নবজাতককে কোলে পেয়ে মা কী যে আনন্দিত! যেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আদরের ধনই হাতে পেয়েছেন ক্রমে শিশুটির বয়স বাড়তে বাড়তে এক সপ্তাহ/পনের দিন হলে আবারও সামাজিক প্রথা অনুসারে নবজাতক ও মাকে পবিত্র করা হলো এবং শুভ দিনক্ষণ দেখে পিতা-মাতা শিশুটির নাম রাখলেন রথীন্দ্র শিশু রথীন্দ্রের হাবভাব অন্য দশটি শিশুর মতো নয় ছোটকাল থেকেই উদাসীন ও ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন সাধারণত ছোটবেলায় যেভাবে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা হৈ-চৈ, দৌঁড়াদৌঁড়ি, বিভিন্ন খেলাধুলায় মেতে থাকে; দুষ্টামি করতে করতে জামা কাপড় ময়লা ধূলাবালিতে লিপ্ত থাকে শিশু রথীন্দ্র ঠিক তার উলটো শিশুকাল অত্যন্ত চঞ্চল আর অস্থিরতার সময় আবার এ অস্থিরতাও একই জিনিসে তাদের মন বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকে না তাই তারা নতুন কিছু দেখলে সেটা জানতে, বুঝতে, শিখতে চেষ্টা করে আর সেই মানসিকতায় বেড়ে ওঠে

শৈশবের সেই অস্থির চঞ্চলময় সময়েও শিশু রথীন্দ্র আচার-আচরণ, চাল-চলন, কথাবার্তা ও কার্যকলাপে শান্তশিষ্ট ও গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন সঙ্গীদের সাথে খেলাধুলা না করে কীসের চিন্তায় যেন নিমগ্ন থাকতেন পুণ্যাত্মা সেই শিশুটি এভাবে নীরব, নির্জন স্থানে চুপচাপ থাকতেই পছন্দ করতেন বয়স বাড়তে বাড়তে যখন ৫/৭ বৎসর হয় তখন তাঁর খেয়াল হয় রাত্রে চলাফেরা করার সময় তাঁর চারিদিকে এক উজ্জ্বল আলোর দৃশ্য ঘুরে বেড়াত সেই আলোর দৃশ্য দেখে প্রথমে চিন্তান্বিত হলেও পরে ভাবলেন, এটি হয়ত তাঁর ভাবুক মনের সহায়ক হতে পারে এবং তা দেখে তিনি মনে মনে মুগ্ধ ও বিস্মিত হতেন ৬/৭ বৎসর বয়সী শিশু রথীন্দ্রের প্রজ্ঞা ও সুদৃষ্টিসম্পন্নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কোনো একদিন মুড়ি-মোয়া বিক্রেতা মুড়ি-মোয়ার ভার কাঁধে নিয়ে মুড়ি-মোয়া, মুড়ি-মোয়া ডাক দিতে দিতে পাড়া ঘুরছিল এবং তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে দেখে মা (বীরপুদি চাকমা) মুড়ি-মোয়া বিক্রেতাকে ডেকে নিয়ে আসতে শিশু রথীন্দ্রকে আদেশ দিলেন মার আদেশে তিনি মুড়ি-মোয়া বিক্রেতাকে ডেকে নিয়ে আসলেন বিক্রেতা তাঁদের উঠানে এসে মুড়ি-মোয়ার ভার নামালেন কিছুক্ষণ পর আশপাশের কয়েকজন মহিলাও সেখানে এসে মুড়ি-মোয়া দরদাম করতে থাকে দরদাম ঠিক হলে বিক্রেতা সকলকে পরিমাণ অনুসারে মুড়ি-মোয়া মেপে দিল মুড়ি-মোয়া বিক্রেতাকে ডেকে নিয়ে এসে সামান্য দূরত্বে শিশু রথীন্দ্র দাঁড়িয়ে থেকে তার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন মহিলাদের কেনাকাটা শেষ হলে রথীন্দ্র বিক্রেতাকে নরম সুরে বললেন, ও মুড়ি-মোয়া ওয়ালা, আপনার পাল্লাটা ঠিক আছে তো? ছোট ছেলের এমন প্রশ্ন শুনে বিক্রেতা তো হতবাক! অবাক দৃষ্টিতে চোখ দুটি বড় বড় করে রথীন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বলল, না বাবা, ঠিক আছে মনে হয় তুমি ভুল দেখেছ মুড়ি বিক্রেতার এমন মিথ্যাকথা শুনে রথীন্দ্র বললেন, তাহলে শিল নামিয়ে আপনার পাল্লাটা দেখান ছোট্ট শিশু রথীন্দ্রের কথা শুনে উপস্থিত সকলের সন্দেহ হলো তখন তারা মুড়ি-মোয়া বিক্রেতাকে পাল্লা থেকে শিল (বাতখারা) নামিয়ে পাল্লার ফের পরীক্ষা করে দেখাতে বাধ্য করল এতক্ষণ কম ওজনে তাদের মুড়ি দিচ্ছিল এতে উপস্থিত ক্রেতারা রুষ্ট হয়ে মুড়ি-মোয়া বিক্রেতাকে ইচ্ছেমতো ধমক দিলেন সে অবশেষে ক্ষমা চেয়ে তাদের পরিমাণমতো মুড়ি-মোয়া দিয়ে নিস্তার পায় তার পর শিশু রথীন্দ্র গম্ভীর স্বরে বললে, ও মুড়ি ওয়ালা, মিথ্যা বলা মহাপাপ কাউকে ঠকানোও পাপ সুতরাং কাউকে কখনো আর মিথ্যা বলবেন না, ওজনে কম দিয়ে কাউকে ঠকাবেন না শিশু রথীন্দ্রের মুখে প্রাপ্তবয়স্ক লোকের মতো কথা শুনে সে বিস্মিত হলো আর ভাবতে লাগল এমন শিশুর পক্ষে এ উপদেশ! শেষে মুড়ি-মোয়া বিক্রেতা মহিলাদের অনুরোধ করে গেলেন যেন শিশুটিকে ভালো করে দেখাশুনা করা হয় কারণ, শিশুর ভালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে পরে মুড়ি-মোয়া বিক্রেতা শিশু রথীন্দ্রের মাথায় হাত বুলিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের সুখ কামনা করে চলে গেলেন

সময় ও স্রোত কারোর জন্য অপেক্ষা করে না দিনের পর মাস, মাসের পর বছর এভাবে সময় চলে যায় অপরদিকে স্রোতও চলতে থাকে আপন ছন্দে তারা কারোর কথায় সে নিয়মের ব্যতিক্রম করে না রথীন্দ্রের বয়সও বাড়তে থাকে অন্য বালকেরা যেভাবে বিভিন্ন খেলাধুলা, হাঁস্য-কৌতুকে মত্ত থাকত বালক রথীন্দ্র সম্পূর্ণ তার বিপরীত তাঁর মন সর্বদা চিন্তিত হয়ে থাকত মন কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে তাঁর এই উদাসীনতা দেখে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন সকলেই বেশ চিন্তিত হলো কেন তাঁর এই চুপচাপ? কেন এত আনমনা? কেন এই উদাসীনভাব? এ বয়সেই বা তার কীসের চিন্তা? পুত্রের এমন স্বভাব দেখে পিতা-মাতা দুজনেই চিন্তাগ্রস্ত তার পরও তাকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেন ছেলেকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়ে চিন্তাগ্রস্ত পিতা-মাতা স্বস্তি ফিরে পেলেন যদি পুত্রের মনোভাব এবার পরিবর্তন হয় কারণ, বালক রথীন্দ্র যে-কোনো বিষয় জানার ও শেখার প্রতি প্রবল আগ্রহী এদিকে রথীন্দ্র বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে কী হবে? তার ভাবের তো কোনোই পরিবর্তন হলো না তখনকার সময়ে বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পরিবেশ বর্তমান সময়ের মতো সুযোগ-সুবিধা ছিল না তা ছাড়াও তখনকার সময়ের অভিভাবক ও সমাজের শিক্ষার তেমন গুরুত্ব ছিল না এমন পরিবেশে রথীন্দ্র উপরের ক্লাশে উত্তীর্ণ হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি মনযোগ ও আকর্ষণ না থাকায় পড়ালেখার সমাপ্তি ঘটে পড়ালেখার সমাপ্তি ঘটলেও যেটুকু পড়ালেখা শিখেছেন তা দিয়ে বড় বড় বৈজ্ঞানিকদের জীবনী ও তাদের আবিষ্কারবিষয়ক বিভিন্ন বই এবং বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিকদের বইসমূহ সংগ্রহ করে মনোযোগ দিয়ে পড়তেন আর বুদ্ধধর্মবিষয়ক গ্রন্থ ছাড়াও ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম ও খ্রিষ্টান ধর্মবিষয়ক বিভিন্ন বই পড়তেন অবসর সময়ে নিরিবিলিতে/গাছের ছায়ায় একান্তে কী যেন চিন্তায় মগ্ন থাকতেন বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়নের পাশাপাশি বৈরাগ্যবিষয়ক গান ও নাটকের প্রতিও তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল আর তাই বিভিন্ন কাজ করতে করতে সেসব গানগুলো আপন মনে গুন গুন করে গাইতেন

এদিকে সমাজের বিভিন্ন ঘটনা ও কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করতে করতে রথীন্দ্রের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করতে থাকে এবং ক্রমে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি দেখতেন বিভিন্ন রোগ-বালাই, আপদ-বিপদ থেকে রক্ষা পেতে, লাভের প্রত্যাশায়, সুখের আশায় মানুষ ইষ্ট দেবতার আশীর্বাদ পেতে প্রাণীবলিসহ বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মদ, ভাঙ, কানজি, জগড়াসহ বিভিন্ন নেশা পান করে মাতাল হয়ে আনন্দ-ফূর্তি করত এতে অনেক সময় ঝগড়া-বিবাদসহ বিভিন্ন অঘটনও ঘটত, যা নিয়ে পরিবার ও সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো প্রত্যক্ষ করতেন স্বামী-স্ত্রীতে, পাড়া-প্রতিবেশীতে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে, এলাকায় এলাকায় দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর দুঃখ-দুর্দশা তখন সুখের সংসারে নামে হাহাকার কিশোর রথীন্দ্র এসব প্রত্যক্ষ করতে করতে উদ্বিগ্ন যেমন হতেন, তেমনি এসব থেকে মুক্তির উপায় নিয়েও ভাবতেন

রথীন্দ্রকে উদাসীন দেখে পিতা-মাতা সততই চিন্তান্বিত উদ্বিগ্ন থাকতেন তাই রথীন্দ্রকে উদাসীনতা থেকে ফিরিয়ে আনতে তাঁকে গৃহস্থালীর বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব দিতেন রথীন্দ্রের উপর এমন দায়িত্বও দেয়া হতো যে-দায়িত্ব পালনের মধ্যেও তাঁর প্রচুর বই-পুস্তক পড়ার সুযোগ হতো আর এ দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পালন করতেন আর তা দেখে মা-বাবা তো মহাখুশি মা-বাবাকে এভাবে গৃহস্থালীর কাজে সহায়তা করতে করতে নিশ্চিন্তে দিনগুলো চলছিল নিশ্চিন্তভাবে চলার মাঝে যুবক রথীন্দ্রের জীবনে নেমে এলো ঘোর অমানিশা, গভীর শোকের ছায়া হঠাৎ মৃত্যুবরণ করলেন তাঁর পিতা হারুমোহন চাকমা তখন ১৯৪৩ সাল যুবক রথীন্দ্র ও তাঁর ছোট ভাই-বোনেরা হলেন পিতৃহারা আর মাতা বীরপুদি চাকমা হলেন অকালে বিধবা তিনি (রথীন্দ্র) পিতার অকালমৃত্যুতে এতটুকু শোকাহত হলেন না বরং শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিনি চিন্তা করতে থাকেন, জগতে কেউ অমর নয় জন্ম হলেই সকলকে এরূপ নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হয় তাকে কোনো শক্তি দিয়ে রোধ করা সম্ভব নয় যে-পিতা এতদিন পরিবারের সকল সমস্যা সমাধান করতেন, তাঁর অবর্তমানে যুবক রথীন্দ্রের কাঁধেই সে-দায়িত্ব বর্তালো পিতা-মাতার প্রথম সন্তান হওয়ায় তাঁর উপরেই দায়িত্ব বর্তাবে, এটাই তো স্বাভাবিক

মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসারে উপার্জনক্ষম কর্তার অবর্তমানে নেমে আসে আর্থিক অনটন তাঁর অপর ভাই-বোনেরা ছোট হওয়ায় পরিবারের সব দায়িত্ব যুবক রথীন্দ্র ও মাতা বীরপুদির উপর মাতা পুত্রের কঠোর পরিশ্রমে আর্থিক অনটন কিছুটা লাঘব হওয়ায় ভাই-বোনেরা সুখে-দুঃখে বড় হতে থাকে সংসারে আরও স্বচ্ছলতার আশায় মায়ের ইচ্ছায় ও উৎসাহে রথীন্দ্রকে মিজোরাম থেকে রেশম এনে ফেরি করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করার ব্যবসায় নামতে হলো এ ব্যবসায় লাভ হওয়ায় পরিবারে কিছুটা স্বচ্ছলতা ফিরে আসে তবে তিনি চিন্তা করতে থাকেন এ ব্যবসায় স্বচ্ছলতা আসলেও সংসার-বন্ধনে জড়িত হওয়ার ভয় থাকেকারণ, নারীরাই তো রেশম সুতা কিনে থাকে তাই এ রেশম ব্যবসা ছেড়ে অন্য আয়ের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন

বিকল্প আয়ের উৎস খুঁজতে গিয়ে তাদের গ্রামেরই অধিবাসী মগবান মৌজার তৎকালীন হেডম্যান বাবু বিরাজ মোহন দেওয়ানের রেশনিং-এর দোকানে চাকরি নেন এ সময় রথীন্দ্র অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সাথে দোকান পরিচালনা করতে থাকেন দোকানের মালামাল বিক্রির সময় তিনি বিশৃঙ্খলা মেনে নিতেন না দেখা যায় ছোটকাল থেকেই তিনি সুশৃঙ্খল ও পবিত্র জীবন-যাপন করতে পছন্দ করতেন তাই তিনি রেশনিং-এর দোকানে বিশৃঙ্খলা মেনে নিতেন না এদিকে তিনি নিজের সততা, বুদ্ধিমত্তা ও গুণাবলীর কারণে বাজারে অচিরেই সকলের প্রিয় হয়ে উঠলেন এবং তাঁকে অনেকে বলতেন, রথীন্দ্র, তোমার রাজ্যশাসন করার মতো জ্ঞান, বুদ্ধি, কৌশল বিদ্যমান তুমি রাজ্যশাসন করতে পারবে বাবু বিরাজ মোহন দেওয়ানের দোকানে চাকরির সুবাদে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার অন্তর্গত নাইখাইন নিবাসী বাবু গজেন্দ্র লাল বড়য়ার সাথে রথীন্দ্রের পরিচয় হয় গজেন্দ্র বাবু সে-সময় তবলছড়ি বাজারে চিকিৎসা ব্যবসায় রত ছিলেন তিনি দীর্ঘদিন বার্মার রেঙ্গুনে অবস্থান করায় বুদ্ধধর্ম বিষয়ে তাঁর প্রচুর জ্ঞান ছিলতিনি একজন ধর্মপ্রাণ লোক ছিলেন দুজনের সমমনার কারণে অচিরেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে সময় সুযোগ পেলেই দুজনে ধর্মালোচনায় মেতে উঠতেন একসময় রথীন্দ্রের মনে প্রব্রজ্যা গ্রহণের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে তাই দৈনন্দিন কাজে কোনোভাবেই মন বসে না প্রব্রজ্যা গ্রহণের ইচ্ছা মনে মনে পোষণ করলেও দোকানের কাজ-কর্ম নিপুণ হাতে সম্পাদন করতেন একদিন কথা প্রসঙ্গে তাঁর প্রব্রজ্যা গ্রহণের আকাক্সক্ষা গজেন্দ্র বাবুকে বললেন এ কথা শুনে গজেন্দ্র বাবুও রথীন্দ্রকে প্রব্রজ্যা গ্রহণের জন্য আরও উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগালেন সিদ্ধান্ত হলো, চট্টগ্রাম শহরের নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে প্রব্রজ্যাগ্রহণ কার্য সুসম্পন্ন করা হবে কারণ, বিহারাধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাস্থবির সে যুগের বিএ পাশ ভিক্ষু ছিলেন তাই পরিকল্পনা-অনুযায়ী প্রব্রজ্যা গ্রহণের দিনক্ষণ ঠিক করা হলো আজন্ম লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলায় রথীন্দ্রও যেন খুশিতে আত্মহারা প্রব্রজ্যার জন্য সকলের নিকট থেকে বিদায় নিতে হবে ভাবলেন, প্রথমে দোকানের কর্তাবাবু দাদু সম্পর্কীয় বিরাজ মোহন দেওয়ানের কাছে তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়ে বললেন, দাদু, আমাকে আশীর্বাদ করুন, যেন আমার স্বপ্ন পূরণ হয় আমার প্রস্তুতি চূড়ান্ত, চট্টগ্রাম নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করব তিনি রথীন্দ্রকে অনুমতি দিয়ে বললেন, সে পথ তো ভীষণ কণ্টকময় তবু আশীর্বাদ করি যেন তোমার চলার পথ মসৃণ হয়

দাদু বিরাজ মোহন দেওয়ানের অনুমতি পেয়ে মাসহ পাড়া-প্রতিবেশীদের নিকট থেকে বিদায় নিতে এবার জন্মস্থান মোরঘোনা গ্রামের দিকে রওনা দিলেন এদিকে মা বীরপুদিও ছেলের বিয়ের উপযুক্ত বয়স চিন্তা করে উপযুক্ত এক যুবতিকে ঠিক করে রেখেছিলেন স্নেহময়ী মা ভাবতে থাকেন, এবার ছেলেকে অবশ্য বিয়ে করাতে হবে যদিও এর আগে আমার কথাই শুনেনি, পাত্তা দেয়নি তা ছাড়া ছেলের বয়স তো কম হয়নি ঊনত্রিশ বছর হয়েছে একটি ছেলেকে নিয়ে মা-বাবা যেরূপ স্বপ্ন দেখতে থাকেন, তিনিও তাঁর ব্যতিক্রম নন কিন্তু পুত্রের চিন্তা-চেতনা সম্পূর্ণ মায়ের বিপরীত মা পুত্রের কৃতসংকল্পের কথা জেনে তাঁকে বাধা দিতে পারেননি বুকের ধন পুত্র তাকে ছেড়ে চলে যাবে, যা তিনি ভাবতেই পারেন না অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রশ্ন করতে থাকেন, কোথায় প্রব্রজ্যা নিবে? প্রব্রজ্যা নিলে কি তার সাক্ষাৎ পাবেন? এমনি কতো প্রশ্ন রথীন্দ্র বলেন, সব ঠিক আছে চট্টগ্রামের নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে প্রব্রজ্যাগ্রহণ আর ধর্মীয় বন্ধনে সুসম্পর্কিত গজেন্দ্র বাবুর সাথে চলে যাব সেখানে অবশিষ্ট কাজ সুসম্পন্ন করব রথীন্দ্র গৃহত্যাগের আগে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলের সাথে সুখ-দুঃখ নিয়ে আলাপ করতে থাকেন অবশেষে কাক্সিক্ষত দিন চলে এলো রথীন্দ্র স্নেহময়ী মায়ের পদধূলি নিয়ে এ যাবৎ কৃত সকল ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাইলেন আর মাও প্রাণ খুলে বুকের ধন পুত্রকে আশীর্বাদ করলেন, যেন যাত্রা তাঁর শুভ হয়, উদ্দেশ্য সফল হয় আদরের ছোট ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নেন তার পর রাঙামাটি শহরে এসে দাদু বিরাজ মোহন দেওয়ানেরও আশীর্বাদ নিয়ে গজেন্দ্র লাল বড়য়ার সাথে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছে বুকভরা আশা ও কাক্সিক্ষত সেই স্বপ্নপূরণের সাধ নিয়ে নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন কারণ, বিহার অধ্যক্ষ শ্রীমৎ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাস্থবির (বিএ পাশ) উচ্চ শিক্ষিত ভিক্ষু তাই রথীন্দ্রের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তিনি গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং তাঁর মনের গভীরে থাকা সব (লোকোত্তর ধর্মবিষয়ক) প্রশ্নের সুন্দর সমাধান দিতে সক্ষম হবেন

অবশেষে, তাঁরা শ্রীমৎ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাস্থবিরের নিকট উপস্থিত হয়ে বন্দনাপূর্বক প্রব্রজ্যা গ্রহণের অনুমতি প্রার্থনা করলেন ভন্তে রথীন্দ্রের প্রব্রজ্যাগ্রহণের দৃঢ় মনোবল ও কঠোর সংকল্প দেখে অত্যন্ত আনন্দিত মনে অনুমতি প্রদান করলেন অতঃপর গজেন্দ্র লাল বড়য়া রথীন্দ্রকে সাথে নিয়ে চট্টগ্রাম শহর ঘুরে বেড়াতে বের হলেন কারণ, প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো যাবে না প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অপূর্ব সমাহার চট্টগ্রাম যেন এসব দৃশ্য দেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায়, মন ভরে উঠে! রথীন্দ্র যেমন প্রব্রজিত হয়ে দুঃখমুক্তি নির্বাণ অনুসন্ধানের আনন্দে আত্মহারা, তেমনি গজেন্দ্র লাল বড়য়াও তাঁকে প্রব্রজিত হতে সহায়তা করতে পারায় নিজেকে ধন্য মনে করছেন ঘুরতে ঘুরতে এক পর্যায়ে গজেন্দ্র বাবু রথীন্দ্রকে তাঁর পূর্বপরিচিত এক ধনী মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীর কথা বললেন, যিনি একজন সৎ নিষ্ঠাবান পাহাড়ি লোকের সাথে রাঙামাটিতে অংশীদারের ভিত্তিতে ব্যবসা করতে চান রথীন্দ্র ইচ্ছে করলে সে সুযোগ গ্রহণ করতে পারে গজেন্দ্র বাবুর এমন লোভনীয় প্রস্তাবে কিছুক্ষণের জন্য হলেও রথীন্দ্রের মন মোহাচ্ছন্ন হয়ে গেল কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলেন, আমি এ কী ভাবছি? এ তো আমার কাক্সিক্ষত স্বপ্ন নয় এভাবে নিজের বিবেকের সাথে আলোচনা করে রথীন্দ্র বিপথগামী মনকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনলেন সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শুভ ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে ১৯৪৯ সালে রথীন্দ্র শ্রীমৎ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান মহাস্থবিরের নিকট দুর্লভ প্রব্রজ্যা জীবন লাভ করলেন সেদিন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ও আনন্দঘন একটি মুহূর্ত তখন থেকে তিনি পরিচিত হলেন রথীন্দ্র শ্রামণনামে

প্রব্রজিত হয়ে দীক্ষাগুরুর সংগ্রহশালায় থাকা গ্রন্থসমূহ বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা আর আগ্রহ নিয়ে অধ্যয়ন করে আয়ত্ত করলেন সেই সাথে শ্রামণের প্রতিপালনীয় নিয়ম-নীতি রপ্ত করে নিলেন শুরু করলেন বুদ্ধের সময়কালে ভিক্ষু-শ্রামণদের ন্যায় বিনয়ানুকূল জীবনযাপন প্রব্রজিত জীবনে রবীন্দ্র শ্রামণ নামে তাঁর এক সতীর্থ শ্রামণও ছিল যার সাথে অনেক সময় ধর্ম বিষয়ে আলোচনা হতো প্রব্রজিত জীবন কিছুদিন অতিবাহিত হলে ধুতাঙ্গশীল প্রতিপালনের অংশ হিসেবে পি-পাত্র (সাবেক) হাতে নিয়ে শহরের বিভিন্ন অলি-গলিতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে পি-চারণ করতেন যদিও পি-চারণ করতে গিয়ে তাঁকে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হতে হয়েছিল একদিন পি-চারণ থেকে ফেরার সময় রাস্তা পার হতে গিয়ে (তখন রাস্তার মাঝখানে এসে পৌঁছেছেন, হঠাৎ একটি গাড়ি দ্রুতবেগে আসছিল তাঁর সম্মুখে পরক্ষণে দেখেন তিনি রাস্তার অপর পারে দাঁড়িয়ে) বিরাট দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যান প্রব্রজিত হয়ে রথীন্দ্র শ্রামণ বুদ্ধের সমসাময়িক ভিক্ষু-শ্রামণদের ন্যায় জীবন যাপন করতেন

বিহারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা-পবিত্রতা রক্ষা, গুরুসেবাসহ যাবতীয় কর্তব্য অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন সে কারণে তিনি গুরুর একান্ত বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠলেন তাই কোনো সময় কোথাও ফাং-এ গেলে রথীন্দ্রকে বিহারের সমস্ত জিনিসপত্র দেখাশুনার দায়িত্ব দিয়ে যেতেন এভাবে দিন যাপনের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রব্রজিত জীবন চলছিল

একদিন গুরুর নিকট লোকোত্তরবিষয়ক প্রশ্ন করতে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর নিকট এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব নয় আর গুরুও অকপটে স্বীকার করলেন, তিনি লোকোত্তর জ্ঞানের অধিকারী নন গুরুর নিকট হতে এমন অপ্রত্যাশিত উত্তর তিনি আশা করেননি একদিকে মহাবিহারের বিভিন্ন ঝামেলা, অন্যদিকে গুরুর নিকট এমন অপ্রত্যাশিত উত্তর পেয়ে তিনি চিন্তা করতে লাগলেন, এখানে থেকে কীভাবে ধ্যান-সাধনা? প্রায় তিন মাস অবস্থানের পর দুঃখমুক্তির প্রবল আকাক্সক্ষা নিয়ে গুরুর সান্নিধ্য ছেড়ে এক শুভক্ষণে চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন পথিমধ্যে বেতাগী বনাশ্রমে অবস্থানরত সাধক শ্রীমৎ আনন্দমিত্র স্থবিরের নিকট উপস্থিত হন উদ্দেশ্য, সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে তাঁর নিকট ভাবনা পদ্ধতি ও আরণ্যিক জীবন সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা তার পর সেখান থেকে লঞ্চে করে চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারে এসে পৌঁছলেন রথীন্দ্র শ্রামণ চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভন্তে উঃ পা-িতা মহাথেরর সাথে সাক্ষাৎ করে বন্দনা জানিয়ে চিৎমরমে চলে আসা বিষয়াদি খুলে বললেন উঃ পা-িতা ভন্তের সাথে রথীন্দ্র শ্রামণ আলাপ-আলোচনায় ভাবনা পদ্ধতি, চতুরার্যসত্য, আরণ্যিক জীবন ও লোকোত্তর ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করেন সেই সাথে বিনয় সম্পর্কিত উপদেশও গ্রহণ করেন তাই শ্রদ্ধেয় ভন্তে রথীন্দ্র শ্রামণের বিজ্ঞোচিত ও বিনয়সম্মত আচার-আচরণ দেখে প-িত মইসাংনামে সম্বোধন করতেন চিৎমরমে কিছুদিন অবস্থান করে গভীর অরণ্যে ধ্যান-সাধনার অনুকূল স্থান সন্ধান করতে করতে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে কর্ণফুলী নদীর তীরে ধনপাতা নামক ছড়ার এক নির্জন স্থানের সন্ধান লাভ করলেন শেষ পর্যন্ত ধনপাতায় গহীন অরণ্যে নির্জনে গুরুবিহীন একাকী প্রায় বার বছর সাধনা করেছিলেন

১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের কারণে রথীন্দ্র শ্রামণের আবাসস্থলের পার্শ্ববর্তী সমস্ত এলাকা জলমগ্ন হওয়ায় উদ্বাস্তু হয়ে লোকজন বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এতে রথীন্দ্র শ্রামণের ধ্যানস্থল জলমগ্ন না হলেও এলাকার লোকজন না থাকায় তাঁকে নিশিমনি চাকমার প্রার্থনায় দীঘিনালায় চলে যেতে হয় স্থানান্তরিত হলেও রথীন্দ্র শ্রামণ তাঁর ধ্যান-সাধনায় মগ্ন থাকেন সেখানে এক পর্যায়ে চাকমা রাজগুরু শ্রীমৎ অগ্রবংশ স্থবির ও শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী স্থবিরের অনুপ্রেরণায় ১৯৬১ সালে রথীন্দ্র শ্রামণ উপসম্পদা নিতে সম্মত হন মাইনী নদীর উদকসীমায় উপসম্পদা দেওয়া হয় এবং তখন তাঁর পূর্বের নাম বদল করে রাখা হয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ ভিক্ষু তবে রথীন্দ্র শ্রামণ নাম হলেও দীর্ঘদিন বনে ধ্যান-সাধনায় জীবন যাপন করায় বন শ্রামণনামে তিনি সকলের নিকট বেশ সুপরিচিত আর উপসম্পদা গ্রহণ করে বন শ্রামণবনভন্তে নামেই পরিচিত হন বনভন্তে ধ্যান-সাধনার ফাঁকে ফাঁকে কিছু কিছু ফাং গ্রহণ করেন আর সদ্ধর্ম বিষয়ে উপদেশ প্রদান করতে থাকেন সদ্ধর্মপিপাসুদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে পূজ্য বনভন্তের নাম আর অলৌকিক ঘটনার বিভিন্ন কাহিনি দীঘিনালায় ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল প্রায় দশ বছর অবস্থানের পর পূজ্য ভন্তে ১৯৭০ সালের শেষের দিকে লংগদু তিনটিলা বনবিহারে চলে যান লংগদুতে প্রস্তাবিত তিনটিলা বনবিহারের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় পূজ্য ভন্তে দূরছড়ি চলে যান সেখানে মাস কয়েক অবস্থানের পর লংগদু তিনটিলা বনবিহারে চলে আসেন ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিবাহিনী ও হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছিল তখন পূজ্য বনভন্তে তিনটিলা বনবিহারে প্রচ- যুদ্ধ চলাকালে পূজ্য ভন্তে কিছুদিনের জন্য নিরাপদ স্থানে সরে যান দেশ স্বাধীন ও যুদ্ধ বন্ধ হলে পূজ্য ভন্তে আবার তাঁর আবাসস্থলে ফিরে আসেন পূজ্য ভন্তের উপদেশ বাণী ও বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার বিবরণ পার্বত্য অঞ্চল তথা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে বৌদ্ধ-অবৌদ্ধ অগণিত ভক্ত আসতে থাকে তাঁকে এক নজর দেখতে ও আশীর্বাদ নিতে ধীরে ধীরে বিহারেরও উন্নতি হতে থাকে ১৯৭৩ সাল পার্বত্য অঞ্চল তথা এদেশিয় বৌদ্ধদের এক স্মরণীয় ঐতিহাসিক দিনপূজ্য বনভন্তের নামএদেশি বৌদ্ধদের হৃদয়ে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বুদ্ধের সময়কালে মহাউপাসিকা বিশাখা কর্তৃক প্রবর্তিত নিয়মে ২৪ ঘন্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা রঙ করে শুকায়ে কাপড় বুনে চীবর তৈরি করে বনভন্তে প্রমুখ ভিক্ষুসংঘকে দান করা হলো পূজ্য ভন্তেকে ভিত্তি করে মৌলিক বুদ্ধধর্মের নবজাগরণ সৃষ্টি হয় এবং ধর্মের নামে অধর্ম, মিথ্যাদৃষ্টি ও অন্ধকুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করতে থাকেন দায়ক-দায়িকারা বুঝতে শুরু করে ধর্ম কী, অধর্ম কী, মিথ্যাদৃষ্টি কী, সম্যকদৃষ্টি কী? ত্যাগ করতে থাকে মিথ্যাদৃষ্টি ও অধর্মকে দায়ক-দায়িকা তথা আপামর জনসাধারণের মাঝে উচ্চারিত হতে থাকে পূজ্য বনভন্তের নাম যে নাম উচ্চারণ করলে মন হয় পুতপবিত্র অগণিত ভক্তদের মাঝে চাকমা রাজ পরিবার অন্যতম তাই রাজমাতা বিনীতা রায় রাজ পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও রাঙামাটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পূজ্য বনভন্তেকে রাঙামাটিতে স্থায়ীভাবে অবস্থানের জন্য ফাং করলে তা তিনি সাদরে গ্রহণ করেন তার পর ১৯৭৪ সালের বর্ষাবাস যাপন করেন নবপ্রতিষ্ঠিত রাজবন বিহারে বর্ষাবাসের পর ফিরে যান তিনটিলা বনবিহারে পরে ১৯৭৬ সালে স্থায়ীভাবে রাজবন বিহারে চলে আসেন

পাহাড় ঘেরা রাঙামাটির এক পার্শ্বে সবুজে বেষ্টিত ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় রাজবন বিহার যেখানে জগৎ দুর্লভ সর্বজনপূজ্য আর্যশ্রাবক ষড়াভিজ্ঞ অর্হৎ পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তে দীর্ঘ (১৯৭৪, ১৯৭৬-২০১২ খ্রিষ্টাব্দশুধুমাত্র ১৯৯৯ সালের বর্ষাবাস যাপন করেছিলেন ধর্মপুর আর্যবন বিহার, খাগড়াছড়িতে) প্রায় ৩৪টি বছর অবস্থান করেছিলেন স্থল ও জলপথে যোগাযোগ সুবিধা হওয়ায় প্রতিদিন অগণিত দেশি-বিদেশি পুণ্যার্থী আর পর্যটকের সমাগমে রাজবন বিহার থাকত সদা মুখরিত এখানে সুদীর্ঘকাল অবস্থান করে পূজ্য ভন্তে পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষত রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আনাচে-কানাচে, গ্রামে-গঞ্জে এবং (চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের) বিভিন্ন অঞ্চলে ফাং-এ গিয়ে আপামর দায়ক-দায়িকাদের অন্ধকুসংস্কার থেকে সম্যকদৃষ্টি আর মৌলিক বুদ্ধধর্ম তথা সত্যধর্মের মাধ্যমে আলোকিত করেছেন এতে কুসংস্কারাচ্ছন্ন দায়ক-দায়িকাদের মাঝে ত্রিরতেœর প্রতি ও কর্ম-কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস জাগ্রত হয়েছে বলা যায়, ধর্মীয় জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে

পূজ্য ভন্তে ১৯৮১ সালে মহাস্থবিরঅভিধায় অভিষিক্ত হন আশির দশকের শেষের দিকে দেশের অভ্যন্তরে জেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক, সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ পূজ্য ভন্তের সাথে সাক্ষাৎ ও আশীর্বাদ পেতে ছুটে আসেন রাজবন বিহারে দিনে দিনে পূজ্য ভন্তের শিষ্যসঙ্ঘ ও ভক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং রাজবন বিহারের উন্নয়নের গতিধারা চলতে থাকে আর বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়ধর্মপ্রচারের গতিও বেগবান হয় তাই নব্বই-এর দশকে বিভিন্ন এলাকায় শ্রদ্ধাবান দায়ক-দায়িকাদের আকুল প্রার্থনায় পূজ্য ভন্তে শাখা বনবিহার স্থাপনের অনুমতি প্রদান করেন এমনকি দেশের বাইরে ভারতের ত্রিপুরা (মনুগাং থেকে) ও মিজোরামের বড়পনছড়ি থেকেও শাখা বনবিহার স্থাপনের জন্য প্রার্থনা আসে ভাগ্য ভালো তারা পেয়েও যান অনুমতি নাম হলো মনুগাং বনবিহার, মায়নামা, ধলাই, ত্রিপুরা, ভারত; ভূ-জয়ন্তী বনবিহার, বড়পনছড়ি, মিজোরাম, ভারত এসব শাখা বনবিহার স্থাপনের ফলে দূর-দূরান্তের প্রত্যন্ত বিভিন্ন এলাকার দায়ক-দায়িকারা দান-শীল-ভাবনা আর প্রব্রজ্যা গ্রহণের মতো পুণ্য অনায়াসে সম্পাদন করতে পারছেন তাই তারা আজ রাজবন বিহার ও পূজ্য বনভন্তের বিভিন্ন শাখা বনবিহারে প্রতিনিয়ত পুণ্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করেই চলেছেন এরই মধ্যে সদ্ধর্মশাসন প্রতিরূপ দেশ শ্রীলঙ্কা, বার্মা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এমনকি ভারত থেকেও আসতে থাকে অসংখ্য পুণ্যার্থী দায়ক-দায়িকা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, জ্ঞানী-গুণী ও ভিক্ষু-শ্রামণের তা ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও সাধারণ লোক থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছুটে আসেন উদ্দেশ্য এক নজর রাজবন বিহার দেখা, পূজ্য বনভন্তেকে দান করা ও লোকোত্তর এই মহামানবের আশীর্বাদ গ্রহণ করা পূজ্য বনভন্তের আশীর্বাদ নিতে প্রতিরূপ দেশ থাইল্যান্ডের ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের ভিক্ষুসংঘ ও দায়ক-দায়িকারা আসেন ২৫৫৫ বুদ্ধবর্ষের (২০১১ সালের) বর্ষাবাসে উদ্দেশ্য ৮ জানুয়ারি ২০১২ পূজ্য বনভন্তের ৯৪তম জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সংখ্যক কুলপুত্রকে প্রব্রজ্যা দেয়া সিদ্ধান্ত হয় ২৯৪ জনকে প্রব্রজ্যা দেয়া হবে ২০১১ সালের শেষের দিকে আসতে থাকে ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের ভিক্ষুসংঘ ও দায়ক-দায়িকার প্রতিনিধি দল শুরু হয় গণপ্রব্রজ্যা অনুষ্ঠানের জোর প্রস্তুতি ২০১২ সালের শুরুতে কাক্সিক্ষত সেই গণপ্রব্রজ্যা অনুষ্ঠান ও পূজ্য ভন্তের জন্মদিনটিকে মহাসাড়ম্বরে জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজনের অক্লান্ত পরিশ্রম দেখতে দেখতে সন্নিকটে চলে আসে মাহেন্দ্রক্ষণ ২৯৪ জনের গণপ্রব্রজ্যার দিনটি তখন চারিদিকে সুন্দর সুশৃঙ্খল পরিবেশ অপেক্ষা করতে থাকে পূজ্য বনভন্তের যা দেখে শাসন-প্রতিরূপ দেশের কথা-ই মনে করিয়ে দেয় কিছুক্ষণ পর আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত সাধু! সাধু!রবের মধ্যে পূজ্য ভন্তে মঞ্চে আগমন করেন এবং তাঁর জন্য নির্দিষ্ট আসনে বসেন যদিও তখন পূজ্য ভন্তের শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কারণে কষ্ট হচ্ছিল পঞ্চশীলাদি গ্রহণসহ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে পূজ্য ভন্তে প্রব্রজ্যাপ্রার্থী ও সমবেত দেশি-বিদেশি পুণ্যার্থীদের উদ্দেশ্যে সদ্ধর্মদেশনা প্রদান করে নিজ আবাসস্থলে ফিরে আসেন

অবশেষে ফিরে এলো পুণ্যময় সেই দিনটি অর্থাৎ ৮ জানুয়ারি ২০১২ সাল মূল বিহার সীমানায় খুব ভোর থেকে পূজ্য ভন্তের শিষ্যসংঘ ও পূজ্য ভন্তেকে জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমাণ সেই সাথে ধম্মকায়ার উদ্যোগে ও রাজবন বিহারের সহায়তায় নব প্রব্রজিত শ্রামণসংঘ আর বাইরে ফুল ও অন্যান্য দানীয়সামগ্রী হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে অগণিত দেশি-বিদেশি দায়ক-দায়িকা উদ্দেশ্য একটাই পূজ্য ভন্তেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে পুণ্যার্জন করা যে-পুণ্য ইহ-পরকালে সুখ বয়ে নিয়ে আসবে এবং অন্তিমে নির্বাণ সুখে স্নাত করবে যথাসময়ে ভিক্ষুসংঘ ও দায়ক-দায়িকাদের পক্ষ থেকে পূজ্য ভন্তেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের পর ভিক্ষুসংঘের পানীয় (প্রাতঃরাশ) সমাপ্ত হলো তার পর মূল অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হলো যে অনুষ্ঠানের জন্য এত বিশাল আয়োজন, যে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য ভিক্ষুসংঘ ও দায়ক-দায়িকাদের বিপুল উৎসাহ, উদ্দীপনা ও অধীর আগ্রহ নিয়ে থাকতে দেখা যায় রাজবন বিহারের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী টেকনিক্যাল ও পিটিআই সংলগ্ন বিশাল মাঠটি অনুষ্ঠানের জন্য সুসজ্জিত করা হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান মাঠটি লোকে লোকারণ্য শুধু অপেক্ষার পালা, কখন পূজ্য বনভন্তে সশিষ্যে আগমন করবেন, নির্ধারিত আসনে উপবেশন করবেন? অনুষ্ঠানে দায়ক-দায়িকাদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন এই রাজবন বিহারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বাবু দিলীপ বড়য়া, ধর্মপ্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোঃ শাহজাহান মিয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বাবু দীপঙ্কর তালুকদার, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাবু নিখিল কুমার চাকমা, রাঙামাটি সেনা রিজিয়নের বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, জেলা প্রশাসক শ্রী সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদুল হাসান, জেলা বিএনপি সভাপতি অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান (সাবেক জেলা যুগ্ম জর্জ, বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক) সহ জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন সকাল ৯:০০ ঘটিকার দিকে রাজবন বিহার কর্তৃপক্ষ ও ধম্মকায়া ফাউন্ডেশন, থাইল্যান্ডের যৌথ উদ্যোগে নবপ্রব্রজিত ২৯৪ জন শ্রামণেরসহ শত শত ভিক্ষু-শ্রামণের সাথে নিয়ে মুহুর্মুহু সাধুবাদ ধ্বনির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান মঞ্চে নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করেন পূজ্য বনভন্তের জন্মদিনকে উপলক্ষ করে রচিত ধর্মীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার শুভ সূচনা হয় অভ্যাগত অতিথিবর্গের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর দেবমানব পূজ্য, আমার আপনার সকলের শ্রদ্ধাভাজন আর্যশ্রাবক লোকোত্তর মহামানব পরমপূজ্য শ্রদ্ধেয় বনভন্তের আনুষ্ঠানিক সর্বশেষ (সময়ের স্বল্পতায় সংক্ষিপ্ত) দেশনা শুরু করেন দেশনায় তিনি চাকমা ভাষায় বলেন :

ত্যাগেই সুগ, ত্যাগেই মহিমা, ভোগেই দুঃখের মূল, ভোগেই দোষপূর্ণ, সমস্ত জীবের প্রতি দোয়ে গড়িবা, নির্দয় ন-অবা, নির্দয় অলেগোই দেবেদাগুনে ভোগ গড়ন, সমস্ত প্রাণীর প্রতি দোয়ে গড়ি থাগ’, নির্দয় ন-অবা বুঝিলা? ত্যাগোই সুখ, ধর্ম উত্তমভাবে আচরণ গড়িবা আমি উত্তমভাবে গড়িবং অন্যায় ন-গড়িবং কাররে ধর্ম যদি উত্তমভাবে আচরণ গড়, কাররে অন্যায় ন-গড়, ইহকাল-পরকাল সুগে থেই পাড়িবা হে-যান? উত্তমভাবে গড়, কাররে অন্যায় ন-গড়িবা অন্যায় গড়িলে দুগ অয়, পাপ অয় উত্তমভাবে গড়িলে ইহকাল-পরকাল সুগেই থেবা, বুঝ? উত্তমভাবে গড় অয়েই বেল সাধু, সাধু, দুয়বেল

অর্থাৎ ত্যাগই সুখ, ত্যাগই মহিমা; ভোগই দুঃখের মূল, ভোগই দোষপূর্ণ সমস্ত জীবের প্রতি দয়া করবে, নির্দয় হবে না, দেবতারাও ভোগ করে, সকল প্রাণীর প্রতি দয়াশীল হতে হবে নির্দয় হবে না, বুঝেছ? ত্যাগই সুখ, ধর্ম উত্তমভাবে গ্রহণ করবে কাউকেও অন্যায় করবে না, ধর্ম উত্তমভাবে আচরণ করতে হবে, কাউকে অন্যায় না করলে ইহকাল-পরকাল সুখে থাকতে পারবে ধর্ম উত্তমভাবে কর, কাউকে অন্যায় করবে না অন্যায় করলে দুঃখ হয়, পাপ হয় উত্তমভাবে করলে ইহকাল-পরকাল সুখে থাকতে পারবে উত্তমভাবে করএরূপ বলে তাঁর দেশনা সমাপ্ত করেন পূজ্য ভন্তের সদ্ধর্মদেশনা শেষ হলে অনুষ্ঠানও সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়

অনুষ্ঠানের পর থেকে পূজ্য ভন্তে ঠান্ডাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হন পূজ্য ভন্তের অসুস্থতা বেড়ে গেলে চিকিৎসার জন্য ডাক্তার নিয়ে আসা হয় কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পূজ্য ভন্তে চিকিৎসায় অনীহা প্রকাশ করলে ডাক্তার কোনো চিকিৎসা না দিয়ে চলে যান এভাবে পূজ্য ভন্তের ঠান্ডাজনিত সমস্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে আর খাওয়া-দাওয়াও সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে এমনকি অনেক সময় কোনো খাদ্য/পানীয়ও গ্রহণ করেন না এ অবস্থায় ২৫ জানুয়ারি ২০১২ ইং তারিখ সকালে পানীয় (প্রাতঃরাশ) খাওয়ার পরে পূজ্য ভন্তেকে চিকিৎসার জন্য ডা. সুপ্রিয় বড়য়া, ডা. উদয় শংকর দেওয়ান, ডা. সুচরিতা দেওয়ান, ডা. সলিল বড়য়া ও ল্যাব টেকনিশিয়ান মুরতি সেন চাকমাকে নিয়ে আসা হয় প্রাথমিক চেকআপ করার পর পূজ্য ভন্তেকে স্যালাইন দেয়া হয় বিকালের দিকে চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ উপাসক-উপাসিকা পরিষদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে পূজ্য ভন্তেকে আয়ুসংস্কারের জন্য প্রার্থনা করেন সারাদিন স্যালাইন চলার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে সন্ধ্যার দিকে আবার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় শ্বাসকষ্টের জন্য আলগা আলগা করে (চিকিৎসাশাস্ত্রমতে) নেবুলাইজার মেশিন/অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়, তাতে শ্বাসকষ্টের সামান্যতম উন্নতিও হয় রাত ৮:০০/৮:৩০ ঘটিকার দিকে পানীয় খুঁজলে ছোট্ট একটি গ্লাসে করে কোকাকোলা দেয়া হয়, সেখান থেকে সামান্য পান করেন পূজ্য ভন্তের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ডা. নিখিল চন্দ্র বড়য়া, ডা. সলিল বড়য়া ও ডা. মংক্য চিং মারমা সারারাত্রি চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন রাত ২:৩০ ঘটিকার (তখন ২৬ জানুয়ারি ২০১২) দিকে হঠাৎ করে পূজ্য ভন্তের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে আশপাশের কয়েকজন ভিক্ষু একত্রিত হয়ে সূত্রপাঠ করেন আর সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, ডা. নীহারেন্দু তালুকদার, ডা. সুপ্রিয় বড়য়া ও ডা. নুয়েন খীসা ছুটে আসেন সকালে ভিক্ষুসংঘের পানীয় খাওয়ার সময় পূজ্য ভন্তের স্যালাইন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় ডাক্তার ডেকে তা আবার সচল করা হয়, স্যালাইন চলতে থাকে আরও চিকিৎসা বিষয়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ডা. সুপ্রিয় বড়য়া, ডা. সুশোভন দেওয়ান ও ডা. প্রতীক দেওয়ান আসেন এ অবস্থায় বিকাল বেলায় চট্টগ্রাম থেকে ডা. সুজাত পাল, ডা. হেনা বড়য়া, ডা. অসীম বড়য়া ও ডা. শৈবাল বড়য়া এসে পূজ্য ভন্তের চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তারদের সাথে একটি মেডিকেল বোর্ড বসে শেষ বিকালে পূজ্য ভন্তের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে সন্ধ্যায় পূজ্য ভন্তের শীর্ষ পর্যায়ের ভিক্ষুসংঘ, উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, রাঙামাটির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও পূজ্য ভন্তের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক দলের সমন্বয়ে পূজ্য ভন্তের চিকিৎসা বিষয়ে জরুরি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় আলোচনায় চিকিৎসক দল মত দেন এভাবে এ অবস্থায় পূজ্য ভন্তেকে চিকিৎসা দেয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যে-কোনো মুহূর্তে একটা কিছু ঘটেও যেতে পারে তাই আলোচনা সভায় চিকিৎসক দলের পরামর্শমতে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে পূজ্য ভন্তেকে উন্নত ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্বলিত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় তবে রাতের বেলায় এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সের উড়তে অসুবিধা হওয়ার কারণে পরদিনই অর্থাৎ ২৭ জানুয়ারি ২০১২ সাল সকালের দিকে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় আর পূজ্য ভন্তেকে চিকিৎসা সেবায় সহযোগিতার জন্য রাত সাড়ে ৯টায় দিকে ভিক্ষুসংঘের একটি অগ্রবর্তী দল রওনা দিই পরদিন ২৭ জানুয়ারি ২০১২ সাল সকাল ৬:১৫/৭:১৫ ঘটিকার সময় ঢাকাতে পৌঁছি সেখানে পৌঁছে উপাসক বাবু রনেল চাকমার কোয়াটারে পানীয় (প্রাতঃরাশ) খাওয়ার পর স্কয়ার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিই আর সেখানে পৌঁছে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তাড়াতাড়ি রাঙামাটি পাঠানোর জন্য তদবির করতে থাকি এদিকে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় এখানকার কর্তৃপক্ষের আবহাওয়া সম্পর্কে ক্লিয়ারেন্স (এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভেন্টিলেশনেরও কিছু সমস্যা মেরামত করতে দেরি হওয়ায়) না পাওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সও রওনা দিতে দেরি হচ্ছে আর ওদিকে রাজবন বিহার, রাঙামাটি থেকে অ্যাম্বুলেন্সটিকে তাড়াতাড়ি পাঠানোর জন্য ফোনে বার বার তাগাদা দেয়া হচ্ছিল অবশেষে ১০:৩০/১০:৪৫ ঘটিকার দিকে অ্যাম্বুলেন্স রাঙামাটির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় রাঙামাটি পৌঁছে সব কিছু চূড়ান্ত করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ২:১৫ মিনিটের দিকে স্কয়ার হাসপাতালের ছাদে পূজ্য বনভন্তেকে বহনকারী এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি অবতরণ করে তখন হাসপাতালের প্রচলিত নিয়ম শিথিল করে পূজ্য বনভন্তের শত শত ভক্ত, অনুরাগী হাসপাতালের নিচতলায় ওয়েটিং রুমে অপেক্ষমাণ, উদ্দেশ্য পূজ্য ভন্তেকে এক নজর দেখা তাদের সকলের চেহারায়, চোখে-মুখে বিষন্নতার ছাপ, যেন পরিবেশও ভারাক্রান্ত এয়ার অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে পূজ্য ভন্তেকে সরাসরি ইমার্জেন্সি বিভাগে নিয়ে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আইসিইউ (যাকে বাংলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বলা হয়)-তে ভর্তি করানো হয় সন্ধ্যা ৭:০০ ঘটিকার দিকে শিল্পমন্ত্রী উপাসক দিলীপ বড়য়া সস্ত্রীক পূজ্য ভন্তেকে দেখতে আসলে, আমিও তাদের সাথে পূজ্য ভন্তেকে আইসিইউ-তে দেখে আসি তখন জানানো হয় রাজবন বিহার থেকে নিয়ে আসার সময় যে-সংকটাপন্ন অবস্থা ছিল, কিছুটা উন্নতি হয়েছে রাত ১০:০০ ঘটিকার দিকে ডা. স্নেহ কান্তি চাকমা জানান যেটুকু উন্নতি হয়েছে তাতেই স্থিতিশীল পরবর্তী ২৪ ঘন্টা না হলে অবস্থা জানা সম্ভব নয় ২৪ ঘন্টার পরও স্থিতিশীল অবস্থায় থাকায় ৪৮ ঘন্টা সময় দেয়া হলো এরই মধ্যে পূজ্য ভন্তের রোগমুক্তি প্রার্থনায় কমলাপুরের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহার, মিরপুরের শাক্যমুণি বৌদ্ধ বিহারসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে, এমনকি বৌদ্ধদের প্রতি বাড়িতে বাড়িতেও প্রার্থনা হতে থাকে আর রাজবন বিহারসহ বিভিন্ন শাখা বন বিহারেও পূজ্য ভন্তের রোগমুক্তির প্রার্থনা চলতে থাকে ৪৮ ঘন্টা শেষ হওয়ার আগে জানানো হলো বিদেশে নেয়ার মতো অবস্থা বিরাজ করছে (যদিও শরীরের ভেতরের কিছু কিছু কাজ করছিল না) ইচ্ছা হলে বিদেশে নেয়া যাবে শুরু হলো পাসপোর্ট-ভিসা করার তোরজোড় আর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল ও থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রান্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ লিভার, কিডনী, আতুড়ির বিভিন্ন সমস্যা দূরীকরণে ৩০ জানুয়ারি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ সকাল ১০:০০ ঘটিকার দিকে ডায়ালাইসিস শুরু হয় ঘন্টা খানেক পরে পূজ্য ভন্তে দুর্বল হয়ে পড়লে ডায়ালাইসিস বন্ধ করা হয় পরে পূজ্য ভন্তের শারীরিক অবস্থা দুর্বল হতে থাকলে ৪/৫ জন ভিক্ষু সূত্রপাঠ করতে থাকেন এক পর্যায়ে পূজ্য ভন্তের শারীরিক অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়লে হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে অপেক্ষমাণ সকল ভিক্ষু-শ্রামণকে পূজ্য ভন্তের আইসিইউ রুমে নিয়ে যাওয়া হয় তখন পূজ্য ভন্তের শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে থাকে ডাক্তার, নার্সরা পূজ্য ভন্তের শরীরে লাগানো জীবনরক্ষাকারী সকল যন্ত্রপাতি খুলতে থাকেএকসময় পূজ্য ভন্তের জীবন-প্রদীপ নিভে গেল ৩০ জানুয়ারি ২০১২, ১৭ মাঘ ১৪১৯ বাংলা, সোমবার বিকাল ৩:৫৬ ঘটিকার সময় ভিক্ষু-শ্রামণেরা আর দেশ-বিদেশে অবস্থানরত ভিক্ষু, অনুরাগী সকল দায়ক-দায়িকাদের সাথে ভাগ্যাকাশে নেমে আসে সীমাহীন শোকের ছায়া পূজ্য ভন্তে আমাদের মাঝে জীবিত নেই সত্য কিন্তু তাঁর শারীরিক ধাতু বিদ্যমান এবং তাঁর দীর্ঘদিন প্রচারিত উপদেশবাণী আমাদের মাঝে চির অম্লান যে উপদেশ বাণী প্রতিপালন ও কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে আমরা সকল প্রকার দুঃখ, অন্তরায়, উপদ্রব থেকে রক্ষা পাব যেমন ২৫০০ বছর পরেও তিনি তথাগত বুদ্ধের উপদেশ-বাণী প্রতিপালন ও কর্মসম্পাদন করে বনে-জঙ্গলে ধ্যান-সাধনার সময় রক্ষা পেয়েছেন

 পূজ্য ভন্তের উপদেশ : মিথ্যাদৃষ্টি না হয়ে সম্যকদৃষ্টি হওয়া

মিথ্যাদৃষ্টি কী?

বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘকে বিশ্বাস না করা; কর্ম-কর্মফলকে বিশ্বাস না করা ও চারি আর্যসত্যকে বিশ্বাস না করা

সম্যকদৃষ্টি কী?

 বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘকে বিশ্বাস করা; কর্ম-কর্মফলকে বিশ্বাস করা ও চারি আর্যসত্যকে বিশ্বাস করা বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘকে বিশ্বাস করে, কর্ম-কর্মফলকে বিশ্বাস করে ও চারি আর্যসত্যকে বিশ্বাস করে দান-শীল-ভাবনা এবং শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা অনুশীলন করা কাউকে অন্যায় না করা তিল পরিমাণও কারো ক্ষতি না করা ধর্ম উত্তমরূপে আচরণ করা তখন সেই ধর্মচারীকে ধর্মই রক্ষা করবে

তাই আসুন, সকলে মিলে পূজ্য বনভন্তে ও তথাগত বুদ্ধের উপদেশ মেনে চলি, আর নিজেকে পূজ্য বনভন্তে ও বুদ্ধের উপদেশে সুমন্নত রাখি নিজেকে একজন আদর্শ বৌদ্ধ হিসেবে গড়ে তুলি, গড়ে তুলি আদর্শ বৌদ্ধ পরিবার, গড়ে তুলি আদর্শ বৌদ্ধ সমাজ সুখময় হোক ইহ-পারলৌকিক জীবন সার্থক হোক দুর্লভ মানব জীবন বুদ্ধের শাসন চিরস্থিতি হোক! জয় হোক বুদ্ধশাসনের! জয় হোক বনভন্তের শাসন!

 

লেখক : জিনপ্রিয় ভিক্ষু, অধ্যক্ষ, তপোবন অরণ্য কুটির, মরিচ্যাবিল, রাঙামাটি

Print Friendly, PDF & Email