log1

বনভন্তের আজীবন আবাসস্থল রাজবন বিহার উন্নয়ন প্রসঙ্গে কিছু কথা

বনভন্তের আজীবন আবাসস্থল
রাজবন বিহার উন্নয়ন প্রসঙ্গে কিছু কথা

প্রকৌশলী নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা-

    bana  পরম পূজনীয় মহান আর্যপুরুষ শ্রাবকবুদ্ধ শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের রাঙামাটিতে অবস্থান গ্রহণের পর স্বয়ং তাঁর দর্শনে আগমন ও কালক্রমে রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটিতে নিজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগে ও পূজ্য বনভন্তের একান্ত সান্নিধ্য লাভে এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ও কমিটিতে থাকাকালীন ১৯৭৪ হতে ১৯৯৫ খিষ্টাব্দ পর্যন্ত একাগ্রতাসহকারে দায়িত্ব পালন করি। কীভাবে এর পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন কর্মকা- সাধিত হয়েছে সে বিষয়ে ভবিষ্যৎ প্রজম্মের জানার স্বার্থে আমার একান্ত সংশ্লিষ্টতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করা বিশেষ সমীচীন মনে করি। তাই এক্ষেত্রে সেসব তথ্য উপাত্ত নিয়ে কিছু লিখার প্রয়াস পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ ইন্দ্রগুপ্ত মহাস্থবির ভন্তের ঐকান্তিক নির্দেশে সেই সুযোগ পেলাম।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে রাঙামাটি রাজ বিহারে সর্বজনীনভাবে মিগারমাতা বিশাখা প্রবর্তিত নিয়মে দানোত্তম কঠিন চীবরদান উপলক্ষে পরম পূজনীয় আর্যপুরুষ শ্রাবকবুদ্ধ শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের প্রথম রাঙামাটিতে শুভাগমন ঘটে। উক্ত সময়ে পূজ্য বনভন্তের সাময়িক বসবাসের জন্য রাজবাড়ি এলাকার অনতিদূরে অনুচ্চ পাহাড়ে গহীন অরণ্যবেষ্টিত বর্তমান রাজবন বিহার ভিটায় একটি অস্থায়ী কুঠির নির্মাণ করা হয়। কঠিন চীবরদান শেষে শ্রদ্ধেয় ভন্তে পুনরায় লংগদু তিনটিলায় প্রত্যাবর্তন করেন।

রাজ বিহারের শুভ কঠিন চীবরদানানুষ্ঠানে সমবেত হাজার হাজার সদ্ধর্মানুরাগী জনতা, পুণ্যার্থী, রাজ পরিবারের সদস্যগণ ও রাঙামাটি শহরের বুদ্ধিজীবী মহল পূজ্য বনভন্তের মতো মহান ত্যাগী, ধ্যানী এবং পরম সিদ্ধপুরুষের সাধনালব্ধ জ্ঞান বহুল প্রচার ও প্রসারের তথা বুদ্ধশাসন রক্ষা উন্নতি ও উজ্জ্বলতর করার ও সর্বোপরি দেবমনুষ্যের হিতসুখ ও মঙ্গলের জন্য রাঙামাটিতে পূজ্য বনভন্তেকে স্থায়ীভাবে অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। এই প্রয়োজনীতার ভিত্তিতে রাঙামাটি বুদ্ধিজীবিগণের অগ্রণী ভূমিকায় ও রাজ পরিবারবর্গের বিশেষ বদান্যতায় তাঁকে স্থায়ীভাবে বসবাসের আমন্ত্রণ করা হলে পূজ্য ভন্তে আশীর্বাদস্বরূপ তাঁর সম্মতি প্রকাশ করেন। পূজ্য বনভন্তের সম্মতি লাভের পর হতে তাঁর উপদেশ-অনুযায়ী মহান একজন সাধকের বাসোপযোগী স্থায়ী কুঠির নির্মাণ, ধর্মীয় বিধান-অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিভিন্ন স্থাপনা যেমন বিহার, চংক্রমণ ঘর, ¯œানঘর, লেট্রিন, ভোজনশালা নির্মাণ, ভিক্ষু-শ্রামণ ও শিষ্যবর্গের বাসস্থান, চতুর্প্রত্যয় ও দৈনন্দিন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ এবং বিহার পরিচালনার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ধর্মানুরাগী কয়েকজন স্থানীয় দায়ক-দায়িকার সমন্বয়ে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে অস্থায়ীভাবে ডা. হিমাংশু বিমল দেওয়ানকে সভাপতি, বাবু বঙ্কিম চন্দ্র দেওয়ানকে (সোনামণি বাপ) সম্পাদক মনোনীত করে একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়। তার পর ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে পুনরায় ডা. হিমাংশু বিমল দেওয়ানকে সভাপতি এবং বাবু ¯েœহ কান্তি চাকমাকে সম্পাদক মনোনীত করে রাজ পরিবারের দানকৃত ভূমির উপর রাজবন বিহার প্রতিষ্ঠা করে একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে রাজ বিহারে দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসবে শ্রদ্ধেয় বনভন্তে ও তাঁর শিষ্যবর্গের সাময়িক অবস্থানের জন্য বিহার কমিটি জনগণের আর্থিক শ্রদ্ধাদানে তাৎক্ষণিক ১টি কুঠির, ১টি চংক্রমণ ঘর, ১টি ভোজন শালা, ভিক্ষু-কুঠির, ১টি দেশনালয় ও ১টি রান্নাঘর অস্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয়। শ্রদ্ধেয় ভন্তের উপদেশ মোতাবেক শ্রদ্ধেয় বনভন্তের জন্য নির্জন স্থানে ১টি ভাবনা কুঠির নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পূজ্য বনভন্তে প্রথম এই কুঠিরে বর্ষাবাস যাপন করেন ও বর্ষাবাস শেষে লংগদু তিনটিলায় চলে যান। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে পূজ্য বনভন্তে শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে তিনটিলা হতে তাঁর শিষ্যবর্গসহ রাঙামাটি রাজবন বিহারে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হন। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৮০ এবং ১৯৮১ হতে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পূজ্য বনভন্তে রাঙামাটিতে স্থায়ীভাবে আগমনে পরিচালনা কমিটি জনগণের শ্রদ্ধাদানে যে সমস্ত দানাদি-পুণ্যানুষ্ঠান সম্পাদন ও অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ এবং আমি কমিটিতে থেকে ও কমিটির বাহিরে যে সমস্ত ধর্মীয় কর্মকা-ে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করেছি, তাঁর বিবরণ সংক্ষিপ্তাকারে দেওয়া হলো :

(ক) ১। পূজ্য বনভন্তে ও শিষ্যবর্গের তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য ১টি বিহার, ১টি চংক্রমণ ঘর, ১টি ভোজনশালা, ১টি ভিক্ষু-কুঠির, ১টি রান্নাঘর, ১টি ভিক্ষু-শ্রামণের ভোজনালয়, ২টি ভাবনা কুঠির, পায়খানা, প্রস্রাবখানা, পূর্ণিমা ও অমাবস্যা তিথিতে উপোসথ গ্রহণের জন্য পানিতে ড্রামের উপর ভাসমান উপোসথ ঘর তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে উহা ভেঙে ফেলা হয়।

২। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বৃদ্ধা রাজমাতা বিনীতা রায় মহোদয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালীন সরকার প্রদত্ত ঢেউটিন ও জনগণের শ্রদ্ধাদানে এবং বাবু লগ্ন কুমার চাকমার (কারিগর) কায়িক স্বেচ্ছাশ্রমে একটি দেশনালয় নির্মাণ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে কমিটির উদ্যোগে দেশনালয়ের ভিটা পাকাকরণ ও শ্রদ্ধাবান দায়ক বাবু প্রকৃতি রঞ্জন চাকমার উদ্যোগে জলযান ঘাট হতে বিহার এলাকায় উঠা-নামার জন্য পাকা সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়।

৩। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে বিহারের উত্তর দিকে বাবু হিমাংশু বিমল দেওয়ানের অর্থানুকূল্যে একটি মাটির দেওয়ালের চংক্রমণ ঘর ও পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাদানে একটি ৫ (পাঁচ) কামরাবিশিষ্ট মাটির গুদামের ভাবনা-কুঠির তথা ভিক্ষু-নিবাস নির্মাণ করা হয়।

৪। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে রান্নঘরের পার্শ্বে বিহারের দানীয় মালামাল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য অস্থায়ী গোডাউন নির্মাণ করা হয়।

৫। ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে হাজার হাজার পুণ্যার্থী অংশগ্রহণের মাধ্যমে পূজ্য বনভন্তেকে মহাসমারোহে ‘মহাস্থবিরবরণ’ করা হয় এবং একই সঙ্গে ১টি ভিক্ষুসীমা বা ঘ্যাং ঘর নির্মাণ ও উৎসর্গ করা হয়।

৬। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে ভাতৃপ্রতীম বৌদ্ধ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা সরকার প্রদত্ত মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী কর্তৃক বোধিবৃক্ষ চারা রোপণ করা হয়, যা দেশি-বিদেশি অতিথিবৃন্দের উপস্থিতিতে এই মহান পুণ্যানুষ্ঠান সম্পাদন একটি ঐতিহাসিক স্মরণীয় ঘটনা।

৭। বাবু প্রকৃতি রঞ্জন চাকমার উদ্যোগে বুদ্ধগয়া হতে সংগৃহীত ‘বোধিবৃক্ষ চারা’ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমার শুভলগ্নে পূজ্য বনভন্তে নিজ হাতে রোপণ করেন।
১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে বোধিবৃক্ষ চারারোপণ উপলক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী, মাননীয় খাদ্য প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, নেদারল্যান্ড ও ভারতের হাই কমিশনার এবং কয়েকটি দেশের হাই কমিশনার ও রাষ্ট্রদূতগণ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে গৌরবান্বিত করেছেন। তা ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সহকারী উপদেষ্টা বাবু সুবিমল দেওয়ান, বাবু উপেন্দ্র লাল চাকমা, এমপি ও চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় উক্ত মহতী পুণ্যানুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

৮। শ্রদ্ধাবান দায়ক বাবু অজিত কুমার দেওয়ান পূজ্য বনভন্তের বসবাসের জন্য একটি মাট্যাগুদাম ঘর (মাটির দেওয়ালের কুঠির) নির্মাণ করে দেন এবং তৎসংলগ্ন পায়খানা, প্রস্রাব ও গোসলখানা বাবু হিমাংশু বিমল দেওয়ান, বাবু সুকুমার দেওয়ান ১টি পানির ওভার হেড ট্যাংক নিজ অর্থায়নে নির্মাণ করে দিয়ে অশেষ পুণ্যের অধিকারী হন।

৯। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের হতে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শ্রদ্ধাবান দায়কবৃন্দ বাবু অদ্যুৎ কুমার চাকমা, বাবু নির্মল কান্তি চাকমা, বাবু সঞ্জয় বিকাশ চাকমা, বাবু প্রশান্ত কুমার দেওয়ান, বাবু পংকজ কুমার দেওয়ান ও পরবর্তী সময়ে বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা বর্তমান রাজবন বিহার মূলভিটাটির মাটি কাটা, ভরাট তাদের অর্থায়নে সম্পাদন করে পুণ্যাংশের ভাগী হন।

১০। ২৪ ডিসেম্বর ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীলঙ্কার মাননীয় হাই কমিশনার তাঁর মাতার ৫৫তম মৃত্যুবার্ষিকী রাজবন বিহারে পূজ্য বনভন্তের উপস্থিতিতে সম্পাদন এবং বিশেষ আশীর্বাদ লাভ করেন।

রাজবন বিহার মূল ভিটার মাটি কাটা সমাপ্ত হলে পূজ্য বনভন্তের নির্দেশক্রমে মূল ভিটা পরিস্কার ও সমগ্র ভিটা লেপন করে প্রথম পূজ্য বনভন্তের পরিকল্পনা ও নির্দেশক্রমে বাবু নির্মল কান্তি চাকমা, বাবু প্রশান্ত কুমার দেওয়ান (টুকু) বাবু সঞ্জয় বিকাশ চাকমা, বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা ও বাবু অদ্যুৎ কুমার চাকমা সম্মিলিত উদ্যোগে প্রথম ‘লাভীশ্রেষ্ঠ অর্হৎ সীবলী পূজা’, ‘বোধিবৃক্ষ পূজা’ ও অন্যান্য দানাদি পুণ্যকর্ম সম্পাদন ও প্রচলন করেন এবং বর্তমানেও এই পুণ্যকর্ম ও পূজা সম্পাদন অব্যাহত রয়েছে।

(খ) উল্লেখ্য যে, ডিসেম্বর ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে অস্থায়ী পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হলে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ জানুয়ারিতে রাজবন বিহার পরিচালনার জন্য পূজ্য বনভন্তের অনুমোদিত ও প্রণীত বিধিমালা অনুসারে ১১ (এগার) সদস্যবিশিষ্ট ‘পূর্ণাঙ্গ নিয়মিত কমিটি’ অস্থায়ী দেশনালয়ে পূজ্য বনভন্তের উপস্থিতিতে ও অনুমোদনে রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়। উক্ত কমিটিতে (১) ডা. হিমাংশু বিমল দেওয়ান, সভাপতি  (২) বাবু জ্যোতির্ময় চাকমা, সহ-সভাপতি (৩) বাবু যামিনী কুমার কার্বারী, সহ-সভাপতি (৪) বাবু ¯েœহ কান্তি চাকমা, সম্পাদক, (৫) বাবু বঙ্কিম চন্দ্র দেওয়ান, সহ-সম্পাদক, (৬) বাবু হ্লাথোয়াই প্রু কার্বারী, (৭) বাবু শাক্য কিংকর খীসা, (৮) বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, (৯) বাবু সমর বিজয় চাকমা, (১০) বাবু সুনীতি বিকাশ চাকমা (সক্ক) ও (১১) বাবু প্রগতি খীসাকে সদস্য নির্বাচিত করা হয়।

(গ) ১। রাজবন বিহার দ্বিতল পাকা বিহার ভবন নির্মাণ : নবগঠিত পরিচালনা কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর হতে পূজ্য বনভন্তের নির্দেশক্রমে সদ্ধর্ম রক্ষা, উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি ও স্থিতিকল্পে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সর্বসাধারণের আর্থিক শ্রদ্ধাদানে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্পাদন করা হয়। পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক মহোদয় বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যাকে কমিটির প্রকৌশলী সদস্য হিসেবে রাজবন বিহারে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও প্রকৌশল কাজসমূহ প্লান, নকশা-প্রণয়ন, নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান করার জন্য দায়িত্ব অর্পণ করেন। শ্রদ্ধেয় বনভন্তে রাজবন বিহারে দ্বিতলবিশিষ্ট পাকা বিহার নির্মাণ করার জন্য প্রায়ই তাগিদ দিতেন ও অভিপ্রায় ব্যক্ত করতেন। পূজ্য বনভন্তের নির্দেশে দ্বিতল পাকা বিহার নির্মাণের জন্য আমি প্লান, ডিজাইন ও নকশা প্রণয়ন করে ও বাবু ¯েœহ কান্তি চাকমা, ডা. হিমাংশু বিমল দেওয়ান, বাবু বঙ্কিম চন্দ্র দেওয়ানকে (ঝর্ণা বাপ) সাথে নিয়ে পূজ্য বনভন্তের নিকট নকশা অনুমোদন করিয়ে নিই। আর ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভবনটি নির্মাণের জন্য পূজ্য বনভন্তে আমার হাতে ধরা কংকর মিক্সার কড়াই হতে কর্নি দিয়ে ফাউন্ডেশন গর্তে নিজ হাতে কংকর ধালাই দিয়ে ভিত্তিস্থাপন উদ্বোধন করেন। উল্লেখ্য যে, বিদায়ী কমিটি দায়িত্ব হস্তান্তরকালে মোট ১,০০০/- টাকা,       ১ গাড়ি বালু ও ১ হাজার ইট নবগঠিত কমিটির নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। উক্ত কাজ সম্পাদনের জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে ৮ হাজার ইট, ১ গাড়ি বালু, সিমেন্ট ও ২,০০০/- (দুই হাজার) টাকা নির্মাণ কাজে দান করি। তা ছাড়া প্রকৌশলী অশোক কুমার বড়–য়া প্রথম ধাপে ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ১০,০০,০০০/- (দশ লক্ষ) টাকা রাজবন বিহার উন্নয়ন কাজের জন্য দান করেন এবং পার্বত্য অঞ্চলের সর্বসাধারণ ও বাংলাদেশের আপামর বুদ্ধধর্মালম্বীদের সম্মিলিত আর্থিক শ্রদ্ধাদানে সর্বমোট ১৭,৬০,০০০/- (সতের লক্ষ ষাট হাজার) টাকা) উন্নতিতে ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা হয়।

২। ১২ এপ্রিল ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ২৯ চৈত্র ১৩৯১ বঙ্গাব্দ রাঙামাটি রাজবন বিহারে বুদ্ধধর্ম ও দর্শন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং এ উপলক্ষে রাজবন বিহার হতে প্রথম স্মরণিকা ‘বিমুক্তি’ প্রকাশিত হয়।

৩। সর্বজনীন উপাসনা বিহার নির্মাণ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দ, ২ ফাল্গুন ১৩৯২ বঙ্গাব্দ, ২৫২৯ বুদ্ধাব্দ রাজবন বিহারে প্রথম ‘মহাবোধি বৃক্ষরোপণ বার্ষিকী’ ও ‘লাভীশ্রেষ্ঠ অর্হৎ সীবলী পূজা’ উপলক্ষে একটি রাজবন বিহার স্মরণিকা ‘বিমুক্তি’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সর্বসাধারণের দৈনন্দিন বুদ্ধপূজা, পার্বণ, বন্দনা ও ভাবনা করার জন্য পূজ্য বনভন্তের উপদেশ-অনুযায়ী মায়ানমার বৌদ্ধ বিহারের অনুকরণে বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা কর্তৃক সংগৃহীত ডিজাইন প্লান ও নকশা-অনুসারে আপামর জনসাধারণের অর্থায়নে ২৫/১২/১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ, ০৯/০৯/১৩৯৪ বঙ্গাব্দ ও ২৫৩১ বুদ্ধাব্দ সকাল ৯:০০ ঘটিকার সময় পূজ্য বনভন্তে নিজ হাতে ‘সর্বজনীন উপাসনা’ বিহারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। উক্ত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে আমি পূজ্য বনভন্তেকে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মালামাল যোগান ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করি। ডা. হিমাংশু বিমল দেওয়ান ও বাবু বঙ্কিম চন্দ্র দেওয়ানসহ বহু পুণ্যার্থী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

৪। ৭ নভেম্বর ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দ, ২০ কার্তিক ১৩৯৩ বঙ্গাব্দ, ২৫৩০ বুদ্ধাব্দে রাজবন বিহারে দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব উপলক্ষে প্রথম স্মরণিকা ‘বিমুক্তি’ প্রকাশিত হয়। (কঠিন চীবরদান স্মরণিকা বিমুক্তি/৮৬)।

(ঘ) ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হলে বিদায়ী কমিটি রাজবন বিহার পরিচালনার জন্য এই অঞ্চলের সকল সদ্ধর্মপ্রাণ জনগণের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে পার্বত্য এলাকার সদ্ধর্মানুরাগী দায়ক-দায়িকাগণের সমন্বয়ে বৃহত্তর পরিসরে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা কমিটি গঠনের উপর গুরুত্বারোপ করেন। বিদায়ী কমিটি ডিসেম্বর ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে সাধারণ সভার মাধ্যমে ২৫ (পঁচিশ) সদস্যবিশিষ্ট পূজ্য বনভন্তের উপস্থিতিতে পুরাতন দেশনালয়ে পূজ্য বনভন্তের নিকট অনুমোদন গ্রহণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। নবগঠিত রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি ৫ (পাঁচ) বৎসর মেয়াদের জন্য দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কমিটি সদস্যগণের নাম  নি¤œরূপ :

১। বাবু সুনীতি বিকাশ চাকমা (সক্ক), সভাপতি,   ২। বাবু বিমল চন্দ্র চাকমা, সহ-সভাপতি, ৩। বাবু নির্মল কান্তি চাকমা, সহ-সভাপতি, ৪। বাবু সঞ্জয় বিকাশ চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, ৫। বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, সহ-সাধারণ সম্পাদক ও সদস্যগণের নাম যথাক্রমে    ১। বাবু সজ্জিত কুমার চাকমা, ২। বাবু সাধন তালুকদার, ৩। বাবু সুশোভন দেওয়ান (ববি), ৪। বাবু মৈত্রী প্রসাদ খীসা, ৫। বাবু লুইথা মারমা, ৬। ডা. অরবিন্দ বড়–য়া, ৭। বাবু সাধন মানিক কার্বারী, ৮। বাবু সত্যব্রত বড়–য়া, ৯। বাবু চিত্ত রঞ্জন কার্বারী, ১০। বাবু পূর্র্ণ কুমার চাকমা, ১১। বাবু প্রশান্ত কুমার দেওয়ান (টুকু), ১২। বাবু রবি মোহন তঞ্চঙ্গ্যা, ১৩। বাবু শুভ স্বর্ণ চাকমা, ১৪। বাবু ইন্দ্র দত্ত তালুকদার, ১৫। বাবু লগ্ন কুমার চাকমা (কারিগর), ১৬। বাবু নিউমং মহাজন, ১৭। বাবু কাজল চাকমা, ১৮। মিসেস সমিরা দেওয়ান, ১৯। মিসেস অনুপমা চাকমা, ২০। মিসেস প্রণতি চাকমা।

(ঙ) ১। জানুয়ারি ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে নতুন কমিটি দায়িত্বভার গ্রহণের পর রাজবন বিহারের সার্বিক উন্নয়ন, ভিক্ষুসংঘের দৈনন্দিন চতুর্প্রত্যয়, ভোজন, পানীয়, রাজবন বিহারে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, ভিক্ষু-শ্রামণদের আবাসন, ভাবনা কুঠির নির্মাণ, মেরামত ও পুরাতন জীর্ণ কুঠির সমূহের মেরামত, পানীয় জলের ব্যবস্থা, টিউবওয়েল বসানো, মেরামত, বিদ্যুৎ সংযোগ, অভ্যন্তরীণ ভিক্ষু-শ্রামণ আবাসিক ভবন, পূজ্য বনভন্তের আবাসন কুঠির ও রান্নাঘরে পানি সংযোগ, উপাসিকাদের আবাসন ও অভ্যন্তরীণ বিহার ও কুঠিরসমূহে বৈদ্যুতিক খুটি বসানো, লাইন টানা, বিদ্যুৎ সংযোগ ইত্যাদি বাবু মৈত্রী প্রসাদ খীসা, বাবু প্রশান্ত কুমার দেওয়ান, বাবু নির্মল কান্তি চাকমা, নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা ও সঞ্জয় বিকাশ চাকমার কায়িক স্বেচ্ছাশ্রমে সম্পন্ন করা হয় এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন ও বিদায়ী পরিচালনা কমিটির অসমাপ্ত কাজের যথাযথ বাস্তবায়ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। উল্লেখযোগ্য পুণ্যানুষ্ঠানের মধ্যে রাজবন বিহার পাকা দ্বিতল বিহার ভবন উৎসর্গ, মহাবোধি বৃক্ষ উৎসর্গ ও ভাবনাকেন্দ্র উদ্বোধন ও অন্যান্য দানাদি পুণ্যানুষ্ঠান ২২ এপ্রিল ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দ, ৯ বৈশাখ ১৩৯৫ বঙ্গাব্দ ২৫৩১ বুদ্ধাব্দ মহাসমারোহে পূজনীয় বনভন্তে ও অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র পূজনীয় ভিক্ষুসংঘের নিকট বিশ্বের সকল প্রাণীর সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য দানোৎসর্গ করা হয়। এই উপলক্ষে ‘বিপস্সনা’ নামে একটি রাজবন বিহার পাকা দ্বিতল ভবন উৎসর্গ ও ভাবনা কেন্দ্র উৎসর্গ, সর্বজনীন উপাসনা বিহার উদ্বোধন স্মরণিকা প্রকাশিত হয়।

২। ১৯৮৭-৮৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজবন বিহার এলাকা গভীর অরণ্যবেষ্টিত জঙ্গলাকীর্ণ বড় ছোট গাছ-গাছালি পরিপূর্ণ ছিল। বাইরে থেকে রাজবন বিহারে প্রবেশের কোনো যোগাযোগ রাস্তা ছিল না। তাই টিটিসি গেইট হতে রাজবন বিহার মূল গেইট পর্যন্ত বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যার উদ্যোগে ও অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ বিভাগ হতে মাটিকাটা, মাটি ভরাট, নতুন রাস্তা নির্মাণ, রাস্তা ড্রেসিং কাজের জন্য বুলডোজার, পে-লোডার ও গ্রেডারের সাহায্যে পাহাড় কেটে নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হয়। তা ছাড়া রাজবন বিহার উত্তর মাঠের ভাবনা কুঠির ও বলপিয়া আদামের শ্রদ্ধাবান দায়কগণের দ্বারা নির্মিত বনবিহারের প্রবেশ গেইট (উত্তর গেইট) পার্শ্বে বিরাট কিজিং বা ঝিরি (এঙজএঊ) এর মাটি ভরাট কাজ নিজ অর্থায়নে ও বাবু সাধন মানিক কার্বারীর সহযোগিতায় সম্পাদন করেন। কিজিং বা ঝিরি ভরাট করার ফলে বাইরে থেকে মূল বিহারে প্রবেশের ও যোগাযোগের ব্যবস্থা সুরাহা করা হয়। ফলে গাড়িতে করে রাজবন বিহারে প্রবেশ ও বের হওয়ার রাস্তা, যাতায়াত ও রাজবন বিহারের নির্মাণসামগ্রী আনয়ন করা সহজতর হয়।

(চ) ৩০ জুন ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে কমিটির মেয়াদ শেষ হলে বিদায়ী কমিটি জুলাই ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে নতুন পরিচালনা কমিটির নিকট দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন। নবগঠিত পরিচালনা কমিটির সদস্যগণের নামগুলো  হচ্ছে : ১। বাবু সুনীতি বিকাশ চাকমা, সভাপতি,      ২। বাবু বিমল চন্দ্র চাকমা, সহ-সভাপতি, ৩। বাবু পংকজ দেওয়ান, সহ-সভাপতি, ৪। বাবু সঞ্জয় বিকাশ চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, ৫। বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ বিদায়ী কমিটির ৩জন সদস্য-সদস্যা ব্যতীত ১। বাবু ভৈরব চন্দ্র কার্বারী, ২। বাবু সুশীল দেওয়ান (কাটাছড়ি) ও মিসেস লাকী চাকমা (কাস্টম) নবগঠিত পরিচালনা কমিটিতে নির্বাচিত হন। নবগঠিত পরিচালনা কমিটি দায়ত্বভার গ্রহণের পর উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রাজবন বিহারের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় ও মাইলফলক হিসেবে চির জাগরুক থাকবে, যেমন :

(ছ) ১। ভূমিক্রয় উপকমিটি : মোট ৭ সদস্যবিশিষ্ট ভূমিক্রয় উপকমিটির নাম যথাক্রমে ১। বাবু সুনীতি বিকাশ চাকমা (সক্ক), আহবায়ক, ২। বাবু সঞ্জয় বিকাশ চাকমা, ৩। নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, ৪। নির্মল কান্তি চাকমা, ৫। বাবু সাধন মানিক কার্বারী, ৬। বাবু সুশোভন দেওয়ান (ববি), ৭। বাবু মৈত্রী প্রসাদ খীসা সদস্য নির্বাচিত হন। নাসিরাবাদ সুগার অ্যান্ড কেইন ফ্যাক্টরির অধীন বর্তমানে রাজবন বিহার উত্তর মাঠ (বিশ্বশান্তি প্যাগোডার জন্য নির্বাচিত স্থান) ক্রয় কমিটির সদস্য বাবু নির্মল কান্তি চাকমা, বাবু সুশোভন দেওয়ান (ববি), বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, বাবু সাধন মানিক কার্বারীর উদ্যোগে টেন্ডার দাখিল করে রাজবন বিহারের নামে ক্রয়কৃত টেন্ডারের মাধ্যমে প্রাপ্ত মোট ৬.৪২ একর ভূমি সর্বমোট ১৪,০০,০০০/- (চৌদ্দ লক্ষ) টাকা যা সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাদানে ক্রয়কৃত ও রাজবন বিহারের নামে রেজিস্টারি ও দানোৎসর্গ করা হয়। উল্লেখ্য যে, রাজ পরিবারের পক্ষ হতে মোট ৬.৯৬ একর ভূমি দান করা হলেও ০.২৩ একর ভূমি ঘ্যাং ঘরের নামে নিষ্কর (করমুক্ত) হিসেবে রেজিস্টারি করা হয়।

২। বেইন ঘর নির্মাণ : বাবু মৈত্রী প্রসাদ খীসা বেইন ঘর নির্মাণের জন্য কমিটি কর্তৃক ক্রয়কৃত যাবতীয় কাঠ নিজ উদ্যোগে মহালছড়ি হতে সরবরাহ ও সর্বসাধারণের অর্থায়নে পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় এবং দানোৎসর্গ করা হয়।

৩। ভিক্ষুসংঘের ভোজনশালা : রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মিত। তা ছাড়া জেলা পরিষদের অর্থানুকূল্যে বেইন ঘরসংলগ্ন পাকা রিটার্নিং ওয়াল ও বেইন ঘরের দক্ষিণ পার্শ¦স্থ জলযান ঘাট হতে বেইন ঘরে উঠার জন্য পাকা সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়।

৪। রাজবন বিহার প্রবেশ গেইট : কুতুকছড়ি মৌজার হেডম্যান শ্রদ্ধাবান দায়ক বাবু করুণা মোহন চাকমার উদ্যোগে বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যার নকশা-অনুসারে রাজবন বিহার কার্যালয়সংলগ্ন (দুই পার্শ্বে) রাজবন বিহার প্রবেশ গেইট শ্রদ্ধেয় শ্রাবকবুদ্ধ বনভন্তে নিজ হাতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। জুরাছড়ি এলাকাবাসীর উদ্যোগে ফাউন্ডেশন ট্রেন্সকাটিং ও সর্বসাধারণের আর্থিক শ্রদ্ধাদানে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। গেইট সংলগ্ন রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটির কার্যালয় প্রথম ধাপে নির্মাণ কাজ শেষ হলে পূজ্য বনভন্তের উপস্থিতিতে সংঘদান সম্পাদন ও উদ্বোধন করে অফিস কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

৫। পূজ্য বনভন্তের প্রতিমূর্তি কুঠির : বাবু সুশোভন দেওয়ান (ববি) ও বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা তত্ত্বাবধানে ও শ্রদ্ধাবান দায়ক বাবু সুশীল কুমার চাকমার (বক্র) উদ্যোগে ও পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে এবং সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাদানে নির্মিত ও দানোৎসর্গ করা হয়।

৬। উপগুপ্ত ভন্তে (জলবুদ্ধ) কুঠির : বাবু সুশোভন দেওয়ান (ববি) ও পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানের সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাদানে নির্মিত ও দানোৎসর্গ করা হয়।

৭। শ্রাবকবুদ্ধ বনভন্তের সাধনা কুঠির ০১ (এক) : ১১-০৩-১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজবন বিহার এলাকায় ঘ্যাং ঘর পার্শ্বে বাবু সঞ্জয় বিকাশ চাকমা, বাবু প্রশান্ত কুমার দেওয়ান (টুকু), বাবু নির্মল কান্তি চাকমা, বাবু অদ্যুৎ কুমার চাকমা ও বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যার উদ্যোগে ও নিজেদের অর্থায়নে প্রথম নির্মিত সেমিপাকা পূজ্য বনভন্তের সাধনা কুঠির নির্মাণ ও দানোৎসর্গ করা হয়।

৮। শ্রাবকবুদ্ধ বনভন্তের কুঠির ০২ (দুই) : মিসেস লাকী চাকমার উদ্যোগে ও অর্থায়নে ও সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে প্রথমদিকে বাবু সুশোভন দেওয়ান (ববি) ও বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা পরবর্তী সময়ে প্রকৌশলী কামিনী মোহন চাকমা ও ডা. সুরেশ্বর চাকমার সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত ও ১৫ মার্চ ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ, ১ চৈত্র ১৪০০ বঙ্গাব্দ, ২৫৩৭ বুদ্ধাব্দে মহাসমারোহে দানোৎসর্গ করা হয়। এ সময় অন্তেবাসী ভিক্ষুদ্বয় শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ বোধিপাল স্থবির ও পূজ্য রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির ভন্তের শিষ্য মায়ানমারে (বার্মায়) উপসম্পাদাপ্রাপ্ত ভিক্ষু (উপাধ্যায় : উঃ ঞালিন্ডা) শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপাল ভিক্ষু (বর্তমানে শ্রীমৎ নন্দপাল মহাস্থবির) মহোদয়কে ‘মহাস্থবির’ অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়। এই উপলক্ষে ‘রাজবন’ নামে একটি স্মরণিকা পুস্তক পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে প্রকাশিত হয়।

৯। ঘাগড়া কুঠির : ঘাগড়া এলাকাবাসীর উদ্যোগে ও অর্থায়নে ও সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধাদানে বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যার তত্ত্বাবধানে ও পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা হয়।

১০। রাজবন বিহার কমপ্লেক্সের দক্ষিণের অনুষ্ঠান মাঠ : বাবু মৈত্রী প্রসাদ খীসা ও বাবু লগ্ন কুমার চাকমার (কারিগর) উদ্যোগে অনুষ্ঠান মাঠের মাটি কাটার কাজ আরম্ভ হয়। পরবর্তী সময়ে বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যার উদ্যোগে ও অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ বিভাগ হতে ১টি বুলডোজার, ১টি গ্রেডার ও ১টি পে-লোডার -এর সাহায্যে স্বর্গঘর ও বেইন ঘর রাস্তা পর্যন্ত সমস্ত বর্তমান অনুষ্ঠান মাঠ মোট ০৮ ব্যারেল ডিজেল-তৈল, গ্রীস ও মোবিলসহ বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যার অর্থায়নে ও বাবু কিনা মোহন চাকমা ড্রাইভার, বাবু কিনারাম চাকমা ড্রাইভার ও জনাব মোহাম্মদ কাসেম ড্রাইভারের সহযোগিতায় রাজবন বিহার দক্ষিণে অনুষ্ঠান মাঠের মাটির কাজ সমাপ্ত করা হয়।

১১। ৩ নভেম্বর ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ, ১৯ কার্তিক ১৩৯৬ বঙ্গাব্দ, ২৫৩৩ বুদ্ধাব্দ, রাঙামাটি রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে দানোত্তম কঠিন চীবরদান স্মরণিকা/৮৯ প্রকাশিত হয়।

১২। ১৯ অক্টোবর ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ, ৩ কার্তিক ১৩৯৭ বঙ্গাব্দ, ২৫৩৪ বুদ্ধাব্দ দানোত্তম কঠিন চীবরদান/৯০ স্মরণিকা প্রকাশিত হয়।
১৩। ১৫ নভেম্বর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ, ৩০ কার্তিক ১৩৯৮ বঙ্গাব্দ, ২৫৩৪ বুদ্ধাব্দ, কঠিন চীবরদান স্মরণিকা/৯১ পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে প্রকাশিত হয়।
১৪। ৬ নভেম্বর ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ, ২৫৩৬ বুদ্ধাব্দ ঊনবিংশতিতম দানোৎসব কঠিন চীবরদান স্মরণিকা/৯২ পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে প্রকাশিত হয়।
১৫। ১৮ নভেম্বর ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দ, ০২ অগ্রহায়ণ ১৯৯৫ বঙ্গাব্দ, ২৫৩২ বুদ্ধাব্দ, রাজবন বিহারে দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব উপলক্ষে রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে কঠিন চীবরদান স্মরণিকা/৮৮ প্রকাশিত হয়।

১৬। পূজ্য বনভন্তের ভোজনশালা নির্মাণ ও মহাসংঘদান প্রচলন : মিসেস বাসন্তি দেওয়ান, মিসেস সমিরা দেওয়ান, মিসেস কনক লতা খীসা ও উপাসিকাদের উদ্যোগে সর্বজনীন শ্রদ্ধাদানে পূজ্য বনভন্তের ভোজনশালা ও পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ ও ৪ কার্তিক ১৩৯৫ বঙ্গাব্দ সর্বজনীনভাবে উৎসর্গ করা হয়। উক্ত সময় হতে মিসেস সমিরা দেওয়ান, মিসেস বাসন্তি দেওয়ান ও উপাসিকাদের উদ্যোগে ও স্বকীয়তায় প্রথম ‘মহাসংঘদান’ প্রচলিত হয় এবং বর্তমানেও তা প্রচলিত আছে।

১৭। ভাবনা কুঠির : চট্টগ্রাম জেলার জনৈক শ্রদ্ধাবান বড়–য়ার অর্থায়নে ও কমিটির আর্থিক শ্রদ্ধাদানে দুটি ভাবনা কুঠির পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ ও উৎসর্গ করা হয়।

১৮। রাজবন বিহার দ্বিতল বিহার ভবনের উত্তর পার্শ্বে আন্ডার-গ্রাউন্ড পানির ট্যাংক, গাড়ি ধৌত করার ফ্লাটফর্ম, লেট্রিন ও শৌচাগার এবং রাজবন বিহারের দক্ষিণ মাঠে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য লেট্রিন ও শৌচাগার পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ ও উৎসর্গ করা হয়।

১৯। সর্বজনীন উপাসনা বিহারের প্রবেশ পথের দু-পাশে দুটি হাতির মূর্তি পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়।

২০। রাজবন বিহারের উত্তর পার্শ্বে (উত্তর গুদাম) ভিক্ষু-শ্রামণগণের ব্যবহারের জন্য দুটি পাকা স্যানিটারী ল্যাট্রিন ও সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য রাজবন বিহারের দক্ষিণ অনুষ্ঠান মাঠে দুটি পাকা ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হয়।

২১। বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ উপ-কমিটি গঠন, বুদ্ধমূর্তি তৈরি, জীবন্ন্যাস ও উৎসর্গ অনুষ্ঠান : রাজবন বিহারের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে রাজবন বিহারে বড় বুদ্ধমূর্তি না থাকায় শ্রদ্ধাবান ও ধর্মপ্রাণ দায়ক-দায়িকাবৃন্দ রাজবন বিহারে প্রতিষ্ঠার জন্য বড় বুদ্ধমূর্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে দায়ক-দায়িকাবৃন্দ ও পরিচালনা কমিটি পরমপূজ্য আর্যপুরুষ বনভন্তের নিকট বড় দুটি বুদ্ধমূর্তি তৈরির প্রার্থনা করা হলে পূজ্য বনভন্তে সদ্ধর্মের উন্নতি ও দেবমনুষ্য তথা সকল প্রাণীর হিতসুখ ও মঙ্গলের জন্য বুদ্ধমূর্তি তৈরির অনুমতি প্রদান করেন। এ লক্ষ্যে রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি ও সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক একটি বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ উপ-কমিটি গঠন করা হয়। উপ-কমিটিতে সদস্যগণের নাম যথাক্রমে ১। বাবু নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, আহবায়ক, ২। বাবু সুশোভন দেওয়ান (ববি), সদস্য, ৩। বাবু নির্মল কান্তি চাকমা, সদস্য, ৪। বাবু মৈত্রী প্রসাদ চাকমা, সদস্য, ৫। বাবু প্রশান্ত কুমার দেওয়ান (টুকু), সদস্য, ৬। বাবু লুইথা মারমা, সদস্য, ৭। বাবু সাধন মানিক কার্বারী, সদস্য, ৮। বাবু নিউমং মহাজন, সদস্য, ৯। বাবু মংচেঞ রাখাইন (ভাস্কর্য শিল্পী ও প্রধান কারিগর, সদস্য,     ১০। বাবু মংথোয়াই রাখাইন (সহকারী কারিগর) সদস্য, ১১। বাবু সঞ্জয় বিকাশ চাকমা, সদস্য, ১২। বাবু লগ্ন কুমার চাকমা, সদস্য, ১৩। বাবু কাজল চাকমা, সদস্য, ১৪। বাবু সুনীতি বিকাশ চাকমা সদস্য মনোনীত হন।

বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ উপ-কমিটি বুদ্ধমূর্তি তৈরির জন্য সক্রিয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করে। বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ উপ-কমিটি বুদ্ধমূর্তি অবয়ব নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মইনা (এঁটেল) মাটি কুতুকছড়ি এলাকা হতে এলাকাবাসী কর্তৃক সরবরাহ ও বিবিধ নির্মাণসামগ্রী যেমন— বাপদাদা আমলের প্রাচীনকালে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কাঁচের সামগ্রী সোনা, রূপা, দস্তা, এমনকি ধর্মপ্রাণ মহিলাদের নিজের ব্যবহৃত সোনার চেইন অকাতরে দান করেন। নির্মাণ সামগ্রী সংগ্রহের পর ২৪/০১/৯২ খ্রিষ্টাব্দে অষ্টধাতুর সংমিশ্রণে স্থানীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে ২টি পিতলের বুদ্ধমূর্তি ও ১টি উপগুপ্ত ভন্তে (জল বুদ্ধ) মূর্তি নির্মাণ করা হয়। (১) গৌতম মুণি বুদ্ধমূর্তি উচ্চতা ৫ ফুট ওজন ১০ মন ১১ কেজি, (২) শাক্যমুণি বুদ্ধমূর্তি ৫ফুট ওজন ১০ মন ৫ কেজি, (৩) উপগুপ্ত মহাস্থবির মূর্তি উচ্চতা ১.৬ ফুট, ওজন ৩৫ কেজি। অতীব স্মরণীয় ও সৌভাগ্যের বিষয় যে, ২২ এপ্রিল ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ, বুদ্ধমূর্তি নির্মাণকালে বন্দুকভাঙ্গার জনৈক শ্রদ্ধাবান ব্যক্তির দানকৃত বিরাট একটি পাঁকা চাঁপাকলার ছড়া, ডাব ও বিস্কুট পুরাতন দেশনা ঘরে অবস্থানরত পূজ্য বনভন্তেকে দান করেন। বৈশাখ মাসের প্রখর ও প্রচ- গরমে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণকালীন আমাদের কঠোর পরিশ্রমের কথা ভেবে পূজ্য বনভন্তে আমাদের কলাছড়াটি খাবার জন্য দিলেন এবং বললেন, ‘নব কুমার, এই কলাছড়াটি নিয়ে যাও, তোমরা পরিশ্রম করতেছ, তোমরা সকলেই মিলে এই কলাগুলো খাও’। আমি কলাগুলো এনে নির্মল দা, সঞ্জয় দা, টুকু দা, মৈত্রী দা, কাজল ও দুজন রাখাইন মূর্তিনির্মাণ শিল্পীসহ মোট আটজন মিলে ভন্তের দেওয়া কলা, ডাব ও বিস্কুট খেয়ে ফেলি। ‘ইহাই পূজ্য বনন্তের দেওয়া বুদ্ধের প্রসাদ আমরা গ্রহণ ও খেয়েছি’।

প্রসঙ্গত বুদ্ধমূর্তি তৈরির বিষয়ে আদিকথা উল্লেখ করা সমীচীন বলে মনে করি যে, বুদ্ধের জীবদশায় প্রথমভাগে কোনো বুদ্ধ প্রতিমূর্তি ছিল না বলে জানা যায়। কথিত আছে, ভগবান বুদ্ধ তাঁর জন্মদাত্রী মাতৃদেবীকে ধর্মদেশনার জন্য ত্রয়োত্রিংশ স্বর্গে গমন করেছিলেন এবং তথায় ভগবান বুদ্ধ ৭ম বর্ষাবাস উদযাপন করেন। উক্ত সময়ে কৌশল রাজ প্রসেনজিত অনেকদিন ধরে বুদ্ধকে দর্শন করতে না পেরে খুবই চিন্তিত ও ব্যথিত হয়ে পড়েন ও ভগবান বুদ্ধের ত্রয়োত্রিংশ স্বর্গে গমনের ৯০ দিন পরে বুদ্ধকে দর্শন করার জন্যে বড়ই উৎসুক হয়ে উঠেন। তিনি তখন ভগবান বুদ্ধের দেহ অবয়ব সাদৃশ্যে একটি চন্দন কাষ্ঠের বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করান ও বিহার ভবনের মধ্যে যে স্থানে ভগবান বুদ্ধ সাধারণত উপবিষ্ট থাকেন, সে স্থানে মূর্তিটি স্থাপন করেন। ভগবান বুদ্ধ স্বর্গ হতে প্রত্যাবর্তন করে বিহার ভবনে প্রবেশকালীন সময়ে তখন সে মূর্তিটি স্থান পরিত্যাগ করে গমনোদ্যত হয়। তখন ভগবান বুদ্ধ সে দারুমূর্তিকে বলেন, ‘তুমি তোমার আসনেই প্রতিষ্ঠিত থাক। আমি পরিনির্বাণ করলেই তুমি আমার প্রতিমূর্তির নমুনারূপে বিশ্ব মানবের নিকট থাকবে’। বুদ্ধ কর্তৃক এই কথা বলার পর মূর্তিটি স্বস্থানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো। এটিই ভগবান বুদ্ধের প্রথম মূর্তি। পরবর্তী যুগে বহু মানুষ ইহারই অনুকরণে খোদিত প্রস্তরে ও ধাতব দ্রব্যে মূর্তি নির্মাণে এবং চিত্রের সাহায্যে ভগবান বুদ্ধকে অনাদিকাল ধরে রেখেছে। ইহার পর হতে ভগবান বুদ্ধ সেই বিহার ভবনের বিশ পা দক্ষিণে আরও অন্য একটি বিহার ভবনে বাস করতে থাকেন।

উক্ত বিষয়ে চীনা পরিব্রাজক ফা হিয়েনের ভারত ভ্রমণ বিবরণে ঞৎধাবষং ড়ভ ঋঅঐওঊঘ গ্রন্থে ইংরেজিতে নি¤œরূপ বর্ণনা রয়েছে। ‘ডযবহ ইঁফফযধ বিহঃ ঁঢ়ঃড় ঞৎধুধংঃৎরহংংধং ঐবধাবহ ধহফ চৎবধপযবফ ঃযব ষধি ভড়ৎ ঃযব নবহবভরঃ ড়ভ যরং গড়ঃযবৎ, ধভঃবৎ যব যধফ নববহ ধনংবহঃ ভড়ৎ হরহবঃু ফধুং জধলধ চৎধংবহলরঃ ষড়হমরহম ঃড় ংবব যরস, পধঁংবফ ধহ রসধমব ড়ভ যরস ঃড় নব পধৎাবফ রহ ঈঐঅঘউঅঘ ডঙঙউ, ঢ়ঁঃ রঃ রহ ঃযব ঢ়ষধপব যিবৎব ইঁফফযধ ঁংঁধষষু ংধঃ, যিবহ ইঁফফযধ ড়হ যরং ৎবঃঁৎহ বহঃবৎবফ ঃযব ঠওঐঅজঅ, ঃযরং রসধমব রসসবফরধঃবষু ষবভঃ রঃং ঢ়ষধপব ধহফ পধসব ভড়ৎঃয ঃড় সধশব ৎড়ড়স ভড়ৎ যরস. ইঁফফযধ ংধরফ ঃড় রঃ, “জবঃঁৎহ ঃড় ুড়ঁৎ ংবধঃ”. অভঃবৎ ও যধাব ধঃঃধরহবফ ঃড় দদচঅজওঘওজঠঅঘঅ’’ ুড়ঁ রিষষ ংবৎাব ধং ধ ঢ়ধঃঃবৎহ ড়ভ সু নড়ফু’’ ঞযরং ধিং ঃযব াবৎু ভরৎংঃ ড়ভ ধষষ ঃযব রসধমবং ড়ভ ইঁফফযধ ধহফ ঃযধঃ যিরপয সবহ ঝঁনংবয়ঁবহঃষু পড়ঢ়রবফ. ইঁফফযধ ঃযবহ ৎবসড়াবফ যরং ংবধঃ ঃড় ধহফ ফবিষঃ রহ ধ ংসধষষ ারযধৎধ ড়হ ঃযব ংড়ঁঃয ংরফব ড়ভ ঃযব ড়ঃযবৎ, ধ ফরভভবৎবহঃ চষধপব ভৎড়স ঃযধঃ পড়হঃধরহরহম ঃযব রসধমব, ঃবিহঃু ংঢ়ধপবং ফরংঃধহপব ভৎড়স রঃ. (ইহা জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের ‘চার পুণ্যস্থান’ গ্রন্থ হতে সংগৃহীত) উল্লিখিত তথ্যে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বৌদ্ধ রাজা প্রসেনজিতই প্রথম বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন বৌদ্ধ প্রধান দেশে নির্মিত বুদ্ধমূর্তিগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, বুদ্ধমূর্তিগুলোর আকার ও চেহারা ভিন্ন রকমের। যেমন চীন, জাপান, ভারত, থাইল্যান্ড, মায়ানমার (বার্মা) ও শ্রীলঙ্কার বুদ্ধমূর্তিগুলো আকার ও চেহারার কোনো মিল নেই। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের আকার ও চেহারার পার্থক্য হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
ভগবান বুদ্ধ জীবিতাবস্থায় তাঁর সত্যধর্ম প্রচারকল্পে যখন বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের মধ্যে যেতেন তখন তিনি ওই গোত্রের বা জাতির আকার ও চেহারার সদৃশ হতেন বিধায় পরবর্তী সময়ে বুদ্ধমূর্তি তৈরি করার জন্য নিজ নিজ এলাকার বা গোত্রের চেহারা সদৃশ বুদ্ধমূর্তি তৈরি করেছিলেন। তাই দেখা যায় মায়ানমারের বুদ্ধমূর্তিগুলো মায়ানমারের গোত্রসদৃশ। এভাবে প্রত্যেকে নিজ দেশের লোকের চেহারাসদৃশ বুদ্ধমূর্তিগুলো তৈরি করেছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশের বুদ্ধমূর্তিগুলোর আকার ও চেহারার মধ্যে কোনো সদৃশ্যতা নেই।

রাঙামাটি রাজবন বিহারের নির্মিত বুদ্ধমূর্তিগুলো মঙ্গোলয়েড গ্রুপের ন্যায় তৈরি করা হয়েছে। অতীব আনন্দ ও স্মরণীয় বিষয় যে, ৫ মার্চ ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ, ২৫৩৬ বুদ্ধাব্দ রোজ শুক্রবার রাজবন বিহারের ইতিহাসে একটি চিরস্মরণীয় দিন এবং ওই দিনটি স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ ও মাইল ফলক হিসেবে চিরজাগরুক ধর্মীয় ঘটনা হিসেবে স্মৃতিতে অম্লান থাকবে। এদিনে রাজবন বিহারে স্থানীয় প্রযুক্তিতে অষ্টধাতুর সংমিশ্রণে নির্মিত গৌতম মুনি বুদ্ধমূর্তি, শাক্যমুণি বুদ্ধমূর্তি ও উপগুপ্ত মহাস্থবিরের মূর্তি মহাসমারোহে দানোৎসর্গ ও জীবন্ন্যাস অনুষ্ঠান সম্পাদন করা হয় এবং একই সঙ্গে রাজবন বিহারে প্রথম বুদ্ধের ৮৪ হাজার ধর্মস্কন্ধ পূজা অনুষ্ঠান সম্পাদন উপলক্ষে ৮৪ হাজার প্রদীপ দান ও প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। এই পুণ্যানুষ্ঠানে লক্ষাধিক পুণ্যার্থী অংশগ্রহণ করে রাজবন বিহারের ইতিহাসে এই মহতী ধর্মীয় পুণ্যানুুষ্ঠানে এ যাবৎকালে আর কোনো অনুষ্ঠানে লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটেনি। এই মহান পুণ্যানুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে ‘বুদ্ধমূর্তি দানোৎসর্গ ও জীবন্ন্যাস’ অনুষ্ঠান স্মরণিকা রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি প্রকাশ করে। পরম পূজনীয় মহান আর্যপুরুষ, কল্যাণমিত্র, ষড়াভিজ্ঞ অর্হৎ, শ্রাবকবুদ্ধ শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের শিষ্যম-লীসহ এই মহতী পুণ্যানুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বুদ্ধমূর্তিগুলোর উৎসর্গ, জীবন্ন্যাস, সর্বজনীন উপাসনা বিহার উৎসর্গ, উদ্বোধন ও নিজ হাতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে বুদ্ধের ৮৪ হাজার ধর্মস্কন্ধ পূজা ও ৮৪ হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠান শুভ উদ্বোধন করেন এবং মঙ্গলাচরণের দ্বারা বিশ্বের সকল প্রাণীর সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য আশীর্বাদ প্রদান করেন।

পরম পূজনীয় মহান আর্যপুরুষ, কল্যাণমিত্র, ষড়াভিজ্ঞ অর্হৎ, শ্রাবকবুদ্ধ শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তে বিগত ৩০ জানুয়ারি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ, ১৭ মাঘ ১৪১৮ বঙ্গাব্দ, ২৫৫৫ বুদ্ধাব্দ রোজ সোমবার বিকাল ৩:৫৬ মিনিটে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে দেবমনুষ্য তথা বিশ্বের সকল সত্ত্বগণের মন ও চিত্তের সংবেগ অবনমিত করে জাগতিক বিশ্বজগৎ থেকে চিরতরে অবমুক্ত হয়ে পরিনির্বাপিত হন। ১ জানুয়ারি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ, ১৮ পৌষ ১৪১৮ বঙ্গাব্দ, ২৫৫৬ বুদ্ধাব্দ রোজ রবিবার প্রজ্ঞাসাধনা প্রকাশনীর উদ্যোগে ৮৪ হাজার প্রদীপদান ও প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠানে সমবেত পুণ্যার্থীদের প্রতি পূজ্য বনভন্তের দেশনায় দেশিত অন্তিম বাণী—‘তুমি কারোরে অন্যায় নগজ্য, কারোরে হিংসা নগজ্য, উত্তমভাবে ধর্ম গর, তোমার সু-উ-খ অব’। অর্থাৎ তোমরা কাউকেও অন্যায় কর না, কাউকেও হিংসা কর না, উত্তমভাবে ধর্ম আচরণ করবে, তোমাদের সুখ হবে’। পূজ্য বনভন্তে আজ আমাদের মাঝে চর্মচক্ষুতে দৃশ্যমান নেই, কিন্তু আমাদের প্রতি তাঁর অন্তিম দেশনা ও বাণীকে মন ও চিত্তে স্মরণে রেখে যথাযথ পালন, অনুশীলন ও ধারণ করে মুক্তির পথে এগিয়ে চলার গতিধারা সমুন্নত রাখতে হবে। তবেই সম্ভব হবে আমাদের দুঃখমুক্তি। তাই মন ও চিত্ত সদাজাগ্রত ও অটুট থাকুক, এই প্রার্থনা করি। পূজ্য বনভন্তের মতো মহান আর্যপুরুষের সদ্ধর্মশাসনে যতটুকু সময় আমাদের সান্নিধ্য লাভ হয়েছে। আমি এবং আমরা তাঁর অসীম উচ্চমার্গ জ্ঞান, তাঁর সত্য, তাঁর শক্তি—শান্তির সুশীতল ছায়ায় তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপস্থিতিতে নমিত চিত্তে যতটুকু কায়িক, আর্থিক, বাচনিক ও মানসিক একাগ্র শ্রদ্ধায় দানাদি কুশলকর্ম সম্পাদন করেছি এবং যা পুণ্য লাভ ও সঞ্চয়ের সুযোগ হয়েছে; তাঁর অবর্তমানে যেন ইহা উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ও সদা সর্বদা রক্ষিত থাকে এ প্রত্যাশা।

বুদ্ধধর্মীয় দৃষ্টিতে এ যাবৎ কালের কুশলকর্মের ফল পরিহানি না হয়ে অনির্বাণকাল সুফল প্রসবিনী হোক এবং যাবতীয় অজ্ঞানতা, অকুশল, অবিদ্যা, সংস্কার, তৃষ্ণা, হিংসা চিরতরে বিনাশ হয়ে বুদ্ধ-প্রশংসিত শ্রেষ্ঠতম মহাপ্রজ্ঞাময় মুক্তির জ্ঞান লাভ হোক এবং এ যাবৎ কালের কুশলকর্ম ও কায়িকশ্রমে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণজনিত পুণ্যফল ও দানের প্রভাবে সকল পারমিতা পরিপূর্ণ হয়ে অন্তিমে নির্বাণ লাভের হেতু হোক—আজিও তাঁর শ্রীচরণে এ প্রার্থনা করছি। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক! 

লেখক : প্রকৌশলী নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, সাধারণ সম্পাদক, প্রজ্ঞাসাধনা প্রকাশনী ও প্রাক্তন সদস্য, সহ-সাধারণ সম্পাদক, রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি

Print Friendly, PDF & Email