log1

স্মৃতিতে বনভন্তের পরিনির্বাণ লাভ

 

ইন্দ্রগুপ্ত ভিক্ষু-17

২৫ জানুয়ারি ১২, রোজ বুধবার বেলা ১১:৪০ মিনিট হঠাৎ আমার মুঠোফোন বেজে উঠল। মনিটরে চোখ পড়তেই দেখলাম পূর্ণজ্যোতি ভিক্ষুর কল। কল রিসিভ করলে অপর প্রান্ত থেকে পূর্ণজ্যোতি বলে উঠলেন, ‘ভন্তে, পূজ্য ভন্তে (অর্থাৎ পূজ্য বনভন্তে। আমরা কখনো উনার নাম গবহঃরড়হ করি না, কেবল ভন্তে বলি। অপর সব ভন্তেদের নাম গবহঃরড়হ করেই বলি) তো বেশ অসুস্থ। আপনি কি খবর পেয়েছেন? কেউ কি এ ব্যাপারে আপনাকে ফোন করেছে?’ ভন্তে বেশ অসুস্থ শুনেই মনটা ভারী হয়ে গেল। আমি বললাম, কই না তো! পূর্ণজ্যোতি বলতেই থাকলেন, কিছুক্ষণ আগে ভন্তের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বলতে গেলে শ্বাস নিতে পারছিলেন না প্রায়। শ্বাস নিতে না পারায় শরীরও কালো হয়ে যেতে বসেছিল। তৎক্ষণাৎ ডাক্তার ডেকে এনে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করায় আস্তে আস্তে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়েছে। এখনও অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। তবে বর্তমানে মোটামুটি ভালো অবস্থায় রয়েছেন। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তারের দলও চলে গেছেন। গত কিছুদিন ধরে খেতে পারছিলেন না, তার উপর কাঁশি, এই দুয়ে মিলে হয়তো এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমি এখনও পূজ্য ভন্তের পাশে রয়েছি। পরবর্তী সময়ে অবস্থার আরও উন্নতি না হলে আপনাকে জানাব। এখন রাখছি। একটানা কথাগুলো বলে পূর্ণজ্যোতি লাইন কেটে দিলেন।

পুরো খবরটা শুনে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। তবে বর্তমানে মোটামুটি ভালো অবস্থায় রয়েছেনজেনে কিছুটা স্বস্তিবোধ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলাম, পরে খবর জানানোর দরকার নেই। এক্ষুণি চলে যাব রাজবন বিহারে। 

কুঠিরের দরজা, জানালা বন্ধ করলাম চটজলদি। শুধুমাত্র সংঘাটি সাথে নিয়ে জিনলংকার ভিক্ষুর কুঠিরে চলে গেলাম। তাকে খবরটা জানিয়ে বললাম, একটা সিএনজি টেক্সি ফোন কর। আর তুমিও তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে যাও। এবার একে একে প্রজ্ঞালংকার ভন্তে, ভৃগু ভন্তে, প্রজ্ঞাবংশ ভন্তেকে ফোন করলাম। তাঁরা জানালেন, ইতিমধ্যে তাঁকে খবর জানানো হয়েছে। আর রাজবন বিহারের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন। অমনি আমি ব্রহ্মদত্ত ভিক্ষুকে ফোন করলাম। আমার কাছ থেকে খবর পেয়ে ওর মন ভারী হয়ে গেল; গলার আওয়াজ শুনে অন্তত আমার সেরূপ মনে হলো। আমি বললাম, তুমিও চলে আস। আমরা রাজবন বিহারের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছি। হ্যাঁ ভন্তে, আসছিবলে ব্রহ্মদত্ত লাইনটা কেটে দিলেন। জিনলংকার তৈরি হয়ে গেলে হেঁটে রওনা দিলাম। ৮/১০ মিনিট হাঁটার পর সিএনজি টেক্সি এসে পড়লে তাতে চড়ে বসলাম। রাজবন বিহারে পৌঁছে সোজা পূজ্য ভন্তের আবাসিক ভবনে ঢুকলাম। পূজ্য ভন্তেকে তাঁর বিশ্রামকক্ষে নির্ধারিত আসনে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখতে পেলাম। ভন্তের অবস্থা তেমন খারাপ বলে চোখে পড়ল না। অবশ্য স্যালাইন চলছিল, আর ভন্তে তখন সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন। শ্বাস-নিঃশ্বাস একটু জোরে হলেও অক্সিজেনের প্রয়োজন হচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, অক্সিজেনের সব ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সশ্রদ্ধচিত্তে বন্দনা করলাম ভন্তেকে। তার পর একপার্শ্বে বসে পড়লাম হাতজোড় করে। এবার পূজ্য ভন্তের নিয়মিত সেবক ভিক্ষুদের কাছ থেকে পুরো খবরটা জানতে চাইলাম নিচুস্বরে। অল্পক্ষণ পরে পূজ্য ভন্তে বিশ্রামকক্ষ থেকে হলরুমে বেরুনোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। অর্থাৎ চাকা-লাগানো আসনে বসে হলরুমে চক্রাকারে ঘুরবেন। যেটি তিনি প্রতিদিন করে থাকেন। নির্ধারিত আসনটি আনা হলো। খুব সতর্কতার সাথে পূজ্য ভন্তেকে আসনে বসালাম ধরাধরি করে। আর ভন্তের নির্দেশমতো আসনটি পেছন থেকে ঠেলে ঠেলে হলরুমে বের করে চক্রাকারে ঘুরানো শুরু করলেন নিয়মিত সেবাদানে অভ্যস্ত ভিক্ষুরা। তাদের সাথে যোগ দিতে ইচ্ছা জাগল আমারও। আমার দায়িত্ব পড়ল, স্যালাইনের বোতলটা ধরে ভন্তের আসনের আগে আগে হাঁটা। জিনলংকার, ব্রহ্মদত্ত ভিক্ষুরা কেন চেয়ে থাকবেন? তারাও যোগ দিলেন। কেউ ভন্তের আসনটি পেছন থেকে ঠেলে ঠেলে চালিয়ে নেওয়া, কেউ আসনের দু-পাশে থেকে পূজ্য ভন্তেকে সেবা-শুশ্রƒষা করার দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকলেন। অল্পক্ষণ পর ভৃগু ভন্তে এসে পড়লেন। বন্দনা শেষ করে তিনিও পূজ্য ভন্তের আসনটি ঠেলে চালিয়ে নেওয়ার কাজে যোগ দিলেন সাগ্রহে। পূজ্য ভন্তেকে এভাবে ঘুরানোর ফাঁকে ডা. নীহারেন্দু তালুকদার, ডা. সুপ্রিয় বড়য়া, ডা. উদয় শংকর দেওয়ান, ডা. সুশোভন দেওয়ান, ডা. ¯œহ কান্তি চাকমা, ডা. পরেশ খীসাসহ মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা আসলেন। তাঁরা ভন্তের শারীরিক পরীক্ষাদি করে নিলেন। পরীক্ষা শেষে বললেন, ভন্তে তো আমাদের পুরোপুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন না। আপনারা অল্পক্ষণ পর পর কখনো অক্সিজেন, কখনো ঘবনঁষরুধঃরড়হ-এর মাস্ক মুখে লাগিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। এই বলে তাঁরা চলে গেলেন। ইত্যবসরে প্রজ্ঞাবংশ ভন্তে ও প্রজ্ঞালংকার ভন্তে হলরুমে এসে পৌঁছলেন। উভয়ে কাছে এসে পূজ্য ভন্তেকে বন্দনা করলেন। অন্যান্য দিনে প্রজ্ঞাবংশ ভন্তেকে দেখলেই পূজ্য ভন্তে কিছু না কিছু বলে থাকেন। আজ কিন্তু কিছুই বললেন না।

পূজ্য ভন্তের পুরো শরীরে দুর্বলতার ছাপ থাকলেও প্রয়োজনীয় কথাগুলো ঠিকই বলছেন সুস্পষ্টভাবে। যদিও একটু নিচুস্বরে। যখন ঠা-া লাগছে ঠা-া, ঠা-াবলছেন। যখন পানির পিপাসা পাচ্ছে পানি পানিবলছেন। প্র¯্রাবের বেগ আসলেও বলছেন। বিশ্রামের রুমে যেতে চাইলেও বলছেন। মোটকথা সবকিছুই বলছেন বেশ স্পষ্টভাবে। আমরা ডাক্তারদের কথামতো অল্পক্ষণ পর পর কখনো অক্সিজেন, কখনো ঘবনঁষরুধঃরড়হ-এর মাস্ক পূজ্য ভন্তের মুখে লাগিয়ে দিতে থাকলাম। অবশ্য এটাকে ঠিক মুখে লাগিয়ে দেওয়া বলা চলে না। মুখ বরাবর ধরে থাকা বলাই যুক্তিসঙ্গত। কারণ, পূজ্য ভন্তে মুখে লাগিয়ে দিতে দেন না। ফলে মাস্কটি শুধু ভন্তের মুখের সামনে ধরে থাকতে হচ্ছে। আর তাতেও ভন্তে মাঝে মাঝে বাধা দিচ্ছেন। এমনকি মাঝে মাঝে হাত বাড়িয়ে ঠেলে দিচ্ছেন মাস্কটি। এই মাস্ক ধরে থাকার কাজটি প্রথমদিকে মৈত্রীসেন ভিক্ষু করলেও পরবর্তী সময়ে করুণাময় ভিক্ষু করতে থাকলেন।

আমরা পূজ্য ভন্তের কথামতো কখনো তাঁকে বিশ্রামের রুমে নিয়ে যাচ্ছি, কখনো হলরুমে চক্রাকারে ঘুরাচ্ছি। এসব করতে গিয়েও আমি সর্বদা স্যালাইনের দিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখছি। একটা স্যালাইনের বোতল শেষ হলে আরও একটা স্যালাইনের বোতল চলতে লাগল। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম, পূজ্য ভন্তে আগামীকাল বেশ সুস্থ হয়ে উঠবেনই। কারণ, আগেও বহুবার অসুস্থতার দরুন এ রকম দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু যেই না তাঁকে রাজী করিয়ে স্যালাইন দেওয়া হয়েছিল, অমনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কাজেই এবারও তা-ই হবে। ব্যতিক্রম হবে না কিছুতেই। স্যালাইন তো চলছে একটার পর একটা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল। আমরা সেদিকে আমল না দিয়ে পূজ্য ভন্তের সেবা-শুশ্রƒষায় ব্যস্ত থাকলাম। তিনি যেভাবে বলছেন, সেভাবেই আমরা করে যাচ্ছি। রাত সাড়ে নয়টায় ডা. নিখিল বড়য়া ও ডা. সলিল বড়য়া আসলেন। তবে ভন্তের বিরক্তিবোধের কথা ভেবে দূর থেকে দেখলেন মাত্র। ভন্তের শরীর ছুঁয়ে দেখলেন না। তারা আমাদের বললেন, ‘ভন্তে, আমরা বাড়ি যাব না, এখানেই থাকব। পূজ্য ভন্তের পুরানো বাথরুমের পাশের রুমে ঘুমাব। যখন প্রয়োজন হবে, আমাদের ডাকবেন।ক্রমেই রাত বাড়তে লাগল। বেশ কয়েকজন ভিক্ষু এসে আমাদের সাথে যোগ দিলেন। তারা আমাদের বললেন, ভন্তে, আপনারা ঘুমাতে যান। এবার আমাদের পালা। আমরা ঘুমিয়ে এসেছি। কয়েকজন চলে গেলেও জিনলংকার, ব্রহ্মদত্ত ও আমি রাজী হলাম না। বললাম, ঘুম তো আসতেছে না। দেখা যাক, কতক্ষণ থাকতে পারি। বাস্তবিক ভন্তেকে অসুস্থ অবস্থায় দেখলে আমার সহজে ঘুম আসে না। পূজ্য ভন্তে বিশ্রামরুমে থাকতে ইচ্ছা করছেন কম, হলরুমে ঘুরতে ইচ্ছা করছেন বেশি। আমরাও ভন্তের নির্দেশমতো চাকা-লাগানো আসনটি ঠেলে ঠেলে ভন্তেকে হলরুমে ঘুরাতে লাগলাম।

রাত ১২টার দিকে ভন্তের পেটে বায়ু সঞ্চারের সমস্যাটা বেড়ে গেল। পেট বেশ ফুলে উঠল। পূজ্য ভন্তেও বেশ অস্বস্তিবোধ করতে লাগলেন। তবে মুখ খুলে কিছুই বলছেন না। না বললেও তাঁর চোখ-মুখের অভিব্যক্তি দেখে সেটা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ভন্তের এ অবস্থা দেখে আমাদের মন বিষাদে ভরে গেল। ডাক্তার দুজনকে ডাকলাম। তারা বললেন, বাহ্যের মাধ্যমে বায়ু বের করার ব্যবস্থা করতে হবে। পরামর্শ-মাফিক বীরসেন ভিক্ষু পূজ্য ভন্তের মলদ্বারে ঘধঢ়ধ ংঁঢ়ড়ংরঃড়ৎু ট্যাবলেট ঢুকিয়ে দিলেন। প্রায় এক ঘন্টার পর ভন্তে বাহ্য ত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ধরাধরি করে ভন্তেকে বাথরুমে নিয়ে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ বাহ্য ত্যাগের চেষ্টা করলেন। বাহ্য তেমন ত্যাগ করতে না পারলেও বায়ু নির্গত হয়ে যাওয়ার কাজ মোটামুটি হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পূজ্য ভন্তে স্বস্তিবোধ করতে লাগলেন। আমাদের মন থেকেও বিষাদের কালোমেঘ সরে গেল। রাত ২:৩০ মিনিটে জিনলংকার ভিক্ষু ও ব্রহ্মদত্ত ভিক্ষু ঘুমানোর জন্য চলে গেলেন নিজেদের রুমে। চলে যাওয়ার সময় আমাকেও ডাকলেন। আমি রাজী হলাম না। পূজ্য ভন্তেকে নির্ঘুম অবস্থায় রেখে গিয়ে নিজে ঘুমাতে যাওয়া কিছুতেই মন সায় দিচ্ছিল না। রাত সাড়ে তিনটার দিকে আমাকে হঠাৎ ঘুমে চেপে ধরল। মনে মনে বললাম, না, এখন ঘুমাব না। যদি ঘুমাতেই হয়, তাহলে সাড়ে চারটার দিকে ঘুমাব। তখন অনেক ভিক্ষু-শ্রামণ এসে পড়বেন। চারটার একটু আগে পূজ্য ভন্তে বিশ্রামরুমে যেতে চাইলেন, আমরাও নিয়ে গেলাম। আসনে বসিয়ে দিয়ে আনুষাঙ্গিক সবকিছু ঠিকঠাক করে দিলাম। ভন্তেও বেশ আয়েশ করে আসনে হেলান দিলেন। অন্যান্য দিনে এভাবে বসলে লাইট অফ করে দিতে বলতেন, আজ কিন্তু বললেন না। আমরা আগ্রহ ভরে ভন্তেকে সেবা করে যেতে লাগলাম।

রাত সাড়ে চারটার দিকে হঠাৎ পূজ্য ভন্তের শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন ঘন হয়ে গেল। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কেউ একজন যেন বলে উঠলেন, গত কালকের মতো হচ্ছে। ভন্তের হাত ও মুখ কালো হয়ে যেতে লাগল প্রায়। সঙ্গে সঙ্গে ধক করে ওঠল আমার বুক। মুখের রঙে বসে গেল গাঢ় কালো ছাপ। ভন্তের জন্য বুকের ভেতর গভীর কষ্টের উত্তাপ জ্বলতে লাগল। অন্যদের চোখে মুখেও একই অভিব্যক্তি। একটুও সময় নষ্ট না করে অক্সিজেনের মাস্ক মুখে লাগিয়ে দিলাম। পাশের রুম থেকে ডাক্তারদের ডেকে আনলাম। তারা এসে অক্সিজেনের ব্যবস্থাটা পরীক্ষা করে দেখলেন। আর মেডিকেল বোর্ড-এর অন্য ডাক্তারদের ফোন করলেন। আমরা কেউ পূজ্য ভন্তের জন্য বোজ্ঝাঙ্গ সূত্র, গিরিমানন্দ সূত্রাদি পাঠ করতে লাগলাম। কেউ সিনিয়র ভিক্ষুদের ফোন করলাম। অল্পক্ষণের মধ্যে প্রজ্ঞাবংশ ভন্তে, সৌরজগৎ ভন্তে, জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষুসহ দশ/পনের জন ভিক্ষু এসে পৌঁছলেন। তারাও সূত্রপাঠে যোগ দিলেন সাগ্রহে। অন্যদিকে ডা. সুশোভন দেওয়ানসহ অন্য ডাক্তাররা আসলেন। আর পূজ্য ভন্তের শারীরিক অবস্থাদি পরীক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তবে ততক্ষণে ভন্তের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি প্রায় স্বাভাবিক হয়েছে। তারা কিছুক্ষণ পরীক্ষা করার পর বললেন, ভন্তে, এখন চিন্তার তেমন কোনো কারণ নেই। সবকিছু মোটামুটি ঘড়ৎসধষ, তবে বেশ কিছু পরীক্ষা করা দরকার। তন্মধ্যে কিছু পরীক্ষা আছে, যেগুলো রাঙামাটিতে করার সুযোগ নেই। আজ দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে কনসালটেন্ট ডা. সুজাত পাল আসছেন, তাকে এখানে নিয়ে আসব। দেখা যাক তিনি কী বলেন? তখন সবাই বসে আলোচনা করব, ভন্তেকে আরও ভালো চিকিৎসা প্রদান করার জন্য কী করা দরকার। আমরা দুপুরে আসছি বলে ডাক্তারেরা চলে গেলেন।

অল্পক্ষণ পর ভন্তে হলরুমে আসার ইচ্ছা করলে, আমরা তাঁকে হলরুমে নিয়ে আসলাম। এর ফাঁকে অপরাপর ভিক্ষু-শ্রামণেরা ভন্তেকে বন্দনা করলেন। এবার ভন্তের মুখ ধোয়ার ব্যবস্থাদি করা হলো। আমরা ভন্তের হাতে টুথ পাউডার ঢেলে নিলাম। তর্জনী দিয়ে খুব আস্তে দাঁত মাজলেন তিনি। মুখ ধোয়া শেষ হলে সকালের নাস্তা পরিবেশন করলাম। ভন্তে দুয়েক কোষা কমলা খেলেন মাত্র। এর চেয়ে বেশি কিছু খেলেন না। ওদিকে পূর্ণজ্যোতি ভিক্ষু, আর্যবোধি ভিক্ষু ও মৈত্রীসেন ভিক্ষুরা সকালের নাস্তা খেয়ে হলরুমে আসলেন। এসেই আমাদের বললেন, ‘ভন্তে, আমরা খেয়ে এসেছি। যান, আপনারা খেয়ে আসেন। এখন আমরা ভন্তের সেবায় থাকছি।আমরা নাস্তা খেতে নিচে নেমে আসলাম। তাড়াতাড়ি খেয়ে আবার ভন্তের সেবায় যোগ দিলাম। গতকালকের মতো কখনও ভন্তেকে বিশ্রামরুমের আসনে, কখনও হলরুম ঘুরাতে লাগলামভন্তে যখন যেটা করতে বলছেন।

ইতিমধ্যে পূজ্য ভন্তের অসুস্থতার কথা ব্যাপকভাবে প্রচার হয়ে গেছে। ফলে অনেক দায়ক-দায়িকা রাজবন বিহারে ভিড় জমাতে থাকলেন। তবে ভন্তের শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যার কথা ভেবে তাদের হলরুমে না উঠার অনুরোধ জানানো হলো। সব দায়ক-দায়িকাদের একটাই জিজ্ঞাসা, এখন ভন্তে কেমন আছেন? সকাল পৌনে নয়টার দিকে চট্টগ্রাম হতে ডা. শৈবাল বড়য়া, ডা. অসীম বড়য়া ও ডা. শর্মিলা বড়য়া আসলেন। পূজ্য ভন্তেকে বন্দনা করার পর তারা ডা. ¯œহ কান্তি চাকমা ও ডা. নিখিল বড়য়ার কাছ থেকে ভন্তের অসুস্থতা ও চিকিৎসা সম্বন্ধে জেনে নিলেন। এরপর ডা. শৈবাল বড়য়া পূজ্য ভন্তের কাছে এসে কিছু পরীক্ষা করতে থাকলেন। ডা. অসীম বড়য়া সাহায্য করলেন তাকে। এ সময় ডা. শর্মিলা বড়য়া ভন্তের চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্রসহ আনুষাঙ্গিক পরীক্ষাদির রিপোর্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগলেন। মুখে কিছুই বলছেন না, কিন্তু দু-চোখে অশ্রু ঝরালেন।

আমরা ৭/৮ জন ভিক্ষু ও ৫/৬ জন শ্রামণ সারাক্ষণ পূজ্য ভন্তের সেবাদানের রত রয়েছি। আজ পূজ্য ভন্তের গলার স্বর অনেক ছোট। উঁঁনি আমাদের কী বলতে চাচ্ছেন, সেটা বুঝা বেশ কঠিন হয়ে পড়ল। আমাদের বার বার জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে, ‘কী ভন্তে, কী বলছেন?’ অনেক সময় আমরা বলতাম, ‘এটা করতাম ভন্তে?’ ঠিক হলে তিনি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ’, বেঠিক হলে নাইঙ্গিত করতেন। সকাল সাড়ে দশটা বেজে গেলে আমি অল্পক্ষণের জন্য আমার রুমে আসলাম। গতকাল রাজবন ভাবনা কেন্দ্র থেকে রাজবন বিহারে আসার পর এক মিনিটের জন্যও রুমে আসা হয়নি। রুমে ঢুকে দোয়াজিকটি খাটে রাখলাম আর জানালা দুটি খুলে দিলাম। এরপর সোজা পূজ্য ভন্তের আবাসিক ভবনের হলরুমে উপস্থিত হলাম। দেখতে পেলাম, পূজ্য ভন্তে দুপুরের খাবার গ্রহণ করলেন না। এ সময় প্রিয়জ্যোতি ভিক্ষু বললেন, গত দুদিন ধরে দুপুরের খাবার একদম খাচ্ছেন না, আজও খেলেন না। দুপুর সাড়ে বারটা বেজে যেতেই চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, বাবু গৌতম দেওয়ানসহ উপাসক-উপাসিকা পরিষদের ৭/৮জন সদস্য হলরুমে এসে উপস্থিত হলেন। অল্পক্ষণ পরে চট্টগ্রাম মেডিকেলের কনসালটেন্ট ডা. সুজাত পালসহ ডা. নীহারেন্দু তালুকদার, ডা. সুপ্রিয় বড়য়া, ডা. উদয় শংকর দেওয়ান, ডা. সুশোভন দেওয়ান, ডা. প্রতীক দেওয়ান, ডা. পরেশ খীসা, ডা. নিখিল বড়য়া, ডা. হেনা বড়য়াসহ বেশ বড় একদল ডাক্তারও উপস্থিত হলেন হলরুমে। সামান্য কথাবার্তা সেরে ডা. সুজাত পালকে পূজ্য ভন্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। এবার তিনি ভন্তের শারীরিক পরীক্ষায় মনোযোগ দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত চলল তার এ পরীক্ষা পর্ব। পরীক্ষা শেষে ডা. পাল ভন্তেকে ভালো চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম না হয় ঢাকার অত্যাধুনিক হাসপাতালে আশু নিয়ে যাওয়া দরকার বলে অভিমত ব্যক্ত করলেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার জন্য ডা. পাল, চাকমা রাজাসহ সবাই কমিটির অফিসে চলে গেলেন। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ থাকলাম অল্পক্ষণ।

বেলা দেড়টার পর চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়, গৌতম দেওয়ান, প্রতুল বিকাশ চাকমা, ডা. সুশোভন দেওয়ানসহ ৭/৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি পূজ্য ভন্তের আবাসিক ভবনে আসলেন। শুরু হলো সিনিয়র ভিক্ষুদের সাথে আলোচনা। চাকমা রাজা আমাদের জানালেন, ‘ভন্তে, ডাক্তারগণের সাফ কথা, পূজ্য ভন্তেকে আর রাজবন বিহারে রেখে চিকিৎসা করা যাবে না। ভন্তের বর্তমান অবস্থা প্রেক্ষিতে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সেবাসম্বলতি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। এবং সেটা আজ বা আগামীকালের মধ্যেই।সঙ্গে সঙ্গেই নন্দপাল ভন্তে রাজী হলেন। আমরা দুয়েকজন বললাম, ভন্তে তো হাসপাতালে যেতে চাইবেন না হয়ত। যে-কোনো উপায়ে কী এখানে চিকিৎসা করা যায় না? ডাক্তারেরা বললেন, এখন আইসিইউ-তে রেখে চিকিৎসা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম সন্ধ্যায় একটা জরুরি সভা আহ্বান করি। সেখানে সব সিনিয়র ভিক্ষু ও রাঙামাটির গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন। সবাই মিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। বিকাল ৪ টার দিকে পূজ্য ভন্তের রোগ মুক্তি কামনায় ভিক্ষুসংঘ একত্র হয়ে সূত্রপাঠ করে দিতে লাগলাম। একটানা দেড় ঘন্টার অধিক সময় ধরে সূত্রপাঠ চলল। এ সময় পূজ্য ভন্তে হলরুমে সেই চাকা-লাগানো আসনে বসে থাকলেন। বিশ্রামের রুমে ঢুকার ইচ্ছা যেমন করলেন না, তেমনি ইচ্ছা করলেন না হলরুমে চক্রাকারে ঘুরার।

এদিকে জরুরি সভায় সময় (সন্ধ্যা ৬টা) হয়ে গেল। আমরা পূজ্য ভন্তেকে বন্দনা করে দেশনালয়ে চলে আসলাম। দেখলাম, ইতিমধ্যে ভিক্ষুসংঘ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে জরুরি সভা ঋদ্ধ। তবে কারোর চোখে-মুখে উচ্চ¦লতা নেই সবাই গম্ভীর। পূজ্য ভন্তের অসুস্থতার কথা ভেবে সবার বুকে যেন পাহাড়সমান কষ্ট এসে চেঁপে বসেছে। প্রথমে ডা. সুশোভন দেওয়ান মাইক্রোফোন হাতে নিলেন। পূজ্য ভন্তের অসুস্থতা ও বর্তমান শারীরিক অবস্থাসহ কয়েকটি পরীক্ষার রিপোর্ট তুলে ধরলেন। সোজাসপ্টা বললেন, আমরা ডাক্তারেরা ভন্তেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছি না। আর একটুও দেরি করা যাবে না। এরপর উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ হতে চাকমা রাজা, মনিস্বপন দেওয়ানসহ ৪/৫জন এবং নন্দপাল ভন্তে, প্রজ্ঞালংকার ভন্তে, ভৃগু ভন্তে, জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষু ও আমি আলোচনায় অংশগ্রহণ করলাম। সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, আগামীকালই পূজ্য ভন্তেকে ঢাকাস্থ স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। নিয়ে যাওয়ার বাহন হবে এয়ার অ্যা¤^লেন্স। কথা উঠল, পূজ্য ভন্তের আগে একদল ভিক্ষু ঢাকায় পৌঁছা দরকার। কে কে সেই দলে যাবেন? সেই হিসাব কষতে শুরু করলেন জিনপ্রিয়, ধম্মবোধি ভিক্ষুরা। অন্যদিকে স্কয়ার হাসপাতালের যোগাযোগ এবং আগামীকাল এয়ার অ্যাম্বুলেন্স রাঙামাটিতে নিয়ে আসার ব্যাপারে আলোচনা শুরু হলো। উপাসক-উপাসিকা পরিষদ সে ব্যাপারে দায়িত্ব প্রদান করলেন ডা. প্রতীক দেওয়ানকে। ফলে ডা. প্রতীক দেওয়ান, ডা. কৌশিক চাকমা ও ম্যাজিস্ট্রেট মিসেস রনি চাকমা সেই দায়িত্ব সুচারুভাবে সম্পাাদনে নেমে পড়লেন। জিনপ্রিয়দের হিসাব কষায় যোগ না দিয়ে আমি সোজা আমার রুমে চলে আসলাম। উদ্দেশ্য, আগে এক ঘন্টা ঘুমাব। তার পর গতরাতের মতো পুরোরাত ভন্তের সেবায় নিয়োজিত থাকব। যেহেতু গতকাল থেকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করা হয়নি, সেহেতু কিছু ঘুমিয়ে না নিলে আজ রাত জেগে থাকা সম্ভব হবে না। ঘড়ি তাকিয়ে দেখলাম, সাড়ে ছয়টা বেজে গেছে। অ্যালার্ম ঠিক করে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঠিক ঠিক এক ঘন্টায় জেগে ওঠে সামান্য করে চোখ ধুয়ে নিলাম। অমনি চলে আসলাম হলরুমে। ইতিমধ্যে পূজ্য ভন্তেকে চাকাওয়ালা আসন হতে হাসপাতালের বেডে হেলান দিয়ে বসানো হয়েছে। ভন্তে অনেকটা আধশোয়া অবস্থায় পা ছেড়ে নিয়ে চোখবুজে রয়েছেন। মুখে অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো। জানতে পারলাম, সন্ধ্যা ৭টা দিকে একটা অফৎবহধষরহব ইঞ্জেকশনও দেওয়া হয়েছে। আর প্র¯্রাবের সমস্যা দেখা দেওয়ায় ঈধঃযবঃবৎ করে দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় ডা. প্রতীক দেওয়ান সেই সেবা প্রদান করেন। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পূজ্য ভন্তের এই শারীরিক অবনতি দেখে বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। মুখ ঢেকে গেল আঁধারে। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর এদিক-ওদিক তাকালাম। দেখলাম, আজ বহু ভিক্ষু-শ্রামণ সারা রাত জেগে থাকার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। আর হলরুমের দক্ষিণপার্শ্বে পূজ্য ভন্তের বেডের একটু দূরে ডা. সুশোভন দেওয়ান, ডা. প্রতীক দেওয়ান, ডা. পরেশ খীসা, ডা. শৈবাল বড়য়া, ডা. অসীম বড়য়া, ডা. নুয়েল খীসা, টেকনেসিয়ান মুরতি চাকমাসহ বেশ কয়েকজন সারা রাত জেগে থাকার জন্য অবস্থান নিয়েছেন। যাতে করে পূজ্য ভন্তেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা ও চিকিৎসা সেবা প্রদানে সক্ষম হন। কোনো একজন ভিক্ষু আমাকে বললেন, ‘ভন্তে, পূজ্য ভন্তেকে নিত্য সেবাদানে অভ্যস্ত কয়েকজন ভিক্ষুকে তো ঢাকায় পাঠানো ব্যবস্থা করতে হবে। আগামীকাল জ্ঞানপ্রিয়, বিশুদ্ধানন্দ ভন্তেরা যাবেন, তাদের সাথে অমুক অমুক ভিক্ষুকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।আমি বললাম, ঠিক আছে। জ্ঞানপ্রিয় এখন কোথায়? ‘পূজ্য ভন্তের বিশ্রামরুমের পাশের রুমেবলে ভিক্ষুটি উত্তর প্রদান করলেন।

আমি জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষুর কাছে গিয়ে সেটার ব্যবস্থা করে দিলাম। এরপর ফোন করলাম জিনপ্রিয় ভিক্ষুকে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সম্বন্ধে (পুরো খবর) জানতে চাইলাম। অপর প্রান্ত থেকে জিনপ্রিয় বললেন, যতদূর জানি, ম্যাজিস্ট্রেট রনি চাকমারা সেই ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আগামীকাল সকালে যত দ্রুত সম্ভব রাঙামাটিতে আসবে। কোথায় ল্যা- করবে, সেটা আগামীকাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানাবে। আর এ ব্যাপারে উপাসক-উপাসিকা পরিষদ যোগাযোগ রক্ষা করছে। আপনারা যথা সময় জানতে পারবেন। জিনপ্রিয়ের সাথে কথা শেষ করে ফোন করলাম কনক চাঁপা চাকমাকে। বললাম, পূজ্য ভন্তেকে সুচিকিৎসার জন্য আগামীকাল ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করানো হবে। আপনার যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে জানাশুনা থাকে, তাহলে আমাদের নিয়ম-কানুনগুলো একটু বলে দেবেন। যাতে করে ভন্তেকে কোনো মহিলা ডাক্তার বা নার্স স্পর্শ না করেন। আমার কথা শুনে কনক চাঁপা চাকমা বললেন, হ্যাঁ ভন্তে, আমি অবশ্যই এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব। স্কয়ার হাসপাতালের ডাইরেক্টর অঞ্জন চৌধুরী পিন্টুর সাথে আমাদের বেশ জানাশুনা রয়েছে। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এটা তো আমাদেরও দায়িত্ব। আমি আরও বললাম, আজ সন্ধ্যায় নয়/দশ জনের একদল ভিক্ষু ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। আগামীকাল আরও আট/ নয় জন ভিক্ষু ঢাকায় আসবেন। স্কয়ার হাসপাতাল তো আপনাদের একদম কাছে। আপনারা রাজী থাকলে আমার ছেলে আর্যের রুমটি আপনাদের দিয়ে দেব। আপনারা আমার এখানে অবস্থান করে সহজে পূজ্য ভন্তেকে দেখাশুনা করতে পারবেন।আমিও রাজী হলাম।

এবার ফোন করলাম পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর মিসেসকে। অপর প্রান্ত থেকে কল রিসিভ করে মিসেস মন্ত্রী বললেন, ‘ভন্তে বন্দনা, কেমন আছেন?’ আমি বললাম, তেমন ভালো না। পূজ্য ভন্তেকে সুচিকিৎসার জন্য আগামীকাল ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে, নিশ্চয় এতক্ষণে জেনেছেন। আপনি মন্ত্রীকে বলেন আগামীকাল স্কয়ার হাসপাতালে গিয়ে পূজ্য ভন্তেকে রিসিভ করতে এবং নিজেই হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে। এটা মন্ত্রী করলে যতটুকু গুরুত্ব পাবে, ভন্তেকে শ্রদ্ধা জানানো হবে, অন্যেরা করলে ততটুকু গুরুত্ব পাবে না। আরও বললাম, ছোট, (সাধারণত ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলাপনে মিসেস মন্ত্রীকে আমি ডাকনাম ধরে ডাকি) এটা আপনাদের জন্য একটা মহাপুণ্য লাভের সুযোগ হচ্ছে কিন্তু। আপনিও যাবেন। এবার মিসেস মন্ত্রী বললেন, ‘কোনো অসুবিধা নেই ভন্তে। আমি দীপঙ্করকে অবশ্যই সেটা করতে বলব। আর সেও আগ্রহভরে করবে। আগামীকাল মন্ত্রী যে স্কয়ার হাসপাতালে যাচ্ছেন, এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত থাকুন। আগামীকাল আপনারা যখন ভন্তেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিবেন, তখন আমাকে একটু কল দিবেন।আমি বললাম, ঠিক আছে। ফোনে যোগাযোগ শেষ করে পূজ্য ভন্তের কাছে ফিরে আসলাম। রাত ৯টার দিকে ডা. সুপ্রিয় বড়য়া, ডা. নীহারেন্দু তালুকদার, ডা. উদয় শংকর দেওয়ান, ডা. নিখিল বড়য়া সবাই হলরুমে আসলেন। পূজ্য ভন্তের হাতধরে নাড়ি, রক্তচাপ পরীক্ষা করলেন। কিছু কথা বললেন ডা. সুশোভন দেওয়ানের সাথে। তারা বেরিয়ে যাওয়ার পথ ধরলেন। এ সময় ডা. উদয় শংকর দেওয়ান আমাকে বললেন, ভন্তে, আমরা চলে যাচ্ছি, সুশোভনরা সারা রাত থাকবেন। আমরা আগামীকাল সকালে আসব। রাত ১০টার পর ডা. প্রতীক দেওয়ার ও ডা. সুশোভন দেওয়ান পূজ্য ভন্তের নাড়ি, রক্তচাপ পরীক্ষা করলেন। ডা. প্রতীক আমার পাশে আসলে আমি ও ব্রহ্মদত্ত ভিক্ষু ওনাকে বললাম, পূজ্য ভন্তের অবস্থা কী রকম? বলা বাহুল্য, ডা. প্রতীক হলেন ব্রহ্মদত্ত ভিক্ষুর গৃহীকালীন ক্লাসমেট। তিনি বললেন, ভন্তে, আপাতত নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। ঢাকায় নিয়ে গিয়ে সবকিছু পরীক্ষা করার পর তবেই পুরাপুরি বলা যাবে।

ডাক্তারেরা প্রটি ঘন্টায় একবার করে পূজ্য ভন্তের হাত, পা ধরে রক্তচাপ, নাড়িসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাদি করতে থাকলেন। আমরা বুকে এক ধরনের কষ্ট অনুভব করে করে রাত কাটাতে লাগলাম। অব্যক্ত বেদনায় ভরা এক্সপ্রেশন সবার চোখে-মুখে। পূজ্য ভন্তের এ অসুস্থতা দেখে সবার মন মুষড়ে গেছে যেন। নিজেদের অজান্তে মনে উৎকন্ঠা, উদ্বেগ বাসা বেঁধে ফেলল। সবাই গম্ভীরমুখে চুপচাপ বসে রইলেন। ভন্তেকে সেবাদানরত ভিক্ষু-শ্রামণেরা একটু-আধটু নড়াচড়া করছেন যা। রাত আস্তে আস্তে বাড়তে থাকল। কুকুরগুলো কিছুক্ষণ পর পর একসাথে ডেকে উঠল উঠানে। চোর বা অপরিচিত কাউকে দেখলে যেমন ডাকে, ঠিক সে রকম। রাত বাড়লেও কারোর চোখে ঘুম ঘুম ভাব নেই। অবশ্য কাউকে কাউকে সামান্য ঝিমিয়ে নিয়ে ঘুমের বিষ ঝেড়ে ফেলতে হয়েছে। তবে আমরা ১৪/১৫ জন এক মুহূর্তের জন্যও দু-চোখের পাতা এক করলাম না। সেরূপ ইচ্ছাও উৎপন্ন হলো না। মনের মধ্যে সারাক্ষণ একটা চিন্তাই কাজ করতে থাকল কখন ভোর হবে, কখন ঢাকা হতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স রাঙামাটিতে পৌছবে, কখন ভন্তেকে ঢাকায় পাঠাতে পারব?’ কোনো কিছুর জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকা বেশ কঠিন। তখন এক মিনিটকে মনে হয় এক ঘন্টা, আর ঘন্টাকে মনে হয় যেন পুরো একটি দিন। আমাদেরও তা-ই মনে হতে লাগল।

রাত তিনটার দিকে হঠাৎ প্রিয়জ্যোতি ও প্রজ্ঞাকীর্তি ভিক্ষুর খেয়াল হলো, অক্সিজেনের সিলিন্ডারের মজুদ কমে যাচ্ছে। ঢাকা হতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হলে সংকট দেখা দিতে পারে। তারা আমাকে বললেন, নতুন অক্সিজেন সিলিন্ডার আনার জন্য চট্টগ্রামে লোক পাঠাব কি? সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম, কেন নয়, এক্ষুণি পাঠাও। ভোর চারটা না বাজতেই অন্যান্য ভিক্ষু-শ্রামণেরা হলরুমে এসে পড়লেন। সশ্রদ্ধচিত্তে ভন্তেকে বন্দনা করে হলরুমের একপার্শ্বে বসে হাতজোড় করে বসে থাকলেন। ক্রমেই পূর্বাকাশ ও চারপাশ ফর্সা হয়ে ওঠল। একসময় সূর্য উঁকি দিল পূর্বদিকের গাছগাছালির ফাঁকে। ঝলমলে দ্যুতি ছড়াতে লাগল পূজ্য ভন্তের আবাসিক ভবনের আশপাশ এলাকায়। কিন্তু আমাদের মনের আকাশ তো ঘনকালো মেঘে ঢাকা। মনের সেই চাপ চোখে-মুখেও স্পষ্ট। ভোরে বিশুদ্ধানন্দ ভন্তে, জ্ঞানপ্রিয়রা মাইক্রোবাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

সকালের নাস্তা খাবার সময় হলে প্রায় ভিক্ষু-শ্রামণেরা হলরুম থেকে নেমে গেলেন। আমরা দশ/পনেরজনের মতো ভিক্ষু রইলাম পূজ্য ভন্তের সাথে। ডাক্তারের দল থেকেও কয়েকজন নাস্তা খেতে হলরুম ত্যাগ করলেন। নাস্তা খেয়ে নিয়ে পূর্ণজ্যোতি, আর্যবোধি, ব্রহ্মদত্ত ভিক্ষুসহ দশ/পনেরজন ভিক্ষু হলরুমে ফিরে আসলেন। আর আমাদের বললেন, যান, এবার আপনারা খেয়ে আসেন। প্রথমদিকে আনন্দমিত্র ও আমি রাজী হচ্ছিলাম না। হঠাৎ মনে পড়ল, আমি তো গতকালের দুপুরের খাবারও খাইনি। আজকের দুপুরের খাবারও হয়ত খাওয়া হবে না। কারণ, ঢাকা হতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কখন আসবে সেটা তো ঠিক নেই, এই ভেবে আনন্দমিত্রকে বললাম, চল সামান্য হলেও খেয়ে আসি। এ সময় ডা. সুশোভন দেওয়ান বললেন, ভন্তে, আমরাও একটু নাস্তা খেয়ে আসছি। নাস্তা খেয়ে ফিরে আসতে আমাদের সামান্য দেরি হলো। এসেই দেখলাম, ডাক্তারদের মধ্যে বেশ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, পূজ্য ভন্তের শরীরের তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে। ঠা-াভাব পা থেকে ক্রমেই ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে। আর স্যালাইনের গতিও শ্লট হয়ে যাচ্ছে। ডা. রতন চাকমার হাত রীতিমতো কাঁপতে লাগল। তাদের এ অবস্থা দেখে দ্রিম করে একটা ধাক্কা লাগল আমার বুকে। বুকের রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার অবস্থা প্রায়। তবে মনস্থির করলাম, নার্ভাস হওয়া চলবে না। চটজলদি ডা. প্রতীক দেওয়ানকে ফোন করলাম। বললাম, প্রতীক, ভন্তের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে মনে হয়। আপনি এক্ষুণি চলে আসুন। অনেকের চোখে তখন অশ্রু ঝরতে শুরু করল। পূর্ণজ্যোতি ভিক্ষুর চোখও ভেজা প্রায়। ধীমান চাকমা তো ফুঁপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছেন। সিনিয়র ভন্তেদের ফোন করা হলো। ফোন করা হলো চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়কেও। ইতিমধ্যে ডা. প্রতীক দেওয়ানসহ অনেকেই হলরুমে এসে পড়লেন। যোগ দিলেন ডা. সুশোভনদের সাথে। খুব দ্রুত চলতে লাগল তাদের হাতের কাজ। অফৎবহধষরহব ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করতে লাগলেন। একটা, দুইটা . . .তবুও ভন্তের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছিল না। ভিক্ষুসংঘ সূত্রপাঠ করে যাচ্ছেন একটার পর একটা। আমরা যারা ভন্তের সেবাদানেরত তারাও ব্যস্ত স্বীয় স্বীয় দায়িত্বে। পূজ্য ভন্তের এ অনভিপ্রেত অবস্থার প্রেক্ষিতে জ্ঞানপ্রিয়কে ফোন করলাম। বললাম, ভন্তের বর্তমান অবস্থান ভালো নয়। কাজেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তাড়াতাড়ি পাঠাতে ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এটুকু বলাতেই আমার স্বর বসে গেল। চোখে পানি আসল। এ সময় হলরুমে উপস্থিত সবার মাঝে একটা মহা উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়লযা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। প্রত্যেকের বুক দুরু দুরু করতে থাকল যদি পূজ্য ভন্তের কিছু একটা হয়ে যায়!নানা দুশ্চিন্তা এসে ভর করতে লাগল মনে। সবাই চরম উদ্বিগ্ন ও ভীতু চোখে তাকিয়ে থাকলেন পূজ্য ভন্তের দিকে। এ সময় প্রজ্ঞাবংশ ভন্তে বলে উঠলেন, ডাক্তারেরা পূজ্য ভন্তেকে কেমোর দিকে যাচ্ছে বললেও ভন্তে তো আসলে ধ্যানেই রয়েছেন। ধ্যানে অধিষ্ঠিত অবস্থায় ধ্যানী তো বাহ্যিক জগৎ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকেন। তখন তার বাহ্যিক কোনো অনুভূতিই থাকে না। প্রজ্ঞাবংশ ভন্তের এই কথা আমি বিশ্বাস করলাম। অমনি মনে পড়ল, ভগবান বুদ্ধের পরিনির্বাণের পূর্বমুহূর্তের কথা। ভগবান পরিনির্বাণ প্রাপ্তির পূর্বে প্রথমে প্রথমধ্যানে মগ্ন হন, প্রথমধ্যান হতে উঠে দ্বিতীয়ধ্যানে মগ্ন হন, দ্বিতীয়ধ্যান . . . তৃতীয়ধ্যান . . . চতুর্থধ্যান . . . আকাশ-অনন্ত-আয়তন সমাপত্তিতে . . . বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন সমাপত্তিতে . . . আকিঞ্চন-আয়তন সমাপত্তিতে . . . নৈবসংজ্ঞানাসংজ্ঞা-আয়তন সমাপত্তিতে . . . সংজ্ঞাবেদয়িত নিরোধ সমাপত্তিতে মগ্ন হন। সে সময় আয়ুষ্মান আনন্দ আয়ুষ্মান অনুরুদ্ধকে সম্বোধন করে প্রশ্ন করলেন, ‘ভন্তে অনুরুদ্ধ, ভগবান কি নির্বাণে পরিনির্বাপিত হলেন?’ অনুরুদ্ধ জ্ঞাননেত্রে দেখলেন, ‘ভগবান সংজ্ঞাবেদয়িত নিরোধ সমাপত্তিতে মগ্ন রয়েছেন। তিনি এটা ভালোভাবে জানেন যে, নিরোধ সমাপত্তিতে কখনো কালক্রিয়া হতে পারে না। ধ্যানীগণ যতক্ষণ নিরোধ সমাপত্তিতে মগ্ন থাকেন, ততক্ষণ তাঁদের মৃত্যু হয় না।তাই আয়ুষ্মান অনুরুদ্ধ বললেন, বন্ধু আনন্দ, ভগবান নির্বাণে পরিনির্বাপিত হননি; সংজ্ঞাবেদয়িত নিরোধ সমাপত্তিতে মগ্ন রয়েছেন। এ কথা স্মরণ হতেই আমার মনে সাহস আসল। মনে মনে ভাবলাম, আয়ুষ্মান আনন্দ স্রোতাপত্তিলাভী হয়েও যেখানে ভগবানের সেই ধ্যানস্থ অবস্থা জানতে পারেননি, সেখানে পৃথকজন ডাক্তার কীভাবে পূজ্য ভন্তের ধ্যানস্থ অবস্থা জানতে পারবেন। প্রায় আধ ঘন্টার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করল। ভন্তের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেল, স্যালাইনও স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগল। এবার সবার পরানে যেন পানি আসল। ভয় কেটে গেল। দশ মন ওজনের বিশাল কষ্টের পাথরটা যেন সরে গেল বুক ও মাথা থেকে। বুক হালকা হয়ে গেল: মনও কিছুটা হালকা হলো। ডাক্তারদের চোখে-মুখেও স্বস্তির আভা ফুটে উঠল। অমনি শুরু হলো এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষার পালা। এই অপেক্ষার পালাও সুদীর্ঘ বলে মনে হতে থাকল ক্রমেই। সবাই মনে-প্রাণে চাইতে লাগলাম অতি দ্রুত এয়ার অ্যাম্বুলেন্স রাঙামাটিতে পৌঁছুক।

সকাল সাড়ে নয়টার দিকে খবর আসল, কুয়াশার কারণে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আসতে একটু দেরি হবে। আর অ্যাম্বুলেন্সে পূজ্য ভন্তের সাথে মাত্র একজনের জায়গা হবে। কথা উঠল, তাহলে কে যাবেন? গতকালের খবর অনুসারে দুজন যাওয়ার কথা, আনন্দমিত্র স্থবির ও ডা. ¯œহ কান্তি চাকমা। অনেকে বললেন, আনন্দমিত্রই যাবেন। সে তো ভন্তের সেবক। আমি বললাম, আমার মনে হয় ডাক্তারকে পাঠালে বেশি ভালো হয়। কারণ, সেখানে গিয়ে পূজ্য ভন্তের অসুস্থতা সম্বন্ধে বলতে হলে ডাক্তারের পক্ষেই ভালোভাবে বলা সম্ভব। সবাই আমার কথা মেনে নিলেন।

পূজ্য ভন্তেকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করার কথা শুনে অনেক দায়ক-দায়িকা রাজবন বিহারে এসে ভিড় জমালেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হলরুমে এসে ভন্তেকে দর্শন করার সুযোগ পেলেন। অল্পক্ষণ পর পর ভন্তের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করতে গিয়ে সাড়ে নয়টার পর ডাক্তারেরা একটু ঘাবড়ে গেলেন। কারণ, ভন্তের নাড়ির স্পন্দন হাতে ধরে পরীক্ষা করলে ঘড়ৎসধষ হলেও চঁষংব ঙীরসবঃবৎ দিয়ে ঠিকমতো রেকর্ড করা সম্ভব হচ্ছে না। দু-হাত ও দু-পায়ের আঙুলে কয়েকবার বসিয়ে দিলেন, কিন্তু রেকর্ড করতে পারলেন না। সোয়া দশটার দিকে কমিটির একজন সদস্য এসে আমাকে বললেন, ভন্তে, সার্কিট হাউস থেকে আর্মিরা ফোন করে অনুরোধ করেছেন, সেখানে কয়েকজন ভিক্ষু পাঠানোর জন্য। পূজ্য ভন্তেকে সার্কিট হাউসের হেলিপ্যাড থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে উঠানো হবে শুনে সেখানে দায়ক-দায়িকা ভিড় জমিয়েছেন। আর্মিদের পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি অনেকে নাকি হেলিপ্যাড পর্যন্তও যেতে চাচ্ছে। সে রকম হলে তো এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ল্যান্ড করতেও পারবে না। এ খবরের প্রেক্ষিতে অনোমদর্শী ও ভদ্দীয় ভিক্ষুকে দুয়েকজন সঙ্গী দিয়ে সার্কিট হাউসের মাঠে পাঠিয়ে দিলাম, যাতে করে পূজ্য ভন্তেকে ঢাকায় পাঠাতে কোনো প্রকার বিলম্বের কারণ সৃষ্টি না হয়।

এগারটার দিকে ফোন আসল, ঢাকা হতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স রাঙামাটির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এ খবর শুনার সাথে সাথে সবার চোখে-মুখে স্বস্তির আভা খেলে গেল। গম্ভীর মুখগুলো হালকা হতে শুরু করল। ইতিমধ্যে পূজ্য ভন্তের আবাসিক ভবনের আশেপাশে হাজারো দায়ক-দায়িকার উপচে পড়া ভিড়। সবাই উৎসুক নয়ন হলরুমের সিঁড়ির দিকে। অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্য গাড়িগুলো দাঁড় করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ১১:৩৫ মিনিটে হাসপাতাল হতে আগত ডাক্তার ও টেকনেশিয়ান হলরুমে এসে পৌঁছলেন। সঙ্গে সঙ্গে পূজ্য ভন্তেকে স্ট্রেচারে করে হলরুম থেকে নিচে নামানো হলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। আর অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ছুটে চলল সার্কিট হাউসের দিকে। এ সময় বিহার প্রাঙ্গণ হতে টিটিসি সড়ক পর্যন্ত বহু দায়ক-দায়িকা রাস্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে সাধুবাদ দিতে থাকলেন। তাদের মধ্যে অনেকে চোখের জলও ফেলছেন। কেউ বা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। সার্কিট হাউসের মাঠের দু-পাশেও দায়ক-দায়িকার ঢল নামে। পূজ্য ভন্তেকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স দেখার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মাঠে সাধুবাদ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকল। অনেকের মুখ দিয়ে অবশ্য সাধুবাদের শব্দের চাইতে কান্নার শব্দই বেশি বের হচ্ছিল। মুহূর্তেই অ্যাম্বুলেন্স হেলিপ্যাডের মাঠে গিয়ে পৌঁছল। পূজ্য ভন্তেকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে ইতিমধ্যে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন জেলা প্রশাসক, রিজিয়ন কমান্ডার, পুলিশ সুপারসহ সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ। আনুষাঙ্গিক প্রস্তুতি সেরে পূজ্য ভন্তেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিলাম। এ সময় কী মনে করে যেন ভন্তেকে বহন করা স্ট্রেচারটি ছুঁয়ে পূজ্য ভন্তের উদ্দেশ্যে সশ্রদ্ধ চিত্তে বন্দনা করলাম। তখন কী আর জানতাম, সেটাই হবে পূজ্য ভন্তেকে জীবিতাবস্থায় শেষ বন্দনা করা। অমনি অ্যাম্বুলেন্সের চাকা ঘুরতে থাকল। আমরা নির্দিষ্ট সীমার ভিতরে দাঁড়িয়ে দু-হাত জোর করে সাধুবাদ দিতে থাকলাম। অল্পক্ষণের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স মাটি থেকে উপরে উঠল আর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সবাই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিলাম, সময় তখন ১২:১০ মিনিট। এবার আমি প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারের মিসেসকে ফোন করলাম। কল রিসিভ হলে বললাম, ‘ছোট, পূজ্য ভন্তেকে এইমাত্র এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিলাম। আপনারা হাসপাতালে গিয়ে রিসিভ করুন।যতক্ষণ না দৃষ্টির আঁড়ালে হারিয়ে যায়, ততক্ষণ যুগপৎ বিষন্ন ও প্রার্থনার দৃষ্টিতে অনিমেষ তাকিয়ে থাকলাম এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটির দিকে। হেলিপ্যাড হতে ফেরার পথে আনন্দমিত্র ভিক্ষুকে সাহস যুগিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলাম। এবার আনন্দমিত্রসগহ অন্য ভিক্ষুরা গাড়ি যোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আর আমরা বিহারের পথ ধরলাম।

বিহারে এসে সোজা রুমে ঢুকলাম। অল্পক্ষণ পর ব্রহ্মদত্ত ভিক্ষু এসে বললেন, ভন্তে, আমি ভাইবোনছড়া কুটিরে চলে যাচ্ছি। ইচ্ছা ছিল ভন্তের খবরাখবর নিতে এখানে থাকব। কিন্তু এখন মন চাচ্ছে না। সর্বত্র কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগতেছে। কিছুতেই ভালো লাগছে না। আমিও নাবলতে পারলাম না। আসলে আমার অবস্থাও অনেকটা সেরকম। তবে সেটা তাকে বললাম না। বেলা তিনটার দিকে মিসেস দীপঙ্করের ফোন পেলাম। তিনি বললেন, ভন্তে, পূজ্য বনভন্তেকে বহনকারী এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পৌঁনে একটার পরে স্কয়ার হাসপাতালের ছাদে ল্যান্ড করেছে। প্রতিমন্ত্রী তখন নিজে উপস্থিত থেকে ভন্তেকে রিসিভ করেছেন। সেখান থেকে নামিয়ে এনে সোয়া একটায় ভর্তি করানো হয়েছে ভন্তেকে। বর্তমানে ভন্তে আইসিইউ-তে রয়েছেন ৫ম তলায়। আইসিইউ-র কেবিন নং ৪৩৯, বেড নং ৯। ডাক্তারেরা বলেছেন, ২৪ ঘন্টার আগে কিছুই বলা যাবে না। আরেকটা কথা, ভন্তেকে দেখে তো খুবই অসুস্থ বলে মনে হলো। আরও আগে কেন ঢাকায় পাঠাননি?

বিকাল সাড়ে চারটায় পূজ্য ভন্তের আশু রোগমুক্তির কামনায় অষ্ট পরিষ্কার দান, হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলো। শুধু রাজবন বিহারে নয়, অন্যান্য শাখা বনবিহারসমূহেও অনুষ্ঠিত হলো। সন্ধ্যায় যৌথ বন্দনার সময় আমরা ভিক্ষুসংঘ সবাই পূজ্য ভন্তের রোগমুক্তির কামনায় বুদ্ধের সকাশে বিশেষ প্রার্থনা করলাম। সিদ্ধান্ত হলো, প্রতিদিন এ বিশেষ প্রার্থনা করা হবে। তখন পূজ্য ভন্তের চিকিৎসাসংক্রান্ত খবরাখবর ভিক্ষু-শ্রামণদের জানিয়ে দেওয়া হবে। ঢাকায় অবস্থানরত ভিক্ষুদের সাথে এবং পূজ্য ভন্তের সার্বক্ষণিক সঙ্গে থাকা ডা. ¯œহ কান্তি চাকমার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব আমার ওপর বর্তাল। রাত আটটার পর ডা. ¯œহকে ফোন করলাম। অপর প্রান্ত থেকে তিনি জানালেন, ‘পূজ্য ভন্তেকে আইসিইউ-তে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসারত ডাক্তারেরা ২৪ ঘন্টার আগে তেমন কিছু বলতে পারছেন না। তবে সুখের খবর হলো, আমরা রাজবন বিহারে ভন্তের চঁষংব ঠিকমতো পেতাম না, এখন ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে। ব্লাড প্রেসারও ঠিকমতো আছে। নতুন কিছু পরীক্ষা করা হয়েছে, আরও হবে। মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়া হাসপাতালে এসে ভন্তেকে দেখে গেছেন। চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। ভালোভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। জানানোর মতো আরও খবর পেলে আমি আপনাকে জানাবোপরে জ্ঞানপ্রিয় ও জিনপ্রিয় ভিক্ষুর সাথে কথা হলো। তারা জানালেন, ‘পূজ্য ভন্তের চিকিৎসার ব্যাপারে ঢাকাবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করছে। বিশেষত বাবু পুলক জীবন খীসা ও শুভাশীষ চাকমার নাম উল্লেখযোগ্য। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, আশা করি, হবেও না। শিল্পমন্ত্রী দীলিপ বড়য়া ভন্তেকে দেখতে হাসপাতালে এসেছেন।আধো ঘুম, আধো জাগরণে কেটে গেল সারাটা রাত।

পরদিন ২৮ জানুয়ারি ২০১২, রোজ শনিবার। কখনো ফোন করে, কখনো উপস্থিত দায়ক-দায়িকাদের ভন্তের খবর জানাতে জানাতে কেটে গেল অনেকটা সময়। পুরো পার্বত্য অঞ্চলে তখন শুধু একটাই চাওয়া পূজ্য ভন্তে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুক।সবাই যেন আকুল স্বরে ভন্তেকে বলছেন, হে পূজনীয় ভন্তে, আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন। বেসরকারি কয়েকটা ঞঠ চ্যানেলও পূজ্য ভন্তের অসুস্থতার খবর প্রচার করতে থাকল। বেলা সাড়ে তিনটায় ভন্তের সর্বশেষ খবর জানার জন্য ডা. ¯œহ কান্তি চাকমাকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, ভন্তের রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। রোগটা নিউমোনিয়া। কিডনির সমস্যাও রয়েছে। বিশেষত একটা কিডনির অবস্থা বেশ নাজুক। আর নিউমোনিয়ার জীবাণুগুলো ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়েছে। অবশ্য ভালো ঞৎবধঃসবহঃ চলতেছে। উন্নত বিশ্বেও নাকি এর চেয়ে ভালো ঞৎবধঃসবহঃ নেই। সব পরীক্ষার রেজাল্ট এখনও পাওয়া যায়নি। কারণ, কিছু কিছু পরীক্ষা একেবারে নিশ্চিত হওয়া যায় না। অন্যদিকে ভন্তে এখনও নড়াচড়া করছেন না। আজ তো ২৪ ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেল। ডাক্তারেরা এখন ৪৮ ঘন্টার কথা বলছেন। তাদের মতে, যেহেতু ভন্তের অনেক বয়স হয়েছে, সেহেতু সেরে উঠতে সময় লাগবে। গতকাল যখন ভন্তেকে আইসিইউ-তে ভর্তি করেছিলাম, তখন কেমো ৬ পয়েন্ট ছিল। এখন ৮ পয়েন্ট, অর্থাৎ ২ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। আজ মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাক্তার দীপুমনি পূজ্য ভন্তেকে দেখতে হাসপাতালে এসেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শতভাগ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত শ্রীলংকার হাই কমিশনারও হাসপাতালে এসে পূজ্য ভন্তেকে দেখে গেছেন।

বিকাল সাড়ে চারটায় যথানিয়মে পূজ্য ভন্তের আশু রোগমুক্তির কামনায় অষ্ট পরিষ্কার দান, হাজার প্রদীপ উজ্জ্বলন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলো। বিপুল সংখ্যক দায়ক-দায়িকা উপস্থিত হলেন। অনেকে নিজের উদ্যোগে ভন্তের সুস্থতা কামনায় পানিতে মাছ ছেড়ে দিলেন। সমবেত দায়ক-দায়িকাদের ধর্মদেশনা প্রদান করলেন শ্রদ্ধেয় শাসন রক্ষিত ভন্তে; আর আমি ভন্তের চিকিৎসাসংক্রান্ত সর্বশেষ খবর জানিয়ে দিলাম। সন্ধ্যায় বিহারে অবস্থানরত সকল ভিক্ষু-শ্রামণ যৌথ বন্দনা ও বিশেষ প্রার্থনায় সমবেত হলাম। সেখানেও পূজ্য ভন্তের চিকিৎসাসংক্রান্ত সর্বশেষ খবর জানিয়ে দিলাম প্রাপ্ত তথ্যমতে। রাত ৮টার পর ডা. ¯œহ কান্তি চাকমাকে আবারও ফোন করলাম। তবে নতুন কোনো খবর পাওয়া গেল না। জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষুকে ফোন করলাম। তিনিও প্রায় একই কথা বললেন। আরও বললেন, কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো ত্রুটি করছেন না। ভরসা করা যায়। আমি রাতে একবার দেখতে যাব ভন্তেকে। সবকিছু জেনে চাকমা রাজার সাথে আলোচনা করব।

২৯ জানুয়ারি, রোজ রবিবার। সকালের নাস্তা খাওয়ার পর বিমলানন্দ ভিক্ষুর ফোন পেলাম। তিনি পূজ্য ভন্তেকে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করলেন। এবং সেই ব্যাপারে চাকমা রাজাকে বলতে অনুরোধ করলেন। আমি বললাম, জ্ঞানপ্রিয় ও ডা. ¯œহ কান্তি চাকমা তো বর্তমান ঞৎবধঃসবহঃ-এর চেয়ে উন্নত ঞৎবধঃসবহঃ কোথাও নেই বলছেন। ঠিক আছে, আমি রাজাবাবুর সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করব। পূজ্য ভন্তের জন্য যেটা ভালো হবে, সেটাই করতে হবে আমাদের। অল্পক্ষণ পরে আমি রাজাবাবুকে ফোন করলাম। আমার সব কথা শুনে তিনি বললেন, ভন্তে, আপনারা যদি সে রকম করতে চান, আমাদের দ্বিমত করার কিছু নেই। আমি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করব। আর আমাদের (চাকমা, বড়য়া) মাঝে যারা চিকিৎসা বিষয়ে অভিজ্ঞ তাদের পরামর্শও চেয়ে নেব। ভন্তের জন্য এ মুহূর্তে যেটা ভালো হবে, সেটাই করা হবে।এবার আমি জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষুকে ফোন করলাম। একই বিষয়ে আলোচনা চলল। তারও একই অভিমত। তাকে বললাম, আমরা তো এখানে (রাঙামাটি) রয়েছি, আমাদের সার্বক্ষণিক ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। তোমাদেরই এ ব্যাপারে সময়োপযোগী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হ্যাঁ ভন্তে, তা-ইবলে জ্ঞানপ্রিয় আমাকে আশ্বস্ত করলেন।

সকাল এগারটার পর জ্ঞানপ্রিয়ের কল পেলাম। বললেন, ভন্তে, বিদেশের ব্যাপারে রাজাবাবুসহ আরও কয়েকজনের সাথে আলোচনা হয়েছে। যেহেতু ৪৮ ঘন্টার পরও পূজ্য ভন্তের উল্লেখ করার মতো তেমন অগ্রগতি নেই, সেহেতু অনেকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার পক্ষপাতী। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনও অপেক্ষা করার কথা বলছে। বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পূজ্য ভন্তের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে ডাক্তারদের কিছুটা শঙ্কা রয়েছে। বিদেশে নিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকার জন্য ভন্তের পাসপোর্ট বানিয়ে দিতে হবে। আপনি আজই পৌরসভা অফিস থেকে জন্ম নিবন্ধন সনদনিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। সাথে আনন্দমিত্রের জাতীয় পরিচয় পত্রটাও পাঠাবেন। আমরা ঠিক করেছি, বিদেশে নিয়ে যাওয়া হলে পূজ্য ভন্তের সাথে আমি, আনন্দমিত্র, বিমলানন্দ, ডা. প্রতীক দেওয়ান যাব। সম্ভব হলে চাকমা রাজাও যাবেন। এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন? আমি বললাম, কোনো অসুবিধা নেই। আমার কোনো দ্বিমত নেই। পূজ্য ভন্তের জন্ম নিবন্ধন সনদসহ আনুষাঙ্গিক সবকিছু আজ সন্ধ্যায় পাঠিয়ে দিচ্ছি আমি।

এবার উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের সাথে আলোচনা হলো। তিনি বললেন, ৮নং ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কমিশনার বাবু কালায়ন চাকমাকে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে। উনি আপনার কাছে আসবেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি নিয়ে সনদটি আপনার হাতে দিবেন। বেলা ২:৩০ মিনিটের দিকে ডা. ¯œহ কান্তি চাকমার সাথে সামান্য কথা হলো। তিনি বললেন, ভন্তের অবস্থা চোখে পড়ার মতো উন্নতি হয়নি। ডাক্তারেরা এখন ৭২ ঘন্টার কথা বলছেন। আর এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, নিউমোনিয়ার জীবাণুগুলো পুরো ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়েছে। অল্প পরিমাণে রক্ত কণিকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে খুব সম্ভবত। একটা কিডনি হয়ত তেমন সক্রিয় নয়। তবে হার্টে কোনো সমস্যা নেই।

বেলা ৩টার পর কমিশনার বাবু কালায়ন চাকমা পূজ্য ভন্তের জন্ম নিবন্ধন সনদটি এনে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি সেই সনদ ও আনন্দমিত্র ভিক্ষুর জাতীয় পরিচয় পত্রটি ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে ছিলাম। বিকাল ৪টার আগে জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষুকে সেটা জানালাম। তিনি বললেন, সম্ভবত ভালো হয়েছে ভন্তে। এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে পূজ্য ভন্তের শারীরিক দুর্বলতা অনেকটা কেটে গেছে। এখন বিদেশে নিয়ে গেলে ঝুঁকি থাকবে না। কাজেই আমরা যদি পূজ্য ভন্তেকে বিদেশে নিয়ে যেতে চাই, নিয়ে যেতে পারব। আগামী কাল যদি পাসপোর্টের ব্যবস্থা হয়ে যায়, তখন বিদেশে নিয়ে যেতে পারব। সিঙ্গাপুর ও থাইল্যা-ে যোগাযোগ চলছে। তবে হয়তো সিঙ্গাপুরেই নিয়ে যাওয়া হবে।

বিকাল ৪:২০ মিনিটের পর ডা. ¯œহ কান্তি চাকমাকে কয়েকবার ফোন করলাম। কিন্তু যোগাযোগ স্থাপন করতে পারলাম না। ফলে জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষু হতে প্রাপ্ত তথ্যই আমার মূল সম্বল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অষ্ট পরিষ্কার দান ও হাজার প্রদীপ উজ্জ্বলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলাম। দায়ক-দায়িকাদের সামনে সেভাবেই ভন্তের সর্বশেষ খবর তুলে ধরলাম। দায়ক-দায়িকারা ধরতে পারলেন কি না জানি না; আজ কিন্তু লিখে আনা খবরই পরিবেশন করলাম। আর মুখে তো গম্ভীরভাব বিরাজ করছে আগাগোড়া।

সন্ধ্যায় যৌথ বন্দনায় যাওয়ার আগে আবারও ডা. ¯œহ কান্তি চাকমাকে ফোন করলাম। এবার তিনি ফোন ধরলেন। বললেন, ভন্তে, আমাকে এখন একটু ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। আপনাকে সংক্ষেপে বলি, বলার মতো উন্নতি নেই। তার উপর কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। যেমন প্র¯্রাব, পেট ফুলে যাওয়া। আশা করি রাতের সময় আরও বলা যাবে। ডা. চাকমার সাথে কথা বলতে গিয়ে দেরিতে বন্দনায় যোগ দিতে হলো আমাকে। বন্দনাপর্ব শেষে উপস্থিত ভিক্ষু-শ্রামণদের পূজ্য ভন্তের চিকিৎসা সম্পর্কিত খবর জানালাম কিছুটা হতাশা-মিশ্রিত সুরে। রাত সাড়ে নয়টার পর ডা. ¯œহ কান্তি চাকমাকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ ভন্তে, বলছি। প্রায় সব পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়া গেছে। আমি বললাম, আচ্ছা, ভন্তেকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করা সম্ভব হবে কি? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে রাজাবাবু হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছেন। কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়েছে আপনারা ইচ্ছা করলে নিয়ে যেতে পারেন। আজ সন্ধ্যার দিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী পূজ্য ভন্তেকে দেখতে এসেছেন। ভন্তেদের পরামর্শমতে আমি তাকেও এ বিষয়টি অবহিত করেছি। সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছি। তিনি বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন, আমি গিয়ে উনাকে এ বিষয়ে অবহিত করব। আপনারা চিন্তা করবেন না। ডা. বাবু এবার পূজ্য ভন্তের প্রসঙ্গে বললেন, ভন্তের হার্ট পুরোপরি সুস্থ, কার্যক্ষম, কোনো সমস্যা নেই। হার্টের রেজাল্টে ডাক্তারেরা আশ্চর্য হন। সাধারণত ভন্তের মতো বয়সীদের হার্ট এমন সুস্থ ও কার্যক্ষম হয় না। লিভারেও কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা রয়েছে কিডনীতে। একটা কিডনী কাজ করছে না। আগেই বলেছি, পূজ্য ভন্তে নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত। খঁহমংÑএর অবস্থা ভালো নয়। নিউমোনিয়ার জীবাণু পুরো খঁহমং জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু খঁহমংÑএ নয়, রক্ত কণিকায়ও ছড়িয়েছে। আতুরিতেও সমস্যা ধরা পড়েছে। প্র¯্রাব হচ্ছেও খুবই সামান্য। অবশ্য রক্তচাপ, নাড়ির স্পন্দন ঠিক রয়েছে। এসব আমাদের ডাক্তারি কথা। হয়ত আপনাকে ঠিকভাবে বুঝাতে পারছি না। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, ধরুন কোনো একজন ছাত্র বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছে। ছাত্রটি দশ বিষয়ের মধ্যে সাত বিষয়ে পাশ করেছে। তিনটি বিষয়ে ফেল করেছে। বিষয়ের হিসেবে পাশ করার সংখ্যা নিঃসন্দেহে বেশি। তবে যেই তিন বিষয় ফেল করেছে, সেগুলো হলো ইংরেজি, অঙ্ক ও বাংলাঅত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবার আপনি বলেন, সেই ছাত্র কী পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হতে পারবে? কথাটা শুনতে খুবই কঠিন হলেও পূজ্য ভন্তের বেলায় এ উপমাই প্রযোজ্য। ডা. বাবুর এ কথাটি শুনার সঙ্গে সঙ্গে আমার বুক ভেঙে-চুড়ে গুঁড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা। বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম যেন। মাথাটা ঝিন করে উঠল। কথা শেষ করার পর বেশ কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তার পর নেতিবাচক চিন্তা সরিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করতে লাগলাম। দুঃসময়ের মাঝে মানুষ যখন আশা-নিরাশার দোলাচলে কুল-কিনারা দেখতে পায় না, তখন দুর্বল মনে ভয়ে আশার দিকটাই চেপে ধরে থাকে। যেটা হলে তার মঙ্গল, সেটা আশা করে, আমিও ভগবানের কাছে মনে-প্রাণে সেরূপ প্রার্থনা করতে লাগলাম বার বার। একসময় ঘুম এসে সেই প্রার্থনা ও দুশ্চিন্তার অবসান করে দিল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম নিজেও টের পেলাম না।

৩০ জানুয়ারি ২০১২ রোজ সোমবার। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। অনেকক্ষণ পর্যন্ত বুদ্ধবন্দনাদি করার পর মৈত্রী ভাবনা করলাম। তার পর পূজ্য ভন্তের রোগমুক্তির প্রার্থনা করলাম। মনে মনে জপতে লাগলাম, ‘ডাক্তারদের অভিমত মিথ্যা হয়ে ভন্তে অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক। আজই ভন্তের উল্লেযোগ্য উন্নতি হোক।

মনমরা মুখে সকালের নাস্তা খেতে গেলাম। সকাল ৯টার পরে জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষুকে ফোন করলাম। পূজ্য ভন্তের খবর জানতে চাইলাম। অপর প্রান্ত থেকে তিনি বললেন, গতকালের খবর ছাড়া নতুন তো কিছুই নেই। ফাং শেষ করে হাসপাতালে গিয়ে ভন্তেকে দেখে আসব। তখন যদি নতুন কোনো খবর পাই, তাহলে জানাতে পারব। পাসপোর্ট বানিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। এ প্রসঙ্গে জ্ঞানপ্রিয় জানালেন, ইতিমধ্যে সেই চৎড়পবংং শুরু হয়েছে। আজ না হয় আগামীকাল পাওয়া যাবে। তবে আজকেই পাওয়ার চেষ্টা চলছে। দুপুরের দিকে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের হাই কমিশনার পূজ্য ভন্তেকে দেখতে যাবেন। দুপুরের পর আমি আপনাকে ফোন করব।

সকাল সোয়া ১১ টার দিকে ডা. ¯œহ কান্তি চাকমাকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, ভন্তে, অল্পক্ষণ পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আমাদের একটি মিটিং হবে। আর পূজ্য ভন্তের প্র¯্রাবের সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। মনে হয়, ছোট একটা অপারেশন করতে হবে। এ বিষয়সহ আরও কিছু বিষয়ে মিটিং হবে। মিটিংÑএর পরে আপনাকে নতুন কিছু জানাতে পারব। কথা শেষে আমি রুম থেকে বের হলাম। তেমন কিছু ভালো লাগছিল না। পূজ্য ভন্তের আবাসিক ভবনের নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তার পর সৌরজগৎ ভন্তে ও পূর্ণজ্যোতি ভিক্ষুর রুমের সামনে চংক্রমণ করতে শুরু করলাম। এ সময় তাদের সাথে সামান্য কথাবার্তাও চলল। বেলা সোয়া তিনটার দিকে রুমে ফিরে আসলাম। সাড়ে তিনটার দিকে আমার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষুর নাম। কল রিসিভ করতেই শুনতে পেলাম, ভন্তে, ডাক্তারেরা মানসিকভাবে তৈরি থাকতে বলছেন। পূজ্য ভন্তের অবস্থা খারাপ। এটুকু বলে জ্ঞানপ্রিয় থামলেন। অমনি ডা. ¯œহ কান্তি চাকমার কল আসল। কম্পিত হাতে রিসিভ বোতম টিপলাম। তিনি বললেন, ভন্তে, আপনাকে তো আগেই বলেছি। পূজ্য ভন্তের প্র¯্রাব বন্ধ হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে কিডনী ডায়ালাইসিস করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। অপারেশন থিয়েটারে সেটাই করা হচ্ছিল, কিন্তু আর . . .বর্তমানে পূজ্য ভন্তের ব্লাড প্রেসার, হার্টবিট খুব কমে গেছে। ডাক্তারেরা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। তার পর লাইন কেটে দিলেন ডা. ¯œহ কান্তি চাকমা। সঙ্গে সঙ্গে আমার বুক ফেটে অনুচ্চারিত নাশব্দ বেরিয়ে আসল যেন। নিজেকে শক্ত করে মনে মনে বলতে লাগলাম, ‘পূজ্য ভন্তে, আপনাকে ফিরে আসতেই হবে। আপনাকে এভাবে যেতে দেব না।অমনি সকল ভিক্ষু-শ্রামণকেও ডাক্তারদের কথা জানিয়ে দিলাম। আর পূজ্য ভন্তের এ কঠিন সময় যেন কেটে যায় তজ্জন্য বড় বিল্ডিংÑএ এসে বুদ্ধের সামনে সূত্রপাঠ করে দিতে আহ্বান জানালাম। খবর শুনে সাবাই ছুটে আসলেন। একাগ্রচিত্তে একের পর এক সূত্রপাঠ করে দিতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর আরও একটি সূত্রের বই নিয়ে আসতে আমাকে আমার রুমে ঢুকার প্রয়োজন পড়ল। ঢুকে রুমের কাছাকাছি আসতেই শুনতে পেলাম আমার ফোন বেজেই যাচ্ছে। কল রিসিভ করার আগে লাইন কেটে গেল। মনিটরে দেখলাম ১৪টি মিস্ড কল। কল বেক করার জন্য যেই না বোতম টিপবো, অমনি আরও একটি কল আসল। রিসিভ বোতম টিপামাত্র অপর প্রান্ত থেকে কনক চাঁপা চাকমা বলে উঠলেন, ভন্তে, আপনাকে অনেক্ষণ ধরে ফোন করছি, পাচ্ছি না। পূজ্য বনভন্তেকে তো রাখা গেল না। ভন্তে আর নেই। ডা. ¯œহ কান্তি মামাসহ আইসিইউ-তে ভন্তের পাশে থেকে অবলোকন করলাম ভন্তের চলে যাওয়ার দৃশ্য। মনিটরে ভন্তের হার্টবিট কমে আসতে আসতে, একসময় শূন্যে নেমে আসল। সময় তখন বেলা ৩-৫৬মিনিট এটুকু বলে লাইন কেটে দিলেন। ততক্ষণে আমার চোখে নোনাজল পূর্ণ হয়ে গেছে। মাথা ঘুরতে থাকল ক্ষীপ্র গতিতে। এক ধরনের অবশ করা অনুভতি ছড়িয়ে গেল দেহ-মনের প্রতিটি শির-উপশিরায়। ধপ করে পড়লাম খাটের পাছে। খাটের ওপর মাথা রাখলাম, টপটপ করে চোখ দিয়ে পড়তে লাগল স্বচ্ছ অশ্রুধারা। তখনও অন্যান্য ভিক্ষুরা সূত্রপাঠ করেই যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ভগবান বুদ্ধের পরিনির্বাণ লাভের পর স্থবির আনন্দ ভন্তের অবস্থার কথা মনে পড়ল। বুদ্ধ পরিনির্বাণ লাভ করলে তিনিও অনেক কেঁদেছিলেন; কিন্তু যথা দায়িত্ব পালন করেছেন। চিন্তা করলাম, এ খবর অন্যান্য ভিক্ষু-শ্রামণদের জানানো দরকার। ফলে রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। কোনো মতে বললাম, ‘পূজ্য ভন্তে পরিনির্বাণ লাভ করেছেন।আমার শব্দটা সব ভিক্ষুদের কানে না গেলেও চোখের অবস্থা দেখে তারা বুঝে গেলেন সবকিছুই। অমনি সবার চোখে জল টলমল করতে লাগল। সূত্রপাঠ থেমে গেল মুহূর্তেই; কারণ, সবাই তখন বাকরুদ্ধ। ইতিমধ্যে পূজ্য ভন্তের আরোগ্য লাভের কামনায় অষ্ট পরিষ্কার দান, হাজার প্রদীপ দানানুষ্ঠানের সময় হয়ে গেল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য শাসন রক্ষিত ভন্তে আমাকে ডাকলেন। আমি রাজী হলাম না। আমাকে রুমে রেখে তারা অনুষ্ঠানে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ পর নিজেকে শক্ত করে নিতে সমর্থ হলাম। এবার রুম হতে বের হয়ে সৌরজগৎ ভন্তে, অনুমোদর্শী ভিক্ষুসহ দশ/বারজন ভিক্ষুকে নিয়ে দেশনালয়ে চলে আসলাম। আর পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ ঢাকা হতে রাজবন বিহারে নিয়ে আসার অনুষ্ঠানটি কীভাবে সুসম্পন্ন করা হবে, সে ব্যাপারে আলোচনায় বসলাম উপস্থিত দায়ক-দায়িকাদের সাথে।

প্রথমে সিদ্ধান্ত নিলাম, পূজ্য ভন্তেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে মূল রাস্তায় (অর্থাৎ রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক) তোরণ বানানো হবে। প্রশ্ন উঠল, কোথায় কোথায় তোরণ বানানো? পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ কীভাবে নিয়ে আসা হবে, সেটা তো এখনও ঠিক হয়নি। আমি বললাম, তাহলে সার্কিট হাউজ হতে বিহারে ঢুকার রাস্তা হিসেব করি। যেভাবে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেভাবে ফিরিয়ে আনলেও রাস্তার এ অংশটুকু বাদ পড়বে না। যদি গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয়, তাহলে আরও তোরণ বাড়িয়ে নেব। ভক্তবৃন্দ যাতে পূজ্য ভন্তেকে ভালোভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারে তজ্জন্য উত্তরদিকের খোলামাঠে মঞ্চ তৈরি করা হবে। ভন্তের পবিত্র দেহ সরাসরি বিহারে না ঢুকিয়ে সেই মঞ্চে রাখব। ভক্তবৃন্দের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিহারে আনবো। ইতিমধ্যে আলোচনাস্থলে প্রাক্তন উপমন্ত্রী বাবু মনিস্বপন দেওয়ান এসে পৌঁছলেন। তিনি বললেন, ভন্তে, অল্পক্ষণ আগে আমার চাকমা রাজার সাথে কথা হয়েছে। রাজাবাবু আমাকে বলেছেন, পূজ্য ভন্তেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসা হচ্ছে না। কারণ, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স মৃতদেহ বহন করে না। অন্যদিকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিমানে করে আনতে গেলেও পূজ্য ভন্তের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানোর প্রতি প্রশ্ন উঠবে। কারণ, বিমানেও মৃতদেহ উপরে রাখার নিয়ম নেই। রাখা হয় নির্দিষ্টস্থানে, নিচে। ফলশ্রুতিতে পূজ্য ভন্তেকে গাড়িতে করে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর সে রকম হলে রাঙামাটিতে পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে। তাই রাজাবাবু বলেছেন, রাতে দায়ক-দায়িকাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। এতে রাতেও কুলাবে না। পরদিন সকাল হতে আমি বললাম, হাজার হাজার দায়ক-দায়িকা রাত জেগে লাইন ধরে পূজ্য ভন্তেকে পবিত্র দেহ দেখার জন্য উৎসুক থাকবেন। শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য আকুল হয়ে থাকবেন, তাদের সুযোগ না দেওয়াটা ঠিক হবে নাতেমনটি করা হলে তাদের ভীষণ কষ্ট দেওয়া হবে। দায়ক-দায়িকারা কিছুতেই মেনে নিতে পারবেন না সেটা। অসুবিধা নেই, আমরা সারা রাত জেগে থাকবো। সঙ্গে সঙ্গে নন্দিত রায়সহ সবাই আমার কথা মেনে নিলেন। এবার রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাবু নিখিল কুমার চাকমা বললেন, ভন্তে, যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি জেলা পরিষদের পক্ষ হতে চট্টগ্রাম-রাঙামাটির সংযোগ মুখে প্রথমে তোরণটি করে দিবো। আর পূজ্য বনভন্তের আবাসিক ভবন সাজানোর জন্য দুই পিকআপ ফুল দান করব। সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদর্শী ভিক্ষু ঘাগড়ায় একটি তোরণ নির্মাণ করার দায়িত্ব নিলেন। রাঙামাটির কয়েকটি এলাকা থেকেও এলাকাভিত্তিক তোরণ নির্মাণ করার দায়িত্ব নিলেন। আরও কিছুক্ষণ আলোচনা চলল। দেশনালয় হতে ফিরে এসে অন্যান্য ভিক্ষু-শ্রামণদের সাথেও আলোচনা করলাম। তার পর জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষুকে ফোন করলাম। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম, পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আগামীকাল সর্বস্তরের জনসাধারণকে শ্রদ্ধা নিবেদন করার সুযোগ করে দিতে ঢাকাস্থ কলাবাগানের আবাহনী মাঠে গিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে দুপুর নাগাদ গাড়িতে করেই রাজবন বিহারে নিয়ে আসা হবে। ইতিমধ্যে একটা ফ্রিজার ভ্যান ভাড়া করা হয়েছে। প্রায় সাথে সাথেই একের পর এক কল আসতে লাগল আমার ফোনে।

একসময় বিছানায় শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম আসছে না। ঘুম আসবেই বা কী করে? চোখ দুটিই যে বন্ধ করতে পারছি না। পূজ্য ভন্তের কথা মনে পড়তে লাগল একটার পর একটা। কারণ, পূজ্য ভন্তের অনেক স্মৃতি যে আমার মনকে আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। অনেক কথা যেন কানে ঝনঝন করে বেজে চলছে। স্মৃতির মণিকোঠায় জ্বলজ্বল করে জ্বলছে সবকিছু। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিকত কথা, কত স্মৃতিই জমা রয়েছে হৃদয় মন্দিরে। এই মনে পড়াতে যদিও বুকে প্রিয়বিচ্ছেদের কষ্ট আঘাত হানছে, তবুও কেন যেন বড় মধুর লাগছে। মনে হচ্ছে এই স্মৃতি জীবনের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ, মহামূল্যবান . . . এসব স্মৃতি কী আর বন্ধ করা যায়? নাকি বন্ধ করা উচিত? অনেকক্ষণ চোখ বুজে থাকলাম। কিন্তু স্মৃতির দুয়ার তো বন্ধ করতে পারলাম না। প্রায় সারা রাত কাটল এভাবে। শেষরাতে অল্পই ঘুম হলো। পরদিন ৩১ জানুয়ারি, রোজ মঙ্গলবার সকল ভন্তেরা যন্ত্রচালিত মানুষের ন্যায় ভোজনালয়ে গিয়ে উপস্থিত হলাম। অন্যদিকে দায়ক-দায়িকাদের অবস্থাও একই রকম। যদিও দায়ক-দায়িকারা তাদের আনীত দানীয় বস্তু নিয়ে আমাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে দান করছেন, আমরাও হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করছি। কিন্তু কেউই কারোর মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। নাস্তা গ্রহণ শেষে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহকে গ্রহণ করার অনুষ্ঠানিক কাজ তদারকি করতে নেমে পড়লাম। কেউ উত্তরদিকে খোলামাঠে মঞ্চ তৈরিতে, কেউ পূজ্য ভন্তের আবাসিক ভবন ফুলে ফুলে সাজাতে, কেউ কেউ দেশনালয়ে ফ্রিজার ভ্যান রাখার সুব্যবস্থা করতে। মনে যত প্রিয়বিচ্ছেদ দুঃখই থাকুক, অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে সম্পাদন করা চাই। যাতে পূজ্য ভন্তেকে শ্রদ্ধা নিবেদনে, সম্মান প্রদর্শনে এতটুকুও ঘাটতি না থাকে। সকাল নয়টার দিকে জিনপ্রিয় ভিক্ষুকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহকে শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। অনুষ্ঠানে হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে। অনুষ্ঠান শেষে রওনা হব।

সকাল সোয়া দশটায় আবারও জিনপ্রিয় ভিক্ষুকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে। হাজার হাজার দায়ক-দায়িকা লাইন ধরে পূজ্য বনভন্তেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে যাচ্ছেন। সাধারণ ভক্তবৃন্দের পাশাপাশি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গও শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আর বিএনপি-এর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। সাড়ে দশটার পর জিনপ্রিয় ভিক্ষুকে আবার ফোন করলাম। অপর প্রান্ত থেকে উত্তর পেলাম, ‘অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। আমরা এখন স্কয়ার হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি। সেখানে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহে ওষধ প্রয়োগ করা হবে। তার পর আমরা রওনা হব।আমি বললাম, রওনা দিলে আমাকে কল দিও। বেলা পৌঁনে একটায় জিনপ্রিয় ভিক্ষু ফোনে বললেন, আমরা রওনা দিয়েছি।

এদিকে আমাদের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। দেশনালয়ের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। পূজ্য ভন্তের আবাসিক ভবন ফুলে ফুলে সজ্জিত করার কাজ অর্ধেক হলেও উত্তরদিকে খোলামাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ বেশ বাকি। তৈরির কাজ তদারকি করেছেন অনোমদর্শী ভিক্ষু। তাড়াতাড়ি তার কাছে গিয়ে খবরটা দিলাম। তিনি বললেন, চিন্তা করবেন না ভন্তে। পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ বহনকারী গাড়ি পৌঁছার আগে সমাপ্ত হবেই। সিদ্ধান্ত হয়েছে, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সীমান্ত হতে পূজ্য ভন্তের দেহকে শ্রদ্ধাসহকারে আগু বাড়িয়ে নিয়ে আসা হবে। সেখানে প্রজ্ঞালংকার ভন্তে, ভৃগু ভন্তে, বুদ্ধশ্রী ভন্তে, বশিষ্ঠ ভন্তে, শাসন রক্ষিত ভন্তে প্রমুখ ৩০/৩৫ জন ভিক্ষু থাকবেন। সাথে শতাধিক স্কুটারসহ বিশাল গাড়ি বহর। আর টিটিসি সড়ক মুখে হতে আগু বাড়িয়ে নিয়ে আসবেন নন্দপাল ভন্তে, প্রজ্ঞাবংশ ভন্তে, সৌরজগৎ ভন্তে, ইন্দ্রগুপ্ত ভন্তে, পুর্ণজ্যোতি ভন্তে প্রমুখ শতাধিক ভিক্ষু-শ্রামণ। এ সময় রাস্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে অজ¯্র দায়ক-দায়িকা ফুলেল শ্রদ্ধা জানাবেন। উত্তরের খোলা মাঠের গেইট হতে আগু বাড়িয়ে মঞ্চে নিবেন অনোমদর্শী ভিক্ষু, ভদ্দীয় ভিক্ষু, শান্তলোক ভিক্ষু, প্রজ্ঞাকীর্তি ভিক্ষু প্রমুখ বহু ভিক্ষু-শ্রামণ। সবশেষে মূল বিহার কমপ্লেক্সে আগু বাড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন প্রিয়জ্যোতি ভিক্ষুসহ অপরাপর ভিক্ষু-শ্রামণেরা। বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে প্রজ্ঞালংকার ভন্তেরা পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ আগু বাড়িয়ে নিয়ে আসতে তাদের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। দ্বিতীয়, তৃতীয় গ্রুপের ভন্তেরা তখনও আনুষাঙ্গিক কাজে নিয়োজিত থাকলাম। তবে ফোনে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে লাগলাম। ফোনে খবর আসতে লাগল, আমরা এখন অমুক স্থানে পৌঁছেছি। আর পথে পথে নানাস্থানে থামাতে হচ্ছে, বিশেষত যেখানে বৌদ্ধ রয়েছে। পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহকে এক নজর দেখতে, শ্রদ্ধা নিবেদন করতে, উৎসুক হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি বহর থামাচ্ছেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর জিনপ্রিয় ভিক্ষু ফোনে জানালেন, আমরা এখন চট্টগ্রাম ভার্সিটি এলাকায়। পূজ্য ভন্তেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ভার্সিটির বৌদ্ধ ছাত্রছাত্রীদের বার বার প্রার্থনা রক্ষা করতে হচ্ছে। জানতে পারলাম হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এলাকায় বড়য়ারাও নাকি ইতিমধ্যে রাস্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কাজেই সেসব জায়গায়ও থামাতে হবে। পুরো পথে কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর পর আমাদের থামতে হয়েছে। সামনের পথেও যে থামাতে হবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দশটার পর ফোনে খবর আসল, পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ বহনকারী গাড়ি বহর বেতবুনিয়া পৌঁছেছে। অর্থাৎ পূজ্য ভন্তেকে আগু বাড়িয়ে আনা প্রথম গ্রুপের সম্মুখে এসে পড়েছে। আর শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞালংকার ভন্তে প্রমুখ ভিক্ষুসংঘ ফুলের তোরা দিয়ে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।

আমরা রাত ৯ টার পর ব্যানার নিয়ে টিটিসি সড়ক মুখে গিয়ে অবস্থান নিলাম। ইতিমধ্যে উত্তরের খোলা মাঠ হতে রাঙামাটি উপজেলা পরিষদ অফিস পর্যন্ত রাস্তার দু-পাশে দায়ক-দায়িকা ভিড় জমেছে। সবাই পূজ্য ভন্তের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধায় সকৃতজ্ঞতা চিত্তে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। জানতে পারলাম, ঘাগড়া, মানিকছড়ি, ভেদভেদী এলাকার রাস্তার দু-পাশেও অসংখ্য ভক্ত দাঁড়িয়ে রয়েছেন পূজ্য ভন্তেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। এসব এলাকার সবাই যেন এসেছেন রাস্তায়, নেহাৎ বাড়ি পাহারা দেওয়ার লোক ছাড়া। শুধু স্থানীয় লোকজন নয়, বিভিন্ন এলাকার লোকজনও সেখানে এসে জড়ো হয়েছেন। বৃদ্ধ, মধ্যবয়সী, তরুণ থেকে শুরু করে শিশুরা পর্যন্ত সামিল হয়েছে। অসংখ্য মানুষের ঢল নামলেও কোনো কোলাহল নেই। বরং পুরো পরিবেশ ভারী ও বিষন্ন। অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে শোকে অশ্রু ঝরাচ্ছেন থেমে থেমে। অনেকে নির্বাক পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মাঝে মাঝে মৃদু স্বরে দু-একটা কথা শুনা যাচ্ছে মাত্র। সেটাও নিতান্ত প্রয়োজনে। রাত সাড়ে এগারটায় খবর পেলাম গাড়ি বহর ঘাগড়ায় এসে পৌঁছেছে। ঘাগড়ার আপামর জনসাধারণ তাদের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহে। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও প্রস্তুত হলাম। আমি মনের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলাম . . .বারটার আগে খবর পেলাম, গাড়ির বহর পৌঁছেছে মানিকছড়িতে। মনের সাথে চলা যুদ্ধ যেন আরও তীব্রতর হলো। রাত ১২:৩০ মিনিটে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ বহনকারী গাড়ি কলেজ গেইটের সামনে এসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে গগণ প্রকম্পিত সাধুবাদ ধ্বনি উঠল অপেক্ষমাণ দায়ক-দায়িকার মুখে। অবশ্য অনেকেই সাধুবাদ দিতে পারছেন না। পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ বহনকারী গাড়ি দেখার সাথে সাথে কেউ কেউ কেঁদে উঠেছেন। কেউ-বা বাকরুদ্ধ হয়ে দু-চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরাচ্ছেন। আরও ৩ মিনিট পর অর্থাৎ রাত ১২:৩৫ মিনিটে (১ ফেব্রুয়ারি) আমাদের সামনে এসে পৌঁছাল গাড়িটি। আমরা ফুলেল শ্রদ্ধা জানালাম। এরপর সিনিয়র ভিক্ষুরা গাড়ির সামনে ব্যানার ধরে আর জুনিয়র ভিক্ষুরা গাড়ির পিছনে থেকে হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় বিশেষ শোভাযাত্রাসহকারে অনুষ্ঠান মঞ্চে নিয়ে আসতে লাগলাম। রাস্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দায়ক-দায়িকাবৃন্দ সাধু, সাধু, সাধুধ্বনি ও ফুল ছিটিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দায়ক-দায়িকাদের মধ্যে অনেকেই কেঁদে যাচ্ছেন অঝোরে। প্রথম লাইনে থাকার কারণে এ কান্নার দৃশ্য, আমার দৃষ্টিতে আঘাত হানছে বার বার। ফলে আমার মনও বিদ্রোহী হয়ে উঠল। দু-চোখে ভরে গেল নোনাজলে; ঠোঁট কামড়ে ধরেও শেষ রক্ষা হলো না। গাড়ি খোলামাঠের গেইটে পৌঁছলে অনোমদর্শী, শান্তলোক, ভদ্দীয়, প্রজ্ঞাকীর্তি ভিক্ষুরা আগু বাড়িয়ে মঞ্চে নিলেন। পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ বহনকারী ফুলের পাঁপড়ি বাড়িয়ে মঞ্চে এসে পৌঁছাল। মাইকে করুণ সুরে সাধুবাদ ধ্বনি দিতে লাগলেন। রাঙামাটির পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কমিশনার বাবু কালায়ন চাকমা। সময় তখন রাত পৌনে ১টা। আমরা ভিক্ষুরা সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করে বসে পড়লেন। সম্মিলিতভাবে অনিত্য-গাথা অনিচ্চা বত সঙ্খারাপাঠ শুরু হলো। অনেক ভিক্ষু গাথা পাঠ করতে পারলেন না। আমিও প্রথম লাইন বলে থেমে গেলাম। মুখ দিয়ে আর কিছু বের হলো না। চোখ বুজে থাকলাম পরম শূন্যতায়। আর দু-চোখ বেয়ে টপ টপ করে ঝরে পড়তে লাগল অশ্রুধারা। অনিত্য গাথা পাঠ শেষে চাকমা রাজা সংক্ষিপ্তভাবে পূজ্য ভন্তের চিকিৎসা ও পরিনির্বাণ লাভের কথা তুলে ধরলেন। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। এরপর শুরু হলো রাত জেগে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ দায়ক-দায়িকাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের পালা। প্রথমে রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসক, রিজিয়ন কমা-ার, পুলিশ সুপার শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করলেন। তার পর উপস্থিত দায়ক-দায়িকা অত্যন্ত শৃঙ্খলার সাথে তিনটি লাইন ধরে এগিয়ে পূজ্য ভন্তের দেহ বহনকারী ফ্রিজার ভ্যানের পাশ দিয়ে হেঁটে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে লাগলেন। শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকলেন কয়েকজন ভিক্ষু। তাঁরা অনুরোধের সুরে বললেন, ‘পূজ্য ভন্তের মুখ দেখার সুযোগ নেই, আপনারা ফুলগুলো শ্রদ্ধার সাথে ফ্রিজার ভ্যানের পাশের মঞ্চে রেখে সামনে দিয়ে হেঁটে যান। বন্দনাও করবেন দূর থেকে। সামনে বসে পড়ে নয়।বহুসংখ্যক দায়ক-দায়িকা হলেও তিনটি লাইন হওয়ায় এক ঘন্টার মধ্যে সবার শ্রদ্ধা নিবেদন করা সমাপ্ত হলো। এবার রাত ২:৩০ মিনিটে পূজ্য ভন্তের দেহ বহনকারী ফ্রিজার ভ্যান শোভাযাত্রাসহকারে দেশনালয়ে নিয়ে আসলাম। আর পূজ্য ভন্তে গভীর নীরবে নিঃশব্দে ফিরে আসলেন তাঁর আজীবন আবাসস্থল রাজবন বিহার কমপ্লেক্সে। কিন্তু তাঁর এ নীরবে, নিঃশব্দে ফিরে আসাতে অজ¯্র ভক্তের হৃদয়ে উৎপন্ন হয়েছে মহাকোলাহল। এই কোলাহল আনন্দের, উচ্ছ্বাসের নয়; বরং হৃদয়-ভাঙা দুঃখের, কষ্টের।

পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি, রোজ বুধবার ভোর হওয়ার সাথে সাথেই অজ¯্র মানুষের ঢল নামল রাজবন বিহারে। উদ্দেশ্য একটাই, তাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবেন। এসব মানুষের ঢলে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে। দুপুরের দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানের পক্ষ থেকেও পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হলো। দিনভর সমান তালে অসংখ্য দায়ক-দায়িকা লাইন ধরে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। সেটা অব্যহত থাকল রাত পর্যন্তও। শুধু পার্বত্য অঞ্চলের নয়, গোটা বাংলাদেশের বৌদ্ধদের ইতিহাসে এমন দৃশ্য কস্মিনকালেও দেখা যায়নি।

 

২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ রোজ বৃহস্পতিবারও সারাদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দায়ক-দায়িকা, ভক্তবৃন্দ এসে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করলেন। সেদিন পূজ্য ভন্তের সিনিয়র শিষ্যম-লী ও চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মিলে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে আলোচনা চলল। দীর্ঘ আলোচনা শেষে সকলের সম্মতিতে সিদ্ধান্ত হলো, থাইল্যা-ে ব্যবহৃত প্রযুক্তির মাধ্যমে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ সুদীর্ঘকালের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। আর এ ব্যাপারে থাইল্যান্ডের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতা চাওয়া হবে। ইতিমধ্যে কিছু যোগাযোগও করা হলো। পরবর্তী সময়ে ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় থাইল্যান্ড একটি উন্নতমানের কফিন ও হাসপাতালের ডাক্তার এনে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ সুদীর্ঘকালের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা সুসম্পন্ন হয়। বর্তমানে পূজ্য ভন্তের পবিত্র দেহ সেই কফিনে রাখা হয়েছে হলরুমে। শ্রাবকবুদ্ধ পূজ্য ভন্তে পরিনির্বাপিত হলেও অজ¯্র ভক্তকুলের হৃদয়ে তিনি চির অম্লান হয়ে থাকবেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরলসভাবে সদ্ধর্মের বাণী প্রচার করা এবং অসহায় নৈরাজ্যমথিত নরনারীর কাছে শান্তির মূর্ত প্রতীক বনভন্তে ভক্তদের মন হতে নির্বাপিত হবেনই বা কেমন করে? পূর্ণিমার অনিন্দ্য সুন্দর অবিনাশী জোছনার মতো তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের চোখের তারায়, হৃদয়ের মণিকোটায়। অসংখ্য ভক্তবৃন্দের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে থাকবেন তিনি অনন্তকাল ধরে। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক!

 

 

 

লেখক : ইন্দ্রগুপ্ত ভিক্ষু, সংকলক, আর্যশ্রাবক বনভন্তের ধর্মদেশনা (১-৯), পিটকীয় গ্রন্থের অনুবাদক ও অধ্যক্ষ, রাজবন ভাবনা কেন্দ্র, রাঙামাটি

Print Friendly, PDF & Email