log1

সদ্ধর্মের পুনর্জাগরণে পূজ্য বনভন্তের অবদান

সদ্ধর্মের পুনর্জাগরণে পূজ্য বনভন্তের অবদান
সুনীতি বিকাশ চাকমা (সক্ক)
দুল্লভো পুরিসজঞ্ঞো ন সো সব্বত্থ জায়তি,
যত্থ সো জায়তি ধীরো তং কুলং সুখমেধতি। ধম্মপদ – ১৯৩
বাংলা : মহাপুরুষের আবির্ভাব অতীব দুর্লভ। এইরূপ পুরুষোত্তম সর্বত্র জন্মগ্রহণ করেন না। যেখানে এই মহাপুরুষের আবির্ভাব হয় সেই দেশ ও জাতি ধন্য হয়।
পূজ্য বনভন্তের আবির্ভাবে ধন্য তাঁর জন্মকুল চাকমা জাতি। ধন্য তাঁর জন্মভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। তিনি বর্তমান যুগের বিশ্ব বৌদ্ধ সমাজের একটি প্রদীপ্ত ভাস্বর ও তাঁর ভক্তম-লীর পরম কল্যাণমিত্র। তাঁর জীবনেতিহাসের কথা শত মুখে বললেও ফুরাবে না। তা হবে বাহুল্য মাত্র। তিনি সংক্ষেপে যা বলেছেন এবং গোটা জীবনে যা উপদেশ দিয়েছেন তা তিনি এই গাথাযোগে প্রকাশ করেছেন :
‘নহে দূরে, নহে কাছে খুঁজিলেই পায়;
লোভ-দ্বেষ-মোহ তারে ঢাকিয়াছে গায়।
আবরণ খুলে ফেল দেখিবে নির্বাণ;
চিরশান্ত হবে তুমি রহিবে অম্লান।’
‘অনিচ্চা বত সঙ্খারা উপ্পাদ-বয়ধম্মিনো, উপ্পজ্জিত্বা নিরুজ্ঝন্তি তেসং বূপসমো সুখো’—বিগত ৩০ জানুয়ারি পতন হলো বৌদ্ধ জগতের এই অনন্য উজ্জ্বল নক্ষত্রের। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের ইতিহাসের একট গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান হলো। তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের ফলে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তাঁর জন্মকুল চাকমা জাতির, পার্বত্যবাসী ও সমতলবাসী বৌদ্ধদের তথা বিশ্ব বৌদ্ধ সমাজের। বর্তমানে তাঁর পবিত্র দেহধাতু যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষিত আছে রাজবন বিহারে তাঁর আবাসিক ভবনে। বর্তমানে তিনি পরিনির্বাপিত, চিরশান্ত, চিরনিবৃত ও চির অম্লান।
সদ্ধর্মের পুনর্জাগরণে পূজ্য বনভন্তের অবদান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ণনা করা একটা দুষ্কর ব্যাপার। একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বর্ণনা করাও ধৃষ্টতা মাত্র। তবুও আমাদের মতো সাধারণের দৃষ্টিতে যা মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন সে বিষয়ে আমার এই লেখার প্রয়াস। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি প্রথম তিনটিলা বনবিহারে পূজ্য ভন্তের দর্শনে গমন করি। সেই হতে বহুবার তথায় আসা-যাওয়া করেছি এবং তাঁর অমৃতময় উপদেশবাণী শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাঙামাটিতে শুভাগমন, রাজবন বিহার প্রতিষ্ঠা, ইহার সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন সময়ের গঠিত পরিচালনা কমিটির সাধারণ সদস্যপদ, কিছুকাল উহার সাধারণ সম্পাদক, দুই মেয়াদকাল সভাপতি পদে ছিলাম। এভাবে বিহার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকার সুযোগে স্বীয় লব্ধ উপলব্ধি বোধ থেকে এই প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর আলোকপাত করছি। মানব সমাজে সাধারণ লোক পরস্পরের যোগে কোনো একটা বিশেষ জাতির, বিশেষ দেশের, বিশেষ শ্রেণির পরিচিতিতে আবদ্ধ। আবার ব্যক্তি মানুষ মাত্রেই স্বীয় বুদ্ধিমত্তা, মানবিক বোধশক্তি আশা-আকাক্সক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ। এই বৈশিষ্ট্যগত প্রভেদের কারণে মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত, ভিন্ন রুচিবোধ ও এত বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান। মোটামুটি বলতে গেলে নিজস্ব উপলব্ধি, বোধ ও নিজস্ব বলয়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে একজন ব্যক্তিমানুষের জীবন-প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। কিন্তু যুগে যুগে, দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে মানব সমাজে এমন অনেক মনীষীর ও ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তির জন্ম হয়েছে যাঁদের পরিচয় দেশ-কাল-জাতির গ-িবদ্ধ পরিচিতিতে নয়, তাঁদের পরিচয় মানবেতিহাসে অসাধারণ মানুষ বা মহামনীষীরূপে। এই অসাধারণ মানুষেরা মানবেতিহাসের পাতায় অক্ষয় স্বাক্ষর রেখে গেছেন। যদিও মানব সমাজে তাঁদের উল্লেখযোগ্য অবদান ও বিশিষ্ট স্থান রয়েছে সত্যের খাতিরে বলতে হয় যে, নিখুঁত সত্যের বিচারে তাঁদের অনেকের মধ্যে শুধু সত্যের খ- প্রকাশই পরিলক্ষিত হয়। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে তাঁরা বড় মাপের অসাধারণ মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত বটে, তবে তাঁদের অনেকেই প্রচ্ছন্নভাবে একটা সীমাবদ্ধ চৈতন্যের গ-িতে আবদ্ধ। বলা যায়, পরিপূর্ণ সত্যের বিকাশ তাঁদের মধ্যে অপরিণত, যাঁর ফলশ্রুতিতে মানুষে মানুষে, শ্রেণিতে শ্রেণিতে, জাতিতে জাতিতে, দেশে দেশে ভেদ-বৈষম্যের নিষ্ঠুর মূঢ়তায় রঞ্জিত হয়েছে মাটির ধরণী, মনুষ্যত্ব হয়েছে অপমানিত ও লাঞ্ছিত। বিশ্বের ইতিহাসে তার ভুরি ভুরি প্রমাণের অভাব নেই।
বিশ্বের ইতিহাসে এমন লোকের জন্ম অতি বিরল যাঁরা দেশ-কাল-জাতি ও শ্রেণিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে নিখাদ সত্যলাভীর প্রভা নিয়ে আপন মহিমায় পূর্ণরূপে স্বতঃই প্রকাশমান। যিনি সকল মানুষকে এমনকি সর্বজীবকে আপনার মতো করে দেখে আপনার মধ্যে প্রকৃত সত্যকে দর্শন করতে পেরেছেন, কেবল মাত্র তাঁর মধ্যেই পূর্ণ সত্য পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত। তিনিই পরিপূর্ণ সত্যের দীপ্তিতে দীপ্তিমান। যিনি চিরন্তন সত্যকে বুঝে, সত্যকে দর্শন করে, সবার মধ্যে আপনাকে ও আপনার মধ্যে সবাইকে দেখতে পেয়েছেন, তিনি আর কোনো সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারেন না। তিনি সর্বকালের, সর্বমানুষের জন্যে প্রকাশিত হন লোকোত্তর মহামানবরূপে। এমন সত্যদ্রষ্টা মহাপুুরুষেরা অসাধারণ ব্যক্তি। তাঁরা নিজেদের জ্ঞান-গরিমার দ্বারা মোহগ্রস্ত জগদ্বাসীকে সত্যপথের সন্ধান দেন। তাঁদের মহান প্রভাব, উপদেশ ও অনুকম্পায় জগতের অশেষ কল্যাণ সাধিত হয়। বর্তমান যুগে পূজ্য বনভন্তে মহোদয়ও একজন লোকোত্তর মহামানব যাঁর মধ্যে পরিপূর্ণ সত্যের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ভাসিত। যিনি চিরন্তন সত্যকে (চারি আর্যসত্য) অধিগত করে পূর্ণভাবে প্রকাশমান। তিনি একজন অরণ্যচারী অনন্য সাধক। সুদীর্ঘ এক যুগাবধি সাধনার ফলশ্রুতিতে বৌদ্ধ সাধনার চরম লক্ষ্যে সিদ্ধি লাভে ধন্য হয়ে তিনি আপনাকে প্রকাশিত করেছেন মানুষের মধ্যে। তিনি যেমন দেশ-জাতি ও শ্রেণিভেদের এবং কালের সীমাবদ্ধ পরিচয়ের অন্তরালে আবদ্ধ নন, তেমনি কোনো ক্ষুদ্র প্রয়োজন সিদ্ধির প্রলুব্ধতায় তাঁর আত্মপ্রকাশ নয়। তিনি স্বয়ং নিখাদ সত্যকে উপলব্ধির মাধ্যমে আপনার মধ্যে সবাইকে বিরাট হৃদয়ে গ্রহণ করে প্রকাশিত হয়েছেন। তাঁর ন্যায় সত্যদ্রষ্টা আর্যপুুরুষ পৃথিবীতে ডজন ডজন জন্মান না। শত বছরে একজনও জন্মান কি না সন্দেহ।
তিনি একাই একশ নন, একাই লক্ষকোটি। সত্যকে অধিগত করার লক্ষ্যে খ্যাতি-লোভহীন নিষ্কাম সাধনায় তাঁকে কঠোর ত্যাগ ও অসহনীয় দুঃখ স্বীকার করতে হয়েছে। তাঁর মতো এত ত্যাগ, এত দুষ্কর সাধনা কোনো মহাজীবন ব্যক্তি স্বীকার করেছেন কি না জানা নেই। তাঁর অরণ্যচারী সাধনা কোনো আবেগতাড়িত চমক কিংবা কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামীর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ছিল না। তাঁর সাধনা ছিল নিখাদ সত্যকে উপলব্ধি করার সাধনা। তিনি সে সাধানায় বিফল হননি। তিনি ভগবান বুদ্ধ-প্রদর্শিত সত্যপথের অনুসরণে সত্যোপলব্দিতে সফল হয়ে ধন্য হয়েছেন এবং নিজেকে উদাহরণরূপে উপস্থাপিত করে অপরের কল্যাণার্থে মানুষকে দেখিয়ে গেছেন সত্যপথের সন্ধান। এর জন্য তাঁকে পদে পদে নানা প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখী হতে হয়েছে। তিনি সেসব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে সত্যধর্মের বাণী প্রচার ও সদ্ধর্মের আলো বিতরণের মহান উদ্দেশ্য সাধনে সফল হয়েছেন।
বস্তুতপক্ষে পূজ্য বনভন্তের সাধনা ও সাধনাশেষে তাঁর সাধারণ সমাজে বুদ্ধধর্মের মর্মবাণী ও ধর্মের মূলতত্ত্ব প্রচারের কেন্দ্রভূমি হচ্ছে মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। অবশ্য মাঝে-মধ্যে সমতল অঞ্চলেও যেতে হয়েছে তথাকার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাদর আহ্বানে। উল্লেখ্য যে, পূজ্য ভন্তের সাধনাকালীন আস্তে আস্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিস্থিতির উদ্ভব হতে থাকে। কাঁপ্তাই বাঁধের ফলে এখানকার জনজীবনে নেমে আসে মহাপ্রলয়ের তা-বলীলা। হাজার হাজার পরিবার বাস্তুহারা হয়ে পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে অজানা ভবিষ্যতের পথে নামতে বাধ্য হন। বাঁধের ফলে তাদের বাড়িঘর, ক্ষেত-খামার, জায়গা-জমি, বিদ্যালয় ও ধর্মীয় উপাসনালয় অতল জলে তলিয়ে যায়। এভাবে এক সর্বনাশা অবস্থার মধ্যে দিশেহারা জনগণ যে নিদারুণ দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত হয়েছিলেন তা ভাষায় বর্ণনাতীত। ক্রমে রক্তাক্ত মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংকটের এক পর্যায়ে শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রাম। সারা পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে চলে যুদ্ধ। দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানি, হত্যা, গুম, অগ্নিসংযোগ, বহিরাগত কর্তৃক জমি বেদখল, নিপীড়ন, নারীনির্যাতন ইত্যাদি নারকীয় বর্বরতা। সুদীর্ঘ চার দশকব্যাপী এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে এখানকার বৌদ্ধ জনসাধারণকে যে কী অমানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখী হতে হয়েছে তা ভাষায় বর্ণনাতীত। তৎকালীন এহেন প্রতিকূলতার পাশাপাশি ধর্মীয় অবস্থা ছিল নাজুক। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত কতকগুলো ধর্মীয় আচার-আচরণ ব্যতীত বৌদ্ধ জনসাধারণের ধর্মের মূলতত্ত্ব সম্বন্ধে অজানা ছিল এবং আচারসর্বস্ব ধর্মীয় কর্মকা- আচরণে সদ্ধর্মের স্বরূপ জানা, উহার আস্বাদ লাভ করা থেকে দূরে ছিল। অধিকন্তু ধর্মের নামে নানা কুসংস্কার প্রবিষ্ট হওয়ায় প্রকৃত বুদ্ধধর্মের স্বরূপটি জানা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল অধিবাসী বৌদ্ধ জনসাধারণের উপরে বর্ণিত দুঃসহ অবস্থার প্রেক্ষাপটে পূজ্য বনভন্তের সম্মুখে সাধারণ জনসমাজে ধর্মের আলো বিতরণ করার মতো অনুকূল অবস্থা ছিল না বললেই চলে। তাঁর করুণা ও উদ্যমশীলতার কারণে তিনি এতদঞ্চলে সদ্ধর্মের আলোক শিখা প্রজ্জ্বলন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তিনি তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ধর্মের গতানুগতিক ভাবধারা থেকে বৌদ্ধ জনসাধারণের ধ্যান-ধারণাকে প্রকৃত বৌদ্ধ ধর্মীয় ভাবধারায় নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। বলা যায়, তিনি বৌদ্ধ জনমানসে সত্যধর্মের নব প্রাণপ্রবাহের সঞ্চার করেছেন। মোহগ্রস্ত মানুষের চেতনায় নতুন উদ্যমের ধারণা বইয়ে দিয়েছেন। তিনি সিংহনাদে বুদ্ধের অমৃতময় মহাবাণী ও তথাগত বুদ্ধের সত্য ও জ্ঞানালোকের কথা প্রচার করে অসংখ্য নরনারীর মনে জ্ঞানচেতনার বীজ পুঁতে দিয়েছেন বললে অত্যুক্তি হয় না। তিনি ধর্মপিপাসুদের বজ্রকণ্ঠে শুনিয়ে গেছেন সত্য ও জ্ঞানচেতনার মুক্তধারার মর্মবাণী। মোহগ্রস্ত মানুষের মনোরাজ্যে সদা আঘাত হেনে আহ্বান জানিয়েছেন, সকলকে পরম সুখ নির্বাণের পথে ধাবিত হওয়ার জন্যে সত্যাশ্রয়ী ও জ্ঞানাশ্রয়ী হতে। তিনি বরাবর বলে গেছেন, আত্মোৎকর্ষ সাধনাই হচ্ছে ধর্মসাধনার চরম লক্ষ্য। আত্মোৎকর্ষ মানে আপনউন্নতি ও আপন শ্রেষ্ঠত্ব লাভের সাধনা। কাজেই প্রত্যেকের প্রতি আহবান জানিয়েছেন জ্ঞানশক্তি অর্জনে যতœবান হওয়ার জন্য যাতে ক্রমে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়ে বিবেকের পরিপূর্ণতা সাধনে ধন্য হওয়া যায়।
বর্তমান চাকমা বৌদ্ধ সমাজে পূজ্য বনভন্তের অমূল্য অবদান অপরিসীম। চাকমা জাতি যুগ যুগ ধরে বুদ্ধধর্মের অনুসারী বটে, তবে কালের বিবর্তনে জাতীয় জীবনের উত্থান-পতনের ফলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখা দেওয়ার এক পর্যায়ে চাকমা সমাজে ধর্মের নামে অনেক অন্ধ কুসংস্কার প্রবিষ্ট হয়েছিল এবং তাদের সমাজ জীবন ধর্মান্ধতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল। যদিও চাকমারা বুদ্ধধর্ম ব্যতীত অন্য ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হননি, তথাপি পারিবারিক ও সামষ্টিক মঙ্গল কামনায় দেবদেবীর উদ্দেশ্যে নানা পূজা অনুষ্ঠান, এমনকি পশুবলি দানের মতো বহু অন্ধ কুসংস্কারের প্রচলন হয়েছিল। নিকট অতীতে এসব পূজানুষ্ঠানের মতো পূজার্চনা প্রচলনের সংকটাপন্ন সময়ে পূজ্য বনভন্তে স্বীয় লব্ধজ্ঞান, মহানুভবতার গুণে চাকমা সমাজের বৌদ্ধ ধর্মীয় আদর্শ অনুশীলনে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বর্তমান সময়ে চাকমা সমাজের সেসব লালিত অন্ধ কুসংস্কার ও কল্পিত দেবদেবী পূজার প্রচলন প্রায় নেই বললেই চলে। চাকমা সমাজে ধর্মসংস্কার ও সমাজসংস্কারের বেলায় পূজ্য বনভন্তের মহৎ অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না।
পূজ্য বনভন্তের আবির্ভাবে শুধু চাকমা সমাজে নয়, বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তিনি সদা উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ইহকাল-পরকাল সুখ লাভের জন্যে ধর্মসাধনা। সুখ ও মঙ্গলকামী হয়ে যাতে আপন পরিহানি না হয় তজ্জন্য সত্যান্বেষী হওয়া। তিনি বলতেন, সত্য-মিথ্যা পরীক্ষা কর। যা সত্য গ্রহণ কর, মিথ্যা হলে পরিত্যাগ কর। সুপথ-কুপথ চিনে লও, ভালো-মন্দ যাচাই কর। পরস্পর বলাবলি কর যে, আমরা বুদ্ধের শাসন গভীরভাবে বিশ্বাস করব ও একাগ্রভাবে মেনে চলব। আমার এসব উপদেশমতো চলতে পারলে জীবনে মঙ্গল, উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি হবে। কিছুতেই পরিহানি হবে না। বিভিন্ন উপলক্ষ করে যেসব পুণ্য কাজ করছ তা বৃথা যাবে না। পুণ্য কখনো তোমাদের ফাঁকি দেবে না।
পূজ্য বনভন্তের দর্শন পেয়ে তাঁর উপদেশে জ্ঞানহারা ও সদ্ধর্মহারা নরনারী পেয়েছেন জ্ঞান ও সত্যের সন্ধান। অসাধু হয়েছেন সাধু, কৃপণ হয়েছেন দাতা, মূর্খ হয়েছে প-িত, দীনহীন হয়েছেন সামর্থ্যবান, রোগী হয়েছেন সুস্থ, স্বল্পায়ু হয়েছেন দীর্ঘায়ু, কত শত নরনারীর আপন অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছে তা তারা নিজেরাই জানেন। পূজ্য ভন্তে দশবল বুদ্ধশাসন রক্ষা, স্থিতি, বিস্তার ও শ্রীবৃদ্ধির জন্যে যা যা করণীয় সে বিষয়ে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর উপদেশ শ্রবণ ও তাঁর মহান প্রভাবে শত শত যুবক, প্রৌঢ়, এমনকি বয়স্ক ব্যক্তি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে ধর্মসাধনায় রত হয়েছেন। ইতিমধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি এলাকায় সুরম্য বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শত শত ভিক্ষু-শ্রামণ স্বীয় ধর্মসাধানার পাশাপাশি জনসমাজে ধর্মীয় নীতি-আদর্শ প্রচারে নিরত রয়েছেন। বলা বাহুল্য যে, এদেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ তথা বাংলাদেশের বাইরেও পূজ্য ভন্তেকে উপলক্ষ করে অনেক বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পবিত্র ত্রিপিটক গ্রন্থ হচ্ছে বুদ্ধধর্মের মূল আধার, ত্রিপিটক সংগ্রহ, অনুবাদ ও প্রচারের জন্য পূজ্য ভন্তে খুবই গুরুত্ব দিতেন। ইতিমধ্যে এই রাজবন বিহারে ত্রিপিটক গ্রন্থ সংগৃহীত হয়েছে। ইহার বেশ কিছু খ-ও অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়েছে। রাজবন বিহারে অফসেট প্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বই ছাপানো কাজ অনেক সহজ হয়েছে।
পূজ্য বনভন্তের অবদানে পার্বত্য অঞ্চলে তথা সারা বাংলাদেশে বুদ্ধধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় জীবনে নতুন প্রাণপ্রবাহের সঞ্চার হওয়ার পাশাপাশি সত্যধর্ম জানার আগ্রহ দিন দিন বেড়ে চলেছে এবং নারী-পুরুষনির্বিশেষে বহু গুণী-জ্ঞানী, কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ এবং স্বনামধন্য অনেক বিদেশি ভিক্ষু তাঁর দর্শনার্থী হয়ে এখানে শুভাগমন করেছেন। তাঁরা এদেশের বুদ্ধধর্মাবলম্বীদের কর্মকা- স্বচক্ষে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। ইহা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, পূর্বে এই পার্বত্য অঞ্চলের কোনো জায়গায় কোনো আর্যপুরুষের পদার্পণ হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অধুনা সেই জায়গায় পরমপূজ্য মহান আর্যপুরুষের জন্ম ও পদচারণা, তাঁর সেবা-পূজা ও হিতোপদেশ লাভ করা ও ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে অনুসরণ ও অনুশীলনের প্রবল জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এক কথায় এখানে বুদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণের শুভ লক্ষণ সূচিত হয়েছে। পূজ্য বনভন্তে সুদৃষ্টি ও সুত্ত-নিপাত নামক দুটি গ্রন্থ স্বয়ং প্রণয়ন করেছেন। উক্ত দুটি পুস্তক প্রকাশ হওয়ায় জনসমাজে ধর্মীয় প্রকাশনা কাজে উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে অনেক ভিক্ষু-শ্রামণ ও ধর্মপিপাসু ব্যক্তি ধর্মীয় প্রকাশনা কাজে আতœনিয়োগ করেছেন। মোটামুটি বলতে গেলে পূজ্য বনভন্তের আবির্ভাবে ধর্মীয় জাগরণের ফলশ্রুতিতে জনসমাজে নৈতিক উন্নতির যে-ধারা সৃষ্টি হয়েছে তা ভাবীকালেও অব্যাহত থাকবে বলে সবার প্রত্যাশা। পূজ্য বনভন্তের আবির্ভাবে ধর্মে উন্নতি ও ভিক্ষুসংঘের সম্মান-সৎকার যে বৃদ্ধি পেয়েছে তা অনস্বীকার্য। তাই পার্বত্য অঞ্চলের সর্বত্র পূজনীয় সংঘের দিক-নির্দেশনায় এখানকার বৌদ্ধ সমাজে ধর্মীয় আলো অধিকতর বিস্তার লাভ হবে—ইহাই কাম্য।
পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা জাতি তথা বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গৌরবরবি পূজ্য বনভন্তের প্রদর্শিত ধর্মীয় আদর্শের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হোক। জয়তু বুদ্ধসাসনম্! জয়তু বনভন্তে! 

লেখক : সুনীতি বিকাশ চাকমা (সক্ক), প্রাক্তন সভাপতি, রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি

Print Friendly, PDF & Email