log1

আর্যশ্রাবক বনভন্তের সাধনাতীর্থ রাঙামাটি রাজবন বিহার : ধ্যানীর ধ্যানমগ্নতা আর প্রকৃতির দুই হাতে উজাড় করা স্বর্গীয় সৌন্দর্য

IMG_0026_resize

আর্যশ্রাবক বনভন্তের সাধনাতীর্থ রাঙামাটি রাজবন বিহার :
ধ্যানীর ধ্যানমগ্নতা আর প্রকৃতির দুই হাতে উজাড় করা স্বর্গীয় সৌন্দর্য
ভাস্কর ডি. কে. দাশ মামুন
ধরিত্রী কত অনুপম উপাচারে এই বাংলাকে ভরিয়ে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ভুবনে ভুবনে ভুলানো প্রকৃতি আর এক আধ্যাত্মিক মহান যোগী পুরুষের সাধনতীর্থ রাঙামাটির বনবিহারকে নিয়ে আমি কটি কথা বলতে কলম ধরেছি। জানি আমার লেখায় বিহারের সৌন্দর্য কিংবা মহান যোগী বনভন্তের কিয়ৎ কীর্তিও তুলে ধরতে পারব না। কেননা, যে রূপ ভুবন ভুলানো, যে যোগীর সারাটা জীবন মুক্তির পথনির্দেশনা, যে আঙিনার ফুল-পাখি-জীব-পতঙ্গ, ইট-সুরকী, নরনারী এক বাক্যে আনত, গভীর শ্রদ্ধায় নতজানু সেই গভীর এক ঘোর লাগা অনন্য সাধারণ বিষয়কে শব্দে, বাক্যে, ভাবে তুলে ধরা অন্তত আমার মতো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। তবু আমার অনুভূতি, অনুভব আর চাক্ষুষ পরিতৃপ্তির কথাটুকু তুলে ধরতে চাই।
‘দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া’—এই মহামূল্যবান চারণটিকে তুলে আনলাম আমি বনবিহারের অপরূপতার বর্ণনা যথার্থতার জন্য। ছুটির দিনে অবকাশ-যাপন কিংবা ট্যুর করতে আমরা ছুটে যাই দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে। আমরা একটি বারও ভাবিনি বিশেষ বৈশিষ্টসম্পন্ন এই নরসন্তান জীবনভর তিল তিল করে হৃদয়ের সকল মঙ্গল চাওয়া দিয়ে কী অনুপম মমতায় গড়ে তুলেছেন রাঙামাটি ‘বনবিহার’। পাহাড়ঘেরা কাকচক্ষু জলের হ্রদ আর সবুজে ঠাসা স্বপ্নের মতো করে সাজানো শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের রাজবন বিহার দেশের উৎকৃষ্ট একটি সাধনতীর্থ ও আদর্শ পর্যটন কেন্দ্র। রাঙামাটি শহরের উপর অথচ একটু ছোঁয়া লাগেনি শহুরে যান্ত্রিকতার এই সাধনতীর্থ ‘বনবিহার’। এখানের সকাল, এখানের দুপুর কিংবা এখানের নিশুতি রাত যেন গভীর ধ্যানে মগ্ন এক স্বপ্নের স্বর্গপুরী। অগণিত দেশি-বিদেশি নরনারী, সকাল-সন্ধ্যা কীসের এক টানে এখানে আসছে। কোনোখানে নেই কোনো কোলাহল। সারাটা বিহারে রয়েছেন অনেক গেরুয়া বসনধারী গৃহত্যাগী ধ্যানীপুরুষ বনভন্তের চর্চিত পথের অনুগামী শিষ্যদল। নিষ্কাম, নির্লোভ, নির্মোহ তাঁদের করেছে দেবতুল্য আদর্শ মানুষের উপমা। বুদ্ধদর্শন তাঁদের করেছে ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত।
১৬ ডিসেম্বরের সকাল ৮টায় এক মহৎ উদ্দেশ্যে রওনা হই রাঙামাটি। আমাদের এই যাত্রার সমূহ বদান্যতা শ্রদ্ধেয় রাখালদার (বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির সভাপতি রাখার চন্দ্র বড়–য়া)। ১০টা নাগাদ আমরা (আমি, আমার সহকারী সুব্রত বাবু এবং শ্রদ্ধেয় রাখালদা) পৌঁছে যাই রাঙামাটি সদরে। পাহাড়ি পথ, দু-পাশে কোথাও পাহাড়ি ঢাল, বন বিভাগের সেগুন, গামারী, ঝাউ বন, জুমচাষের আবাদী পাহাড়, কলাবাগান, আনারস বাগান, চা বাগান, সুদৃশ্য লেক, দুই পাহাড়ের পাদদেশে আংশিক সমতলে সবজির চাষ, ধানের জমি আরও কত কী! প্রকৃতির ঐশ্বর্যভরা দৃশ্য, দেখে দেখে খালি তন্ময় হওয়া যেন। একসময় আমাদের গাড়ি রাঙামাটি সরকারি কলেজের পাশ দিয়ে ঢুকে পড়ে সরু গলির মতো পথে। রাস্তা বেয়ে আমরা পৌঁছে যাই বনবিহারের প্রধান ফটকে। মনটা আনচান করে উঠে। যাঁর দর্শন লাভে, যে উদ্দেশ্যে এসেছি তা হবে তো! বরাবরের মতো রাখাল’দা অভয় দিলেন। আমরা পৌঁছুতেই জনাকয়েক শিষ্য ভন্তের কাছে রাখাল’দা পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং আমার উদ্দেশ্যের কথাটা জানালেন। শ্রদ্ধেয় ভন্তেগণ নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ করে দুরু দুরু বক্ষে আমরাসহ গেলাম বনভন্তের সাধন-কুঠিরের দ্বিতলে। প্রথম দর্শনেই অনুভব করলাম এক অনুপম শিহরণ। পার্ষদ ভন্তেগণ শ্রদ্ধেয় বনভন্তের নিকট সবিনয়ে তুলে ধরলেন আমার অভিপ্রায়। একটি কাগজে তাঁরা লিখে দিলেন যে, আমি শ্রদ্ধেয় বনভন্তের একটি প্রতিকৃতি ভাস্কর্য নির্মাণ করতে চাই। বিষয়টি তিনি অবগত হলে পর তাঁকে খুবই প্রাণোচ্ছ্বল মনে হলো। শ্রদ্ধেয় ভন্তে পাহাড়ি ভাষায় বললেন, ‘ইতিপূর্বেও দুজন ভাস্কর এসেছিলেন তাঁর প্রতিকৃতি রচনার অভিলাষে। তিনি তাতে মত দেননি। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তিনি সানন্দচিত্তে অনুমতি দিলেন। বুকের মাঝ হতে একটি বিশাল ওজনের পাথর নেমে গেল যেন। তবে এখনও ভয় কাটেনি। দেখলাম পার্ষদ শিষ্য ভন্তেগণ কী নিদারুণ আগ্রহে তাঁর দেশনা শুনছেন, করজোড়ে নতশিরে শিরোধার্য করে নিচ্ছেন গুরুর বচন। উৎকৃষ্ট প্রমাণ পেলাম শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের একটি জীবনমুখী বাণীর যথাযথ বাস্তবায়নে ‘এক আদেশে চলে যারা, তাদের নিয়ে সমাজ গড়া’।
শুভক্ষণে শুরু করলাম কাজ। রোজ সকালে/বিকালে সাধন-কুঠিরের দ্বিতলে শ্রদ্ধেয় ভন্তে এসে বসলেই আমি কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। স্বর্গীয় এক পরিবেশ। এ যেন দেবলোকের অন্তঃপুরে আমার সৌভাগ্যবাস। পার্ষদ শিষ্য ভন্তেগণ চতুপার্শ্বে বিহার করছেন সর্বদা। মনে পড়ে শ্রদ্ধেয় ইন্দ্রগুপ্ত ভন্তে, শ্রদ্ধেয় সৌরজগৎ ভন্তে, শ্রদ্ধেয় আনন্দমিত্র ভন্তে, শ্রদ্ধেয় জ্ঞানপ্রিয় ভন্তে, শ্রদ্ধেয় বোধিমিত্র ভন্তে, শ্রদ্ধেয় জ্ঞানরতœ ভন্তেসহ অনেক শিষ্য ভন্তেগণের কথা আজ মনে পড়ছে।
আর বিহারের বিশাল কর্মকা-ের ধারা, গতিপ্রকৃতি দেখে অভিভূত হচ্ছি ক্রমাগত। প্রতিদিন অগণিত ভক্ত নরনারী আসছেন, যাচ্ছেন। অথচ বিঘিœত হচ্ছে না নীরবতা, বিঘিœত হচ্ছে না শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবিরের বিশাল এই কর্মযজ্ঞের। কীসের অলক্ষ্যের এক নিপুণ ইশারায় প্রতিটি বিভাগের কাজ চলছে নিরন্তর, অবিরত। দিবানিশির মাত্র ৪ ঘন্টা ঘুমিয়ে শ্রদ্ধেয় ভন্তেগণ গুরুর আদেশ-মাফিক চরিত্র গঠন আর সাধন পথে সকলে অগ্রসরমাণ।
সারিবদ্ধ হয়ে ভিক্ষু-শ্রামণগণ দু-বেলা গুরুর পদধূলি এবং দেশনা শ্রবণে সাধন-কুঠিরে সমবেত হয়ে থাকেন। দেখা গেছে, শিশু, যুবা-বৃদ্ধ নানা বয়সের শ্রামণবৃন্দ দিনের অবশিষ্ট সময় তথাগত বুদ্ধের স্মরণ-মনন-ধ্যানে রত থাকেন। আর দূর-দূরান্ত হতে দলে দলে উপাসক-উপাসিকাগণ (সাধারণ গৃহী ভক্তগণ) বিবিধ ভোগ্য-দ্রব্য, ব্যবহার্য, সুগন্ধিদ্রব্য, তৈজসপত্র, ফল-ফলাদি, আসবাবপত্র সকাতর শ্রদ্ধায় নিবেদনের জন্য নিয়ে হাজির হচ্ছেন শ্রদ্ধেয় বনভন্তের পদপ্রান্তে। সংসারী, ভোগী মানুষেরা দুঃখ, যাতন, হতাশা, অপ্রাপ্তি, অভিলাষ, কায়-মনো-বাক্যে নিবেদন করছে এই আর্যশ্রাবকের পদপ্রান্তে। অগণিত ভক্তকুলের প্রতি শ্রদ্ধেয় ভন্তের প্রেমালু দৃষ্টি বড়ই সকরুণ। তিনি অন্তর থেকে এ সকল সংসারী তৃষিত মরুর ন্যায় মানুষগুলোর প্রতি আশীর্বাদ করেন, মনযোগ দিয়ে শুনেন বেদনাহতের বেদনার কথা।
শ্রদ্ধেয় ভন্তের প্রতিকৃতির কাজ যেমন চলছে, তেমনি করে বিহারের চৌহদ্দির সাথেও নতুন নতুনভাবে পরিচিত হচ্ছি প্রতিদিন। মূল এই বিহারের অধীনে সারা পার্বত্য এলাকাজুড়ে রয়েছে আরও পঞ্চাশোর্ধ শাখা বিহার। দু-মাসে শ্রদ্ধেয় ভন্তের আবক্ষ প্রতিকৃতি ভাস্কর্যের কাজ শেষ করলে একদিন শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ ইন্দ্রগুপ্ত ভন্তে ও অন্য ভন্তেগণ বললেন, বনভন্তের একটি লাইভ সাইজ পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতি ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য। এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। শুধু একটাই লোভ, অন্তত মোহগ্রস্ত জীবনের বাইরে এই পুত বৃন্দাবনে আরও কিছু কাল থাকা যাবে। এবার বনবিহারের চংক্রমণ ঘরে শুরু করি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ। এ কাজে নতুনভাবে সহযোগী হলেন বন্ধু ভাস্কর সুধীর ম-ল। টানা চার মাস কাজ করে বনবিহারের প্রাণপুরুষ বনভন্তের একটি লাইভ সাইজ প্রতিকৃতি ভাস্কর্য নির্মাণ করলাম, যা দেশনা কমপ্লেক্সের উলটোদিকে দ্বিতীয় মন্দিরটিতে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রতিকৃতি ভাস্কর্য নির্মাণের সময়ে চিত্র শিল্পী কনক চাঁপা চাকমা, ভাস্কর শিল্পী শ্যামল এই বিহারে সৌজন্য সাক্ষাতের কথা মনে পড়ে।
একদিন শ্রদ্ধেয় ভন্তের পার্ষদ শ্রদ্ধেয় ইন্দ্রগুপ্ত ভন্তের কাছে জানতে পারলাম রাঙামাটি থেকে অদূরে কাটাছড়িতে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় (প্রায় ১০০ একর) গহীন আরণ্যের মাঝে তৈরি হচ্ছে বিশাল ভাবনা কেন্দ্র। শ্রীমৎ ইন্দ্রগুপ্ত ভন্তের কাছে ভাবনাকেন্দ্র ঘুরে দেখার ইচ্ছে পোষণ করলে তিনি জানালেন, আমাদের নিয়ে যাবেন একদিন। পরবর্তী সময়ে নিয়েও গিয়েছিলেন সেখানে। সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আসছি। সম্যক বর্ণনা করতে চাই বনবিহারকে নিয়ে।
চারদিক কাকচক্ষুজলের লেক ঘেরা উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলার উপর বনবিহার স্থাপিত। চৌহদ্দির চারপাশে বিহারের পূর্বে রাজবাড়ি, পশ্চিমে একটি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি স্টেডিয়ামের দক্ষিণ দিকে প্রধান সড়কের পাশে স্থাপিত জিমনেসিয়ামের পাশ দিয়ে আরও এক পথে মাত্র ৫ মিনিট পায়ে হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যায় বনবিহারে। মূল সড়ক থেকে সামনে এগুলোর দেখা যাবে সুদৃশ্য তোরণ। কারুকার্য খচিত এই তোরণে বাংলায় লেখা আছে আর্যশ্রাবক শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের বনবিহার। লেকের উপর নির্মিত পাকা ব্রীজ পেরুলেই বনবিহারের আঙিনায় পৌঁছা যায়। আঙিনায় উঠার পূর্বে কটি কাঁচা-পাকা ঘর, ভ্রাম্যমান বইয়ের দোকান, দায়ক-দায়িকার রন্ধনশালা ও তীর্থ নিবাস। বাইরের আঙিনাটা বেশ চওড়া আঙিনার উত্তর পাশে উপাসক-উপাসিকাদের অফিস (বিহার পরিচালনা পরিষদ), পশ্চিম পাশে বেশ উত্তর-দক্ষিণ লম্বা করে গ্রিল লাগানো মুক্ত অডিটোরিয়াম ও মুক্ত মঞ্চ। আঙিনার পাশ দিয়ে পিচঢালা পথ এগিয়েছে সামনে, সেখানে রয়েছে দৃশ্যমান অপূর্ব দুটি স্থাপত্য নিদর্শন। আধুনিক স্থাপত্য-কলার অনুপম দৃষ্টান্ত হতে পারে এ দুটি ইমারত। একটি হলো বুদ্ধধর্মীয় বৌদ্ধ ভাবাদর্শে নির্মিত ক্রমিক ধারায় সাজানো মনুষ্যলোক হতে চূড়ান্ত স্বর্গলোক। আর অন্যটি গেস্ট হাউজ। প্রথমোক্ত ইমারতটি অত্যন্ত কারুকার্য খচিত সাত তলাবিশিষ্ট একটি দালান। ভূমি থেকে দুই সারি করে উপরে আরোহণ, অবরোহনের পথ। আর পরেরটি গেস্ট হাউজ হলেও মূলত দূর-দূরান্ত হতে আসা বিহারবাসী ভিক্ষুগণ এখানে থাকেন। চারদিকে ফুলের বাগান আর মূল্যবান গাছের সারি। একটু পশ্চিমে রয়েছে বিদেশি অতিথিদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি আরও একটি গেস্ট হাউজ। এখানে রয়েছে সকল অত্যাধুনিক পরিপাটি একটি রন্ধনশালা। গেস্ট হাউজের সামনে এক চিলতে লম্বাটে উঠোন, তার এক পাশে ফুলের বাগান।
উঠোন পেরিয়ে আঙিনার দিকে এগোতে গেলেই স্বর্গের সামনে চাতাল বাঁধানো একটি অনেক দিনের পুরনো বটবৃক্ষ। দর্শনার্থীরা চক্ষু মুদে একবার ভেবে নিতে পারেন এমনই এক বোধিবৃক্ষের তলে হাজার বছর পূর্বে তথাগত বুদ্ধ উপাসনায় ছিলেন ধ্যানমগ্ন। আর লোকালয় থেকে খুব প্রাতে আহার্য নিয়ে আসা দায়িকাদের দেখে মনে হবে সুজাতার পায়সান্ন দানের মতো পরমাত্মিক স্মৃতিকথা। বৃক্ষটির তলায় একটি খোপের মতো ছোট চালা ঘরে দুটি সুপেয় পানির কলস এবং নারিকেলের খোলের পানপাত্র। পথচারী ক্লান্ত-পিপাসার্ত হলে বৃক্ষতলে বস শ্রান্তি লাঘব যেমন এখানে করতে পারবেন তেমনি সুপেয় জলে নিবারণ করবেন তৃষ্ণা। স্থানীয় দায়ক-দায়িকারা রোজ ভরে রাখেন এসব জলের কলস।
সামনের আঙিনা পেরিয়ে ঘরের দু-পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে বিহারের মূল অংশে। যে-কোনো দর্শনার্থী মূল অংশে পা রেখেই চমকে যাবেন এক নিটোল সৌন্দর্যে সাজানো মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে। দু-পাশে বেশ মন্দির কক্ষ। স্থাপত্য শৈলী অনুপম। শুরুতে ঢুকতেই বামে একটি কৃত্রিম ঝর্ণা। ঝর্ণাটা নেমে এসে শেষ হয়েছে একটি ফোয়ারায়। ফোয়ারাটি ঘিরে আছে ব্রোঞ্চের উপগুপ্ত ভন্তের মূর্তি স্থাপিত বেদীকে। শস্যপাত্র হাতে ধাতব ভাস্কর্যটি পরমাত্মিক ঐশ্বর্যের ধারক। পাশাপাশি তিনটি মন্দিরের দুটিতে রয়েছে বুদ্ধের ত্রিমাত্রিক ধাতব ভাস্কর্য ও একটিতে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের প্রতিকৃতি ভাস্কর্য (কাস্টিং পদ্ধতিতে আমার করা বনভন্তের প্রস্তর ভাস্কর্য প্রতিমূর্তি)। তারপাশে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের ভোজনালয়। প্রতিদিন এই মন্দিরে মহান আর্যশ্রাবক ভক্তদের দেয়া ভোজ্য গ্রহণ করেন। মাঝখানের উঠোনটি সুন্দর করে বাঁধানো বাহারি অর্কিড, ক্যাকটাস, ঝাউয়ের সারি, ফুলের গাছ। ভেতরের উঠোনের পূর্বপাশে অতিসুদৃশ্য দু-পাশে খোলা অডিটোরিয়াম। এখানে বসেই অসংখ্য উপাসক-উপাসিকার প্রতি দেশনা ও দর্শন দিয়ে থাকেন আর্যশ্রাবক শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তে।
ভেতর উঠোনের একেবারে উত্তর প্রান্তে ভন্তের সাধন-কুঠির। এই কুটিরের দ্বিতলে সাধনায় দিবানিশি মত্ত থাকেন শ্রদ্ধেয় বনভন্তে। অনিমেষ মুরতি এই পারমার্থিক মহাপুরুষকে এই কুঠিরে সারাক্ষণ ঘিরে থাকেন তার প্রিয় পর্ষদ, অনেক সংসারত্যাগী তাঁরই পথের অনুগামী শিষ্যবৃন্দ। মধুর এই নব বৃন্দাবনের প্রতিটি কিছুই সারাক্ষণ যেন ঋজুভঙ্গিতে মুক্তির সাধনায় মত্ত। আর তাপিত, ব্যথিত মানুষ নিয়ত জড়ো হচ্ছে প্রতিদিন এই ব্যথাহরী দয়ালের কাছে।
বিহারের উত্তর পাশে আরও বেশ কটি দালান উঠছে। যেখানে রয়েছে বিহারস্থ শিষ্যবৃন্দের থাকার ব্যবস্থা, হাসপাতাল, প্রেস আর কোথাও নতুন নতুন কর্মপরিকল্পনা নকশা পাতা। উত্তর দিকে বেরিয়ে যাবার অন্য পথের মুখে আরও একটি বিশাল মাঠ। পুরো বিহারের নির্জনতাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে চারপাশের বন-বনানী, উঁচু উঁচু বৃক্ষ, বৃক্ষের ডালে ডালে হরেক পাখি, কোথাও বা ক্রীড়ায় মত্ত বানরের দল।
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে এই পরিবেশে কাজ করতে এসে কখন যে হৃদয়ে বৈরাগ্য বাসা বেঁধেছে খেয়াল করিনি। সকাল সাঁঝে পাখির গান, সন্ধ্যায় সুরেলা কণ্ঠে বহুদূর থেকে ভেসে আসা আজান ও বিহারের মাইক থেকে ছড়িয়ে পড়া ত্রিপিটক-পাঠ প্রাণে কী যে ভগবৎ বাসনা জাগায় তা সহৃদয় অনুভব বিনা বোঝানো যাবে না।
এই বিহারের বাইরেও রয়েছে বিশাল কর্মকা-, বিস্তৃত কর্মপরিধি। শ্রীমৎ ইন্দ্রগুপ্ত ভন্তের সাথে একদিন কাটাছড়িস্থ রাজবন ভাবনা কেন্দ্র ঘুরে দেখতে যাই। সাথে ছিলেন আরও বেশ কয়েকজন বিহারবাসী ভন্তে-শ্রামণ। মিনিট চল্লিশেক পর আমরা পৌঁছে যাই কাটাছড়ি ভাবনা কেন্দ্রের প্রথম সোপানে। গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না বলে পদব্রজে আমরা শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে অনুসরণ করি। একশ একর পাহাড়ি ভূমির উপর গড়ে উঠেছে এই ভাবনা কেন্দ্র। বিহারের চাইতে আরও বেশি জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় দূরে দূরে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় গোটা বিশেক ভাবনা কুঠির তৈরি করা হয়েছে। বেশ কটি পাকা হলেও দু-একটি মাটির ও বাঁশের বেড়ার তৈরিও আছে। একটি থেকে অন্যটির দূরত্ব বেশ। এই পাহাড়ি অরণ্য ভূমিতে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। অতি কষ্টে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি কুঠিরে শুধু একজন করে ভিক্ষু কঠোর তপস্যার লক্ষ্যে নিভৃতে অবস্থান করেন। কঠোর ধ্যানের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ অন্বেষণে আরণ্যবাসী শ্রদ্ধেয় ভিক্ষুগণ দীর্ঘসময় লোকালয় হতে বিচ্ছিন্ন থাকেন। শ্রদ্ধেয় ইন্দ্রগুপ্ত ভন্তে জানালেন, এখানের এই বিশাল বনভূমি জুড়ে গড়ে তোলা হবে আধ্যাত্মিক চর্চার পীঠভূমিরূপে। তথাগত বুদ্ধের চূড়ান্ত সাধনমার্গে পৌঁছার পথে শ্রদ্ধেয় বনভন্তের আশীর্বাদ নিয়ে তাঁরা সত্য, সুন্দরের সন্ধান করবেন।
শেষ কথা আজ ভন্তের সশরীর অবস্থান আমাদের মাঝে নেই। বনবিহারের প্রতিটি সত্ত্বার মাঝে তাঁর উপস্থিতি আমাদের বারে বারে কাছে টানবে, ভালোবাসা জাগাবে, পরমাত্মিক ভাবনায় আকুল করে তুলবে। তাঁর মৃত্যু হতে পারে না, হতে পারে না লক্ষ কোটি ভক্তের হৃদয় হতে ক্ষণিকের জন্য দূরে থাকা। তিনি আছেন, তিনি থাকবেন। বনভন্তের স্বর্গীয় সত্ত্বার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। 

লেখক : ভাস্কর ডি. কে. দাশ মামুন, গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email