log1

বিশ্বশান্তি প্যাগোডা : প্রসঙ্গ রাজবন বিহার

8

বিশ্বশান্তি প্যাগোডা : প্রসঙ্গ রাজবন বিহার
অধ্যাপক ড. জিনবোধি মহাথের
‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি অপূর্ব নিদর্শন। বিচিত্র কারুকার্যখচিত শৈল্পিক চেতনার সৃষ্টি দৃষ্টিনন্দন এবং আকর্ষণীয় ‘প্যাগোডা’ বিশ্বশান্তির নীড় বলা যায়। ‘প্যাগোডা’ মূলত বৌদ্ধ বিহারকে বুঝায়। ‘বুদ্ধ’ শব্দের অর্থ মহাজ্ঞানী বলা হলেও এর প্রকৃত সম্যক জ্ঞান অর্থাৎ যে জ্ঞান অর্জিত হলে মানবের জাগতিক ও আত্যন্তিক দুঃখ-যন্ত্রণাকে জন্মগ্রহণ করতে হয় না। এক কথায় বলা যায় তাকে আর এই ভব সংসারে জন্মগ্রহণ করতে হয় না। একেই বলা যায় পরম শান্তি নির্বাণ। রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের সেই উচ্চ মার্গের জ্ঞান অর্জিত হয়েছিল বলেই জগতে ‘বুদ্ধ’ নামে খ্যাত হয়েছিলেন। প্যাগোডা বা বিহার এক অর্থে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবাসস্থলকে বুঝায়। যেখানে আত্মত্যাগী, সংসারবৈরাগী বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যম-লীর আবাসস্থলরূপে প্রতিভাত। মহান ভিক্ষুসংঘরা সেখানে প্রতিনিয়ত ধ্যান-সমাধি ও শাস্ত্রচর্চায় রত থাকেন। মানুষ মাত্রেই সুখশান্তির প্রত্যাশী, সুখশান্তি চায় না এমনতর মানুষ পৃথিবীতে খোঁজ করলে একজনও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ হয়। তবু কেন জানি না মানুষের জীবনমাত্রেই সুখ-দুঃখমিশ্রিত। সুখের চেয়ে দুঃখের পাল্ল¬াটা অতি ভারী বলে মনে হয়। অজ্ঞান অন্ধ মানুষ তা অতি সহজে বুঝে উঠতে পারে না বলেই দুঃখের কষাঘাতে শুধু তিনি জর্জরিত নন আজ বিশ্ববাসীকে দুঃখে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। তার মূলে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা বা অতি লোভ যা মানুষকে মানবিক চেতনা ও মূল্যবোধ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখে। হিংসা মানুষের সহজাত স্বভাব হলেও প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষের জীবনে কোনো আনন্দ ও স্বস্তি নেই। তাই আজ সারাবিশ্ব হিংসার বিষবাষ্পে প্রজ্বলিত হতে দেখা যাচ্ছে মোহান্ধতাই এসব অসুন্দর, অকল্যাণ, অমানবিক ও অশান্তির মূল সোপানবিশেষ। তথাগত বুদ্ধই বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম বিশ্বমানবতা ও বিশ্বশান্তির বার্তা ঘোষণা করেছেন, যা এখনো অম্লান এবং চিরভাস্বর হয়ে আছে এবং থাকবে যুগ যুগ ধরে। তারই কেন্দ্রস্থলস্বরূপ বৌদ্ধ বিহার বা প্যাগোডাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে জ্ঞানসাধনার শ্রেষ্ঠ পীঠস্থানরূপে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সিদ্ধার্থ গৌতমের বোধিজ্ঞান বা ‘বুদ্ধত্ব’ জ্ঞানলাভের ৪৯ দিন পর সর্বপ্রথম ব্রহ্মদেশীয় (মিয়ানমার) দুজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তন্মধ্যে একজন তপস্সু এবং অন্যজন ভল্লি¬ক নামে ব্যক্তিদ্বয়ের সাক্ষাৎ হলে তারা দুজনেই অন্তরের গভীর শ্রদ্ধানিবেদনপূর্বক মধুপি- নামক আহারের উপাদান হিসেবে দান করেন। বুদ্ধজীবনে এই ছিল তাঁর প্রথম আহার গ্রহণ। তারা দুজনেই সর্বপ্রথম দ্বি-বাচক উপাসক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। এটা তাদের উভয়ের জীবনে অতীব গৌরবের বিষয়। তারা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালে বুদ্ধ সমীপে প্রার্থনা করলেন, আমরা দুজনেই দেশে ফিরে যাবো। আপনার দর্শন পেয়ে আমরা সৌভাগ্যবান ও ধন্য হয়েছি বটে, কিন্তু জন্মজনপদের অসংখ্য ভক্তপ্রাণ নরনারী আপনার দর্শন ও পূজা থেকে বঞ্চিত। আপনার স্মৃতিস্বরূপ কিছু নিদর্শন আমাদের অর্পণ করলে দেশবাসী তা পূজো ও স্মরণ করার গৌরব লাভ করবে। তথাগত বুদ্ধ তাদের এই মহতী প্রত্যাশা পূরণের জন্য স্বীয় মস্তকে হস্ত দিয়ে চারগুচ্ছ (৮টি) পবিত্র কেশরাশি উত্তোলনপূর্বক যাদের অর্পণ করেন তারা এহেন দুর্লভ বুদ্ধের কেশরাশি গ্রহণ করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনপূর্বক এই পবিত্র কেশরাশি সংরক্ষণ ও পূজো করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন সোয়েডাগং প্যাগোডা বা স্বর্ণের প্যাগোডা। এ ঐতিহাসিক প্যাগোডায় সংরক্ষিত হয় বুদ্ধের পবিত্র কেশধাতু (ঐধরৎ জবষরপং)। মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুন হতে কিছুটা পূর্ব-দক্ষিণে সুউচ্চ পাহাড়-পর্বত শৃঙ্গে এই বিশাল প্যাগোডা নির্মিত হয় যা বিশ্ববাসীর কাছে ‘গোল্ডেন প্যাগোডা’ নামে পরিচিত হলেও সবার দৃষ্টিতে এটি একটি বিশ্বশান্তির অতি পবিত্রতম পীঠভূমি। তা ছাড়াও পুণ্যভূমি নামে পরিচিত মিয়ানমার ‘প্যাগোডার দেশ’ হিসেবে খ্যাত হয়েছে। তথায় সোয়েডাগং প্যাগোডা ছাড়াও মহাজাদি প্যাগোডা, শেমাদো প্যাগোডা, শেম্যেথান প্যাগোডা, ক্যইপুন প্যাগোডা ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে। বুদ্ধসমকালীন থেকে বর্তমান শতাব্দী পর্যন্ত দেশে-বিদেশে যতসব বৌদ্ধ বিহার গড়ে উঠেছে সবই শান্তির পীঠস্থান হিসেবে যুগ যুগ ধরে শান্তির অমিয় বাণী প্রচার করে চলেছে, ‘বৌদ্ধ বিহার’ সদ্ধর্মবাণী প্রচার ও প্রসারের কেন্দ্রস্থল শুধু নয়, ধ্যান-সমাধির অনুধ্যান, অনুশীলন, ব্রতপালন, সংযতজীবন, ত্যাগানুষ্ঠান, গুরু-দর্শন-পূজা, হিতোপদেশ শ্রবণ ইত্যাদি মঙ্গল ও কল্যাণকর মুক্ত চিন্তা-চেতনাকে লালন করে থাকেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক এবং সর্বজনীনভাবে প্রবেশাধিকার রয়েছে এ প্যাগোডায়। রাজা-মহারাজা, ধনী-শ্রেষ্ঠী থেকে অতি সাধারণ মানুষের জন্য সকাল-সন্ধ্যা উন্মুক্ত থাকে এসব প্যাগোডা, যা বিশ্ববাসীর অন্তর জয় করার মতো অতি পবিত্রতম স্থান। রাজা বিম্বিসার থেকে শুরু করে আজ অবধি যেসব বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সবই মানুষের তীর্থভূমি নামে খ্যাত। মহামতি অশোক সমগ্র জম্বুদ্বীপে ৮৪ হাজার ধর্মস্তূপ নির্মাণ করে সারা বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, জাপানের মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু ফুজি গুরুজির পরিকল্পনা ও বদান্যতায় জাপানে এবং ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে কয়েকটি বিশ্বশান্তি প্যাগোডা স্থাপন করে বিরল কীর্তি রেখে গেছেন, যা পূর্ব ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করে এসেছে। শাস্ত্রে আছে, ‘কীর্তি যস্যশ্চ সজীবতী’ অর্থাৎ কীর্তিমান মাত্রই আপন কীর্তি মহিমায় ভাস্বর।
এদেশের মাটি খনন করলেই এ অমরস্মৃতি ভেসে ওঠে। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদির প্রচার ও প্রসারের মূল কেন্দ্রস্থল হিসেবে এসব বিহারের ভূমিকা অসাধারণ। ভারত এবং বঙ্গভূমির বিভিন্ন এলাকায় যে-সকল পুণ্যতীর্থ গড়ে উঠেছিল কালের বিবর্তনে অশুভ শক্তির করালগ্রাসে দ্বাদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও ১৮৬৪ সালের কিয়ৎকাল পূর্বে বৌদ্ধদেশ আরাকান ও রেঙ্গুনের সঙ্গে নতুন করে যোগসূত্র তৈরি হওয়ার পর বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মীয় পরিবেশ অনেককেই আকৃষ্ট করেছে।
এ মহাজাগরণের প্রবাদপ্রতীম সাংঘিক পুরোধা ছিলেন মহামান্য সংঘরাজ ভদন্ত সারমেধ মহাস্থবির। তাঁর মহান আদর্শে উদ্দীপ্ত হয়ে সর্বপ্রথম সাতজন রাউলি পুরোহিতগণ পুনরায় থেরবাদ বুদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়ে এ জাগরণকে ত্বরান্বিত করেছেন। সবচেয়ে গৌরবের সংবাদ হলো রাজমাতা কালিন্দী রাণী পুণ্যশীলা সেই পুণ্যপুরুষের কাছে দীক্ষিত হয়ে সমগ্র পার্বত্য এবং সমতল বৌদ্ধদের মধ্যে নতুন করে সদ্ধর্মের গতিধারাকে মহাপ¬াবনে সূচিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে বিরল সাংঘিক মনীষা সর্বজনশ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ আচারিয় পূর্ণাচার মহাস্থবির, রাজগুরু শ্রীমৎ ভগবানচন্দ্র মহাস্থবির, দার্শনিক শ্রীমৎ বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির, রাজগুরু শ্রীমৎ ধর্মরতœ মহাস্থবির, রাজগুরু শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবির প্রমুখ মহাত্মাগণের দূরদর্শী ধর্মীয় চেতনা, সমাজসংস্কার এবং সদ্ধর্মের উন্মেষে অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখে গেছেন, যা কালের সাক্ষী হয়ে আছে।
বর্তমান সময়ে তাঁদেরই যোগ্য উত্তরসূরি সাধকদের মধ্যে মহাসাধক যিনি সম্প্রতি পরিনির্বাণ শয্যায় শায়িত আছেন আর্যপুরুষ ভদন্ত সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তে, তাঁর সাধনপীঠ ছিল রাঙামাটিস্থ রাজবন বিহারে। তাঁর শ্রামণ্য জীবন থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধ্যান-সমাধিতে রত ছিলেন (স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পূর্ব দিন পর্যন্ত)। আমার জীবনে লাভ করা এত বড় মাপের সাধক সিংহপুরুষ বঙ্গভূমিতে বর্তমান সময়ে সত্যিই দুর্লভ। তাঁর মতো ধ্যান-জ্ঞান, ব্রহ্মচর্য জীবনাচার, ত্যাগদীপ্ত নির্লোভ, নির্মোহ জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত জ্ঞানতাপস যে-কোনো জাতিতে বিরল। তিনি এ পর্যন্ত যে সকল এলাকায় গেছেন এবং অবস্থান করেছেন সেসব এলাকা পুণ্যতীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান রাজবন বিহার এরই জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি সংকল্প করেছেন যে, এই রাজবন বিহার প্রাঙ্গণে একটি ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ স্থাপন করা। তাঁর জীবদ্দশায় তা স্থাপন করা সম্ভব না হলেও ইতোমধ্যে ‘প্যাগোডা’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে এই পুণ্যতীর্থভূমিতে। এর আনুমানিক ব্যয়ভার নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫০ (পঞ্চাশ) কোটি টাকার অধিক। এর নকশা যেমন অভিনব ও আকর্ষণীয়, তেমনি শৈল্পিক কারুকার্যও অভূতপূর্ব।
বিশ্বায়নের যুগ-সন্ধিক্ষণে প্রাচীন সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এ জাতীয় ‘প্যাগোডা’ প্রতিষ্ঠা সময়োপযোগী। সমতল এবং পার্বত্যবাসী প্রায় ১৪/১৫ লক্ষ মানুষের পক্ষে আর্থিক, কায়িক শ্রম প্রদানে নিষ্ঠাবান হলে কয়েক বছরের মধ্যে তা বাস্তবে রূপদান করা অতি সহজ হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি নব ইতিহাসের গোড়াপত্তন হবে। দেশি-বিদেশি ভ্রমণার্থীদের কাছে বিশাল তীর্থভূমিতে পরিণত হবে। পরম পুরুষের দীর্ঘ জীবনের সৃষ্টিশীল প্রত্যাশা শুধু পূরণ হবে না, বরং তাঁর প্রত্যাশাকে ভিত্তি করে আমরা বিপুল পুণ্য সঞ্চয়ের সৌভাগ্য লাভ করেছি। এরূপ অপরিমেয় পুণ্যের সুযোগ করে দিয়েছেন বলে তিনি মহাকল্যাণমিত্রের আসন গ্রহণ করে আছেন আমাদের সবার অন্তরে। মহাপুরুষ মাত্রই মহামানবীয় গুণের মূর্তপ্রতীক হিসেবে জীবিতাবস্থায়ও সর্বপ্রাণীর কল্যাণমিত্র এবং পরিনির্বাণের পরও আরও বড় মাপের কল্যাণমিত্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন—এটাই বাস্তবতা। আমরা যদি তাঁর মহাজীবন ও বাণীর নীতিমালাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলন ঘটানোর দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হই, তাতে করে আত্মকল্যাণও হবে, পর কল্যাণেও বাতাবরণ তৈরি করবে। তিনি (বনভন্তে) আজ এমন উচ্চমার্গের জ্ঞানতাপস এবং সাধক পুণ্যপুরুষ, যাকে এক পলক দর্শন, পূজো ও মুখনিঃসৃত বাণী শ্রবণের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসতে দেখা যায় অসংখ্য ভক্তপ্রাণ নর-নারীকে। যেখানে সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িকতামুক্ত চিন্তা-চেতনাকে অন্তরে লালন করে মহামিলন মেলায় পরিণত করেছে। অথচ তাঁর সব কথা ও দেশনার বিষয়বস্তু বোধগম্যে আনয়ন করা সকলের পক্ষে সম্ভবপর না হলেও অন্তরের গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা, পূজো উপকরণ প্রদানে কোনোরকমের কুণ্ঠাবোধ পরিলক্ষিত হয়নি। এখানেই পরিষ্কার ভাষায় বলতে দ্বিধা নেই জীবিত বনভন্তের চেয়ে নশ্চর দেহত্যাগী বনভন্তে এখন অনেক অনেক বড় বললেও অত্যুক্তি হয় না। তাঁর সাধনজীবন ও ব্রহ্মচর্য জীবনের কৃত সংকল্প এখনো পর্যন্ত কোনোটাই অপূর্ণ থাকেনি। দৈবশক্তির ন্যায় একটার পর একটা আশ্চর্যজনকভাবে পরিপূর্ণতা লাভ করে চলেছে। এটা বর্তমান এবং জন্ম-জন্মান্তরের অসীম ত্যাগ ও সাধন-ভজনের প্রত্যক্ষ সুফল বলা যায়।
বিশ্বায়নের যুগ-সন্ধিক্ষণে তাঁর মহান ভিক্ষুত্ব জীবনের একটি মহাপরিকল্পনা ছিল তাঁরই সাধনপীঠে ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে করে সর্ব সম্প্রদায়ের মানুষের মহামিলনের মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতিভাব, মৈত্রীচেতনা, সৌভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধন তৈরি হয়ে থাকবে। থাকবে না পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও অমৈত্রীসুলভ আচার-আচরণ। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর জীবদ্দশায় এই শান্তির প্যাগোডা দেখে যেতে না পারলেও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি, অসংখ্য ভক্তপ্রাণ, ধনাঢ্য সরলপ্রাণ ব্যক্তিদের বদান্যতা এবং বর্তমান লেখকের আন্তরিক সহায়তা দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতায় আশা করি তাঁর এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতিশীলতা লাভ করবে। উল্লেখ্য যে, মহামান্য ১০ম সংঘরাজ মহাপ-িত শ্রীমৎ জ্যোতিপাল মহাথের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বৌদ্ধ শশ্মানে ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বহুদিন আগে থেকে গ্রহণ করলেও তা এখনো বাস্তবরূপ পায়নি। তা ছাড়া চৈত্যভূমি নামে খ্যাত বন্দর-নগরী চট্টগ্রামের বুকে বুড্ডিস্ট রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেন্টার, বাংলাদেশ এর পক্ষে বৌদ্ধদেশ থাইল্যা- এর ধর্মকায়া ফাউন্ডেশনের সার্বিক সহায়তায় আরেকটি বিশ্বশান্তি প্যাগোডা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হাতে নেওয়া হয়েছে কয়েক বছর আগে থেকে। আশা করি এই উদ্যোগ কিছুদিনের মধ্যে বাস্তবায়নে কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এ ব্যাপারে একটি অভিনব নকশা ও মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বরাবরে অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে।
বলা বাহুল্য, রাজবন বিহারে বর্তমান যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এটা পুণ্যপুরুষের অপ্রমেয় পুণ্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবে দ্রুত রূপ লাভ করবে বলতে পারি। এই মহাপুরুষের মুখের প্রচারিত অমূল্য বাণী একদিকে অসুন্দর জীবনে সুন্দর, পথভ্রষ্ট জীবনকে সত্য পথে, অকল্যাণজনক চিন্তাচেতনাকে মঙ্গল ও কল্যাণের পথে, দুঃখময় জীবনকে আত্মজয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার সোপান তৈরির দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন আমৃত্যু তিনি। আজ তিনি মৃত্যুঞ্জয়ীর পথ উন্মুক্ত করার দৃষ্টান্ত যেমনি রেখে গেছেন তেমনি বিশ্বশান্তি প্যাগোডা গড়ে উঠার পেছনে সবাইকে আশীর্বাদ দানেও পরিতৃপ্ত করেছেন। মৈত্রীচেতনা ব্যতীত এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবরূপ লাভ খুবই কঠিন। সবাই আসুন পরস্পরের মৈত্রীচেতনাকে অন্তরে পোষণ করে মহান গুরুর মহাপরিকল্পনাকে সবার কাছে উপস্থাপন করি—এটাই সময়ের দাবী। শান্তি মুখে নয় কাজে, ত্যাগে ও মহানুভবতায়। সর্বোপরি পুণ্যপুরুষের আশীর্বাদপুষ্টের মাঝেই মহাশান্তি, মহাক্ষেম/মহাপুণ্য, মহাপ্রেম। এ প্রসঙ্গে কাব্যিক ছন্দে বলতে হয় :

বঙ্গভূমি, অপার বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কীর্তিগাথা।
বিশ্বশান্তি প্যাগোডা অপার আনন্দের তীর্থভূমি
সবার মিলনক্ষেত্র, নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ
জাতি নেই, ধর্ম নেই, বর্ণ নেই, নেই কোনো সাম্প্রদায়িকতা,
আসুন, চলুন, বসুন, সবাই কিছুক্ষণ আনন্দানুভব করি।
অপূর্ব প্রশান্তি, এমনতর শান্তিনীড় কোথায় খুঁজে পাই।
ভোগবিলাসে মত্ত যারা অশান্তি পান তারা।
কামনা-বাসনা, লোভ-দ্বেষ-মোহে আচ্ছন্ন সদা চঞ্চল তারা।
হীন চেতনা, হীন দৃষ্টি মানুষকে করে ভ্রান্ত।
সৎ চেতনা, শুভ বুদ্ধি না জাগে তাদের অন্তরে
মানবতা, মনুষ্যত্ব মানবপ্রেম হয় ভূলুণ্ঠিত।
জগতে আবির্ভূত হলো সিদ্ধার্থ গৌতম
ত্যাগ-সাধনা, নির্লিপ্ত বৈরাগ্য জীবন করলো বরণ।
অর্জিত হলো বুদ্ধজ্ঞান, প্রচারিল শান্তির বাণী।
বিশ্বশান্তি, বিশ্ববার্তা জাগালো জগৎ-মাঝে
প্যাগোডা হলো পীঠভূমি, শান্তির অমিয় বারতা।
রাজবন বিহার অতি পবিত্র, সর্বজনীন এক মহাপুণ্যতীর্থ
নবরূপ লভ তব ‘বিশ্বশান্তি প্যাগোডা’,
আজি তব নব ইতিহাস হলো শুভ সূচনা
শান্তির বার্তাবাহী আজ পবিত্র তীর্থ হলো ধন্য।
জয় হোক তব জয়। 
লেখক : ড. জিনবোধি মহাথের, অধ্যাপক, প্রাচ্যভাষা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, আন্তর্জাতিক সাংঘিক ব্যক্তিত্ব ও প্রাবন্ধিক।

Print Friendly, PDF & Email