log1

বনভন্তের আদর্শ চিরকাল বেঁচে থাকবে

বনভন্তের আদর্শ চিরকাল বেঁচে থাকবে
প্রফেসর ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া
গৌতম সম্যকসম্বুদ্ধের অনুসারী ভিক্ষুসঙ্ঘ ও গৃহীসঙ্ঘরাই তাঁর ধর্মকে আড়াই হাজার বছরেরও অধিক কাল ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে। মানবতাবাদী এই বুদ্ধধর্ম মানবজাতিকে দুঃখ থেকে মুক্তির সঠিক পথ দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা হচ্ছেন সংসারত্যাগী সাধক সন্ন্যাসী। পুরোহিত হিসেবে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর ভূমিকার চেয়ে একজন সাধক ভিক্ষুর ভূমিকা অর্জন অবশ্যই কঠিন। মানবজাতির মধ্যে জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের ক্ষেত্রে সাধকের জ্ঞান বিস্তৃতি ও পরিধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর কারণ হলো বুদ্ধ দুইটি ধুর বা পথের কথা বলেছেন, একটি হচ্ছে গ্রন্থধুর আরেকটি হচ্ছে বিদর্শন ধুর। গ্রন্থধুর, জ্ঞানবান হওয়া যায়, কিন্তু বিদর্শন ধুরে প্রজ্ঞাবান হওয়া যায়। বিদর্শন ধুরে অগ্রসর হয়ে প্রজ্ঞাবান হওয়া সাধনায় কঠোরভাবে ব্রতী হতে হবে।
এই রকম কঠোর সাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন বনভন্তে। বনে জঙ্গলে গুহায় একাকী নিরবচ্ছিন্ন সাধনার মধ্য দিয়ে একজন মহান অধ্যাত্ম পুরুষ হিসেবে শুধু এদেশে নয় বিশ্বেও প্রতিভাত হয়েছে। কথায় আছে, ধর্মের সুবাতাস বাতাসের বিপরীতেও প্রবাহিত হয়। বনভন্তের সাধনার জ্ঞানলব্ধ সুবাতাস দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ে। তিনি হয়ে উঠেন একজন পূজ্য পুরুষ। আবার দেখা গিয়েছে তিনি বই পড়তেও ভালোবাসেন। তাঁর মধ্যে জ্ঞান সঞ্চয়ের স্পৃহা ছিল প্রবল। তাঁর সান্নিধ্যে যাঁরা এসেছেন তাঁদের প্রত্যেকের মনে এরকম একটা জ্ঞান আহরণের সুপ্রবৃত্তি জেগে উঠাই স্বাভাবিক।
প্রবাদ আছে, Face is the index of mind.IMG_0060_resize যাঁরা একবার বনভন্তেকে দর্শন করেছেন, তাঁরা প্রতিনিয়ত তাঁকে দর্শন করার প্রবৃত্তি জেগে উঠে এবং সেটিই স্বাভাবিক। প্রতিদিন দর্শনার্থীদের ও দেবতাদের তিনি যে জ্ঞান দান করতেন এতে প্রত্যেকে অকুশল চিন্তা দূরীভূত করে কুশল চিন্তায় নিমজ্জিত হতো। অষ্টাঙ্গ-সমন্বিত মার্গে সম্যক প্রচেষ্টা একটি অঙ্গ। চার প্রকার সম্যক প্রচেষ্টার মধ্যে কুশল কর্মকে বর্ধন করা একটি প্রচেষ্টা। এই কুশল কর্মকে বর্ধন করার প্রতিনিয়ত বর্ধনের মধ্যে থাকে আত্মশক্তির প্রবল ইচ্ছা। একজন সাধকের পক্ষেই এই নিরবচ্ছিন্ন আত্মশক্তির উদ্বোধন সম্ভব। গৃহীদের পক্ষে এটি অতীব কঠিন কাজ বা প্রত্যয়। গৃহীরা পারিপার্শ্বিকতার কারণে কুশলকে প্রবৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে তা প্রায়শই নানাবিধ কারণে হয়ে উঠে না।
এই লিখা যখন লিখছিলাম তাঁর উনিশ দিন আগে কক্সবাজারের রামু, ১৮ দিন আগে উখিয়ায় ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় ও কোলাগাঁওয়ে বৌদ্ধ বিহারগুলোতে ও বসতবাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলায়, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ফলে ১২টি বৌদ্ধ বিহার পরিপূর্ণভাবে ভস্মীভূত, নয়টি বৌদ্ধ বিহার ভেঙেচুরে তছনছ হয়েছে তা ছিল স্মরণাতীতকালে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধদের উপর বৃহত্তম হামলা। ২৮টি বৌদ্ধ বসতবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে একেবারে ভস্মীভূত করা হয়েছে। এই ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক পৈশাচিক ঘটনায় বাংলাদেশের বৌদ্ধদের মধ্যে আজো ভীতি ও আতংক বিরাজ করছে, যা কবে দূর হবে তা বলা অসম্ভব।
আমরা জনমুখে শুনেছি বনভন্তে নাকি কোনো এক সময় বলেছিলেনÑ বৌদ্ধদের উপর ভবিষ্যতে বড় ধরণের একটা হামলা আসবে। ঠিকই, এই হামলায় বৌদ্ধ পুরাকীর্তি, সভ্যতা, ইতিহাস, পুরানো পুঁথি, ত্রিপিটক ধ্বংস করা হয়েছে। প্রায় ১৩শ শতাব্দীতে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে বৌদ্ধ ও বুদ্ধধর্মকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। এর ফলে বুদ্ধধর্ম আরো বিস্তৃতি লাভ করে এবং এশীয় দেশসমূহে বুদ্ধধর্মের বিস্তার বিকশিত হয়। রামু, উখিয়া, টেকনাফ, পটিয়ার হামলায় বিশ্ব মানবসমাজে বুদ্ধধর্মের প্রতি আরো বেশি করে সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বৌদ্ধদের এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিজয়। বাংলাদেশের বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বৌদ্ধরা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত, এতে করে বাংলাদেশকেই হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। যারা এই হামলা করেছে তাদের কী লাভ হয়েছে জানি না, তবে তারা বাংলাদেশকে কলঙ্কের কালিমায় লিপ্ত করেছে, কপালে কপালের তিলক এঁকে দিয়েছে।
বৌদ্ধরা কর্মফলে বিশ্বাস করে। এই নৃশংস ঘটনা হয়তো বৌদ্ধদের পূর্বজন্মের সামগ্রিক কর্মফলের প্রতিফলন। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে কোনো কিছুই ধামাচাপা থাকে না। এই ঘটনাও মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বহু দেশে বৌদ্ধরা বিক্ষোভ করেছে। বাংলাদেশের দূতাবাসে স্মারকলিপি দিয়েছে, জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে। আমাদের সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়েছেন; বৌদ্ধদের আশ্বস্ত করেছেন, সহায়তা দিয়েছেন এবং আরো দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিদিনই সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দরা যাচ্ছেন, বৌদ্ধদের অভয়বাণী শোনাচ্ছেন, সহানুভূতি প্রকাশ করছেন। বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দরা তো প্রতিনিয়ত যাচ্ছেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে যে ফাটল ধরেছে, তা কীভাবে জোড়া লাগাবে তা কেউ-ই বলতে পারছে না। এই একটি বিষয়ে আমরা সকলে বনভন্তের আশীর্বাদ কামনা করি। সাধারণভাবে বৌদ্ধ ও মুসলিম ভাইদের মধ্যে মনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সেই দূরত্ব কমাতে হলে উভয়ের মধ্যে সহৃদয় সৌভ্রাতৃত্বের মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। তজ্জন্য প্রয়োজন মানুষ হিসেবে মনুষ্যত্ববোধের শুভ উদ্বোধন। একটি দেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিণত করতে হলে সেই দেশের নাগরিকের প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত মানুষ হিসেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমাদের পরিচয় যখন ধর্মের সীমিত গ-ির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে তখন দেশের নাগরিক হিসেবে মানুষ হিসেবে আমরা বিভাজিত হয়ে পড়ি। তখনই শুরু হয় দ্বন্দ্ব, সংঘাত, পারস্পরিক অনাস্থা, অবিশ্বাস।
বনভন্তের উপদেশ ছিল এই সমস্ত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মনুষ্যত্ববোধের বিকাশ সাধন করা। সেই মনুষ্যত্ববোধের বিকাশ সাধন করতে হলে ‘পঞ্চশীল পালনই হচ্ছে উপযুক্ত পথ’—যা সর্বস্তরের মানুষকে তিনি প্রতিনিয়ত উপদেশ দিয়েছিলেন। পঞ্চশীল একদিকে যেমন বিশ্বশান্তি, অপরদিকে মানুষকে সত্যপথে চলার এক মহাপথ। প্রত্যেকে স্ব স্ব অবস্থানে থেকে পরিশুদ্ধ মন নিয়ে মানবতার জয়গানই হচ্ছে পঞ্চশীলের অপার বৈশিষ্ট্য। সুদীর্ঘ আড়াই হাজার বছরেরও বেশিকাল ধরে পঞ্চশীল সব সময় মানবতার জয়গান গেয়ে আসছে, মানবজাতিকে দিয়েছে পুষ্পিত প্রস্ফুটিত বাগানের ফুলের সুগন্ধি। তাই আজ বিশ্বের অনেক সচেতন জ্ঞানবান মানুষ পঞ্চশীলের উপর গবেষণা করছে। পঞ্চশীলকে অনুসরণ করে চলেছে উন্নত পরিশীলিত জীবন।
বনভন্তের উপদেশ যদি কেউ সঠিকভাবে প্রণিধান করতে সক্ষম হোন, তাহলে অবশ্যই তাঁর জীবন সুখময় হবে। বনভন্তে প্রবারণা পূর্ণিমার এক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ধর্মোপদেশে বলেছেন, ‘সত্য ও জ্ঞান লাভ হইলে সুখ হয় আর মিথ্যা ও অজ্ঞান হইলে দুঃখ উৎপত্তি হয়।’ [সুনীতি বিকাশ চাকমা (চক্ক)] পৃঃ ১২ বনভন্তে জন্মস্মারক ’১০, রাজবন বিহার, রাঙামাটি। বনভন্তে আরো বলেছেন, ‘সত্য ও জ্ঞান হওয়ার জন্য প্রবারণা অধিষ্ঠান করা। প্রবারণা অধিষ্ঠান করার লক্ষ্য হইতেছেÑ সত্য ও জ্ঞানের অনুসারী হওয়া। তাহা হইলে প্রবারণা অধিষ্ঠান করিয়া সুখ লাভ হইবে’।
উপরি-উক্ত উপদেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। আমরা যারা প্রবারণা অধিষ্ঠান করি বিশেষ করে ভিক্ষুসঙ্ঘরা তাঁরা সকলেই এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। প্রকৃষ্টরূপে অকুশলকে বারণ ও প্রকৃষ্টরূপে কুশলকে বরণের নামই প্রবারণা। অকুশলের বারণের মধ্য দিয়ে সত্য ও জ্ঞানের উপলব্ধি সম্ভব। সত্যকে জানাই হচ্ছে জ্ঞান। সেই জ্ঞানীই সুখী হয়।
বুদ্ধের আবিষ্কার হলো চারি আর্যসত্য। অর্থাৎ জগতে দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের নিরোধ সম্ভব, দুঃখ নিরোধের উপায়। এই সত্য উপলব্ধি করা অতীব কঠিন কাজ। যাঁরা এই সত্যগুলো উপলব্ধি করতে পেরেছেন তাঁরাই জ্ঞানী। সত্য ও জ্ঞান একে অপরের পরিপূরক। সত্যকে উপলব্ধির মাধ্যমেই জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। বুদ্ধের আবিষ্কার-অনুযায়ী শীলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ভাবনার মাধ্যমে লোকোত্তর প্রজ্ঞায় উন্নীত হয় একজন সাধক। প্রজ্ঞা প্রদীপ্ত হওয়া ও জ্ঞানপ্রদীপ্ত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। তবে প্রজ্ঞাপ্রদীপ্ত হবার জন্য সকলকেই অবশ্যই জ্ঞানপ্রদীপ্ত হতে হবে।
সর্বজনশ্রদ্ধেয় মহাসাধক বনভন্তে জ্ঞান প্রদীপ্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রজ্ঞা প্রদীপ্ত মহান ভিক্ষু, যিনি সমাজ, দেশ, জাতিকে সত্যের পথে পথ দেখিয়েছেন। এহেন মহান সাধককে জানাই বিনম্র বন্দনা, শ্রদ্ধা, অন্তরের অনাবিল প্রণতি। বনভন্তের আদর্শ চিরকাল বেঁচে থাকুক। 

লেখক : প্রফেসর ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়–য়া, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের যুগ্ম মহাসচিব। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ব বৌদ্ধ নেতা, শিক্ষাবিদ, সংগঠক, প্রাবন্ধিক, ধর্মরতœ, উপাসকরতœ সম্পাদক

Print Friendly, PDF & Email