log1

Sadhanananda (Banabhante) Central Library

৭ম শতাব্দীতে গড়ে উঠা বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠ নালন্দা বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে রত্নসাগর, রত্নদধি ও রত্নরঞ্জিকা নামে তিনটি সুবিশাল লাইব্রেরী ভবন ছিল বলে জানা যায়। সেই লাইব্রেরীতে থেরবাদ ও মহাযান বৌদ্ধধর্মের গ্রন্থ ছাড়াও বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ, গণিত, জ্যোতিষ বিদ্যাসহ বহু শাস্ত্রের অজস্র গ্রন্থরাজি সংগৃহীত ছিল। চৈনিক পরিব্রাজক, জ্ঞানতাপস হিউয়েন সাঙ সুদূর চীন থেকে এসে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুদীর্ঘকাল অধ্যয়ন করেছিলেন। বলা যায়, এই বিদ্যাপীঠের পাদমূলে বসে মহাজ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন। অধ্যয়ন শেষে স্বীয় দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি এখান থেকে বহু ধর্মগ্রন্থ নিয়ে যান। পরবর্তীকালে তিনি সেগুলো চীনা ভাষায় অনুবাদ করেন। আর চীনে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই থেকে সহজেই অনুমিত হয় যে, ধর্ম প্রচারে ও শিক্ষায় গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য| গ্রন্থ দেশ, জাতির অমূল্য সম্পদ।

মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর নেতৃত্বে যখন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করা হয়, তখন তাদের অন্যতম ধ্বংসলীলার লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীটি। তাদের হিংস্রতার আগুনে ভস্মীভূত হয় রত্নসাগর, রত্নদধি ও রত্নরঞ্জিকা নামে তিনটি লাইব্রেরী। হাজার হাজার গ্রন্থরাজি, পুথিপত্র ছয় মাস ব্যাপী আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

বিশ্বকবি রবি ঠাকুর তাঁর “লাইব্রেরী” প্রবন্ধে বলেছেন, ‘লাইব্রেরীর মধ্যে আমরা সহস্র পথের চৌমাথার উপরে দাঁড়াইয়া আছি। কোনো পথ অনন্ত সমুদ্রে গিয়াছে, কোনো পথ অনন্ত শিখরে উঠিয়াছে, কোনো পথ মানব হৃদয়ের অতল স্পর্শে নামিয়াছে। যে যেদিকে ধাবমান হও, কোথাও বাধা পাইবে না। মানুষ আপনার পরিত্রাণকে এতটুকু জায়গার মধ্যে বাঁধিয়া রাখিয়াছে।’ শিক্ষান্বেষী মানুষের কাছে লাইব্রেরী এক চিরকাঙ্ক্ষিত জ্ঞান-তীর্থ। সেখানে সে জ্ঞানের এক শাশ্বত ধারার স্পর্শ পায়, খুঁজে পায় এক দুর্লভ ঐশ্বর্যের খনি। লাইব্রেরী জ্ঞানান্বেষী মানুষের নিকট নীরব আলাপনের পবিত্র বিদ্যাপীঠ সদৃশও। এখানে চিন্তাবিদ পায় তার নানামুখি চিন্তার খোরাক; ভাবুক পায় ভাব-রসের সন্ধান, দুরূহ জিজ্ঞাসার উত্তর। এসব থেকে বিবেচনা করলে লাইব্রেরী জ্ঞানপিপাসু ও ভাব-তৃষ্ণিত সহস্র চিত্তের তৃপ্তি-সরোবর। লাইব্রেরীর সান্নিধ্যে আসলে জনসাধারণের চিত্তের বিকাশ ঘটে। তাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পায়, চিন্তাশক্তি বিকশিত হয়, বিবেক বোধ জাগ্রত হয়। মানুষের মানসিক সম্পদের লালনক্ষেত্র হল এই লাইব্রেরী। পূজ্য বনভন্তে এসব কথা ভালোভাবেই জানেন। আর তাই তো রাজবন বিহারে একটি পূর্ণাঙ্গ লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি দেশনায় বলতে থাকলেন, “আমি রাজবন বিহারে সম্পূর্ণ ত্রিপিটক শাস্ত্র সংগ্রহ করেছি। পালি শিক্ষার ব্যাকরণাদিসহ অনেক পুস্তকের ভাণ্ডার জমা হয়েছে বিহারে। বুদ্ধধর্ম সম্পর্কিত সব বই-ই রয়েছে এই সংগ্রহে। অন্য কোনো বিহারে এতগুলো বই নেই। এ সমস্ত বই ভালোভাবে সংরক্ষণের জন্য একটি লাইব্রেরী দরকার। তিনতল বিশিষ্ট একটি ভবন তৈরী করে সহসা রাজবন বিহারে একটি পূর্ণাঙ্গ লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করতে হবে”।

ভন্তের এই লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার কথা শুনে ভিক্ষুসঙ্ঘ বিশেষভাবে প্রভাবন্বিত হলেন। সেই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপস্বরূপ লাইব্রেরী ভবনের ডিজাইন, নকশা তৈরী করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। ভবনটি যাতে দৃষ্টিনন্দন, আকর্ষণীয় ও আধুনিক সুবিধাসম্বলিত হয়, তজ্জন্য Disha drsign Assoiate, Chittagong-Gi সাথে যোগাযোগ করা হল। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার স্থপতি আশীষ চাকমা রাজবন বিহার, রাঙামাটিতে আসলেন। ভিক্ষুসঙ্ঘের সাথে তার এ ব্যাপারে আলোচনা হল। আলোচনা সাপেক্ষে তিনি ডিজাইন তৈরীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। বলা বাহুল্য, পূজ্য বনভন্তে কী ধরনের লাইব্রেরীর কথা বলেন, সেই সম্বন্ধেও তাকে জ্ঞাত করা হলো। মাস তিনেক পরে স্থপতি আশীষ চাকমা রাজবন বিহারে আসলেন। জমা দিলেন পূজ্য ভন্তের কাঙ্ক্ষিত লাইব্রেরী ভবনের পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান, ডিজাইন। ভিক্ষুসঙ্ঘের সামনে পরিকল্পিত লাইব্রেরী ভবনের ডিজাইন উপস্থাপন করা হলে সবার মনঃপূত হলো। তবে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা গেল না। কয়েক বছর ফাইল বন্দি হয়ে পড়ে থাকল পরিকল্পিত লাইব্রেরীর ডিজাইন-প্ল্যানটি।

অবশেষে ২০১০ সালে নির্মাণকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ কিছুতেই বিলম্ব করা চলে না। নির্মাণসামগ্রী আনা হল প্রয়োজন মতো। সবকিছু ঠিকঠাক করার পর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু করার তারিখ নির্ধারণ করা হলো। সেই শুভদিন―২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১০ সাল, ১৪ ফাল্গুন ১৪১৬ বাংলা, রোজ বৃহস্পতিবার, সকাল নয় ঘটিকায় এক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে পূজ্য বনভন্তে তাঁর বহুদিনের ইচ্ছা লাইব্রেরী ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণকাজ উদ্বোধন করলেন। উপস্থিত ভিক্ষুসঙ্ঘ ও দায়ক-দায়িকাবৃন্দ সাধুবাদ ধ্বনি প্রদান করতে থাকলেন মধুর স্বরে| সেদিন থেকে লাইব্রেরী ভবন নির্মাণকাজ চলতে থাকল দ্রুতগতিতে।

৮ জানুয়ারি ২০১৪ সাল, ২৫৫৭ বুদ্ধাব্দ, রোজ বুধবার―একটি অন্যতম স্মরণীয় দিন রাজবন বিহারের ইতিহাসে। পূজ্য বনভন্তের ৯৫তম শুভ জন্মদিনে বিকাল ৪:০০ মিনিটে বনভন্তের শিষ্যসঙ্ঘের প্রধান ও রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির ও চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় পূজ্য বনভন্তের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত পাঁচতলা বিশিষ্ট লাইব্রেরী ভবন উদ্বোধন করেন। লাইব্রেরীটির নামকরণ করা হয় “সাধনানন্দ (বনভন্তে) সেন্ট্রাল লাইব্রেরী”। উল্লেখ্য, এটি হলো বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধধর্মীয় লাইব্রেরী।